শনিবার, ২৭ এপ্রিল, ২০১৩

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

কবে কিভাবে আওয়ামী সরকার বিদায় নেবে


রানা প্লাজায় নিহত ৩৫২; জীবিত উদ্ধার ২,৪২৮; এখনো চাপা পড়ে আছে (???)

শফিক রেহমান
২৯ ডিসেম্বর ২০০৮-এর সন্দেহজনক নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়ে ৬ জানুয়ারি ২০০৯-এ সরকার গঠন করে। এর মাত্র ৪১ দিন পর থেকে আওয়ামী সরকার স্বরূপে আবির্ভূত হতে থাকে। শান্তিপূর্ণ সহঅবস্থানের ভিত্তিতে দেশকে সামনে দিকে নিয়ে যাবার বদলে আওয়ামী সরকার মনোনিবেশ করে যথাক্রমে, ইনডিয়ার কাছে ব্যক্তি ও দলের ঋণ পরিশোধে, ষড়যন্ত্রে, মামলা দায়ের এবং প্রতিপক্ষকে জেলে পাঠানোতে, দলীয় উদ্দেশ্যসাধনে বিচারবিভাগ বশীকরণে এবং দলকে ক্ষমতায় চিরস্থায়ী করার লক্ষ্যে সংবিধান সংশোধনে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় আওয়ামী লীগের অন্তর্নিহিত চক্রান্তপ্রিয়তা ও অযোগ্যতা, যা এর আগের দুটি আওয়ামী সরকারের সময়েও দেখা গিয়েছিল, যেমন পুলিশবাহিনীসহ প্রশাসনকে দলীয়করণ, অর্থনৈতিক ম্যানেজমেন্টে অদক্ষতা, শীর্ষপর্যায় থেকে স্থানীয়পর্যায় পর্যন্ত ব্যাপক দুর্নীতি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিভিন্ন দিবস পালনে আসক্তি ও ব্যক্তিপূজায় মত্ত হয়ে নাম বদলের নেশা, প্রভৃতি।
তাই এটা কোনো আশ্চর্য নয় যে আওয়ামী সরকারের গত চার বছর চার মাস শাসনে যে পনেরটি বড় বিপর্যয় বাংলাদেশে ঘটেছে তার মধ্যে বারোটির সঙ্গেই আওয়ামী সরকার ও দলের নিবিড় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে। এই বারোটি হলো :
এক. ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৯-এ ঢাকায় পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহে ৭৩ জন নিহত, যার মধ্যে ছিলেন ৫৭ সেনা অফিসার। এই বিদ্রোহে জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও মামলা চলাকালে মৃত্যু হয় ৫৭ বিডিআর কর্মচারীর। অভিযোগ ওঠে এ ঘটনার বিষয়ে আগেই জানতেন আওয়ামী সরকারের প্রতিমন্ত্রী নানক, নেতা মির্জা আজম ও ব্যারিস্টার তাপস। ওই ঘটনায় নিহত বিডিআর চিফ, জেনারেল শাকিলের ছেলে লন্ডন থেকে দাবি করেন, ঘটনার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী আগেই জানতেন এবং সে জন্যে তিনি এই দিনে পূর্বনির্ধারিত অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পিলখানায় যাননি। সার্বিক ভাবে তদানিন্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের অযোগ্যতা এবং প্রধানমন্ত্রীর ভুল সিদ্ধান্তের ফলে পিলখানায় নিহতের সংখ্যা অনেক বেশি হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
দুই. ২০০৯ সালে আওয়ামী সরকার দেশের চলমান বিদ্যুৎ সঙ্কট মেটানোর লক্ষ্যে স্থায়ী সাশ্রয়ী পদক্ষেপ না নিয়ে এগিয়ে যায় ব্যয়বহুল কুইক রেন্টাল সিস্টেম স্থাপনে। ফলে একটি সূত্র মতে, বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের (বিপিডিবি, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড) ক্ষতি ২৫,০০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। আওয়ামী সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রাইভেট কুইক রেন্টাল কম্পানি থেকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে তা কম দামে বিক্রি করায় প্রতি বছর বিপিডিবি-র ক্ষতির পরিমাণ বেড়েই চলেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিপিডিবি-র এক কর্মকর্তা জানান, রেন্টাল পাওয়ার প্লান্ট থেকে প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুৎ কিনতে খরচ পড়ছে ১৪ থেকে ১৭ টাকা। কিন্তু গ্রাহকপর্যায়ে তা বিক্রি হচ্ছে ৭ থেকে ৮ টাকার মধ্যে। এখানে অর্ধেকই ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। ভর্তুকির যে ৯,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে তার ৮০ শতাংশই দিতে হচ্ছে কুইক রেন্টাল থেকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনায়। অর্থাৎ, রেন্টাল কম্পানিগুলো লাভ করছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড তথা সরকার এবং সাধারণ গ্রাহক, যাদের বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে।
কুইক রেন্টাল সিসটেমে যারা জড়িত তাদের মধ্যে নাম এসেছে মন্ত্রী (এবং প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয়) কর্নেল ফারুক খান ও আজিজ গ্রুপ, গার্মেন্টস রফতানিকারক মোহাম্মদী গ্রুপ, ফার্নিচার বিক্রেতা অটবি গ্রুপ, সালমান রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপ ইত্যাদি।
তিন. ১০ জানুয়ারি ২০১০-এ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিন দিনের সফরে নতুন দিল্লিতে যান। এই সফরের সময়ে দুই দেশের মধ্যে তিনটি চুক্তি ও দুটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর বাইরে আরো একটি নিরাপত্তাচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে মিডিয়ায় উল্লেখ করা হয়। এখন পর্যন্ত এসব চুক্তি সংসদে আলোচিত হয়নি। কিন্তু ২০১০ সাল থেকেই আশুগঞ্জ-আখাউড়া স্থলপথে ইনডিয়া ট্রানজিট সুবিধা নেয়। ইনডিয়ানরা তাদের হেভি লরি চলাচলের জন্য ১৬টি কালভার্ট বন্ধ করে দেয় এবং তিতাস নদীর দুটি স্থানে পানিপ্রবাহ বন্ধ করে দেয়। ফলে বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলে গুরুতর পরিবেশ বিপর্যয় ঘটে। বিষয়টি দৈনিক নয়া দিগন্তে এই লেখক কর্তৃক প্রকাশের পরে ইনডিয়ানরা সাময়িকভাবে ওই স্থলপথে তাদের লরি চলাচল বন্ধ করে দেয়।
চার. ২০১০-এর শেষাংশে শেয়ারবাজার কেলেংকারিতে একটি হিসাবে দেশের ৩৩ লক্ষ বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যদি প্রতিটি বিনিয়োগকারীর পেছনে পাচজন আত্মীয়-বন্ধু সেকেন্ডারি বিনিয়োগকারী থাকে, তাহলে দেশে মোট ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা হবে এক কোটি ৬৫ লক্ষ। অর্থাৎ দেশের এক-দশমাংশ জনসংখ্যার কিছু বেশি। ডেইলি স্টার (১০.১০.২০১০)সহ কয়েকটি পত্রিকা এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের হুশিয়ারি সত্ত্বেও, শেয়ারবাজার বিপর্যয়ের মুখে এগিয়ে যেতে থাকে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহ উপেক্ষা করে চলে আগাম সতর্কবাণীগুলো। নভেম্বর ১৯৯৬-এ আওয়ামী সরকারের সময়ে যেমন শেয়ারবাজারে ধস নেমেছিল, তার পুনরাবৃত্তি ঘটে পনের বছর পরে আবার চলতি আওয়ামী সরকারের সময়ে অক্টোবর ২০১১-এ।
ুদ্র বিনিয়োগকারীরা নিঃস্ব হয়ে যান। দিশাহারা বিনিয়োগকারীরা মতিঝিলে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ মিছিল করলে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান বলেন, ‘ওরা দেশের শত্রু। সমাজের শত্রু। ওদের জন্য মাথা ঘামানোর কোনো কারণ নেই। তাদের কষ্টে আমার মন কাদে না। শেয়ারবাজার ধসে সরকারের মাথাব্যথার কিছু নেই। কারণ শেয়ারবাজারে পুজি প্রকৃত বিনিয়োগে যায় না… শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীরা দেশের অর্থনীতিতে কোনো অবদান রাখে না।’ (আমার দেশ ২১.০১.২০১১)
অর্থমন্ত্রী এ এম এ মুহিত একপর্যায়ে সংসদে বলেন, ‘আমি জানি আমি দেশের সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তি।’
এই কেলেংকারিতে যারা জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে তাদের মধ্যে আছেন, ম্যানপাওয়ার বিজনেসম্যান খ্যাত জনৈক আওয়ামী এমপি এবং শেখ মুজিবুর রহমানের বড় ছেলে শেখ কামালের সেই সময়ের বন্ধু ও বর্তমানে “দরবেশ” রূপে খ্যাত ব্যক্তি, প্রমুখ।
পাচ. ১১ ডিসেম্বর ২০১১-তে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্টে অংশ নিতে আদিষ্ট হয় চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে কিছু স্কুলছাত্র। ওই টুর্নামেন্টে অংশ নিতে যাবার পথে ট্রাক উল্টে ৫৩ স্কুলছাত্রের মৃত্যু হয়।
ছয়. দীর্ঘকাল জুড়ে বিভিন্ন দিক থেকে মালটিলেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) কম্পানি ডেসটিনি গ্রুপের বিরুদ্ধে আওয়ামী সরকারকে বারবার সতর্ক করে দেওয়া সত্ত্বেও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি তারা। সম্ভাব্য কারণ ছিল, এই গ্রুপের প্রেসিডেন্ট পদে ছিলেন অন্যতম সেক্টর কমান্ডার ও কট্টর আওয়ামীপন্থী রূপে পরিচিত সাবেক সেনাপ্রধান লে. জে. হারুন-অর-রশিদ।
অবশেষে ১১ জুলাই ২০১২-তে দুদক বাধ্য হয় পদক্ষেপ নিতে। ডেসটিনির ৩,২৮৫ কোটি টাকা মানিলন্ডারিং ও আত্মসাতের মামলায় জেনারেল হারুনকে টানা সাত ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক তদন্ত টিম। ওই তদন্তে দুদক জানতে চায় জেনারেল হারুনের ব্যাংক একাউন্টে ২০ কোটি টাকা ঢুকল কিভাবে? উত্তরে হারুন বলেন, ‘মাসিক সম্মানী, ডিভিডেন্ড ফান্ড, এলাউন্স, কমিশন বাবদ এই টাকা আমার একাউন্টে ঢুকেছে। এ ছাড়া কিছু টাকা বাড়িভাড়া থেকেও এসেছে।‘ (যুগান্তর ৫.১১.২০১২)
হাইকোর্ট জেনারেল হারুনকে আটটি শর্তসাপেক্ষে জামিন দেন। তবে ডেসটিনি গ্রুপের ম্যানেজিং ডিরেক্টর মোহাম্মদ রফিকুল আমীন, ডিরেক্টর দিদারুল আলম ও ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসাইন-কে জেলে যেতে হয়। ডেসটিনির বিরুদ্ধে অর্থের অবৈধ ব্যবহার সংক্রান্ত দুটি মামলায় আসামির সংখ্যা ২২ হলেও ১৮ জনই পলাতক হয়। ডেসটিনি সংশ্লিষ্ট ৫৩৩ ব্যাংক একাউন্ট জব্দ করা হলেও তাদের অঙ্গসংগঠন বৈশাখী টেলিভিশনের একাউন্ট জব্দ হয়নি। এই লাইফলাইনের জন্য কৃতজ্ঞ বৈশাখী টিভির কর্মকর্তারা সুকৌশলে তাদের টিভিতে এবং অন্যান্য টিভির টকশোতে আওয়ামী সরকারের পক্ষে এবং আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক জেলবন্দি মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ডেসটিনি ছাড়া আরো ত্রিশটির বেশি এমএলএম কম্পানি অবাধে মানুষকে প্রতারণা করার সুযোগ পায় আওয়ামী সরকার শাসনে। এসব কম্পানির মধ্যে রয়েছে ইউনিপে টু ইউ, সাকসেস লিংক, গ্লোবাল নিউওয়ে, প্রভৃতি। দুদকের তদন্ত অনুযায়ী, কয়েকটি এমএলএম প্রতিষ্ঠান জনগণের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছে ৪,৯৬৩ কোটি টাকার কিছু বেশি এবং এর মধ্যে ব্যক্তিগত একাউন্টে সরিয়ে ফেলা হয়েছিল প্রায় ৪,৬০১ কোটি টাকা। (প্রথম আলো ৯.৯.২০১২)।
টাকা বানানোর এমন সহজ সুযোগ দেখে ২০০৫-এ এগিয়ে আসে চায়না থেকে তিয়ানশি (বাংলাদেশ) লিমিটেড। (আমাদের সময়.কম ৫.১১.২০১২)। গোয়েন্দা সূত্র জানায় মোট ১২৯ এমএলএম কম্পানি তাদের নজরদারিতে আছে।
সাত. আগস্ট ২০১২-তে বিভিন্ন পত্রিকায় হলমার্ক গ্রুপের জালিয়াতির খবর প্রকাশিত হতে থাকে। জানা যায়, সরকারি ব্যাংক সোনালী ব্যাংকের শেরাটন হোটেল ব্রাঞ্চে (বর্তমানে শেখ হাসিনার দেয়া নাম রূপসী বাংলা হোটেল) বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কুশ্রী অর্থনৈতিক কেলেংকারির পরিমাণ ৩,৬০৬ কোটি ৪৮ লক্ষ বা প্রায় ৪,০০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে হলমার্ক একাই নিয়েছে প্রায় ২,৬৬৮ কোটি টাকা। একটি ব্যাংকের একটি ব্রাঞ্চে একটি কম্পানির এই পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের ঘটনা আর কোথাও ঘটেছে বলে ব্যাংকিং খাতের কেউ বলতে পারেন নি। বাংলাদেশে এর আগে বিভিন্ন সময়ে ঋণের নামে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটলেও অঙ্কের বিচারে এটি সর্ববৃহৎ। স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত এটিই ব্যাংকিং খাতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আর্থিক কেলেংকারি। (প্রথম আলো ৫.৯.২০১২)।
এরপর এক গোলটেবিল অনুষ্ঠানে সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারি নিয়ে গণমাধ্যমের ভূমিকার সমালোচনা করে অর্থমন্ত্রী মুহিত বলেন, ‘ব্যাংকিং খাতে আমরা ৪০ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিই। এর মধ্যে মাত্র তিন বা চার হাজার কোটি টাকা নিয়ে ঝামেলা হয়েছে। এটা কোনো বড় অঙ্কের অর্থ নয়। এ নিয়ে হইচই করারও কিছু নেই। সংবাদমাধ্যম এটা নিয়ে অতিরিক্ত প্রচারণা করে দেশের ক্ষতি করছে। এমন ভাব  যেন দেশের ব্যাংকিং সেক্টর ধসে গেছে। এতে আমাদের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে।’
অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্য প্রচারের পর ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। তথ্য সংগ্রহ করে দেখা গেছে, কেলেঙ্কারির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সোনালী ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন এক হাজার ১২৫ কোটি টাকা। গত ৩১ মার্চ পর্যন্ত তৈরি করা তথ্য অনুযায়ী, সংরক্ষিত মূলধনের পরিমাণ চার হাজার ৫১৯ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। অথচ সোনালী ব্যাংকের এক রূপসী বাংলা শাখায় জালিয়াতি করা অর্থের পরিমাণই তিন হাজার ৬০৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। অন্য কোনো বেসরকারি ব্যাংকে এই পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটলে ব্যাংকটি বন্ধ হয়ে যেত। যেমন বন্ধ হয়েছিল ওরিয়েন্টাল ব্যাংক। (প্রথম আলো ০৫.০৯.২০১২)
অর্থমন্ত্রীর এই মন্তব্যের পর দেশজুড়ে সমালোচনার সিডর ওঠে। দি নিউজ টুডে-র সম্পাদক রিয়াজউদ্দিন আহমেদ লেখেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে অর্থমন্ত্রী অধিক থেকে অধিকতর পরিমাণে অধৈর্য হয়ে উঠছেন, মিডিয়ায় তার সমালোচকদের সহ্য করতে পারছেন না। তার সঙ্গে কেউ দ্বিমত পোষণ করলে তাকে ননসেন্স, রাবিশ ও স্টুপিড-জাতীয় শব্দ শুনতে হয়। সোনালী ব্যাংক দুর্নীতি নিয়ে অর্থমন্ত্রী যে অসহিষ্ণু আচরণ করেছেন, তাতে অনেকেই বিস্মিত হয়েছেন। সোনালী ব্যাংকের দুর্নীতি নজরদারিতে ব্যর্থতার জন্য ওই ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদকে বিলুপ্ত করার অনুরোধ জানিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। সেই অনুরোধ অবজ্ঞা করতে তিনি দ্বিধান্বিত হননি।’ (মানবজমিন ০৭.০৯.২০১২)
যে কারণে অর্থমন্ত্রী মুহিত অসহিষ্ণু হন, ঠিক সেই একই কারণে আওয়ামী মিডিয়া হলমার্ক কেলেংকারি বিষয়ে খবর প্রকাশে কার্পণ্য প্রকাশ করে। কিন্তু তখন এগিয়ে আসে দৈনিক মানবজমিন। এই পত্রিকার দুটি সাহসী রিপোর্টে জানা যায় হলমার্ক কেলেংকারির নায়ক তানভীর মাহমুদ তফসির-এর উত্থানকাহিনী এবং তার সঙ্গে আওয়ামী সরকারের সংশ্লিষ্টতা।
প্রথম রিপোর্টে লায়েকুজ্জামান জানান, মাত্র এক দশক আগে আগারগাঁও তালতলা বাজারে ছোট একটি মুদি দোকান ছিল তার। এ দোকান চালাতেন পিতাকে সঙ্গে নিয়ে। এতে সংসার চলত না তাদের। এই সময়ে সংসারে অভাব-অনটন ঘোচাতে মাত্র ৩,০০০ টাকা বেতনে একটি গার্মেন্ট কম্পানিতে চাকরি নেন। মাত্র এক দশক পরে সেই গার্মেন্টশ্রমিক এখন হাজার কোটি টাকার মালিক। রাজকীয় বিলাসী জীবন তার। মিরপুরের শেওড়াপাড়ায় চোখধাঁধানো রাজপ্রাসাদের মতো বাড়ি। বাড়ির ভেতরটা যেন স্বর্গপুরী। বিদেশি সব কারুকার্যখচিত ফিটিংস ও ঝাড়বাতি। ঝকঝকে তকতকে দামি সব গাড়ি। শেওড়াপাড়ার এই বাড়ির পাশেই বিশাল গারাজ। পাজেরো, প্র্যাডো, ল্যান্ডক্রুজার মিলে বড় গাড়ি ১৫টি। প্রাইভেট কার ১২টি।
যখন যেটি পছন্দ হয় সেটি নিয়ে বের হন। তানভীর চলেন রাজকীয় স্টাইলে। রাজপথে তার গাড়ির আগেপিছে থাকে ১০টি গাড়ি। এসব গাড়িতে থাকে তার সশস্ত্র ক্যাডার। এরা সবাই তার নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত। মানুষকে খাওয়ানোর জন্য কখনো একটি দু’টি গরু কেনেন না, গরু কেনেন ট্রাকভরে। এখন গ্রামের বাড়িতে যান ঘন ঘন। সেখানে উৎসব করেন মানুষকে খাওয়ান, সংবর্ধনা নেন। চলাফেরা করেন ক্ষমতাধর বড় বড় লোকের সঙ্গে। তার ২০৫/৪ রোকেয়া সরণি শেওড়াপাড়ার কার্যালয়ে মাঝে মধ্যে আসেন বর্তমান সরকারের একজন উপদেষ্টা, একজন প্রতিমন্ত্রী ও কয়েকজন এমপি। এখন তার বিলাসী জীবন হলেও মাত্র এক দশক আগেও ছিলেন কপর্দকশূন্য। থাকতেন শেওড়াপাড়ার ভাড়াবাসায়।
২০০১ সালেও আগারগাঁও তালতলা বাজারে ছোট একটি মুদি দোকান ছিল তানভীরের পিতার। সকালে-বিকালে মুদি দোকানে পিতার সহযোগী ছিলেন তিনি। সংসারের নিদারুণ অভাব-অনটন ঘোচাতে মাত্র তিন হাজার টাকা বেতনে একটি গার্মেন্ট কম্পানিতে চাকরি নেন তানভীর। তার উত্থান শুরু তত্ত্বাবধায়ক জমানার শেষ দিকে। গার্মেন্টের চাকরি ছেড়ে নিজে একটি গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি দেন। ওই সময় তার সঙ্গে সম্পর্ক হয় সোনালী ব্যাংক শেরাটন শাখার সে সময়ের ম্যানেজারের সঙ্গে। ওই ম্যানেজারকে ধরে অল্প কিছু টাকা ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। সেটা ২০০৬ সাল। ২০০৮ সালে সরকার পরিবর্তন হলে তানভীর সম্পর্ক গড়ে তোলেন বর্তমান সরকারের একজন প্রভাবশালী উপদেষ্টার সঙ্গে। ওই উপদেষ্টাকে তিনি তার প্রতিষ্ঠান হলমার্কের উপদেষ্টা করেন। ২০০৯ সাল থেকে সকল নিয়মনীতি উপেক্ষা করে সোনালী ব্যাংকে তানভীরের ঋণ বর্ধিত হতে শুরু করে অস্বাভাবিকভাবে ।
ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চেয়ে তানভীর বেশি নজর দেন জমি কেনার দিকে। মিরপুর শেওড়াপাড়া এলাকায়। একের পর এক জমি কিনতে থাকেন বেশি দামে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত তানভীর কম করে হলেও ত্রিশটি দামি গাড়ি উপহার দিয়েছেন সোনালী ব্যাংকের বড় বড় কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতাদের। দেড় শ’ জন আনসার পাহারা দেয় রোকেয়া সরণির হলমার্কের প্রধান কার্যালয়সহ তানভীরের বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। তানভীরের নিজের কাছে থাকে একটি পিস্তল। সব সময় চলেন বিশাল বহর নিয়ে। মিরপুর শেওড়াপাড়া এলাকা এবং সাভারের হেমায়েতপুরে আছে তার বিশাল ক্যাডার বাহিনী। শেওড়াপাড়া এলাকার তার এক প্রতিবেশী জানান, তানভীর তার বর্তমানের রাজকীয় বাড়িতে উঠেছেন মাত্র দুই বছর হলো, এর আগে ওই মহল্লারই একটি বাড়িতে ভাড়া থাকতেন সপরিবারে। নতুন বাড়িতে ওঠার পর দ্ইু বছর ধরে ঈদের সময় এক এলাহি কাণ্ড দেখা যায় তার বাড়ির সামনে। পুরো রমজান মাস ধরে গরু, মহিষ, উট আসে ট্রাক বোঝাই করে। ওই সব গরু, মহিষ, উট জবাই করে খাওয়ানো হয় রোজাদারদের। দান খয়রাতও করেন যথেষ্ট।
মিরপুর এলাকার মানুষ জানে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ থেকে আগামী নির্বাচনে অংশ নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। সে কারণে এখন ঘন ঘন এলাকায় যাচ্ছেন ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে নিয়ে। (মানবজমিন, ১.৯.২০১২)
একই দিনে দ্বিতীয় রিপোর্টে জাবেদ রহিম বিজন জানান, রাজকীয় সেই সংবর্ধনার কথা এখন মুখে মুখে। কোটি টাকা খরচ করে বিশাল আয়োজনের সেই সংবর্ধনার গল্প নতুন করে উঠে এসেছে আবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের মুখে মুখে। আলোচিত শিল্পপ্রতিষ্ঠান হলমার্কের মালিক তানভীর মাহমুদ তফসিরের এত্ত বড় সংবর্ধনার রহস্য মানুষ ভেদ না করতে পারলেও এখন বুঝতে পারছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জের তারুয়া গ্রামের মানুষ। সংবর্ধনার আগে কেউ তার নামও শোনেনি। সংবর্ধনার সময়েই আলোচনা ছড়িয়েছিল আগামী সংসদ নির্বাচনে সরাইল-আশুগঞ্জ আসন থেকে মনোনয়ন চাইবেন তানভীর। এর অংশ হিসেবেই বিশাল সংবর্ধনা।
গত বছরের ২০শে জানুয়ারি হয় এই সংবর্ধনা। সংবর্ধনার এক দিন আগেই এ ব্যবসায়ী চলে আসেন গ্রামের বাড়িতে। নিজেই তদারকি করেন সব। এর আগে বিজিএমইএ আয়োজিত ২২তম বাটেক্সপোতে পোশাক শিল্পের সেরা উদ্যোক্তার পুরস্কার পান তানভীর মাহমুদ। এ উপলক্ষেই বিশাল সংবর্ধনার আয়োজন।
সংবর্ধনায় যোগদানকারীদের অনেকেই তখন বলেন, সংবর্ধনার আয়োজন চোখধাধিয়ে দিয়েছে সবার। বলাবলি হচ্ছিল, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অনুষ্ঠানও এত গর্জিয়াস হয় না। সংবর্ধনা অনুষ্ঠান ঘিরে ওই ব্যবসায়ীর গ্রাম তারুয়ায় সাজসাজ রব পড়ে গিয়েছিল। বসানো হয়েছিল মেলা। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের প্রায় দুই সপ্তাহ আগে থেকে জেলার প্রায় সর্বত্র লাগানো হয় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের ঢাউস সাইজের পোস্টার। পোস্টারের অর্ধেকাংশে জুড়ে দেয়া হয় ট্রফি গ্রহণের সেই ছবি। প্রায় ১০ হাজার পোস্টার লাগানো হয়। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর এক উপদেষ্টা। তবে বিশেষ অতিথি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব:) এ বি তাজুল ইসলাম ও সংসদ সদস্য আ ম ওবায়দুল মুকতাদির চৌধুরী এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেননি।
জানা গেছে, সংবর্ধনার মঞ্চ তৈরি ও অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেয়া হয় ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠানকে। প্রায় ২০ লাখ টাকা চুক্তি হয় তাদের সঙ্গে। বিশাল প্যান্ডালে ৩ সহস্রাধিক লোক বসার ব্যবস্থা করা হয়। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বসানো হয় ৩১টি স্পিকার, ২টি ডিজিটাল ডিসপ্লে। নিরাপত্তার আয়োজনে ছিল কোজ সার্কিট ক্যামেরা ও মেটাল ডিটেক্টর। ছিল ৫ শ’ কেভির দুটি জেনারেটর। দুপুরে আপ্যায়ন করা হয় হাজারেরও বেশি অতিথিকে। খাবার মেনুতে ছিল বিভিন্ন জাতের মাছ আর মুরগি। সব কিছু দেখাশোনার জন্য নিয়োগ দেযা হয় দেড় শতাধিক স্বেচ্ছাসেবক। পুরো সংবর্ধনা অনুষ্ঠান একটি প্রাইভেট চ্যানেলে ২০ মিনিট প্রচারের চুক্তিও করা হয়। ২ শ’ ফুলের তোড়া আনা হয় অতিথিদের দেয়ার জন্য। সংবর্ধিত ব্যবসায়ী প্রধান অতিথির কাছ থেকে গ্রহণ করেন সোনার ক্রেস্ট। অতিথিদের ফুল দেয়ার জন্য ছিল ২০ তরুণী। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ৩ শ’ গাড়িতে করে আসেন হলমার্কের স্টাফরা। গাড়িতে গাড়িতে সয়লাব হয়ে যায় তারুয়া গামের সব রাস্তাঘাট। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের মঞ্চের পাশে বসানো হয় মেলা। মেলা চলে ৩ দিন ধরে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান গাওয়ানোর জন্য আনা হয় ঢাকা থেকে প্রখ্যাত শিল্পীকে। সব মিলিয়ে হুলস্থুল কারবার।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক চিত্রগ্রাহক বলেন, আমি প্রথমে গিয়ে গরু-ছাগলের ভিড় দেখে মনে করেছিলাম, এখানে কোনো হাট বসেছে। পরে আমার ভুল ভাঙে। এগুলো অতিথিদের খাওয়ানোর জন্য জড়ো করা হয়েছিল। এই ব্যবসায়ী বা শিল্পপতির পরিচয় এত দিন তারুয়া গ্রামেই ছিল সীমাবদ্ধ। সংবর্ধনার আয়োজন আর প্রচারণা তাকে জেলাব্যাপী পরিচিত বা আলোচিত করে তোলে। আর হলমার্ক-কেলেঙ্কারির পর রাজকীয় সংবর্ধনা কথা এখন ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসীর মুখে মুখে। (মানবজমিন ১.৯.২০১২)
পরবর্তীকালে তানভীরের সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী রিটায়ার্ড ক্যাপ্টেন তাজুল ইসলাম ও আওয়ামী এমপি ওবায়দুল মুকতাদিরের সম্পর্ক বিষয়ে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। লায়েকুজ্জামান ও জাবেদ রহিম বিজনের দুটি রিপোর্টে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার নামটি অপ্রকাশিত থাকে। পরবর্তী সময়ে এই নামটিও প্রকাশিত হয়। তিনি ছিলেন চোখের ডাক্তার সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী এবং তিনি স্বীকার করেন শেরাটনের সোনালী ব্যাংক ব্রাঞ্চে তার যাতায়াত ছিল।
৪ অক্টোবর ২০১২-তে এসব আওয়ামী নেতার স্নেহপুষ্ট তানভীর শেষ পর্যন্ত গ্রেফতার হন। তার সঙ্গে গ্রেফতার হন তার স্ত্রী জেসমিন ও ভায়রা তুষার আহমেদ। হলমার্কের সাতজন এবং সোনালী ব্যাংকের ২০ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে দুদক।
এর কয়েক দিন পরে অর্থমন্ত্রী মুহিত বলেন, ‘২০১০ সালেই হলমার্কের বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক জেনেছিল। ২০১০ সালে তারা কিছুই করেনি। ২০১২ সালে তারা জেগে উঠল। এতে প্রমাণিত হয় যে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজে অতটা সক্ষম নয়।’ (প্রথম আলো ১৭.১০.২০১২)।
যেটা অর্থমন্ত্রী বলেননি সেটা হলো, তিনি নিজেই ‘২০১০ সাল থেকে ঘুমিয়ে ছিলেন’ এবং তাই তিনি কিছুই করেন নি। তার বক্তব্যে প্রমাণিত হয় যে তার সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর আতিউর রহমানের চরম দ্বন্দ্ব রয়েছে এবং তিনি (অর্থমন্ত্রী) এই অন্তর্দ্বন্দ্ব মেটাতে অক্ষম।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ স্থানে থাকতে মুহিত ভালোবাসেন। সামরিক শাসনের তীব্র সমালোচক হলেও সামরিক শাসক এরশাদের প্রথম অর্থ উপদেষ্টা ছিলেন তিনি। এরপর শেখ হাসিনার অর্থমন্ত্রী হয়েছেন। তবে অর্থমন্ত্রী কখনোই পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করেন নি। সূচনা থেকেই একের পর এক আর্থিক কেলেংকারি সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী তাকে পদত্যাগে বাধ্য করেন নি। সম্ভবত প্রধানমন্ত্রী ভেবেছিলেন তার নিজের মাথার ওপর পদ্মা সেতু দুর্নীতিবিষয়ক ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ঝুলন্ত ডেমোকিসের তলোয়ার মোকাবেলায় ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সাবেক এই অলটারনেট ডিরেক্টর মুহিতের সাহায্য দরকার হবে। মুহিত অর্থমন্ত্রী থেকে যান। কিন্তু মুহিত পারেননি তার বসকে বাচাতে।
অন্য দিকে আতিউর রহমানও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর থেকে যান। সম্প্রতি তার চাকরির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।
আর ড. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলীও তার উপদেষ্টা পদে বহাল আছেন।
আওয়ামী সরকারের এই আমলে আর্থিক ক্ষেত্রে অনেক কমেডির মধ্যে এটি একটি।
আট. ২৪ নভেম্বর ২০১২-তে আশুলিয়ায় তাজরীন ফ্যাশনস লিমিটেডের গার্মেন্ট কারখানায় আগুন লেগে ১১১ কর্মী পুড়ে মারা যায়। তাজরীনের ম্যানেজিং ডিরেক্টর দেলোয়ার হোসেন সরকার সমর্থক ব্যক্তি রূপে পরিচিত।
নয়. দুই দিন পরেই ২৬ নভেম্বর ২০১২-তে চট্টগ্রামে বহদ্দারহাট পুকুরপাড়ে নির্মীয়মান ফাইওভারের গার্ডার ধসে ১৫ জন নিহত হয়। প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকু-র মালিকানাধীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাকটো পারিসা লিমিটেড এবং মীর আক্তার কনস্ট্রাকশন দুটি ফার্ম যুগ্মভাবে এই ফাইওভার নির্মাণের কার্যাদেশ পেয়েছিল।
দশ. ১১ জানুয়ারি ২০১৩-তে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক চূড়ান্তভাবে জানিয়ে দেয় আওয়ামী সরকারের দুর্নীতির কারণে তারা পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়ন করবে না। ইতোপূর্বে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক যখন এই অভিযোগটি আনে তখন বহু গড়িমসির পরে যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন পদত্যাগ করেন। কিন্তু ক্ষতিপূরণস্বরূপ তাকে ‘দেশপ্রেমিক’ রূপে আখ্যায়িত করেন প্রধানমন্ত্রী। আবুল হোসেন ইতোমধ্যে শেখ হাসিনার ছবিসহ তিনটি বড় বিলবোর্ড স্থাপন করেন ফার্মগেট থেকে প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয় পর্যন্ত, যেখানে শেখ হাসিনার স্তুতি বড় অক্ষরে দেখানো হয়েছে। পদ্মা সেতু দুর্নীতিতে আওয়ামী সরকারের অন্য কারা জড়িত ছিলেন সে বিষয়ে গুঞ্জন শোনা গেলেও মেইনস্টৃম পত্রিকায় অসমর্থিত থেকে যায়।
এগারো. কিন্তু ১৯ এপৃল ২০১৩-তে কানাডায় টরন্টোর আদালতে কানাডিয়ান কম্পানি এসএনসি-লাভালিন ও পদ্মা সেতু দুর্নীতিসংক্রান্ত মামলায় এসব নাম প্রকাশিত হয়।
আদালতে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ডায়েরিতে প্রথমেই রয়েছে মন্ত্রীর কথা। সংক্ষেপে লেখা হয়েছে, এমআইএন বা মিন। এই ব্যক্তি হচ্ছেন সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন। মন্ত্রীর জন্য বরাদ্দ ৪ শতাংশ ঘুষ।
কায়সার লিখে তার পাশে লেখা রয়েছে ২ শতাংশ। এই কায়সার হচ্ছেন সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী। তিনিই এসএনসি-লাভালিনের সঙ্গে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রীর যোগাযোগ ঘটিয়ে দিয়েছিলেন।
এরপরই রয়েছে নিক্সনের নাম। কাজ পেলে তিনিও ২ শতাংশ ঘুষ পেতেন। এই নিক্সন হচ্ছেন মুজিবুর রহমান নিক্সন চৌধুরী। ডায়েরিতে তার পরিচয় লেখা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর ভাতিজা। নিক্সন চৌধুরী হুইপ নুরে আলম চৌধুরীর ছোট ভাই। নুরে আলম চৌধুরী লিটন চৌধুরী নামে পরিচিত। তিনি শেখ হাসিনার ফুপাতো ভাইয়ের ছেলে। তিনিও দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ করিয়ে দেন।
এরপর রয়েছে ‘মসি রহমানের নাম’  তিনি হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মসিউর রহমান। তার নামের পাশে রমেশ শাহ (লাভালিনের সাবেক কর্মকর্তা) লিখে রেখেছেন ১ শতাংশ ঘুষের কথা।
আরো ১ শতাংশ অর্থ ঘুষের জন্য ডায়েরিতে, ‘সেক্রেটারি’ কথা লেখা রয়েছে। এই সেক্রেটারি হচ্ছেন সাবেক সেতুসচিব মোশারফ হোসেন ভূইয়া।
সূত্র জানায়, নিক্সনের নামের পরই রয়েছে আরেকটি নাম। তার জন্য বরাদ্দ ২ শতাংশ বলে ডায়েরিতে উল্লেখ রয়েছে। (প্রথম আলো ২০.০১.২০১৩)
পাঠকরা লক্ষ করুন মোটা হরফের শব্দগুলো। আরেকটি নাম ….. । টরন্টোর কোর্টে অভিযোগ গঠনের সময়ে উপস্থিত ছিলেন প্রথম আলো, ইত্তেফাকসহ আরো কয়েকটি পত্রিকার প্রতিনিধি। তারা সবাই জানেন নামটি কার। এই আরেকটি নাম যে কার সেটা প্রথম আলোর সম্পাদকসহ আরো বহু সম্পাদক জানেন। তাদের সঙ্গে জেলবন্দি সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের পার্থক্য এই যে, মুক্ত থাকলে স্কাইপ সংলাপ এবং রাজীবের নূরানীচাপা-র মতো কানাডায় প্রকাশিত সব নামই হয়তো তিনি দৈনিক আমার দেশ-এ প্রকাশ করতেন জাতীয় স্বার্থে। এই অতি স্পর্শকাতর নামটি উচ্চারিত হতে পারে সেই দুশ্চিন্তায় কানাডায় মামলা শুরু হওয়ার পরপরই বাংলাদেশে মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। বস্তুত, ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোনের কল্যাণে এই স্পর্শকাতর নামটি এখন আর গোপন নেই। এটি অনেকেই জানেন। সম্ভবত শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানাও জানেন। আগামী ২৯ মে-তে টরন্টোর সুপিরিয়র কোটে এই মামলার পূর্ণাঙ্গ শুনানি শুরু হবে। তখন এই নামটি হয়তো আবার আদালতে উচ্চারিত হবে। তখন হয়তো বাংলাদেশের সবাই নামটি জানবে।
পদ্মা সেতুর পরামর্শকের কাজটি পেলে এসএনসি-লাভালিন আয় করত ৪৭ লক্ষ ডলার অথাৎ ৩৭৬ কোটি টাকা। এ ১২ শতাংশ হিসেবে ঘুষ দেয়ার কথা ছিল  ৪৫ কোটি ১২ লক্ষ টাকা।

বারো. বুধবার ২৪ এপৃল ২০১৩-তে সাভারে সকাল ৯টার দিকে নয়তলা ভবন রানা প্লাজা হঠাৎ ধসে যায়। এই দুর্ঘটনায় হতাহতদের উদ্ধারের কাজ এখন চলছে।

শুক্রবার, ২৬ এপ্রিল, ২০১৩

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

ইসলামের বিরুদ্ধে ধর্মনিরপেক্ষতা একটা অস্ত্র



বর্তমান পৃথিবীতে অত্যন্ত কৌশলের সাথে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ নামক অস্ত্র দিয়ে ইসলামকে ধ্বংস করার চক্রান্ত চলছে। অথচ সাধারণ মানুষকে বুঝানো হচ্ছে এই মতবাদের অর্থ হলো, যার যার ধর্ম সে পালন করবে। ইসলামের সাথে এর কোনো বিরোধ নেই। ইংরেজি ‘সেক্যুলারিজম’ শব্দের বাংলা অনুবাদ করা হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ। এই সেক্যুলারিজম শব্দের প্রকৃত অর্থ হলো ‘ইহজাগতিকতা।’ যার ব্যাখ্যা করলে আমরা বুঝতে পারি এই জড় জগতে যা কিছু আছে কেবল সে সবকেই এই মতবাদ স্বীকৃতি দিচ্ছে। এই জড় জগতের বাইরে কোনো কিছুর অস্তিত্বকে স্বীকার না করার নামই ইহজাগতিকতা। অতিন্দ্রিয় কোনো শক্তিকে স্বীকৃত না দেয়ার নামই হচ্ছে ইহজাগতিকতা। অর্থাৎ সেক্যুলারিজম অনুযায়ী যা কিছু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য, তাকেই স্বীকৃতি দেয়া যাবে আর যা কিছু ইন্দ্রিয়ানুভূতির বাইরে, তাকে স্বীকৃতি দেয়া যাবে না। এই মতবাদ সরাসরি ধর্মের ওপর আঘাত হানে না, অথচ ধর্মের মূল কেটে দেয়।
বিগত প্রায় তিনশত বছর ধরে এই মতবাদ গোটা পৃথিবীতে একটি আদর্শ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে আসছে। মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে তুরস্কের কামাল পাশাই সর্বপ্রথম এই মতবাদ রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ইতোপূর্বে কোনো মুসলিম দেশ এইভাবে বিশ্বব্যাপী ঘোষণা দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের পূজারী সেজেছেন বলে কোনো মুসলিম রাষ্ট্রের ইতিহাসে পাওয়া যায় না।
ধর্মীয় অনুশাসনসমূহ মানুষের ব্যক্তি জীবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন এবং রাষ্ট্রীয় জীবনকে ধর্মের প্রভাবমুক্ত রাখার প্রক্রিয়াই হচ্ছে রাষ্ট্রীয় জীবনে ধর্মনিরপেক্ষতার স্বরূপ। ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ অনুসারে রাজনীতি, অর্থনীতি, সভ্যতা ও সংস্কৃতিসহ সব ধরনের নীতিমালা হতে হবে ধর্মের প্রভাবমুক্ত। সঙ্গত কারণে এই মতবাদকে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ না বলে ধর্মহীন মতবাদ বলাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত।
ধর্মনিরপেক্ষতা হলো কোনো ধর্মের সাথে সংশ্লিষ্ট না হওয়া। অন্যথায় ধর্মহীন জীবন অনুসরণ করা। এরাই অবশেষে ধর্মের বৈরী হয়ে দাঁড়ায়। এই কারণেই দেখা যাচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা ধর্মের উৎকট বিরোধিতায় লিপ্ত। এই মতবাদের জন্মদাতা ও ধারক-বাহকেরা বলে থাকেন, ধর্ম মানুষের একান্ত নিজস্ব ব্যাপার। কে ধর্ম পালন করলো আর কে পালন করলো না-এ ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন তোলা যাবে না। এই মতবাদ সরাসরি আল্লাহর অস্তিত্ব অস্বীকার করে না বটে, কিন্তু আল্লাহর গুণাবলী সম্পর্কে এই মতবাদ নিজস্ব ধারণা মানুষের সামনে পেশ করে। আল্লাহর অসীম ক্ষমতাকে সসীম করতে চায়। ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ দুনিয়ার জীবনে মানুষের উন্নতি, শান্তি, প্রগতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে নবীদের মাধ্যমে কোনো বিধান পাঠানোর প্রয়োজন নেই বলে ধারণা দেয়। সমাজে বা রাষ্ট্রে ধর্ম হস্তক্ষেপ করবে এ কথা যারা বলে তারা প্রগতি বিরোধী। তারাই প্রতিক্রিয়াশীল ও সাম্প্রদায়িক শক্তি। দুই ব্যক্তির সম্পর্কের মধ্যেও ধর্মের প্রভাব থাকা চলবে না। সংক্ষেপে এটাই হলো ধর্মনিরপেক্ষতার স্বরূপ।
ব্যক্তি জীবনে ধর্মকে গ্রহণ ও পার্থিব জীবনের সকল ক্ষেত্রে ধর্মকে নির্বাসন দেয়ার মতবাদ তথা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ অত্যন্ত কুটিল ষড়যন্ত্রের বহিঃপ্রকাশ এবং দুরভিসন্ধিমূলক। যারা এ মতবাদের পক্ষে তারা ব্যক্তি জীবনেও ধর্মের বন্ধন স্বীকার করতে রাজি নয়। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় যে, ধর্ম যদি ব্যক্তিগত ব্যাপারই হয়, তাহলে ধর্মকে মেনে চলেন না কেন? তখন এ মতবাদের অনুসারীরা বলবে, ধর্ম মানা না মানা একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার। এ প্রশ্ন করাও অপরাধ। কেননা কারো ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে মাথা ঘামানোর অধিকার কারো নেই। এর অর্থ হলো, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা যে ধর্মকেই পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার জন্য এ ধরনের বিভ্রান্তিমূলক মতবাদ প্রচার করে থাকেন তাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা এ কথা ভালো করেই জানে যে, ধর্মকে মানুষের ব্যক্তিগত ব্যাপারে পরিণত করলে এবং ধর্মকে পালন করা না করার ব্যাপারে শাসন করার কেউ না থাকলে, ধর্ম এমনিতেই বিদায় নিয়ে যাবে পৃথিবী থেকে।
তারা ঐ উদ্ভট মতবাদকে ধর্মহীন মতবাদ না বলে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ বলে আর ধর্মনিরপেক্ষতাবাদই মূলত ধর্মহীনতাবাদ। অতএব বোঝা গেল যে, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা মূলত নাস্তিক। ধর্মের প্রতি এদের কোনো বিশ্বাস বা সহানুভূতি নেই। ধর্মের প্রভাব বিস্তার ঘটুক অথবা মানুষ ধর্মভীরু হোক, ধর্মীয় বিধিমালা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হোক, ধমীয় মূল্যবোধের ভিত্তিতে মানুষেরা চরিত্র গঠন করুক ও এ ধরনের কোনো কর্মসূচি ধর্মনিরপেক্ষ শাসক বা ধর্মনিরপেক্ষ দল দেয় না। ধর্ম কিভাবে মানুষের মধ্য থেকে বিদায় নিতে পারে এ ধরনের কর্মসূচি ধর্মনিরপেক্ষ শাসক এবং ধর্মনিরপেক্ষ দলসমূহ দিতে মোটেই কার্পণ্য করে না। এদের প্রতিটি কর্মকা- লক্ষ্য করে দেখলেই অনুধাবন করা যায়, ধর্মকে বরখাস্ত করতে এরা সিদ্ধহস্ত।
জীবন সম্পর্কে যারা অবাধ ভোগবাদে বিশ্বাসী তারাই এই ধর্মনিরপেক্ষতার ধারক-বাহক। জীবনকে নীতিবোধের ঝামেলামুক্ত করে স্বাধীনভাবে যা খুশি তাই করা যায়, এ সস্তা সুবিধা আদায় করার জন্যই একশ্রেণীর নৈতিক চরিত্রহীন ব্যক্তিরা ধর্মকে চিরতরে বিদায় করে দিয়ে সর্বস্তরে চরিত্রহীনতার প্লাবন বইয়ে দেয়ার জন্যই ধর্মনিরপেক্ষতার আমদানি করে তা প্রতিষ্ঠার জন্যই এরা দল গঠন করে দলের অন্যতম নীতি নির্ধারণ করে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ। কারণ অবাধে ভোগ করতে হলে ধর্মকে ব্যক্তিগত ব্যাপারে পরিণত করা ছাড়া উপায় নেই। ধর্ম সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে পরিণত হলে অবাধে ভোগ করার চোরাগলি পথ বন্ধ হয়ে যাবে সুতরাং এ মতবাদের প্রবক্তাদের যে উদ্দেশ্য খারাপ তা দিবালোকের ন্যায় পরিষ্কার।
এ জন্য ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা প্রকৃত ধর্ম তথা ইসলামকে উৎখাতের জন্য সরাসরি ‘ইসলামকে উৎখাত করবো বা ইসলামপন্থীদের নির্মূল করবো’ এ কথা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা বলবে না। কারণ তারা জানে সরাসরি এ কথা বললে দেশের জনগণ ধর্মনিরপেক্ষদের কবর রচিত করবে। তাই তারা মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা উৎখাতের নামে ইসলাম ও ইসলামপন্থীদের উৎখাত করতে চায়। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা মৌলবাদ শব্দটা ব্যবহার ও ধু¤্রজাল সৃষ্টি করে ইসলামকে উৎখাত করার জন্য। মৌলবাদী বলতে বা ফান্ডামেন্টালিস্ট বলতে তাদেরকেই বুঝায়, যারা মূল জিনিসে বিশ্বাসী। মূল থেকে উৎপত্তি ঘটেছে যার, সেই বাদই হচ্ছে মৌলবাদ এবং যারা মূলে বিশ্বাসী তারাই মৌলবাদী (ফান্ডামেন্টালিস্ট)।
কুরআন-হাদীস তথা আল্লাহ ও নবীদের দেখানো পথ ছাড়া অন্য কোনো পথ, মত মেনে নেয় না যারা, তারাই মৌলবাদী। কুরআন-হাদীসের সাথে সংঘর্ষিক কোনো আইন-কানুন মেনে নিতে চায় না, যারা কুরআন-হাদীসের আদর্শের কোনো পরিবর্তন চায় না, যারা কুরআন-হাদীস অনুযায়ী নিজেদের ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে সমাজ জীবন, রাষ্ট্রজীবন তথা আন্তর্জাতিক জীবন পর্যন্ত গড়তে চায়, কুরআন-হাদীসকেই অনুসরণ করতে চায়। ইসলামকে যারা অকৃত্রিমভাবে বুকে চেপে ধরে রাখতে চায়, তারাই মৌলবাদী। প্রতিটি ইসলামী চিন্তাবিদকেই যে মূল ইসলামের জন্য নির্যাতনের স্টীমরোলার সহ্য করতে হয়েছে, সেই মূল ইসলামেই যারা বিশ্বাস করে, তারাই মৌলবাদী মুসলমান। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা এই মৌলবাদকেই উৎখাত করতে চায়। তারা এই মৌলবাদী মুসলমানদেরকেই নির্মূল করে ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ধর্মহীন অবস্থা ও ব্যবস্থা কায়েম করতে চায়।
ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের ইতিবৃত্ত পর্যালোচনা করলে স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে, এ মতবাদ কোনো কল্যাণকর মতবাদ নয়। এ মতবাদ মানবজাতির জন্য চরম অকল্যাণকর। এ মতবাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো, ধর্মকে মানুষের ব্যক্তিগত ব্যাপারে সীমাবদ্ধ করার নামে মানুষের জীবনের সর্বস্তর থেকে আল্লাহ ও রাসূল (সা:)-এর প্রভাবমুক্ত করে মানুষকে চরম হতাশার মধ্যে নিমজ্জিত করে গোটা মানব জাতিকে আদর্শহীনতার মধ্যে নিক্ষেপ করা। মানুষকে ধর্মের প্রভাবমুক্ত করে আল্লাহর দাসত্বের বন্ধন ছিন্ন করার পর কোন্্ আদর্শের ওপর ভিত্তি করে মানুষ তার জীবন পরিচালনা করবে, এ ধরনের কোনো আদর্শের সন্ধান ও মতবাদ পাওয়া যাবে না। জীবনের সকল বিভাগকে ধর্মীয় আদর্শমুক্ত করে মানুষকে তার জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যহীন পশুর ন্যায় জীবন গ্রহণকে বাধ্য করে এ মতবাদ। এ মতবাদ মানুষকে কোনো আদর্শের সন্ধান দেয় না বলে মানুষ চরম হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ যখন মানুষকে আদর্শহীন অবস্থায় ছেড়ে দেয়, তখন স্বাভাবিক কারণেই মানুষের জীবনে নেমে আসে সীমাহীন শুন্যতা।
ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ যখন মানুষকে আদর্শহীন অবস্থায় ছেড়ে দেয় তখন মানুষের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে, শিক্ষার ক্ষেত্রে তথা জীবনের সকল ক্ষেত্রে বিরাজ করতে থাকে এক চরম অরাজকতা। ঠিক এমন এক মহূর্তে মানুষের চরম বিপদের সময় ভোগবাদে বিশ্বাসী ধূর্ত ব্যক্তিরা বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর মতাদর্শ তৈরি করে মানুষের সামনে পেশ করে এবং মানব জাতির সীমাহীন সমস্যা সমাধানের জন্য পরামর্শ দেয়। আদর্শশূন্য হতাশাগ্রস্ত মানুষ এ সমস্ত ভ্রান্ত মতবাদ গ্রহণ করার ফলে সমস্যা আরো বৃদ্ধি পেতে থাকে। এসবকিছুই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ নামক বিষবৃক্ষের ফল।
ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ মানুষকে স্বেচ্ছাচারিতার শেষ স্তরে নিক্ষেপ করে। এ মতবাদ মানবদেহের সুপ্ত পশুত্বকে বল্গাহীন করে নৈতিকতার শেষ বন্ধনটুকু ছিন্ন করারই জঘন্য আদর্শ মাত্র। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ যে ধরনের সভ্যতার জন্ম দিয়েছে তা নৈতিকতার দৃষ্টিতে মানব সমাজের উপযোগী নয়। এ মতবাদের প্রভাবে মানুষের মধ্যে ব্যক্তিগত স্বার্থ, দলীয় সুবিধাবাদ, সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদসহ নানা ধরনের ক্ষতিকর প্রবণতা জন্ম দেয়। এ মতবাদ মানুষকে প্রবৃত্তির দাসে পরিণত করে।
ধর্মহীনতার ফলে জনগণ ব্যাপকভাবে নৈতিকতাবিরোধী কর্মকা-ে লিপ্ত হয়ে পড়ে। পরিচিত ভালো কাজসমূহ লোপ পায়। আর পরিচিত অপরিচিত খারাপ কাজসমূহ ব্যাপকভাবে সমাজে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ধর্মনিরপেক্ষতার প্রভাবে দলীয়, জাতীয় ও দেশীয় স্বার্থের বিপরীত করার প্রবণতা জন্মলাভ করে মানুষের মনে। এই মতবাদের প্রভাবাধীন ব্যক্তিকেন্দ্রিক দল গঠন করে স্বৈরতন্ত্রভিত্তিক ও জাতীয় পর্যায়ে জুলুম-নিষ্পেষন চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কারণে মানুষে মানুষে জাতীয় ও রাষ্ট্রে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের প্রেরণা জোগায় ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ। আল্লাহ আমাদের এই স্থুলবুদ্ধিসম্পন্ন এবং ধর্ম ব্যবসায়ী ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের খপ্পর থেকে হেফাজত করে সঠিক ধর্মপথের পথিকদের অনুসারী হওয়ার তওফিক এনায়েত করুন।
0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

সাভার ট্রাজেডি নিয়েও রাজনীতি



গত ২৪শে এপ্রিল সকাল ৯টা বাজবার একটু আগে সাভারের রানা প্লাজা নামের একটি ৯ তলা মার্কেট ভবন ধসে গিয়ে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটে। এ মার্কেট ভবনটিতে পাঁচ-ছ’টি পোশাক কারখানা ও পাঁচশতাধিক দোকান, ব্যাংকসহ কয়েকটি বেসরকারি অফিস ছিল। উল্লেখ্য, মার্কেট ভবনটির মারাত্মক ফাটল সত্ত্বেও এর মালিক সোহেল রানা এবং পোশাক কারখানার মালিকরা বিশেষ করে পোশাক কারখানার শ্রমিকদের জোর করে এবং বেতন না দেবার ভয় দেখিয়ে কাজ করতে বাধ্য করে। অনেক শ্রমিককে মারধর করেও কাজে যোগদানে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। ভবন ধসের আগের দিন বিপদ অনুমান করে ব্যাংকের কার্যক্রম স্থগিত করে দেয়া হয় বলে জানা গেছে। এতে সৌভাগ্যবশত ব্যাংকের কর্মচারী-কর্মকর্তা ও এর গ্রাহকরা সবাই বেঁচে গেছেন। কিন্তু ভবনের মালিক ও পোশাক কারখানার মালিকদের একগুঁয়েমিতে কারখানা চালু রেখে প্রায় পাঁচ-ছ’ হাজার শ্রমিককে কাজে বাধ্য করায় তাদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হয় বলে অভিযোগ তীব্রতর হচ্ছে। ভবনটি ভেঙ্গে পড়বার সঙ্গে সঙ্গে এলাকার লোকজন আহত-নিহতদের উদ্ধারে এগিয়ে আসে। খবর পেয়ে দ্রুত সেনাবাহিনী, বিজিবি, ফায়ার ব্রিগেড, আনসার বাহিনী ঘটনাস্থলে এসে উদ্ধার কাজে নিয়োজিত হয়। ইতোমধ্যে দুর্ঘটনাস্থল থেকে তিনশতাধিক মৃতদেহ এবং হাজার খানেক আহত মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। এ সম্পাদকীয় লেখা অবধি উদ্ধার কাজ অব্যাহত ছিল। কিন্তু ভবনের নিচে চাপা পড়াদের উদ্ধার কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে পচা-গলা মৃতদেহের দুর্গন্ধে উদ্ধার কর্মীরা যেমন টিকতে পারছে না, তেমনি এখনও বেঁচে থাকা মানুষের আর্তনাদ এবং তাদের বেঁচে থাকবার আকুতি উদ্ধার কাজে অংশগ্রহণকারীদের বারবার হতবিহ্বল করে তুলছে।
সাভার ট্রাজেডি দেশবাসীসহ বিশ্ববিবেককে হতভম্ব করে তুললেও আমাদের মন্ত্রী-এমপিরা দুঃখজনকভাবে এ নিয়ে রাজনীতি শুরু করেছেন। স্থানীয় এমপি মুরাদ জং একটি টিভি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, এ বিপর্যয় নাকি ‘ঘটানো হয়েছে।’ তার ইঙ্গিত মনে হয় প্রকৃত দায়ী ছাড়া অন্য কোন দিকে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘হরতাল সমর্থকরা ভবনের গেইট ও স্তম্ভ ধরে ধাক্কাধাক্কি করছিল’ বলে ভবনটি ধসে পড়তে পারে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এ ধরনের মন্তব্যকে নিষ্ঠুর রসিকতা বলে অনেকে মন্তব্য করেছেন। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে উল্টা-পাল্টা মন্তব্য না করতে পরামর্শ দিয়েছেন। ১৮ দলীয় জোটনেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও আহতদের খোঁজ-খবর নেবার বিষয় নিয়েও বক্র মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শুধু তাই নয়, রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানা নাকি আওয়ামী লীগ কিংবা যুবলীগের কেউ নয় বলে জোর দাবি করেছেন। অথচ সাভারের অলিতে-গলিতে স্থানীয় এমপি মুরাদ জংয়ের সঙ্গে রানার ছবিসহ অসংখ্য পোস্টার সাঁটানো রয়েছে। অবশ্য এমপি সাহেব আলোচ্য পোস্টার সরিয়ে ফেলবার দাবি করেছেন টিভি ক্যামেরার সামনে। তার মানে ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও অগণিত লাশ আর আটকে পড়া আহতদের উদ্ধার চলাকালীন মুহূর্তে ক্ষমতাসীনরা রাজনৈতিক বাগাড়ম্বরে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। ওদিকে সেখানে চাপা পড়া নিহত-আহতদের খুঁজে ফিরছে শত শত মানুষ। তারা স্বজনদের লাশ অথবা আহতদের খুঁজে পেতে দুর্ঘটনাস্থল থেকে এনাম মেডিকেলের হাসপাতাল কিংবা অন্য হাসপাতালে ছুটোছুটি করছেন হন্যে হয়ে। কেউ পাচ্ছেন। কেউ না পেয়ে হতাশ হয়ে স্বজনদের ছবি নিয়ে খুঁজে ফিরছেন হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে কিংবা উদ্ধারকর্মীদের কাছে অভিশপ্ত রানা প্লাজার সামনে। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপাপড়া মানুষের বাঁচবার জন্য আর্তনাদ, পচন শুরু হওয়া লাশের উৎকট গন্ধ আর তাদের স্বজনদের বুক ফাটা কান্নায় সাভারের পরিবেশ যেন ভারি থেকে ভারী হতে চলেছে। শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েছে সারাদেশ। এই ভয়াবহ ধ্বংসকা-ের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের গ্রেফতার করা উচিত ছিল। কিন্তু বলা হচ্ছে, তাকে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নিয়ে নিরাপদ কোথাও পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। এই বিষয়টি স্বজনহারা মানুষদের আরও বেদনার্ত ও বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে।
আমরা জানি না, ভেঙ্গেপড়া রানা প্লাজা থেকে আর কতজনকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হবে। আর কতজনের লাশ উদ্ধার করে তাদের আত্মীয়-স্বজনদের হাতে তুলে দেয়া যাবে। অনেকের চেহারা ইতোমধ্যে ফুলে-ফেঁপে বিকৃত হতে শুরু করেছে। যারা আহত অবস্থায় এখনও বেঁচে আছে, তাদের জীবন প্রদীপও ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় যেসব উদ্ধারকর্মী জীবনবাজি রেখে কাজ করছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাবার ভাষা আমাদের জানা নেই। উদ্ধার কাজে সহায়তার জন্য অক্সিজেন সিলিন্ডার, লাইট, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব ছিল, এটা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। এ ব্যাপারে সরকারসহ সকলের সর্বাত্মক সহযোগিতা ছিল কিনা আমরা জানি না। সম্ভবত আজকের মধ্যেই উদ্ধার কাজ সমাপ্ত হবে। এর মধ্যে জীবিত ও মৃত সবাইকে উদ্ধার করা যাবে বলে মনে হয় না। ধ্বংসস্তূপের অনেক জায়গায় এখনও পৌঁছা সম্ভব হয়নি। আমরা প্রার্থনা করি অবশিষ্ট সময়ে তা করা সম্ভব হবে।
0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

প্রেমের আরেক নাম যাতনা ও টিআইবির ঘোষণা


মিনার রশীদ

নব্বইয়ের দশকে যুক্তরাজ্যে থাকার সময় একটি টিভি অনুষ্ঠান খুব আগ্রহভরে দেখতাম। দাম্পত্য জীবনের অবিশ্বস্ততার কাহিনী নিয়ে অনুষ্ঠানটি সাজানো থাকত। জীবনসঙ্গী কিংবা কয়েক দিনের বিছানাসঙ্গী অন্য কারো সাথে মিশে সবচেয়ে অনাকাক্সিত ত্রিভুজ সৃষ্টি করে বসেছে। এই খবর প্রতারিত সঙ্গী বা সঙ্গিনীকে ক্যামেরার সামনে বিশেষ ঘটা করে জানিয়ে দেয়া হতো। যেকোনো উত্তেজক বিষয় বা বস্তুতে এসব উন্নত দেশের মানুষের আগ্রহ অত্যধিক। একদম তরতাজা অনুভূতি এবং জীবন্ত সেই ফাইটিংগুলোও দেখানো হতো। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে বিশ্বাসঘাতকটি ওই বগা বা মুর্গার অতি আপনজন কিংবা অতি কাছের কোনো এক বন্ধু। দু’জন সুঠামদেহী গার্ড প্রস্তুত রাখা হতো সম্ভাব্য আক্রমণ থেকে এই খেলার ‘ শিকার আর শিকারিকে’ রক্ষা করতে।
অন্যের সঙ্গীকে বাগিয়ে নেয়ার মজাই আলাদা। বগা বা মুর্গাটি যন্ত্রণায় ছটফট করলেও ওই ছিনতাইকারী বা ছিনতাইকারিণীর মধ্যে একধরনের বাহাদুরির ভাব ফুটে উঠত। অনুষ্ঠানটি দেখে মনে হতো, এসব দেশে ছয় কোটি মানুষ থাকলে এই ধরনের বগার সংখ্যাও প্রায় ছয় কোটি। আর ছিনতাইকারী ও ছিনতাইকারিণীর সংখ্যা ছয় কোটির অনেক ওপরে। অর্থাৎ যে একজনের হাতে বগা হয়, সে কমপক্ষে আরো দুইজনকে এমন করেই বগা বানায়। যুক্তি ও সান্ত্বনা একটাইÑ তুমি পারলে আমি পারি না?
পৃথিবীর একেকটি এলাকার মানুষ একেক কিসিমের যাতনা বা ইঁদুরের কলে আটকা পড়েছে। রাজনীতি, অর্থনীতি, দাম্পত্যনীতি সব জায়গাতেই অসংখ্য ফাঁদের ছড়াছড়ি। প্রেম আর রাষ্ট্রনীতি একসাথে মিশেও ফাঁদ তৈরি হতে পারে। এমন একটা ভূরাজনৈতিক ফাঁদে আটকা পড়েছে আমাদের প্রিয় এই মাতৃভূমি। এই কলে আটকা পড়লে অনেক ইঁদুর বুঝতে পারে, সে আটকা পড়েছে। কিন্তু কোনো কোনো বগা তা বুঝতে পারে না। আমরা হলাম ভূরাজনৈতিক অনুভূতির বিচারে এই ধরনের একটা ‘বগা’।
বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক পরিসরে এই ধরনের ইঁদুর মারার একটি কলের নাম রাজাকার ধরার কল। এই কলটির ইজারাদারদের আমরা চিনি না। এসব কল বা ফাঁদের আতঙ্ক ছড়িয়ে শিকারকে একটা বিশেষ জায়গা বা অবস্থান থেকেও দূরে সরিয়ে রাখা হয়।
এই কল থেকে সবাই গা বাঁচিয়ে চলতে চান। ‘বুদ্ধিওয়ালা’ বুদ্ধিজীবীগণ তাই অনেক ভেবেচিন্তে পা ফেলেন। এই মুল্লুকে ‘ট্রুথ ইজ নো ডিফেন্স’। কাজেই কথাটি সত্য হলেই এখানে পার পাওয়া যাবে না। এই বোধটির মাঝখান থেকে উদয় হয়েছে আরো কিছু চেতনা। সেসব চেতনার ব্যাকরণটিও আয়ত্তে আনতে হয়। কাজেই এ দেশে স্বাধীনতা-উত্তর বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক মানসটি এই ধরনের রাজাকার আতঙ্ক নিয়েই বেড়ে ওঠে।
অভাগা দেশটির অবস্থা হয়েছে হতভাগা মেয়েটির মতো। ধর্ষণকারীর হাত থেকে যে উদ্ধার করেছে, সে এখন সকাল-বিকাল ইভটিজিং করে। মাঝে মাঝে নাইট-টিজিংও বাদ রাখে না। আরো কিছু করে, যা মুখ ফুটে বলা যায় না। এই মুখ বন্ধ করে রাখার নাম দেয়া হয়েছে ‘স্বাধীনতার চেতনা’। অন্য কথায় ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’। ফালানীদের লাশ কাঁটাতারে ঝুললেও এই চেতনায় কোনো টনক নড়ে না। এই ধরনের অনেক কষ্ট দীর্ঘ দিন বুকে চেপে সেদিনের সেই পিচ্চি মেয়েটি আজ প্রৌঢ়া হয়েছে। দীর্ঘ দিন ব্যবহারের কারণে এসব ইঁদুর মারা কলের কার্যকারিতা কিছুটা নষ্ট হয়ে পড়েছে।
আওয়ামী লীগের বর্তমান নেতাদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর ও যুক্তিপূর্ণ কথা বলেন তরুণ এমপি গোলাম মওলা রনি। তাকেও শিবির বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। অথচ শিবির নয়, আবুলদের গল্পই তিনি এযাবৎ বেশি শুনিয়েছেন। তার পাশেও কিছু ইঁদুর (শিবির ) ধরার কল ফিট করে রাখা হয়েছে, যাতে তিনি বুঝেশুনে কথা বলেন বা সন্তর্পণে পা ফেলেন। তরুণ রনির মতো আরেকটু সাহস থাকলে তোফায়েল আহমেদও মুখ খুলতে পারতেন। আজীবন আওয়ামী লীগে থাকার একটা পণ করেছিলেন বলেই তিনি মুখটি খুলতে পারছেন না। তোফায়েল আহমেদের যে ভয়, সেই ধরনের ভয় থেকে আজ বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী মুক্ত। তাই তিনি নির্বিঘেœ ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সেবায় নিবেদিত এক বড় কর্মকর্তার মুখোশ উন্মোচন করতে পেরেছেন। এই মস্তবড় ‘হেফাজতে পাকিস্তান’ হলেন তখনকার ময়মনসিংহের ডিসি ম খা আলমগীর। অনেকগুলো ইঁদুর (রাজাকার) ধরার কল ফিট করিয়েও সাহসী এই বীরকে সত্য কথা বলা থেকে বিরত রাখা যায়নি। অনেক সময় হতাশ হয়ে পড়লেও মাঝে মাঝে মনে হয়, এই দেশের প্রতি বোধহয় আল্লাহর একটি বিশেষ রহমত রয়েছে।
বিএনপির চার দিকেও ইঁদুর ( যুদ্ধাপরাধী ) ধরার কল ছড়িয়ে রাখা হয়েছিল। দেড়ফুটি গণতন্ত্র আর এই ইঁদুর (যুদ্ধাপরাধী ) ধরার কলের আতঙ্কে ‘নো নড়ন-চড়ন’ অবস্থা হয়ে পড়ে বিএনপির। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে আন্দোলন করলেও তা ‘যুদ্ধাপরাধী রক্ষার আন্দোলন’ হয়ে যায়। কিন্তু সিঙ্গাপুর থেকে চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরে চার পাশে ফিট করা এই ইঁদুর (যুদ্ধাপরাধী) ধরার কলগুলো একে একে মাথায় তুলে মাটিতে আছাড় দিয়ে ভেঙে ফেলেন। তাতে প্রমাদ গুনে এই ইঁদুর মারা কলের স্থানীয় এজেন্টরা। রাগে-ক্ষোভে-দুঃখে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে জামায়াতের ‘মহিলা আমির’ উপাধি দেন।
নূর নবী নামে একজন পাঠক জনকণ্ঠের সাংবাদিক স্বদেশ রায়ের একটি আর্টিকেলের লিংক পাঠিয়েছেন। অনুরোধ করেছেন এই লেখা পড়ে যেন কিছু লিখি। লেখাটিতে সাবেক তত্ত্ব্াবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মো: হাফিজ উদ্দীন খানকে জামায়াতের একনিষ্ঠ কর্মী বানিয়ে ফেলেছেন বিক্ষুব্ধ স্বদেশ রায়। ভাব দেখে মনে হচ্ছে, আর কিছু সত্য বলে ফেললে টিআইবির সুলতানা কামাল চক্রবর্তীকেও জামায়াতের মহিলা নায়েবে আমির হিসেবে ঘোষণা করে বসবেন। কলামটিকে তাই খুবই ইন্টারেস্টিং মনে হয়েছে।
নিজে সংবাদপত্র জগতের মানুষ নই। বাই চান্সে কলামিস্ট সেজেছি। খুব বেশি সাংবাদিককে চিনি না। এই স্বদেশ রায় সম্ভবত যায়যায়দিনের সেই স্বদেশ রায়। বাংলাদেশে রাজনৈতিক কলামগুলোকে কয়েকজন বোদ্ধা পাঠকদের কাছ থেকে নিয়ে সাধারণ পাঠকদের মধ্যে ছড়িয়েছিল যে ‘যায়যায়দিন’ সেই টিমের তিনিও একজন সদস্যÑ যার কলামের বিশ্লেষণী দক্ষতায় আমার মতো অনেকেই মুগ্ধ হয়েছেন। সেই মুগ্ধতার কিছুটা আবেশ আমার মধ্যে এখনো অবশিষ্ট রয়েছে। কাজেই মনোযোগ দিয়েই তার পুরো লেখাটি পড়লাম। শফিক রেহমান সম্পাদিত যায়যায়দিনের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল। প্রায় সব লেখায়ই চমৎকার  রাজনৈতিক বিশ্লেষণ পাওয়া যেত। কোনো সিদ্ধান্ত জোর করে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে বলে কোনো পাঠক কখনোই অনুভব করতেন না। আজকের জনকণ্ঠের স্বদেশ রায় সেই অবস্থা থেকে অনেকখানি সরে গেছেন বলে মনে হয়েছে।
তবে তিনি একটি অতি মূল্যবান কথা লিখেছেন। টিআইবি একটি বিদেশী এনজিও। এরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে পারে না। দেহটি বিদেশে থাকলেও স্বদেশ রায়ের এই স্বদেশপ্রীতি দুই শত ভাগ সমর্থন করি। কিন্তু সমস্যা হলো, এই টিআইবির অনেক রাজনৈতিক বক্তব্য দেশের গণতন্ত্রের বিপক্ষে এবং আওয়ামী লীগের পক্ষে গেছে। তখন কিন্তু এই দাদারা ‘ মাইন্ড’ করতেন না। আজ যখন টিআইবির একাট ফর্মুলা দেশের গণতান্ত্রিক ধারা অক্ষুণœœ রাখার পক্ষে এসেছে, তখন সেই দাদারা ‘মাইন্ড’ করে বসলেন। হোয়াং হো নদী যেমন চীনের দুঃখ, স্বদেশ দাদাদের এই ‘মাইন্ডগুলো’ তেমনি বাঙালি জাতির দুঃখ।
নিরপেক্ষ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এই দাবি দেশের সর্বস্তরের জনগণের দাবি হয়ে পড়েছে। আওয়ামী লীগ এই দাবির মওসুমি সমঝদার। বিরোধী দলে থাকলেই এই ব্যবস্থা তাদের জন্য দরকার। এই মুহূর্তে না চাইলেও ভবিষ্যতে এই একই আওয়ামী লীগ আবারো এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার চাইবে। জনগণ এটি জানে বলেই আগে থেকেই চাওয়া শুরু করেছে।
টিআইবি, সুজনরাও আজ জনগণের এই চাওয়ার বাইরে থাকতে পারছে না। আওয়ামী লীগ তাই নিজের ছায়ার দিকেও ক্ষেপে যাচ্ছে। টিআইবি এত দিন যে বিশেষ ‘সার্ভিস’ দিয়েছে, তার সব কিছু গাফফার চৌধুরী ও স্বদেশ রায়রা ভুলে গেছেন। পদ্মা সেতুর দুর্নীতি নিয়ে দুদকের চেয়েও বেশি পেরেশান হয়ে সরকারকে বাঁচানোর চেষ্টা করে গেছে এই টিআইবি। বর্তমান সরকারের দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও লুটপাট অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেলেও সুলতানা কামাল তার ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর সরকারকে বেশ ভালো নম্বর দিয়েছেন। বিএনপির জমানায় এই ধরনের শেয়ারবাজার, হলমার্ক, পদ্মা সেতু, কালো বিড়াল, কুইক রেন্টাল পেলে টিআইবি এবং সংশ্লিষ্ট সুশীলেরা এ দেশে কেয়ামত সৃষ্টি করে বসতেন।
টিআইবির নির্বাহী প্রধান ইফতেখারুজ্জামানের রাজনৈতিক আনুগত্যটুকু স্বদেশ রায় না জানলেও অন্য সবাই জানেন। টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের সেক্রেটারি হলেন আওয়ামী ঘরানার বিশেষ লেখিকা সেলিনা হোসেন। ট্রেজারার মাহফুজ আনাম ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি’ হিসেবে আওয়ামী লীগই তার একমাত্র গণতান্ত্রিক চয়েস। দীপু মনির স্বামী তৌফিক নেওয়াজের পরিচয়টি এই বেলায় না বললেও চলে। সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ টি এম শামসুল হুদার আওয়ামী প্রেম অন্যদের মতো তীব্রভাবে প্রদর্শিত না হলেও বিএনপির প্রতি চরম বিদ্বেষ প্রদর্শন করেছেন। ফলে সুশীলসমাজে তার ব্যারোমিটারের পারদটি ওপরের দিকে উঠেছে।
তা ছাড়া সচেতন নাগরিক সমাজ নামে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যে ৪৫টি কমিটি করা হয়েছে, সেসব কমিটির ৬২৫ জন সদস্যের মধ্যে ৩১৪ জন সরাসরি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত। ৪৪ জন বিএনপি-জামায়াত ঘরানার, পাঁচজন জাতীয় পার্টির এবং বাকিরা আওয়ামী লীগ সমর্থিত বিভিন্ন বামপন্থী দলের। কাজেই সেই টিআইবি যখন নিরপেক্ষ নির্দলীয় সরকারের ফর্মুলা উপস্থাপন করে, তখন স্বদেশ রায়রা হতাশ হতেই পারেন।
ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, ট্রাস্টি বোর্ডে অন্য অনেকে থাকলেও সাংবাদিক মহাশয় ক্ষেপেছেন মূলত দুইজনের ওপর। একজন হাফিজ উদ্দীন খান। অন্যজন আবদুুল্লাহ আবু সাঈদ। এই প্রথম আমাদের ঢাকা কলেজের অতি প্রিয় শিক্ষক আবদুুল্লাহ আবু সাঈদ স্যারের বিরুদ্ধে কাউকে কিছু লিখতে দেখলাম। আলোকিত এই মানুষটির ওপরও স্বদেশ রায় নিজের দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ আরোপ করেছেন। ২০০১ সালে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের সময় প্রকৃতিপ্রেমিক এই মানুষটি নাকি নীরব ছিলেন।
এ দেশে একটি দুর্ভাগ্যজনক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। সরকার বিদায় নেয়ার সময় পূর্বতন সরকারি দলের সোনার ছেলেরা নতুন সরকারি দলের রুপার ছেলেদের রোষানলে পড়ে। বিরোধী দলকে পিটুনি দেয়ার সময় যে ছিল ছাত্রলীগ, ফিরতি পিটুনি খাওয়ার বেলায় সে হয়ে পড়ে সংখ্যালঘু। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটি আওয়ামী লীগের জন্য বাড়তি একটা সুবিধা। এই সুবিধা নিতে আওয়ামী ব্র্যান্ডের মানবতাবাদীরা যে স্বর ও ভঙ্গিতে কান্নাকাটি করেন, তা থেকে একটু ভিন্ন ঘরানার আবদুুল্লাহ আবু সাঈদদের কান্নার ভঙ্গিটি সামান্য ভিন্ন হতেই পারে।
শুধু সরকার বদলের সময়েই নয়। একটু বেকায়দায় পড়লেই আওয়ামী লীগ এই বাড়তি সুবিধাটি গ্রহণে প্রলুব্ধ হয়। অটোমেটিকভাবে কাজটি সংঘটিত না হলে নিজেরাই ম্যানুয়েল বাটনটি চেপে দেয়। শহীদ মিনার ভাঙতে গিয়ে ধরা খায় খোদ ছাত্রলীগের কর্মী। আওয়ামী মহল তাকে মানসিক ভারসাম্যহীন বলে ছেড়ে দেয়। সংখ্যালঘুদের ওপর যত সব আক্রমণ, সব হচ্ছে রাতের আঁধারে। অথচ পৃথিবীর কোথাও রাজনৈতিক সহিংসতা কিংবা সাম্প্রদায়িক সহিংসতা রাতের আঁধারে হয় না। রাতের আঁধারে ওই আক্রমণগুলোকে দেশের মিডিয়া সামান্য অনুসন্ধান ব্যতিরেকে বিরোধী গ্রুপের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। কাজেই এই আক্রমণকারী সম্পর্কে খোদ সংখ্যালঘু জনগণের মনেই নতুন ভাবনার উদয় হয়েছে।
কারণ তারা নিজেরা ভুক্তভোগী হলেও এজাতীয় হামলার খবরে রাজনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে আওয়ামী লীগ। যদি অনুমান করেই আক্রমণকারীকে বের করতে হয়, তবে বেনিফিশিয়ারিই প্রথম সন্দেহের কাতারে থাকা উচিত। মানুষ আজ আমাদের ধারণার চেয়েও বেশি সচেতন (well informed)। একটি জনকণ্ঠের বিপরীতে অনেকগুলো গণকণ্ঠ দাঁড়িয়ে গেছে; সেই হিসাব বোধহয় স্বদেশ রায়রা রাখেন না।
বিজেপি ও শিবসেনার অনেক বিবৃতি আছে, যাতে ইন্ডিয়ার মুসলমানদেরকে লাথি মেরে পাকিস্তানে পাঠানোর নির্দেশ রয়েছে। এ দেশের সংখ্যালঘুদের প্রতি এ ধরনের ঘৃণা বিএনপি তো দূরের কথা স্বয়ং জামায়াত-শিবির বা অন্য কোনো ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর কোনো বক্তব্য-বিবৃতিতে পাওয়া যায় না। বরং সংখ্যালঘুদের মন জয় করার জন্য তাদের মধ্যেও একটা প্রচেষ্টা অনেক সময় দেখা যায়। ছাত্র শিবিরের ছেলেরা এবার বিভিন্ন জায়গায় মন্দির এবং অন্যান্য উপসনালয় পাহারা দিয়েছে। কাজেই যে দেশটিতে স্বদেশ রায়রা অবস্থান করছেন, সেই মাটি ও মানুষের এই বৈশিষ্ট্যটিকে একটা আক্রোশের বশে বিকৃত ও বিভ্রান্ত করা ঠিক হবে না।
আজ কিছু কথা ও ভাবনা দেশের সংখ্যালঘুদের মনে উদয় হচ্ছে। স্বদেশ রায়দের জবানিতে সেই ভাবনা উঠে আসছে না। তাই দৈনিক আমার দেশের সঞ্জীব চৌধুরীদের মতো বিবেকরা দাঁড়িয়ে গেছেন। তার লেখা সুধীজনের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। এ দেশের হিন্দুরাও বুঝতে পারবেন, কে তাদের প্রকৃত সুহৃদ। দেশের মধ্যে কোনো একটা সম্প্রদায়কে অস্বস্তিতে রেখে কোনো জাতি এগোতে পারবে না। একজন খাবার খেলে যখন অন্য জনের নামে বিল আসে, তখন খাদকরা উৎসাহিত হয়। এই উৎসাহদাতারা আর যা-ই হোক, ভুক্তভোগীদের শুভাকাক্সী হতে পারে না। ‘জানি, আমার কান্নার শব্দটি আপনার দরকার; কিন্তু মহাশয় হাতে চাপটি তো খাচ্ছি আমি।’ কাজেই এ ধরনের নোংরা রাজনীতিকে উৎসাহিত করলে এ দেশের সংখ্যালঘূু সম্প্রদায় আরো সঙ্কটের মুখে পড়ে যাবে। এ দেশের লুটেরা শ্রেণী শিকারের ধর্ম দেখে কখনোই শিকার করে না। যে দুর্বল তাকেই এরা টার্গেট করে।
এই দেশকে হিন্দু-মুসলমান সবার জন্যই সোনার দেশ করতে পারে এই সঞ্জীব চৌধুরীরাই। কাজেই ইঁদুর ধরার হরেক রকম কলের ইজারাদারদের নয়, এ দেশে দরকার আরো কিছু সঞ্জীব চৌধুরীর।
0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

সঙ্কট যারা সৃষ্টি করেছে সমাধান তাদের হাতেই


সঙ্কট উত্তরণের প্রধান উপায় হলো সঙ্কটের অস্তিত্ব স্বীকার করা। বাংলাদেশ রাজনৈতিকভাবে একটা ভয়াবহ সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে; এটি উপলব্ধি করে সম্মানিত ব্যক্তিরা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যার যার দায়িত্ববোধ থেকে সঙ্কট সমাধানে সরকারকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু সরকার এই হাত বাড়িয়ে দেয়াকে কোনো মূল্য তো দিচ্ছেই না উপরন্তু সবাইকে ধমকের সুরে অপমান-অপদস্থ করছে। সরকার জানে সুশাসন উপহার দিতে এবং জনজীবনের বিরাজমান সমস্যা সমাধানে তারা শুধু ব্যর্থই হয়নি, অত্যন্ত চরমভাবেই ব্যর্থ হয়েছে। তাই নির্দলীয় সরকারে অধীনে নির্বাচনে আবার মতায় যাওয়ার সম্ভাবনা নেই জেনে, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে নানা ফন্দি-ফিকির করছে।

কিন্তু বর্তমানে সর্বগ্রাসী সঙ্কটের মধ্যে একতরফা কোনো নির্বাচনের মাধ্যমে জয় লাভ করে আবার মতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখা দুঃস্বপ্ন ছাড়া আর কিছু নয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এই নির্মোহ সত্যটি শাসক দলকে অনুধাবন করতে হবে এবং এই বিপজ্জনক পথ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
মতার মোহে অন্ধ হয়ে রাজনীতি নিয়ে বিপজ্জনক খেলা শুরু হয়েছে। এই খেলার শেষ কোথায় তা কেউ জানে না, কোথাও কারো কোনো নিয়ন্ত্রণ আছে বলে মনে হচ্ছে না। অনিবার্য ধ্বংস ছাড়া এই বিপজ্জনক খেলার পরিসমাপ্তি ঘটবে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে না। কেননা এই খেলা যারা খেলছেন, নিশ্চয় তাদের একটা সুস্পষ্ট ল্য-উদ্দেশ্য আছে; উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে তারা এখন মরিয়া হয়ে সঙ্কট সৃষ্টি করে চলেছেন।
বর্তমানে দেশে যে সঙ্কট চলছে, তা গত তিন বছর আগেও বাংলাদেশে ছিল না। সমস্যাগুলো সুকৌশলে সৃষ্টি করা হয়েছে; আর তা করেছে বর্তমান সরকার। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের মধ্য দিয়ে মূলত সঙ্কটের আবির্ভাব। সরকার একতরফা আদালতের ওপর দায় চাপিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করেছে। উচ্চ আদালত বাংলাদেশে বর্তমানে যে অবস্থা তাতে আরো দু’টি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করার প্রয়োজন রয়েছে বলে মত দিয়েছেন। কিন্তু সরকার আদালতের মতকে কোনো গুরুত্ব দেয়নি; আর তাতেই সঙ্কটের সূত্রপাত, এই সঙ্কট এখন প্রান্তসীমায় এসে পৌঁছেছে। তাতে দেশ এক অস্থির, অশান্ত ও বেদনাবহ সময় অতিক্রম করছে। সুযোগ সন্ধানী মানুষগুলো তৎপর হয়ে উঠেছে তাদের স্বার্থ আদায়ে। এদের জন্য বর্তমান সয়ম খুবই সহায়ক।
নিকট অতীতে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনাই সমাধানের েেত্র কারো বুদ্ধিবৃত্তিকতার ছাপ পরিলতি হচ্ছে না। প্রত্যেকটি ঘটনাতেই অযাচিতভাবে শক্তি প্রয়োগ করার প্রবণতা ল করা যাচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও জনগণকে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড় করানো হচ্ছে; যা কোনোভাবেই কাক্সিত ও কাম্য নয়। এমন একটা অবস্থায় গিয়ে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে যে, সাধারণ মানুষের মিছিল দেখলেই পুলিশ সরাসরি গুলি চালাচ্ছে। যেমন গুলি চালায় ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলি পুলিশ। গত কয়েক মাসে পুলিশের গুলিতে প্রায় ২০০ নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। আহত হয়েছে হাজার হাজার, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে আগে কখনো ঘটেনি। রাষ্ট্রের মালিক জনগণ, রাষ্ট্রের ভিত্তিও জনগণ; এই জনগণকে নির্বিচারে পাখির মতো হত্যা করে রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না। এই প্রবণতার ফলে রাষ্ট্র ভেতরে ভেতর য় হয়ে যাচ্ছে, একটা ঘটনা থেকে আরেকটা ঘটনার সূত্রপাত হচ্ছে। ধর্ম নিয়ে কটূক্তি ও অশালীন ভাষায় গালমন্দ করা হচ্ছে। তাতে ধর্মপ্রাণ মানুষের মাঝে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে। সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার, তাদের বাড়িঘর, ব্যবসায়প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হচ্ছে, যা স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে ঘটেনি।
অন্য দিকে অত্যন্ত সুকৌশলে ইসলাম ধর্ম ও মুক্তিযুদ্ধকে মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে। এর মাধ্যমে জাতিকে করা হয়েছে সুস্পষ্টভাবে দুই ভাগে বিভক্ত। এই বিভক্তি ধীরে ধীরে চূড়ান্ত পর্যায়ের দিকে যাচ্ছে, সূত্রপাত হচ্ছে সঙ্ঘাত-সংঘর্ষের; ঘরে ঘরে ভাইয়ে ভাইয়ে সৃষ্টি হচ্ছে বিরোধ, একে অপরের বাড়িঘর ও ব্যবসায়প্রতিষ্ঠান আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে। ধ্বংস করা হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সম্পদ।  দিন যত যাচ্ছে এটা বেড়েই চলেছে এবং ভয়ঙ্কর পরিণতির দিকে যাচ্ছে। এটার লাগাম কোথায়, কেউ জানে না। সব সামাজিক শক্তি এখন মুখোমুখি। একে অপরকে ধ্বংস করতে ভেতরে ভেতরে সবাই যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে মনে হয়। একমাত্র আল্লাহ ছাড়া এই খেলা বন্ধ করার কেউ আছে বলে মনে হচ্ছে না।
খেলতে খেলতে সঙ্কটকে এমন এক জায়গায় নিয়ে দাঁড় করানো হচ্ছে, যাতে বাইরের হস্তপে অনিবার্য হয়ে ওঠে; একবার যদি বাইরের হস্তপে হয়, তা হলে এ থেকে বেরিয়ে আসা বাংলাদেশের জন্য কঠিন হয়ে যাবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন। কাজেই রাজনীতিবিদদের বোধোদয় হতে হবে। রাজনীতি নিয়ে বিপজ্জনক খেলা বন্ধ করতে হবে। শীর্ষ রাজনৈতিক  নেতাদের মুক্তি দিতে হবে। হামলা-মামলা ও নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথ পরিষ্কার করতে হবে। একতরফা নির্বাচনের ভূত মাথা থেকে ঝেড়ে ফলতে হবে। চলমান সর্বগ্রাসী সঙ্কট থেকে দেশকে বেড় করে আনতে মতাসীনদের আরো দায়িত্বশীল ও উদ্যোগী হয়ে এগিয়ে আসতে হবে। সর্বোপরি সঙ্কট দূর করে দেশকে নির্বাচনমুখী করতে হবে। দেশ নির্বাচনমুখী হলেই সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনী লড়াইয়ে অবতীর্ণ হবে। মানুষ আশ্বস্ত হবে, মানুষের মাঝে স্বস্তি ও শান্তি ফিরে আসবে।

বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০১৩

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

গ্রেফতার বাণিজ্য প্রসঙ্গ



প্রকাশিত এক পরিসংখ্যান মতে গত চার মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত সহিংসতার প্রেক্ষাপটে ৩৮৬টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। সূত্র মতে, গ্রেফতার করা হয়েছে- প্রায় ৩৩ হাজার লোককে। এসব মামলায় অজ্ঞাত আসামীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন লাখ। এই তিন লাখের অধিক অজ্ঞাত আসামী ধরার আইনগত অধিকারকে একশ্রেণীর পুলিশ ভালভাবেই কাজে লাগাচ্ছে। আজকাল যাকে তাকেই নানান ছুতানাতায় আসামী করে থানায় মামলা দেয়া হচ্ছে। আর তাদের থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে। পুলিশের এই গ্রেফতারী বাণিজ্যের প্রতিবাদও সংশ্লিষ্ট লোকেরা করতে পারছেন না। তাহলে এই বাণিজ্যখাতে আরও অধিক আর্থিক খেসারত দিতে হয়। বলা বাহুল্য, এই গ্রেফতারী বাণিজ্যের অধিক শিকার হচ্ছেন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় একশ্রেণীর নেতাকর্মী। বর্তমানে দেশে এমন এক পরিস্থিতি বিরাজ করছে যে, তাতে রাজনৈতিকভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত লোকেরা নিজেদের প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার মস্তবড় এক সুযোগ পেয়েছে। এতে ভিন্নমতের বিরোধী রাজনৈতিক মতের কর্মী ছাড়াও সাধারণ মানুষও নিরাপদে ঘুমানোর বদলে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। কারণ রাজনৈতিক সুবিধাপ্রাপ্ত এসব লোকের দাপটে অনেক সময় থানাও স্তব্ধ।
রাষ্ট্রীয় প্রশাসনকে দলীয়করণের রাজনীতি যে দেশে প্রশ্রয় পায়, সেখানে ভিন্ন মতের অধিকারী মানুষের আশ্রয় নেবার আর কোনো স্থান থাকে না। ন্যায়নীতি সেদেশে সদা আর্তনাদে থাকে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এই পরিস্থিতিতে কোনোদিন সংশ্লিষ্ট দেশে শান্তি আসতে পারে না। কারণ, মানুষ ন্যায়নীতি বঞ্চিত হয়ে, যেখানে এরূপ আশ্রয় পায় সেখানকারই শরণাপণœ হয়। ফলে পরস্পরবিরোধী এই দ্বি-মানসিকতার সংঘাত ধীরে ধীরে প্রত্যক্ষ সংঘাতময় অবস্থার রূপ নেয়। আমাদের দেশ বর্তমানে এমন একটি পরিস্থিতিরই শিকার হয়ে পড়েছে। এই অবস্থা সৃষ্টির সূচনাপূর্বে দেশের জ্ঞানী বুদ্ধিজীবীমহল নানানভাবে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষকে এটা বুঝাতে চেষ্টা করে আসছে যে, দলীয়করণ নীতি পরিহারে সরকারি ও বিরোধীদলের মধ্যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে সমঝোতায় আসা অপরিহার্য। অন্যথায় দেশের চলমান অবস্থা আরও অধিক অশান্তিময় হয়ে উঠবে। পরিতাপের বিষয়, সরকার মুখে গণতন্ত্রের কথা উচ্চারণ করলেও নিজের রাজনৈতিক স্বার্থ ক্ষুণœ হবার আশঙ্কায় এ পথে চলার বদলে স্বেচ্ছাচারিতার পথে চলার নীতিই অবলম্বন করে চলেছে। একথা বার বার সকল মহল থেকেই বলা হচ্ছে যে, নির্দলীয় সরকারের অধীনেই আসন্ন সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা হবে এই কথা ক্ষমতাসীন সরকার ঘোষণার সাথে সাথেই হরতালসহ রাষ্ট্রের জন্যে আরও যত প্রকার সমস্যা এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে, তার সবই একটি সঠিক পথে এসে যাবে। বর্তমানে যারা দেশে অর্থনৈতিক, সামাজিক, প্রশাসনিক, পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতারী বাণিজ্যসহ সকল প্রকার বাণিজ্যিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক এমনকি ধর্মীয় সমস্যা দেখা দিয়েছে তার সবগুলোই একটি গণতান্ত্রিক চরিত্র লাভ করবে। কিন্তু যে কারণেই হোক সরকার এদিকে না এসে অযৌক্তিক পথেই শুধু চলছে।
এছাড়া দেশে যত অন্যায় কাজ হচ্ছে, খাটুক না খাটুক, যৌক্তিক হোক অযৌক্তিক সব কিছুর জন্যেই প্রথমে জামায়াত-শিবিরকে দায়ী করে বিবৃতি দেয়া হচ্ছে। প্রধান বিরোধীদল বিএনপিকে এখন শুধু সব সংঘটিত অপরাধের জন্যে দায়ী করা হচ্ছে না, দলটির নেতা-কর্মীদের ওপরও চলছে সকল অযৌক্তিক জুলুম-হয়রানি। কোনো যৌক্তিক দাবি সরকার স্বীকার না করে হঠকারিতার পন্থা অবলম্বন করলেই প্রতিবাদের প্রান্তিক ব্যবস্থাস্বরূপ হরতাল, প্রতিবাদ মিছিল ইত্যাদি করা হয়ে থাকে। কিন্তু ন্যায় দাবি না মেনে যদি উল্টো তাদের বিরুদ্ধে পায়ে পাড়া দিয়ে ‘ঝগড়া’র নীতি অবলম্বন করা হয়, তাহলে সেই ঝগড়া তীব্রতর হবার বদলে মিটমাট হবার কোনোই সম্ভাবনা থাকে না। অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের প্রতিবাদের গণতান্ত্রিক পন্থাসমূহ রুদ্ধ করে দেয়ার কারণেই তো বিভিন্ন ক্ষেত্রে অশান্তির মাত্রা বেড়ে যায়, দেশবাসীর কল্যাণে এই সাধারণ কথাটি সরকার খোলামনে মেনে নিলেই সব সমস্যার সমাধান হতে পারে।
বাকি থাকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গ। প্রকৃত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে কারও আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু প্রকৃত যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তি দিয়ে প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ৪০ বছর পর মিথ্যা সাক্ষী সৃষ্টি করে তার ভিত্তিতে কাউকে শাস্তি ও প্রাণদ- দান কি করে ন্যায়বিচারের অনুকূল হতে পারে, যে কারণে আন্তর্জাতিক মহলেও বাংলাদেশের এ বিচারের প্রশ্নে সমালোচনার অন্ত নেই। বলাবাহুল্য, জামায়াত-শিবির ও অন্যান্য ন্যায়বিচারপন্থী দলসমূহ একারণেই তার প্রতিবাদ করে আসছে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিরপেক্ষ ন্যায়বিচারের দাবি জানাচ্ছে। দাবির এই সত্য ও বাস্তবতা কিছুতেই অস্বীকারের উপায় নেই। এসব দলের ব্যাপারে আদৌ কোনো প্রতিহিংসা ছাড়া যদি সরকার তাদের ন্যায্য দাবি মেনে নিয়ে অনুরূপ পন্থায় বিচারের ব্যবস্থা নেয়, তাতে সরকারের অসুবিধা কোথায়? অভিযুক্তরা এ পন্থায় শাস্তি থেকে মুক্তি পেয়ে যেতে পারেন এবং যারা প্রকৃত অপরাধী তাদের মুক্তিদাতারাই উল্টো অপরাধে ফেঁসে যেতে পারেন- এটাই কি আশংকা? যদ্দরুণ এ পথে পা না বাড়িয়ে বক্র পথে পা দিয়েছেন এবং অভিযুক্তদের অস্তিত্বকে পৃথিবী থেকে বিলীন করে দিতে চাচ্ছেন। পরিশেষে আমাদের বক্তব্য, একটাই বিরোধীদল ও জামায়াত শিবিরসহ অন্যান্য যেসব সংগঠন বিভিন্ন দাবি নিয়ে আন্দোলনে রত, সরকারের উচিত প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের বক্রপথে না গিয়ে এসব সমস্যার মীমাংসা করে ফেলা। অন্যথায় এসবকে কেন্দ্র করে আলোচ্য বিষয়সহ যেসব উদ্ভূত সমস্যা গোটা সমাজকে গ্রাস করার জন্যে দ্রুত এগিয়ে আসছে তা থেকে রক্ষার উপায় থাকবে কি না চিন্তার বিষয়। আমরা মনে করি, পরিস্থিতি এখনও হাতের বাইরে চলে যায়নি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইচ্ছা করলে এখনও সব কিছু স্বাভাবিক পথে ফিরে আসার সময় আছে।
0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

সাভারের মৃত্যু দুর্ঘটনা নয় গণহত্যা


সাভারের রানা প্লাজায় যা ঘটেছে, তা সুস্পষ্টভাবে এক গণহত্যা। কোনো মতেই মামুলি কোনো দুর্ঘটনা নয়। উইকিপিডিয়াতে গণহত্যার (Mass murder) সংজ্ঞায় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, যখন এক বা একাধিক ব্যক্তি কোনো একটি ঘটনায় চার বা ততোধিক মানুষকে হত্যা করে, তখন সেটি গণহত্যা বলে গণ্য হবে।

উইকিপিডিয়ার মতে, গণহত্যা সরকারি এজেন্টও সংঘটন করতে পারে। সেটি ইচ্ছা করে এবং বাছবিচারবিহীনভাবেও হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, যখন সরকারি এজেন্ট নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায় সেটাও গণহত্যা। তবে এটি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ কিংবা জেনোসাইড নয়।
সাভারে ভবন ভেঙে পড়ে চারজনের বেশি মানুষ মারা গেছে। এ লেখা তৈরি করা পর্যন্ত সময়ে দুই শতাধিক লোক মারা গেছে। ঘটনাটি যদি হঠাৎ করেই ঘটত, তাহলে এটি হয়তোবা দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়া যেত। কিন্তু আলোচ্য ভবনটিতে ধসে পড়ার এক দিন আগে ফাটল দেখা গিয়েছিল। বিষয়টি ভবনের মালিক ও স্থানীয় প্রশাসন সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন। ভবনের মালিক সেই ফাটলকে সামান্য প্লাস্টার খসে পড়া বলে উল্লেখ করেছিলেন। অন্য দিকে সরকারের প্রশাসনযন্ত্র ফাটল বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মতামত না পাওয়া পর্যন্ত ভবনে জনমানুষের প্রবেশ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। ফলে বুধবার নয়তলা ভবন ধসে মৃত্যুর মিছিল তৈরি হয়েছে। ভবনের মালিক এবং প্রশাসন কেউই এই গণহত্যার দায় এড়াতে পারেন না।
পুলিশ প্রশাসন থেকে দাবি করা হয়েছে, তাদের নিষেধ অমান্য করে ভবনে স্থাপিত পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা ভবনে ঢুকেছে। কথা শুনে হাসি পায়। এ দেশের পুলিশ ৩৮ শতাংশ ভোটের অধিকারী বিএনপি নেতাদের এক চুল পরিমাণ নড়াচড়া থামাতে পারে। আর পোশাক শ্রমিকদের ভবনে প্রবেশ ঠেকাতে পারে না। অবশ্য পোশাক শ্রমিকেরা বলেছেন, মালিকপক্ষ তাদের জোরপূর্বক ভবনে প্রবেশে বাধ্য করেছে। জানতে চাই, প্রশাসন তখন কী করেছিল? আঙ্গুল চুষছিল? একটি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে হাজার হাজার মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে চাইলেই তো সেটা মালিকদের পারার কথা নয়। প্রয়োজনে মালিকদের গ্রেফতার করা যেত। পুলিশ ও জনপ্রশাসনের প্রাথমিক ও প্রধান দায়িত্ব জনগণের জানমালের হেফাজত করা। এরা সেটি কেন করতে পারেনি, সে প্রশ্নের জবাব অবশ্যই দায়িত্বশীলদের দিতে হবে। কিছু জবাব অবশ্য আমরা প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছ থেকে পেয়েছি।
প্রধানমন্ত্রী ঘটনার পরপরই কমলাপুরে ডেমু ট্রেন উদ্বোধন করতে গিয়ে বলেছেন, সাভারে ধসে পড়া নয়তলা ভবন থেকে সব লোককে আগেই সরিয়ে নেয়া হয়েছিল। হতাহতরা পরে নিজেদের মূল্যবান জিনিসপত্র আনতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পড়েছে। প্রশ্ন হলো হাজার হাজার শ্রমিক ঠিক কী ধরনের মূল্যবান জিনিসপত্র তাদের কর্মস্থলে রেখে এসেছিলেন যে সেগুলো আনতে গিয়ে তারা লাশ হলেন?
ঘটনা পুরোপুরি না জেনে এ ধরনের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী আবার নিজেকে শুধুই আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হিসেবে জাতির সামনে পরিচয় করিয়ে দিলেন। ব্লগার রাজীব হত্যার পরও আমরা তার বিভ্রান্তিকর ত্বরিত বক্তব্য দেখেছি। এবার তিনি শত শত মানুষের মৃত্যু ও হাজার হাজার মানুষের আহত হওয়ার জন্য সেই মানুষগুলোকেই দায়ী করলেন। নিন্দুকেরা বলছেন, ভবনের মালিক যুবলীগের নেতা হওয়ার কারণেই প্রধানমন্ত্রী এমনটা বলেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, প্রশাসনকে বাঁচিয়ে দিতেই তার এই বক্তব্য। উল্লেখ করা যেতে পারে, ডেমু ট্রেন উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রীর সাথে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও ছিলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরো একধাপ এগিয়ে গিয়ে বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন- ‘একটি বিষয় আমার নজরে এসেছে। ওই এলাকায় মৌলবাদী বিএনপি এদের হরতালের জন্য আহ্বান জানাচ্ছিল। আমাকে বলা হয়েছে, হরতাল সমর্থক কিছু ভাড়াটে লোক সেখানে গিয়ে এই যে ভাঙা দালান বা ফাটল ধরা দেয়াল ছিল, সেই দেয়ালের বিভিন্ন স্তম্ভ এবং গেট ধরে নাড়াচাড়া করে। এটিও এ ধরনের ধসের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।’
এসবই নোংরা রাজনীতি। মন্ত্রীদের এ ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য এই প্রথম নয়। ভবন ধসে পড়ার ঘটনা এ দেশে অতীতেও ঘটেছে। এ অবস্থায় বাচাল মন্ত্রীদের মুখে লাগাম দেয়া উচিত এবং ফাটল ভবনে মানুষকে ঢুকিয়ে কিংবা ঢুকতে দিয়ে গণহত্যা যারা ঘটিয়েছে, তাদের উপযুক্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা দরকার। নতুবা এমন ঘটনা আগামীতেও ঘটবে।
শোক পালন কিংবা জাতীয় সংসদে শোকপ্রস্তাব অপরাধ থেকে অপরাধীদের নিবৃত্ত করবে না সে কথাটি রাষ্ট্রপতি এবং সংসদ সদস্যদের মনে করিয়ে দিতে চাই। আরো মনে করিয়ে দিতে চাই, রাষ্ট্র পরিচালনায় নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা বিধান সবচেয়ে জরুরি ও প্রধান বিষয়। সেখানে চরম ব্যর্থতা দেখানোর পর সমুদ্র বিজয় হলেও সেই বিজয় শেষ বিচারে বালুকণায় কিংবা জলবিন্দুতে পরিণত হতে বাধ্য।
সংসদ চলছে। সংসদে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে আলোচনা করা উচিত। এ ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত হওয়া উচিত। তদন্ত করে দোষীদের দ্রুত চিহ্নিত করা উচিত এবং আইন অনুযায়ী শাস্তি দেয়া উচিত। এ কাজে যত বিলম্ব করা হবে মানুষের জানমাল ততই অনিরাপদ থাকবে। দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে অপরাধীদের চিহ্নিত করা ও তাদের শাস্তি দেয়ার ব্যবস্থা নিতে গড়িমসি করা হলে সেটা হবে দেশের সাধারণ মানুষের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা ও প্রতারণার শামিল। মানুষ সংসদ সদস্যদের ভোট দিয়ে সংসদে পাঠায় করমুক্ত গাড়ি, সরকারি প্লট, বিদেশ ভ্রমণ, ব্যাংকের অর্থ লুটপাট, উন্নয়ন প্রকল্প থেকে কমিশন খাওয়ার জন্য নয়। আইন প্রণয়ন এবং প্রণীত আইন বাস্তবায়নে ভূমিকা পালনের জন্য। আমরা আশা করব, এ ধরনের ঘটনা মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় উদ্ধার সরঞ্জাম কেনা এবং প্রশিক্ষিত জনবল তৈরির দিকেও সরকার মনোযোগী হবে।
সব শেষে নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। তাদের পরিবারের এই শোক সইবার ক্ষমতা যেন হয় সেই প্রার্থনা করছি। প্রার্থনা করছি আহতদের দ্রুত আরোগ্য যেন ঘটে। সরকারকে মনে করিয়ে দিতে চাই, এখনো সুযোগ আছে একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার। হিংসা বিভেদ আর বিভক্তির রাজনীতি পরিহারের।
0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

সাভার হত্যাকাণ্ড এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তত্ত্ব


আহাজারি, ক্ষোভ, হতাশা আর লাশের গন্ধ এখন সাভারে। একের পর এক লাশ নামানো হচ্ছে সাভারের রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপ থেকে। মানুষের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে সাভারের বাতাস। অধরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে চলছে স্বজনের লাশ খুঁজে ফেরার করুণ দৃশ্য। সাভারের এই ভবনধস নিছক কোনো দুর্ঘটনা নয়, রীতিমতো হত্যাকাণ্ড। কারা এই শত শত মানুষের হত্যার সাথে জড়িত? ত্রুটিপূর্ণ ভবন নির্মাণের সাথে জড়িত এই ভবনের মালিক যুবলীগ নেতা সোহেল রানা এবং ভবনে থাকা চারটি পোশাক কারখানার মালিক। ভবনটির ফাটল আগের দিনেই দেখা গিয়েছিল। এ খবর নয়া দিগন্তে আগের দিনে ছাপাও হয়েছিল। দুর্ঘটনার দিন শ্রমিকেরা কাজে যোগ দিতে রাজি ছিলেন না। তাদের পিটিয়ে জোর করে ভবনে ঢুকতে বাধ্য করা হয়েছিল। এমনও বলা হয়েছিল, ওই দিন যারা কাজে যোগ দেবে না, তারা বেতন পাবে না। বেতন পেতে হলে কাজে যোগ দিতে হবে। যুবলীগ নেতা সোহেল রানা নিজেও এ ভবনের মধ্যে ছিলেন। তিনি হরতালবিরোধী সমাবেশের জন্য অনেককে এই ভবনে জড়ো করেছিলেন। তারাও হতাহতের শিকার হয়েছেন।

ভবনধসের নামে এই হত্যাকাণ্ডের সাথে কারা কিভাবে জড়িত তা বোঝা কোনো কঠিন ব্যাপার না হলেও আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যথারীতি এই হত্যাকাণ্ডের সাথে বিরোধী দলের জড়িত থাকার বিষয়টি আবিষ্কার করতে সফল হয়েছেন। দেশের মানুষ যখন ভবনের ভেতরে আটকে পড়া মানুষের জন্য বেদনা অনুভব করছেন, তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মাথায় কাজ করছে কিভাবে এ ঘটনার সাথে বিরোধী দলকে জড়িয়ে তাদের ফাঁসানো যায়। তিনি বুধবার রাতে বিবিসি বাংলার সাথে সাক্ষাৎকারে বলেছেন, দুর্ঘটনার আগে কিছু মৌলবাদী ও বিএনপির ভাড়াটে লোক সাভারের ভবনটির গেট ও বিভিন্ন স্তম্ভ ধরে ‘নাড়াচাড়া’ করেছিল। তার মতে, ভবনটি ধসে পড়ার পেছনে এটিকেও ‘একটি কারণ’ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
এ সময় তিনি বিরোধী দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদেরও এ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দৃশ্যত যে নির্দেশনা অনুযায়ী ভবনটি নির্মাণ করা উচিত ছিল, সে নির্দেশনা অনুসরণ করে ভবনটি নির্মাণ করা হয়নি। ভবন ধসের জন্য স্থানীয় বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের দায়ী করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এখানকার (সাভারের) মৌলবাদী… বিএনপি… এদের (শ্রমিকদের) হরতালের জন্য আহ্বান জানাচ্ছিল। আমাকে বলা হয়েছে, হরতাল-সমর্থক কিছু ভাড়াটে লোক সেখানে গিয়ে ওই যে ভাঙা দালান ছিল বা ফাটল ধরা দালান ছিল, সেই দালানের বিভিন্ন স্তম্ভ নিয়ে নাড়াচাড়া করে এবং যে গেট বা দরজা ছিল, সেটা নিয়েও নাড়াচাড়া করে। এটাও এ ধরনের একটি দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।’
ভবন ধরে নাড়াচাড়া করার কারণেই ভবনটি ধসে পড়েছে কি না, এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরো বলেন, ‘কিছু অংশ হতে পারে। ভবন সম্পর্কে মনে রাখা দরকার, যখন একটি ভবন ধসে পড়া শুরু হয়, তখন তার একটি অংশ বা খানিকটা অংশ ধসে পড়লে বাকি অংশের ওপরও এর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। সে ধরনের প্রতিক্রিয়াও সৃষ্টি হতে পারে।’
ভবনে ফাটল দেখা যাওয়ার পরও পরের দিন কিভাবে সেখানে শ্রমিকদের কাজে পাঠানো হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা আমাদের মনে রাখতে হবে, এটা পুলিশি রাষ্ট্র নয়। আমরা সবকিছু পুলিশ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। আমরা বলেছি, ভবনটি বিপজ্জনক। স্থানীয় কর্তৃপও বলেছে। তথাপি কিছু লোক সেখানে গেছেন। আমাকে বলা হয়েছে, এরা নিজের সম্পত্তি বা জিনিসপত্র উদ্ধার করতে গেছেন।’
ভবনের মালিক মতাসীন দলের সাথে যুক্ত আছেন বলে এ ঘটনার কোনো বিচার হবে নাÑ এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কাউকেই রেহাই দেয়া হবে না। অপরাধী অপরাধী হিসেবেই বিবেচিত হবে।
বাংলাদেশ নামে এই রাষ্ট্রটি কী ধরনের লোক দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে, তার নমুনা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে পাওয়া যাচ্ছে। তিনি অপরাধীকে অপরাধী হিসেবে দেখছেন, কিন্তু এই অপরাধী হতে হবে অবশ্যই বিরোধী দলের কোনো সদস্য। কারণ, এই মন্ত্রীর মাথায় কোনো দিনই ঢুকবে না ছাত্রলীগ, যুবলীগ বা আওয়ামী লীগের কেউ কোনো অপরাধ করতে পারে। এর আগে প্রধানমন্ত্রী কমলাপুরে ডেমু রেলের উদ্বোধনের সময় বলেছেন, আমরা আগেই ভবন ফাটলের খবর জানতে পেরেছিলাম। ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছিল। কিছু লোক মূল্যবান জিনিসপত্র আনতে গিয়ে আটকে পড়েছে। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ধন্যবাদ দিতে হয় তিনি অন্তত এ কথা বলেননি যে, পাকিস্তান থেকে আমদানি করা ককটেলের আঘাতে ভবনটি ধসে পড়েছে। সাভারের সোহেল রানাকে অচিরেই হয়তো আওয়ামী বীর হিসেবে সংবর্ধনা দেয়া হবে। সেই সংবর্ধনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে। যেমন বিরোধী দলের নেতাদের পেটানোর জন্য তিনি পুলিশ কর্মকর্তাদের পুরস্কৃত করেছেন। এই ভবন ধসের জন্য স্থানীয় বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের আসামি করে মামলা দায়ের করা হবে। হেফাজতে ইসলামের যেসব নেতাকর্মী বা মাদরাসা ছাত্র রক্ত দিতে গিয়েছে তাদের তালিকা করে জঙ্গি হিসেবে এ ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত করে আসামি করলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। অদ্ভুত এক উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ।
0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

আর নয় শোক এবার করুন বিচার


এবার ডেকে এনে শত শত মানুষকে হত্যা করা হলো। এরা কেউ বাংলাদেশের শত্রু ছিল না। এরা সবাই অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চারকারী পোশাক শিল্প শ্রমিক। আমাদের পরম বন্ধু। হোমরাচোমরা যারা অর্থনীতির ৭ শতাংশের প্রবৃদ্ধির হইচই খবর দিচ্ছেন, সেটি মূলত নির্ভর করছে এদের রক্ত ঘামের ওপর। ২০২১ সালে একটি পরিপূর্ণ ডিজিটাল বাংলাদেশ আর মধ্যম আয়ের স্বপ্নমাখা রাজনীতিক বাগাড়ম্বর এদের ওপর নির্ভর করেই করছি। প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে, এরা এখন আমাদের গিনিপিগ। আমরা যেনতেনভাবে এদের নিয়ে খেলছি।

কোনো ব্যাংক কর্তাকে অথবা গার্মেন্ট মালিককে রানা প্লাজায় ঢোকানো যায়নি বৃহস্পতিবার। মালিকেরা নিজেদের জীবনকে অপরিহার্য মনে করেন। কিন্তু সামান্য বেতনের গরিব গার্মেন্ট শ্রমিকদের জীবনকে এরা একই নিক্তিতে মাপেন না। ভবনটি ছিল ক্ষমতাসীন দলের এক নেতার। স্থানীয় প্রশাসন তাই যেচে ঘোষণা করেছে এ ভবন সম্পূর্ণ নিরাপদ। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসে যুবলীগের রানার ভবনটিতে কোনো সমস্যা নেই বলে জোরালো ভাষণ দেন। সরকারি কর্মকর্তা এখন জনগণের সেবক নয়; সেবক ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালীদের।
আগের দিনই সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে সঙ্কেতটি দেয়া হয়েছিল। তোমরা সরে যাও যেকোনো সময় এটি ধসে যেতে পারে। ভবনটি পরিত্যক্ত হলে যুবলীগ নেতা রানার কী হবে! নয় নয়টি তলা, কোটি কোটি টাকার ভাড়া আদায় বন্ধ হয়ে যাবে! খবরে প্রকাশ রানার আরো কয়েকটি ভবন রয়েছে। সবচেয়ে মজবুতভাবে তৈরি ভবনটিতে তিনি পরিবার পরিজন নিয়ে থাকেন। কারণ তাকে যেকোনোভাবে বেঁচে থাকতে হবে। অত অত কোটি টাকার নগদ আয় ভোগ করতে হবে; ফুর্তি আরাম আয়েশ তাকে করতেই হবে!
ভবন নির্মাণের নিয়ম-কানুন মেনে রানা প্লাজা তৈরি করা হয়নি। অনুমোদন ছিল ছয়তলার। কিন্তু নয়তলা করলে আরো কোটি টাকা বেশি আয় হবে। তাহলে উপায় কী, মানুষের জীবন দিয়ে রানার কী হবে? তাকে নয়তলাই বানাতে হবে। উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়া প্রকৌশলীরা বলছেন, যথেষ্ট পরিমাণ রড সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়নি এ ভবনে। ইট বালি সুরকিও মানসম্পন্ন ছিল না। কেনইবা হবে, ভালো জিনিস ব্যবহার করলে টাকা বেশি খরচ হয়ে যাবে না? সে ক্ষেত্রে রানার কী লাভ? ভবন তৈরিতে ব্যয় কমাতে গিয়ে এখন শত শত গরিব নিরীহ শ্রমিককে প্রাণ দিতে হলো।
সরকারের ছায়ায় থেকে যুবলীগ নেতার লোভের জিহবা হাজার মাইল লম্বা হয়ে যেতে পারে। কিন্তু সরকারের দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ কী জবাব দেবেন? ভবন বানানোর সময় পৌরসভা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল বিভাগ কী করেছে? কিংবা মঙ্গলবার যখন ভবনটিতে ভয়ঙ্কর ফাটল দেখা দিলো, স্থানীয় প্রশাসন ভবনটিতে কাজে নিযুক্ত হাজার হাজার মানুষের জীবন রক্ষায় কী উদ্যোগ নিয়েছেন? তারা কি শুধু যুবলীগ নেতার আয় রোজগার ঠিক রাখার দায়িত্ব পালন করেছেন! সরকারি কর্তৃপক্ষই তো ঘোষণা দেয়, এ ফাটল এমন কিছু নয়; আপনারা নির্দ্বিধায় ভবনে অবস্থান নিয়ে কাজ করতে পারেন।
আরো পেছনে রয়েছে সংখ্যালঘুদের জমি হারানোর আর্তনাদ। আজকের প্রিন্স রানা তখন তেলের ঘানি ঠেলেছেন। সরকারি দল করার কারণে ১৯৯৮ সালে ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায়। তিনি হয়ে ওঠেন বিরাট প্রভাবশালী। স্থানীয় রবীন্দ্রনাথ সাহার জমির ওপর তার লোভ হয়। জোর করে দখল করে নেন রানা প্লাজার বর্তমান জমিটি। জমি দখল থেকে শুরু করে অবৈধভাবে ভবন নির্মাণ এবং সর্বশেষ ভবন ধসে যাওয়ার পর তাকে পালাতেও সহযোগিতা করা হয়েছে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন এমনকি এলিট ফোর্স র‌্যাবও তার জন্য সহযোগিতার হাত নিয়ে এগিয়ে এসেছিল। অন্য দিকে জমির মালিক রবীন্দ্রনাথ সাহা সম্পত্তি হারিয়ে এখন পাগল। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে যখন হিন্দুদের জমি দখল, তাদের উৎপাটন ও নির্যাতন করা হয়, সেটা কখনো সংখ্যালঘু নির্যাতন হিসেবে চিহ্নিত হয় না।
শত শত নাগরিককে হত্যা ও হাজার হাজার নাগরিককে আহত করার পর মানুষ এখন জানতে চাচ্ছে দোষীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। যে নির্বাহী কর্মকর্তা যুবলীগ নেতার প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে ভবনটি নিরাপত্তার ব্যাপারে সনদ দিলেন, যারা শ্রমিকদের পিটিয়ে জোরপূর্বক ভবনে ঢোকালেন, আর যারা ভবন নির্মাণে যথাযথ কোড না মানার পরও ভবনটি হতে দিলেন তাদের কাউকে কি আইনের আওতায় আনা হয়েছে? সম্প্রতি গার্মেন্টে বড় বড় হতাহতের ঘটনার দিকে তাকালে পাওয়া যাবে একেবারেই হতাশার চিত্র। এই সাভারেই স্পেকট্রাম গার্মেন্ট ধসে ৭৬ জন শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছিলেন। তাজরীন ফ্যাশনসে আগুন লেগে মারা যান ১১৪ জন। রাষ্ট্র শোক জানিয়েছে, জাতীয় সংসদে আলাপ আলোচনা হয়েছে; এটুকুই সান্ত্বনা। ঘটনার কারণ উদঘাটন করা হয়েছে; কোনো মালিক বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন; কেউ শাস্তি পেয়েছেন আমরা দেখিনি।
সরকারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী হতাহত শ্রমিকদের প্রতি আবেগ দেখিয়েছেন। উদ্ধার কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে দাবি করে হরতাল প্রত্যাহার করার আহ্বান জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতার প্রতি। জাতির চরম শোকের দিন অন্ততপক্ষে দুই নেত্রীকে কিছুটা কাছাকাছি আনার জন্য ভূমিকা রেখেছেন। বিরোধী নেতা হরতাল প্রত্যাহার করেন। প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান না জানালেও সম্ভবত হরতাল এভাবেই প্রত্যাহার করা হতো। সরকার বৃহস্পতিবার জাতীয় শোক দিবস ঘোষণা করে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়।
সরকারের বিভিন্ন বাহিনী উদ্ধার অভিযানে নেমেছে। বিএনপি নয়াপল্টনে দলীয় ও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আহত ব্যক্তিদের সরবরাহ করার জন্য রক্ত সংগ্রহ করেছে। ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন জরুরি ডাক্তারি সাহায্য নিয়ে গেছে আহতদের কাছে। হেফাজতে ইসলামের কর্মী-সমর্থকেরা রক্ত দিচ্ছেন। সাহায্য নিয়ে এগিয়ে এসেছে ইবনে সিনা ও ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল। শোকাবহ ঘটনা জাতীয় ঐক্য গঠনের একটি আবহ তৈরি করেছে। প্রেসিডেন্টের শপথ নেয়া যদি অন্ততপক্ষে কয়েকটি দিন পিছিয়ে দেয়া হতো সেটি আরো ভালো হতো। অনেক ব্যক্তি ও কোম্পানি এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানাতে দেখা যাচ্ছে। একজন নতুন প্রেসিডেন্টের অভিষেক অবশ্যই আনন্দের। আনন্দের জন্য জাতীয় শোকের এদিনকে এড়ানো গেলে আরো ভালো হতো।
রানা প্লাজায় হতাহতেরা স্পেকট্রাম ও তাজরীনের ভাগ্য বরণ করুক এটা কেউ চায় না। জাতীয় শোক পালন করে হতাহতদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে সরকার দায়িত্ব শেষ করবে এমনটা যেন না হয়।
রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি গার্মেন্ট শিল্পে বাংলাদেশের শেষ ট্র্যাজেডি হোক। সেজন্য ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করে দায়ী ব্যক্তিদের যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা করতেও সরকার আন্তরিক হবেন। ডেকে এনে যারা মানুষ হত্যা করল, তারা যেন কোনো ফাঁকফোকর গলিয়ে বেরিয়ে যেতে না পারে সেই প্রত্যাশা সবার।
0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

গৃহযুদ্ধ শুরু করতে চায় সরকার?


তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতির প্রথম নির্বাচনে জয়ী হয়ে ১৯৯৬ সালের জুনে শেখ হাসিনা প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হন। গোড়ার দিক থেকেই আওয়ামী লীগের সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী গঠন শুরু হয়। আমি তখন অন্য একটি পত্রিকায় কলাম লিখি। একাধিক প্রবন্ধে শেখ হাসিনাকে আমি হুঁশিয়ার করে দিয়েছিলাম, বলেছিলাম কাজটা স্বল্প ও দীর্ঘ উভয় মেয়াদে দেশের জন্য ভয়াবহ প্রমাণিত হবে।

তখনই আমি হুঁশিয়ার করে দিয়েছিলাম, চোর-ডাকাত ও খুনিরা শেখ হাসিনার ক্যাডারের ছত্রছায়ায় তাদের দুষ্কৃতিগুলো বাড়িয়ে তুলবে, দেশে চুরিডাকাতি ও খুনখারাবি বেড়ে যাবে। আরো বলেছিলাম, আওয়ামী লীগ যদি অস্ত্রবলে রাজনীতি করে তাহলে বিরোধীদেরও কোনো না কোনো পর্যায়ে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অস্ত্র ব্যবহারের কথা ভাবতে হবে। প্রকৃতির নিয়মটা পদার্থ বিজ্ঞানীরা যুক্তিতর্ক আর হিসাব-নিকাশ করে প্রমাণ করেছেন : ‘এভরি অ্যাকশন হ্যাজ ইটস রি-অ্যাকশন’ প্রতিটি ক্রিয়ারই প্রতিক্রিয়া হবে।
ক্যাডারদের ভয়াবহ তৎপরতা শেখ হাসিনার প্রথম সরকারের আমলেও সবাইকে চিন্তাগ্রস্ত ও উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল। মিডিয়ায় ক্যাডারদের গডফাদার হিসেবে ফেনীর জয়নাল হাজারী, লক্ষ্মীপুরের আবু তাহের, নারায়ণগঞ্জের শামীম ওসমান এবং ঢাকার কয়েকজনের নাম তখন ব্যাপকভাবে উল্লেখ করা হতো। এদের উৎপাত সম্বন্ধে প্রশ্ন করায় এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের রীতিমতো তিরস্কার করেছিলেন। অনেক রাজনৈতিক হত্যার জন্য সাধারণভাবেই এরা দায়ী বলে বিশ্বাস করা হতো। বর্তমান দফায় ক্ষমতায় এসে সরকার এদের সবাইকেই পুনর্বাসিত করেছে। সে সময়ের রাজনৈতিক হত্যার জন্য প্রাণদণ্ডপ্রাপ্ত ২১ জনের দণ্ড এই সরকার মওকুফ করে দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নিজেও রাজনৈতিক হত্যার বিরোধী ছিলেন বলে মনে হয় না। চাটগাঁর আওয়ামী লীগ নেতাদের তিনি ‘একটির বদলে দশটি লাশ ফেলা’র তাগিদ দিয়েছিলেন, ব্যঙ্গ করে তাদের শাড়ি পরার পরামর্শ দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় দফায় গদি পাওয়ার লক্ষ্যেও আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক হত্যার আশ্রয় নিয়েছিল। ২০০৬ সালের অক্টোবরে লগি-লাঠি-বৈঠার লাগাতার হরতালে পিটিয়ে অনেকগুলো মানুষের হত্যার কথা এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে।
বর্তমান দফায় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার সময় থেকে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ প্রভৃতি আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন যেন সশস্ত্র ক্যাডারদের সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছে। হত্যার রাজনীতি অনেকটা স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। হল দখল, ভর্তিবাণিজ্য, সরকারের বিরোধীদের সম্পত্তি ও ব্যবসায় দখল ইত্যাদি বাবদ বহু হত্যা তো হয়েছেই, তার ওপরও বেছে বেছে (সিলেকটিভ) বহু হত্যা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে অন্তত ১৭ জন সাংবাদিক আছেন। সরকারের, শাসক দলের এবং সে দলের কিংবা কোনো না কোনো অঙ্গসংগঠনের সমালোচনা করে সাংবাদিকেরা যেন নিজেদের মৃত্যুর পরোয়ানাই লিখে দিয়েছিলেন।
 গ্রেফতার, নির্বিচার হত্যা ও গুম-খুন
সরকার এক দিকে বিরোধী দলের হাজার হাজার কর্মী এবং শীর্ষ সারির শতাধিক নেতাকে সাজানো মামলায় কারারুদ্ধ করে রেখেছে, অন্য দিকে গত সপ্তাহে প্রকাশিত মানবাধিকার পরিস্থিতির পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই সরকারের আমলে ৪২৬ জনকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়েছে। গুম হয়েছেন ১৫৬ জন। এদের মধ্যে ২৮ জনের মৃতদেহ পাওয়া গেলেও আজ পর্যন্ত অন্যদের কোনো খোঁজখবর পাওয়া যায়নি। নিখোঁজদের মধ্যে আছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ইলিয়াস আলী এবং ঢাকার ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার চৌধুরী আলম। ইলিয়াসের মুক্তির জন্য বিভিন্ন বন্ধুদেশ বাংলাদেশ সরকারকে বারবার অনুরোধ করলেও সরকারের দিক থেকে সাড়া মেলেনি। মনে হচ্ছে হত্যা, গুম ও কারারুদ্ধ করে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের রাজনীতির অঙ্গন থেকে সরিয়ে দিয়ে সরকার আগামী নির্বাচনে বিজয়ের পথ সুগম করতে চায়।
বর্তমান সরকারের আমলে সম্পূর্ণ দলীয়কৃত পুলিশ বাহিনীও যেন সশস্ত্র ক্যাডারদের পরিপূরক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সভা-সমাবেশ কিংবা রাজনৈতিক মিছিলে শান্তি বজায় রাখা পুলিশের কাজ। কিন্তু সরকার এখন পুলিশের পাশাপাশি তাদের ক্যাডারদের এবং ছাত্রলীগ ও যুবলীগকেও মোতায়েন করছে। প্রকৃত প্রস্তাবে অশান্তি এরাই সৃষ্টি করছে। এরা বিরোধী দলগুলোর বিধিসম্মত সমাবেশ কিংবা মিছিলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে, খুন-জখম করছে, আর পুলিশ যেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছে। বিশ্বজিৎ হত্যার ব্যাপারেও দেখা গেছে, ছাত্রলীগের কর্মীরা যখন চাপাতির আঘাতে লোকটাকে খুন করছিল পুলিশ তখন নীরব দর্শক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পরিহাস এই যে, ক্যাডারদের আর পুলিশের সৃষ্ট অশান্তির জন্য সরকার বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের হুকুমের আসামি করছে, তাদের জেলে বন্দী রেখে সরকার আশা করছে, বিরোধী দলের আন্দোলন তারা এভাবেই ঠেকাবে।
নিজের সৃষ্ট কুকাণ্ডগুলোর কারণে দেশে এখন সরকারের কোনো জনসমর্থন নেই। আইনশৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচারের অনুপস্থিতির ওপরেও ইসলামি সন্ত্রাস দলনের নামে টুপি-দাড়ি পরিহিত ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিদের গ্রেফতার ও হয়রানি, যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে বিতর্কিত ট্রাইব্যুনালে সরকারের বিরোধী কয়েকজন নেতার বিচার, তাদের প্রাণদণ্ড দিতে বিচারকদের ওপর চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে কিছুসংখ্যক সন্দেহজনক চরিত্রের লোককে দিয়ে শাহবাগে একটা দঙ্গল সৃষ্টি, শাহবাগীদের কয়েকজনের ইসলামবিরোধী কুৎসা রটনার খবর ফাঁস এবং তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদীদের ওপর বেপরোয়া গুলিবর্ষণ করে একটা গণহত্যাÑ ইত্যাদি কারণে বর্তমান সরকার দেশবাসীর আস্থা হারিয়ে ফেলেছে, সাধারণ মানুষ সরকারের পতন চায়।
 দেশবাসী রুখে দাঁড়িয়েছে
পাঠকেরা অবশ্যই লক্ষ করে থাকবেন, সাম্প্রতিক কিছু দিনে এখানে-সেখানে গুলিবিদ্ধ হয়ে চার-পাঁচজন ছাত্রলীগ কর্মী মারা গেছেন। এই সরকারের আমলে কোনো দুষ্কৃতেরই সঠিক তল্লাশি হয় না, প্রকৃত দুষ্কৃতকারীরা ধরা পড়ে না। পুলিশ সরকারের রাজনৈতিক হুকুম তামিল করতে এতই ব্যস্ত থাকে যে, অপরাধ নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় তাদের থাকে না। তবে ধরে নেয়া যেতে পারে, ছাত্রলীগের এত দিনের ‘অ্যাকশনের’ (সহিংসতার) ‘রি-অ্যাকশন’ (প্রতিক্রিয়া) শুরু করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশে রাজনৈতিক বন্দীর সংখ্যা লাখখানেক বলে অনুমান করা হয়েছে। ছাত্রলীগ, যুবলীগ কিংবা ক্যাডারদের তৃণমূল সদস্যরা বহু ক্ষেত্রেই পুরনো অসদ্ভাব অথবা বহু ক্ষেত্রে শুধু শোনা কথার ওপর ভিত্তি করে এর-তার দিকে আঙুল তুলেছে এবং সরকারের পুলিশ এসে তাদের ধরে নিয়ে গেছে। এই গ্রেফতার ব্যাপারটা পুলিশের জন্যও রীতিমতো একটা বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে।
কোথাও কোনো রাজনৈতিক অশান্তি ঘটলে পুলিশ কোনো রকম সাক্ষ্যপ্রমাণ, এমনকি প্রত্যক্ষ কোনো অভিযোগ ছাড়াই অজ্ঞাত পরিচয় হাজার হাজার মানুষের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করে রাখছে। এই মামলাগুলোকে তারা হাঁড়িভর্তি জিওল মাছের মতোই ব্যবহার করছে। গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে তারা নিরীহ-নির্দোষ মানুষের কাছ থেকে ‘চাঁদা’ আদায় করছে। চাঁদা না দিলে বিএনপি কিংবা জামায়াতের কর্মী অপবাদ দিয়ে তাদের গ্রেফতার করছে।
এরও প্রতিক্রিয়া ঘটতে শুরু করেছে দেশজুড়ে। বিগত কিছু দিনে এক ডজনেরও বেশি স্থানে দেখা গেছে, পুলিশ কাউকে ধরতে এলে গ্রামবাসী ও স্থানীয় জনতা তাদের ওপর চড়াও হচ্ছে। স্থানীয়রা বুঝে গেছে পুলিশ কোনো দুর্বৃত্ত কিংবা দুষ্কৃতকারীকে ধরতে আসছে না, আসছে সরকারের হুকুমে কোনো রাজনৈতিক কর্মীকে গ্রেফতার করতে, অথবা নিজেদের গ্রেফতারবাণিজ্যের অংশ হিসেবে ঘুষের আশায় কোনো নিরীহ ব্যক্তিকে ধরে নিয়ে যেতে। এসব অত্যাচার সহ্য করতে দেশের মানুষ আর রাজি নয়। এ কারণেই রাজধানীর বাইরে গ্রামগঞ্জে যেতে পুলিশ এখন ভয় পাচ্ছে।
বিরোধী দল কিংবা আন্দোলনকারীরা কোনো কর্মসূচি দিলে সরকার রাজধানীতে আসার সব পথ ও যানবাহন বন্ধ করে দিচ্ছে। তারা ভাবছে স্ব-আরোপিত অবরোধে রুদ্ধ রাজধানীতে তারা অবরুদ্ধ দুর্গের সৈন্যদের মতোই নিরাপদ থাকবে। কিন্তু ৬ এপ্রিল হেফাজতে ইসলামের সমাবেশেও দেখা গেছে, রাজধানী ও আশপাশের মানুষও সরকারের বিরোধী হয়ে পড়েছে। সুতরাং অবরুদ্ধ রাজধানীতে তারা আর বেশি দিন নিরাপদ থাকবে না।
গার্মেন্টকর্মী দিয়ে নারী সমাবেশ
হেফাজতের সাফল্যের বিরুদ্ধে যে তাদেরও জনসমর্থন আছে, তা জাহির করার জন্য রাজধানীতে নারী মহাসমাবেশ ডেকেছে সরকার। কিন্তু তার ভেতরের রহস্য সম্বন্ধে কতটুকু জানে সাধারণ মানুষ? কিছু দিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল থেকে এক ছাত্রী ই-মেইলে আমাকে জানিয়েছিলেন, শাহবাগীদের কয়েকজন তাদের হলে ঢুকে ছাত্রীদের শাহবাগীদের সমাবেশে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দিয়ে গেছে; হুমকি দিয়ে গেছে যে, না গেলে পরিণতি ভালো হবে না। সরকারের কোনো কোনো মন্ত্রীও বলেছেন, নারী সমাবেশে যোগদান সব ছাত্রীর জন্য বাধ্যতামূলক। সরকার গার্মেন্ট শিল্প মালিকদের বলেছে, তাদের হাজার হাজার নারীকর্মীকে প্রস্তাবিত নারী সমাবেশে হাজির করতে। তাদের টোপ দেয়া হয়েছে তাহলে হাতিরঝিলে গার্মেন্ট মালিক সমিতির বহুতল ভবনটি ভাঙা হবে না। ভাড়াটে জনতা দিয়ে জনপ্রিয়তা দেখানোর পুরনো টেকনিকে বাংলাদেশের মানুষ এখন আর ভোলে না।
ছাত্রলীগ-যুবলীগ এখন আর আগের মতো বিনা বাধায় তাদের অত্যাচার-নির্যাতন চালাতে পারছে না। পুলিশ বাহিনীর মতো তারাও ক্রমেই বেশি করে স্থানীয় জনসাধারণের কোপে পড়ছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনাটি ঘটেছে ফটিকছড়ির ভূজপুরে। ছাত্রশিবির সেদিন সেখানে একটা সমাবেশ ডেকেছিল। ছাত্রলীগ, যুবলীগ আর আওয়ামী লীগের ক্যাডারদের একটি বিরাট বাহিনী দুই শ’রও বেশি মোটরসাইকেল এবং কয়েকটি গাড়ি নিয়ে শিবিরের সমাবেশের ওপর হামলা করতে আসে। স্থানীয় জনতা তাদের ঘিরে ফেলে। তিনজন হানাদার মারা গেছে, আহত হয়েছে শতাধিক। দুই শতাধিক মোটরসাইকেল ও কয়েকখানি গাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে স্থানীয় জনতা।
সাধারণ ও স্বাভাবিক অবস্থায় আশা করা যেত যে, এই ঘটনা থেকে সরকার শিক্ষা নেবে। কিন্তু এ সরকার সাধারণ কিংবা স্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী কোনো কিছু কিংবা কারো কাছ থেকে শিক্ষা নিতে নারাজ। গত সপ্তাহে তিনি বলেছেন, ছাত্রলীগই শিবিরের মোকাবেলা করবে। প্রধানমন্ত্রীর এই উক্তিকে দেশের মানুষ হুমকি বলেই মনে করবে এবং তারা রীতিমতো আতঙ্কিত হবে।
ফসল কাটা হলো কিন্তু গোলায় উঠল কই?
এ কথা কারোই অজানা নয় যে, আওয়ামী লীগের ক্যাডার এবং ছাত্রলীগের হাতে এখন বহু আগ্নেয়াস্ত্র আছে। প্রয়োজন বোধে অস্ত্র সংগ্রহ করা শিবিরের জন্যও অসম্ভব হবে না। দেশব্যাপী একটা বন্দুক-রাইফেলের যুদ্ধের আশঙ্কা লুকিয়ে আছে প্রধানমন্ত্রীর উক্তিতে। মনে হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী এখন ব্যালটের জোরে বিজয়ের আশা পুরোপুরি ছেড়ে দিয়েছেন। এখন তিনি বুলেটের জোরে গদি আঁকড়ে থাকতে চান। কিন্তু বন্দুকের যুদ্ধের ফলাফলের ওপর নির্ভর করা বিপজ্জনক হতে পারে। ইতিহাসে বহু দেশ ও বহু শাসক জয়ের আশা নিয়ে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, কিন্তু ভাগ্য শেষ পর্যন্ত তাদের ওপর প্রসন্ন থাকেনি।
আরেকটা প্রশ্ন নিশ্চয়ই অনেকের মনে আসবে। দেখা যাচ্ছে, দেশের সর্বত্র মানুষ এখন সরকারের বিপক্ষে চলে গেছে। কিন্তু বিএনপি এবং বিরোধী জোট কেন এখনো এ পরিস্থিতির পুরোপুরি সদ্ব্যবহার করতে পারছে না? কেন তারা সরকারের পতন ঘটাতে পারছে না? অবস্থাটা যেন মাঠভর্তি ফসল কেটে বিছিয়ে রাখা হয়েছে, কিন্তু সে ফসল কৃষকের গোলায় উঠছে না। অতীতে এ সমালোচনা শোনা গেছে যে, খালেদা জিয়া অকান্ত পরিশ্রম করলেও দলীয় নেতৃত্বের একাংশ যথাযোগ্য ভূমিকা পালন করছেন না। এমনকি কেউ কেউ নাকি আন্দোলনে পিছুটান দিচ্ছেন।
এখন আবার সাজানো মামলা দিয়ে শতাধিক শীর্ষ নেতাকে জেলে বন্দী রাখা হয়েছে। কিন্তু তাতেই যদি আন্দোলন বন্ধ হয়ে যায় তাহলে সে আন্দোলনকে সার্থক আন্দোলন বলা যাবে না। আমার এখনো মনে আছে, ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতার আন্দোলনে গান্ধী-নেহরু থেকে শুরু করে হাজার হাজার নেতাকর্মীকে কারারুদ্ধ রাখা হয়েছিল; কিন্তু কংগ্রেসের স্বাধীনতার আন্দোলন থেমে যায়নি। বরং নি¤œতর স্তরের নেতারা, এমনকি স্থানীয় কর্মীরাও দ্বিগুণ উদ্যমে আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। সে রকম প্রত্যয় না থাকলে কোনো আন্দোলনই সত্যিকারের সাফল্য অর্জন করতে পারে না।

Ads