শনিবার, ৭ জুন, ২০১৪

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

আপাত শান্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অস্থিতিশীলতার অশুভ পদধ্বনি



গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনী জালিয়াতির পর রাজনৈতিক ফ্রন্টে দেশ তুলনামূলকভাবে শান্ত রয়েছে। ১৯ দলীয় জোট রাজপথের আন্দোলন সাময়িকভাবে হলেও স্থগিত করেছে। যেটিকে বলা হয় সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে কনফ্রন্টেশন, সেটি এই মুহূর্তে প্রবল এবং তীব্র নয়। এই পরিস্থিতিকে এক কথায় মোটামুটি শান্তিপূর্ণ বলা যায়। বিরোধী দলীয় জোট এই মুহূর্তে রাজপথের আন্দোলনের সাময়িক বিরতি দেয়ার অর্থ এই নয় যে, তারা দুর্বল বা সরকারের সাথে আপোস করেছে। বিগত জালিয়াতিপূর্ণ নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাধিকবার বলেছেন যে, ৫ জানুয়ারি যে নির্বাচন হচ্ছে সেটি নিয়ম রক্ষার নির্বাচন, অর্থাৎ সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলে ঐ নির্বাচন করতে হবে। নির্বাচনের কিছুদিন পর সব দলের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে এবং সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য হয় এমন একটি নির্বাচন করা হবে। প্রয়োজন হলে সেটি হবে একাদশ সংসদ নির্বাচন, যেটি হবে অনেকটা মধ্যবর্তী নির্বাচনের মতো। বিরোধী দল ৫ জানুয়ারির নির্বাচন অর্থাৎ দশম সংসদ নির্বাচন মেনে নেয়নি। তারা মনে করে যে, ঐ নির্বাচন ছিল অবৈধ, সুতরাং দশম সংসদও অবৈধ। তবুও বিরোধী দল মনে করেছিল যে সরকার হয়তো বিরোধী দলের সাথে পরবর্তী নির্বাচন সম্পর্কে আলাপ আলোচনায় বসবে। তারপর ৫ মাস অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে তারা তাদের কথা রক্ষা করেনি। বরং উল্টো তারা বলছেন যে তারা ৫ বছরের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। ৫ বছরের আগে তারা ক্ষমতা থেকে নামবেন না। আওয়ামী লীগের বড় বড় নেতারা কোন রাখঢাক না করেই বলছেন যে মধ্যবর্তী নির্বাচনের কোন প্রশ্নই ওঠে না। এ পরিস্থিতিতে বিরোধী দলের সামনে গণআন্দোলন ছাড়া কোন বিকল্প নাই। কবে কখন বিরোধী দল মাঠে নামবে সেটি এখনও তারা অফিসিয়ালী ঘোষণা করেনি। বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া অবশ্য বলেছেন যে ৫ জানুয়ারির আগে সারা দেশ জুড়ে যে প্রবল গণআন্দোলন গড়ে তোলা হয়েছিল সে আন্দোলন সরকার পাশবিক শক্তি দিয়ে দমন করেছে। সে আন্দোলনে সরকারের জনপ্রিয়তা শূন্যের কোঠায় নেমে গেছে। হাসিনার সরকার একটি ফ্যাসিস্ট এবং স্বৈরাচারী সরকার বলে দেশে বিদেশে প্রতিভাত হয়েছে। ঐ আন্দোলনের একটি বড় সাফল্য এই যে একমাত্র ভারত ছাড়া পৃথিবীর আর কোন দেশ ঐ জালিয়াতির নির্বাচনকে মেনে নেয়নি।  ইউরোপ, আমেরিকার প্রায় প্রতিটি দেশ নতুন একটি নির্বাচনের জন্য বার বার সরকারকে অনুরোধ করছে। একমাত্র ভারতের উপর নির্ভর করে সরকার অবিশিষ্ট দুনিয়ার অনুরোধ আমলে নিচ্ছে না। কিন্তু দেশে এবং বিদেশে সরকারের জনপ্রিয়তা এবং ভাবমূর্তি শেষ পর্যায়ে এসেছে।
বিরোধী দলের রাজপথ আন্দোলনের সাময়িক বিরতি থাকলে কি হবে, সরকার কিন্তু তাদের অপকর্ম এবং দুঃশাসন একের পর এক চালিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ডেভেলপমেন্ট ঘটেছে। জাতীয় পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার আব্দুস সালাম বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ১৫৩ জন জাতীয় সংসদ সদস্যের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন। রিট আবেদনে বলা হয়, সংবিধানে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে জাতীয় সংসদ গঠিত হবে। জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগ ছাড়া কাউকে নির্বাচিত ঘোষণা করা সংবিধানের পরিপন্থী। এই রিট আবেদনের  প্রেক্ষিতে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার বিধানের বৈধতা নিয়ে হাইকোর্ট রুল জারি করেছিল। এককভাবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থী নির্বাচিত করা সংক্রান্ত ১৯ ধারা কেন অসাংবিধানিক হবে না রুলে তা জানতে চেয়েছেন আদালত। সরকারের মন্ত্রিপরিষদ সচিব, আইন সচিব, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশন সচিবকে ১০ দিনের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়। সরকারের প্রতি এই রুল ইস্যু করা ছাড়াও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচনের বৈধতা রিটে গত ১২ মার্চ হাইকোর্ট ৭ জনকে এমিকাস কিউরি নিয়োগ দেন। এরা হলেন- ড. কামাল হোসেন, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার এম আমীরুল ইসলাম, ব্যারিস্টার রফিক-উল-হক, সাবেক এটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলাম, সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ এবং সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। এদিকে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ব্যক্তিগত সমস্যার কথা উল্লেখ করে এ মামলায় এমিকাস কিউরি হিসেবে তার নাম প্রত্যাহারের জন্য আবেদন জানালে আদালত তা মঞ্জুর করে।
॥দুই॥
এমিকাস কিউরিদের অন্যতম ড. কামাল হোসেন তার বক্তব্য মাননীয় হাইকোর্টে দিয়েছেন। সেটি আমরা গত সপ্তাহের এই কলামে তুলে ধরেছি। ইতোমধ্যে এমিকাস কিউরির নিকট প্রবীণ ব্যারিস্টার রফিকুল হক এবং সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার তাদের বক্তব্য দিয়েছেন। ঐ সব বক্তব্য আমরা একটু পর আলোচনা করবো। এমিকাস কিউরিতে প্রদত্ত ড. কামাল হোসেনের বক্তব্য খবরের কাগজে প্রকাশিত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ড. কামালের তীব্র সমালোচনা করেন। এর জবাবে ড. কামাল হোসেন পুনর্বার বলেন যে, যে নির্বাচনে ৮০ ভাগ ভোটার নির্বাচনে অংশ নেয় না সেটিকে নির্বাচন বলা যায় না। তিনি বলেন, সুপ্রিমকোর্টের রায়ের দোহাই দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করা হয়েছে। অথচ সুপ্রিমকোর্টের সাত বিচারপতি এ ব্যাপারে একমত পোষণ করেছিলেন যে, দশম এবং একাদশ সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনে অনুষ্ঠিত হতে পারে। ১৫ সদস্যের সংসদীয় কমিটিও একই মত দিয়েছিলেন। এ মামলার যদি বিরাজমান রাজনৈতিক সংকটের সমাধান না হয় তাহলে নির্বাচন কমিশনের এখনও সুযোগ রয়েছে আরেকটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সুপ্রিমকোর্টের পরামর্শ চাওয়া।
এমিকাস কিউরিতে বক্তব্য প্রদানকালে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র এবং সংবিধানের প্রস্তাবনায় গণতন্ত্রের কথা বলা হয়েছে। গণতন্ত্র বলতে জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল সরকার ব্যবস্থাকে বুঝানো হয়েছে। ভোটারবিহীন নির্বাচন কোন নির্বাচন নয়। ভোট হলেই হবে না। নির্বাচনকে অবাধ ও নিরপেক্ষ হতে হবে। কিন্তু ৫ জানুয়ারির নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ ছিল না। তিনি আরও বলেন, সংবিধানে সরাসরি ভোটের কথা বলা হয়েছে। অথচ বিগত নির্বাচনে ১৫৩ টি আসনের ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের কোন সুযোগ পাননি। নির্বাচনে ৭০ শতাংশ দল অংশ নেয়নি। ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ ভোটার ভোট দেননি। ১৫৩ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচনকে যদি বৈধতা দেয়া হয় তবে আগামী নির্বাচনে দেখা যাবে ২০০ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হবে। পরের নির্বাচনে ৩০০ আসনেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে। এভাবে আমরা গণতন্ত্রকে গুডবাই জানাব।
গত ৫ মে জুন বৃহস্পতিবার এমিকাস কিউরি হিসেবে প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিকুল হক হাইকোর্টে তার লিখিত বক্তব্য পেশ করেন। তিনি বলেন, ৫ জানুয়ারির তথাকথিত নির্বাচন আইনের চোখে কোন নির্বাচন নয়। এটি ছিল নির্বাচনের নামে তামাশা। এটা ইলেকশন নয়, সিলেকশন। এ নির্বাচন ছিল গোলকিপার ছাড়া ফুটবল খেলার মতো। তিনি বলেন, সংবিধান এ ধরনের নির্বাচনের কথা বলেনি। সংবিধানের ৬৫(২) অনুচ্ছেদে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে, সিলেকশনের কথা বলা হয়নি। লিখিত বক্তব্যে তিনি আরেক প্রবীণ আইনজীবী ও সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেনের বক্তব্যের সঙ্গে সহমত পোষণ করেন।
॥তিন॥
র‌্যাবের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- নিয়ে বহু বছর থেকেই প্রবল সমালোচনা চলছিল। কিন্তু কেউই কর্ণপাত করেনি। এর আগে র‌্যাবের কোন কোন সদস্যের বিরুদ্ধে সোনা চুরি এবং টাকা চুরির অভিযোগও ওঠে এবং সেগুলো প্রমাণিতও হয়। কিন্তু সব ব্যাপারেই র‌্যাব ছিল নির্বিকার। কিন্তু নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনার পর নিহত নজরুল ইসলামের শ্বশুর শহীদুল ইসলাম সর্বপ্রথম দ্ব্যর্থহীন ভাষায় অভিযোগ করেন যে ৬ কোটি টাকা ঘুষ খেয়ে র‌্যাব ১১ এর তিন অফিসার ঐ ৭ জনকে অপহরণ এবং খুন করেছেন। এই তিনজন অফিসার হলেন সেনাবাহিনীর লে. কর্নেল তারেক সাঈদ, মেজর আরিফ হোসেন এবং নৌ বাহিনীর লে. কমান্ডার এম এম রানা। প্রথমে সকলেই শহীদুল ইসলামের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছিলেন। দুইটি দৈনিক পত্রিকায় ইন্টারভিউ দিয়ে র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক, অর্থাৎ দুই নম্বর শীর্ষ অফিসার কর্নেল জিয়াও এ অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছিলেন।  কিন্তু ধর্মের কল বাতাসে নড়েছে। এখন মেজর আরিফ এবং কমান্ডার রানা জবানবন্দী দিয়ে স্বীকার করেছেন যে তারা এই অপহরণ এবং হত্যাকা-ে অংশ নিয়েছিলেন। এই দুই অফিসার আরও বলেছেন যে র‌্যাবের দুই নম্বর শীর্ষ ব্যক্তি অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়ার নির্দেশেই এই হত্যাকা- সংঘটিত হয়। এরপর প্যান্ডোরার বাক্সের ঝাঁপি খুলে যায়। বেরিয়ে আসে র‌্যাবের অনেক কীর্তিকাহিনী। লক্ষ্মীপুর, ব্রাক্ষণবাড়িয়া, ফেনীসহ বাংলাদেশের অনেক জায়গায় টাকার বিনিময়ে র‌্যাব অপহরণ এবং খুন করেছে। সারা  দেশে র‌্যাবের ইমেজ এখন নিন্দিত এবং ধিকৃত।
ঠিক এই পটভূমিতেই আরেকটি ঘটনা ঘটে হবিগঞ্জে চুনারুঘাটের সাতছড়ি উদ্যানে। সাতছড়ি ভারতীয় ত্রিপুরা থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে। র‌্যাব দাবি করে যে তারা এখানে বিপুল পরিমাণ রকেট লাঞ্চার, চার্জার এবং মর্টার শেলসহ ভারী অস্ত্র উদ্ধার করেছে। সাতছড়ির গহীন অরণ্যে নয়টি বাঙ্কারে এসব অস্ত্র রাখা হয়েছিল। প্রথম দিনে এই খবরটি যথেষ্ট চাঞ্চল্য সৃষ্টি করলেও দ্বিতীয় দিন থেকে এই খবরের মাঝে অনেক ফাঁক বেরিয়ে আসে। বিভিন্ন মহল থেকে বলা হয় যে, বিনষ্ট ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে। ভারী অস্ত্র উদ্ধারের সমগ্র ঘটনার জন্য র‌্যাব যখন কৃতিত্ব নিচ্ছিল, এমনকি সংশ্লিষ্ট পুলিশ বাহিনীকেও যখন আড়ালে রেখেছিল তখন সাধারণ মানুষের মনে অনেক গুঞ্জনের সৃষ্টি হয়। এই অস্ত্র উদ্ধারের কৃতিত্ব আসলে কি র‌্যাবের ? নাকি ভারতীয় গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষের ? কারণ অস্ত্র উদ্ধারের দ্বিতীয় দিনে কলকাতার সবচেয়ে প্রাচীন এবং সর্বাধিক প্রচার সম্পন্ন দৈনিক ’আনন্দবাজার’ পত্রিকা রিপোর্ট দিয়েছে যে, সাতছড়ির অস্ত্র ভা-ার সম্পর্কে ভারতীয় গোয়েন্দারা অনেকদিন থেকেই বাংলাদেশকে খবর সরবারহ করছিল। শেষের দিকে যেসব খবর ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা দেয় সেখানে অস্ত্রগুলি কোন স্থানে মজুত করা হয়েছে সেই স্থানটিও চিহ্নিত করে দেয়। সেই মোতাবেক র‌্যাব অভিযানের নামে এবং অস্ত্রগুলি উদ্ধার করে। গত ৬ জুন ’ডেইলি স্টারের’ ১৪ পৃষ্ঠায় প্রকাশিত নিবন্ধে প্রশ্ন করা হয় যে, বাংলাদেশীদের জানার আগেই বাংলাদেশের অভ্যন্তরের একটি খবর ভারতীয়রা জানলো কিভাবে ? তারা আরও প্রশ্ন তুলেছে যে এই অস্ত্রের খবর জানতে ২০ বছর দেরি হলো কেন এবং ২০ বছর পরেও সেটি বিদেশীদের সূত্রে জানতে হলো কেন ? তাদের আরও প্রশ্ন, সীমান্তে বিজিবি বা প্রাক্তন বিডিআর মোতায়েন থাকা সত্ত্বেত্ত ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারলো কিভাবে ? তাহলে আমাদের কি বিশ্বাস করতে হবে যে ভারতীয় গোয়েন্দাদের বুদ্ধিশুদ্ধি আমাদের গোয়েন্দাদের চেয়েও বেশি ? তাহলে প্রশ্নটি এই দাঁড়ায় যে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কর্মরত ভারতীয় গোয়েন্দারা যদি বাংলাদেশ সম্পর্কে এত বিস্তারিত খবর রাখতে পারে তাহলে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়গুলি গোপনীয়তা কি এখনও সুরক্ষিত আছে।
আরও অনেক ঘটনা আছে যেটি একটি কলামে বা একটি নিবন্ধে শেষ করা যায় না। হাইকোর্ট র‌্যাবের ঐ তিন জন অফিসারকে গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দিয়েছিল। হাইকোর্টের নির্দেশের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা এবং আইনমন্ত্রী যা বলেছেন সেটি আদালত অবমাননার পর্যায়ে পড়ে। অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন এটি নিয়ে একটি মামলাও দায়ের করেছেন। কিন্তু সে মামলা নিয়ে এখনও কিছু করা হয়নি। এসব ঘটনা মোটামুটি সুধী সমাজকে আলোড়িত করেছে। এসব ঘটনা নিয়ে বিরোধী দল যদি কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতে পারতো তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতি এই মুহূর্তে সম্পূর্ণ ভিন্ন মোড় নিত। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৫৩ ব্যক্তির সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়াকে কেন্দ্র করে যে রিট পিটিশন দায়ের করা হয়েছে সেই রায় যদি আবেদনকারীর অনুকূলে হয় তাহলে গণেশ উল্টে যাবে। ড. কামাল হোসেনও মনে করেন যে এই বিষয়ে দায়ের করা মামলায় রায়টি কি হবে সেটি সঠিকভাবে বলা যাচ্ছে না। রাজনৈতিক পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও অন্যান্য ফ্রন্টে যেসব ঘটনা ঘটছে, বিশেষ করে আদালতে যে রিট পিটিশনটি চলছে সেটির প্রতি মানুষ গভীর আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে। 
আসিফ আরসালান
0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

খুনি-লুটেরা চিরজীবী হোক


আমার এই প্রার্থনার কারণ অনেক। রাষ্ট্র নিজেই যেভাবে খুনি-লুটেরাদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে, নির্লজ্জভাবে তাদের পক্ষে সাফাই গাইতে শুরু করেছে, যেভাবে খুনের ঘটনা আড়াল করতে চাইছে, তাতে এ দেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমার প্রার্থনা এর বাইরে আর কিছু হতে পারে না। সাম্প্রতিক কিছু উদাহরণ এর প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে মন্ত্রীরা এবং মন্ত্রী হতে ইচ্ছুক আওয়ামী নেতারা এমনভাবে খুনি-লুটেরাদের পক্ষ অবলম্বন করছে যে, সাধারণ মানুষ তার নিজের জীবন, পরিবার ও সম্পদ রক্ষার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে। এই উদ্বেগ প্রতিদিনই বাড়ছে। বাড়ত না, যদি রাষ্ট্র দেশে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগী হতো। কিন্তু এর লেশমাত্র কোথাও দেখা যাচ্ছে না, বরং কোনো কোনো মিডিয়া যখন এসব বিষয়ে রাষ্ট্রের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে, তখন সরকারের নেতৃত্ব দানকারীরা তাদের তীব্র সমালোচনা করছে। যেন মিডিয়া ওইসব খুনি-লুটেরার রাজনৈতিক গুরুত্ব বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। 

বেশ আগে ফেনীর গডফাদার হিসেবে পরিচিত জয়নাল হাজারীর অপকর্ম সম্পর্কে যখন সংবাদপত্রগুলো লিখতে শুরু করল, তখন প্রধানমন্ত্রী তার পক্ষ অবলম্বন করে বলেছিলেন, একজন নিবেদিতপ্রাণ আওয়ামী লীগ নেতাকে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য সংবাদপত্রগুলো এ ধরনের ষড়যন্ত্র করছে। অর্থাৎ আমরা মিডিয়ার লোকেরা ‘রাজনীতিবিদ’ হিসেবে জয়নাল হাজারীর প্রকৃত মূল্যায়ন করতে পারিনি। জয়নাল হাজারীর লোকেরা সত্য প্রকাশের দায়ে স্থানীয় সাংবাদিক টিপু সুলতানকে পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে রাস্তার পাশে ফেলে রেখেছিল। তখনো ঘটেছিল একই ঘটনা। দেশে সংবাদপত্রগুলো ওই সাংবাদিকের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল এবং এর প্রতিকার দাবি করেছিল। এরপর তহবিল সংগ্রহ করে চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে পাঠিয়েছিল। তখনো শেখ হাসিনা সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, এসব শোরগোল সরকারকে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য করা হয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতা জয়নাল হাজারী সম্পর্কে সরকারের তরফ থেকে সতর্কতামূলক কোনো ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি। এখনো সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে সরকারি দলের অন্য নেতারাও ওই সাংবাদিকের পক্ষাবলম্বনকারী মিডিয়ার বিরুদ্ধে সুযোগ পেলে বিষোদগার করে যাচ্ছে।

এর প্রায় এক যুগ পরে আরো এক ঘটনা ঘটল। তা সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে নিয়ে। আবুল হোসেন যে কত বড় মূল্যবান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, মিডিয়া যেন তা উপলব্ধিই করতে পারল না। বিশ্বব্যাংক যখন পদ্মা সেতু নির্মাণের সূচনালগ্নেই আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে বিপুল অঙ্কের টাকা ঘুষ নেয়ার অভিযোগ আনল এবং তথ্যপ্রমাণসহ সরকারকে জানাল, তখন একেবারে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছিলেন, আবুল হোসেন খুবই ভালো কাজ করছে। আর সে কারণে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনা হচ্ছে। আর প্রচারমাধ্যমগুলো নাহক অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেছিলেন, আবুল হোসেন ‘খাঁটি দেশপ্রেমিক’। আর দুর্নীতিবাজ বিশ্বব্যাংক নিজেই। তিনি এতটাই ক্রুদ্ধ হয়ে উঠেছিলেন যে, তার কাছে বিশ্বব্যাংকের অডিট রিপোর্ট পেশ করার দাবি জানিয়েছিলেন। পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক একাই ২৩৫ কোটি ডলার ঋণ দেয়ার প্রস্তাব করেছিল। এরা বলেছিল, দুর্নীতিগ্রস্ত ওই মন্ত্রী আবুল হোসেনকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি না দিলে, তারা পদ্মা সেতুতে কোনো ঋণ দেবে না।

এই ঋণ ছিল খুব সহজতম শর্তে। এর গড়পড়তা সুদের হার ছিল শূন্য দশমিক পঁচাত্তর (০.৭৫) শতাংশ। এতে গ্রেস পিরিয়ড ছিল ১০ বছর। এরপর পরবর্তী ৪০ বছরে এই ঋণ পরিশোধ করতে হতো। আবুল হোসেনকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী দেশের এত বড় ক্ষতিকেও গ্রাহ্য করেননি। এত সহজ শর্তে আর কোথাও থেকে ঋণ পাওয়া সম্ভব নয়। পদ্মা সেতু প্রকল্পে ঋণদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল জাপানি সংস্থা জাইকা ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। বিশ্বব্যাংক সরে যাওয়ার পর এরাও সরকারকে জানিয়ে দেয় যে, পদ্মা সেতু প্রকল্পে এরা কোনো বিনিয়োগ করবে না। অর্থাৎ একজন সম্মানিত ‘খাঁটি দেশপ্রেমিকে’র সম্মান রক্ষার জন্য পদ্মা সেতু প্রকল্প ভণ্ডুল হওয়া সম্ভবত ছিল সরকারের কাছে অতি সামান্য মূল্য।

একইভাবে আসে শামীম ওসমান প্রসঙ্গ। দীর্ঘকাল ধরে নারায়ণগঞ্জের গডফাদার হিসেবে পরিচিত শামীম ওসমান। তার কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বছরের পর বছর পত্রিকায় সপ্রমাণ রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর ভাষায় তার সবই ছিল ভুয়া। তিনি জাতীয় সংসদের পবিত্র অঙ্গনে দাঁড়িয়ে শামীম ওসমান পরিবার সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘অনেকেই আছেন, যারা বারবার আঘাতের লক্ষ্যে পরিণত হন। ক্ষেত্রবিশেষে সামান্য কিছু হলেও বড় করে লেখা হয়। অনেকে অনেক বড় অপরাধ করে, কিন্তু কেউ তা দেখে না। তাদের (শামীম ওসমান) পরিবারের ছোট অপরাধগুলো সব সময়ই বড় করে দেখানো হয়। কিন্তু স্বার্থান্বেষী মহল বড় অপরাধগুলো এড়িয়ে যায়।’ তিনি বলেন, ‘রাজনীতিতে আছেন দেশে এমন পরিবার কমই আছে, যারা কোনো অপরাধ করেন না।’ এর অর্থ কি এই দাঁড়াল না যে, রাজনীতিতে একটি নির্দিষ্ট মাত্রার অপরাধ স্বাভাবিক ঘটনা? প্রধানমন্ত্রী কি সেটাই বললেন? তিনি বলেন, ওসমান পরিবার ইয়াহিয়া খানের আমল থেকেই নির্যাতনের শিকার। আওয়ামী লীগ এমপি শামীম ওসমানের বড় ভাই জাতীয় পার্টির এমপি মরহুম নাসিম ওসমানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। কিন্তু জাতিকে খেয়াল রাখতে হবে যে, ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে যেন কোনো পরিবারকে রাজনৈতিকভাবে হেয় করা না হয় এবং ধ্বংস করে দেয়া না হয়। এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা হয়েছে ওসমান পরিবারে। জোহা কাকা (শামসুজ্জোহা, শামীম ওসমানের বাবা) রাজনীতির নীতি-আদর্শ নিয়ে চলতেন। এই পরিবারের সাথে পারিবারিক সম্পর্ক সব সময় ছিল। যদি তাদের প্রয়োজন হয়, দেখাশোনা করব।’ 

প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে যা বলেছেন তার অর্থ দাঁড়ায়, এই পর্যন্ত তার সম্পর্কে সংবাদপত্র যা লিখেছে সেজন্য তাদের শামীম ওসমানের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। এবং উপলব্ধি করা উচিত যে, শামীম ওসমান কত বড় দেশপ্রেমিক। কিন্তু নারায়ণগঞ্জবাসীর মনে হাজারও প্রশ্ন ঘুরপাক খেয়েই যাচ্ছে। গত বছর ত্বকী হত্যা, ২৭ এপ্রিল সাত হত্যা এবং বিভিন্ন অবৈধ কাজের সাথে ওসমান পরিবারের নাম সব সময় জড়িত। ত্বকী হত্যার তদন্ত যত দূর এগিয়েছে তাতে দেখা যায়, এতে জড়িত আছে ওসমান পরিবারের সদস্য। নারায়ণগঞ্জের সাত হত্যাকাণ্ডের মূল আসামি নূর হোসেনকে ভারতে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেছেন শামীম ওসমান। তার অডিও রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। এর সবই কি নারায়ণগঞ্জের ‘বিখ্যাত রাজনৈতিক পরিবারকে’ হেয় করার ষড়যন্ত্র? কিন্তু বাস্তবতা হলো এই যে, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে শামীম ওসমানকে দাঁড় করিয়েছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। কিন্তু তিনি সেলিনা হায়াৎ আইভির কাছে বিপুল ভোটে হেরে যান। কারণ নারায়ণগঞ্জবাসী এই পরিবারের হাত থেকে মুক্তি চেয়েছে। তবে কি নারায়ণগঞ্জবাসীও প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিভঙ্গিতে এই পরিবারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করল? 

এরপর আসা যায় বিদেশী বন্ধুদের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেয়ার পদক প্রশ্নে। এই সম্মাননা তাদের দেয়া হয় স্বাধীনতাযুদ্ধে অবদানের জন্য। সেখানে এক ভরি অর্থাৎ ১৬ আনা সোনা থাকার কথা থাকলেও ছিল মাত্র তিন আনা সোনা। সম্পূর্ণ সরকারের তত্ত্বাবধানে এই মেডেলগুলো তৈরি করা হয়। কিন্তু ওই স্বর্ণচোরদের ধরার বদলে প্রধানমন্ত্রী বলে বসলেন, ‘মুখ্য বিষয় হলো, আমরা তাদের সম্মাননা দিয়েছি। কিন্তু সোনার পরিমাণ নিয়ে লিখে আমরা নিজেদের জন্য অসম্মান ডেকে এনেছি।’ এখানে তিনি জামায়াতের সংশ্লিষ্টতারও আশঙ্কা করেছেন। এখানে দেখা যাচ্ছে, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও দুর্নীতি কোনো উদ্বেগের ইস্যু নয়। আর প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য মতে, এটাকে ইস্যু তৈরি করে মিডিয়া অত্যন্ত বাজে কাজ করেছে। আর স্বর্ণ যারা চুরি করেছে তারা নিরাপদেই থাকছে। 

এ কথা সত্য, র‌্যাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বিএনপি আমলেই। এবং তাদের হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড তখনো সংঘটিত হয়েছে। দেশের মিডিয়া এবং সুশীলসমাজ তখনো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে স্বোচ্চার ছিল। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জে সাত খুনে র‌্যাবের সংশ্লিষ্টতা এখন প্রমাণিত। র‌্যাব কর্মকর্তারাই স্বীকার করেছেন, এরা কিভাবে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছেন। এর বিরুদ্ধে সুশীলসমাজ এখন প্রতিবাদে সোচ্চার। এবং র‌্যাব বিলুপ্তির দাবি জানাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন করেছেন, ২০০৪-০৫ সালে র‌্যাব নাকি এক হাজার লোককে হত্যা করেছিল। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তো অনেক দিন ক্ষমতায় আছেন, সেটি যদি সত্য হতো, তাহলে প্রকৃত ঘটনার তদন্ত করে দোষীদের শাস্তি দিচ্ছেন না কেন? তা না করে বরং আদালত কেন র‌্যাবের দুই কর্মকর্তাকে গ্রেফতারের নির্দেশ দিলোÑ সেজন্য তিনি উষ্মা প্রকাশ করে বলেছেন, তদন্ত তো চলছিলই, তারপরও আদলতই যদি সব করে তাহলে সরকারের কী করার আছে। তার সাথে যোগ দেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিচারকদের সীমানা অতিক্রম করা উচিত নয়। তাদের এমন কিছু করা উচিত নয়, যাতে করে বিচারিক নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়। 

এরপর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নাজমুন নাহার প্রসঙ্গ। বিএনপি নেতা শাহনূর হোসেনকে র‌্যাব ধরে নিয়ে যায়। সারা রাত নির্যাতনের পর হাসপাতালে নিলে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। শাহনূরের ভাই মামলা দায়ের করলে থানাকে হত্যা মামলা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছিলেন নবীনগর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নাজমুন নাহার। তার এক দিন পর গত বুধবার নাজমুন নাহারকে আমলি আদালত থেকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। অর্থাৎ র‌্যাবের বিরুদ্ধে আনীত হত্যার অভিযোগগুলো বিচার না করে বরং সরকার তাদের প্রতি প্রশ্রয়মুখী দৃষ্টিভঙ্গি নিচ্ছেন। প্রসঙ্গত, ইতোমধ্যেই দুইজন র‌্যাব কর্মকর্তা সাত হত্যার সাথে তাদের সংশ্লিষ্টতার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এবং আরো কারা সংশ্লিষ্ট তা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। আদালত যদি আদেশ না-ই দিতেন, তাহলে কি এটা সম্ভব হতো? 

জাপান থেকে ফিরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, কিছু লোক আছে যারা ‘পার্মানেন্ট গভর্নমেন্ট পার্টি’। এরা সব সময় সরকারি দলের সাথে থাকে। এরা তাদের অপরাধমূলক তৎপরতা চালিয়ে যাওয়ার জন্য ক্ষমতাসীন দলে যোগদান করে। নূর হোসেন সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রথমে সে ছিল জাতীয় পার্টি, তারপর যোগ দিয়েছিল বিএনপিতে ১৯৯১ সালে, পরে আওয়ামী লীগে আসে ১৯৯৬ সালে। তাই যদি হয়, তাহলে এত পার্টি ঘুরে সে যখন আওয়ামী লীগে যোগ দিতে এলো, তখন কেন তাকে সাদরে বরণ করে নেয়া হয়? এরপর ১৮ বছর ধরে তাকে লালন করে দলীয় পদমর্যাদা দেয়া হলো কেন? তবে কি তাকে আওয়ামী লীগ অপরাধ করার লাইসেন্স দিলো? একজন সম্পাদক জানতে চেয়েছেন, কত সংখ্যক এ রকম লোককে আওয়ামী লীগ অপরাধের লাইসেন্স দিয়েছে? ওই সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বলেননি যে, তিনি কিভাবে, কী পরিকল্পনায় ‘পার্মানেন্ট গভর্নমেন্ট পার্টি’ওয়ালাদের শায়েস্তা করবেন। 

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সরকার যে হারে গুম-খুন-দুর্নীতি-অত্যাচার-নির্যাতনকে প্রশ্রয় দিচ্ছে, তাতে আমাদের ধ্বনি তোলার সময় হয়েছে যে, ‘খুনি-লুটেরা চিরজীবী হোক’।

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী


 

শুক্রবার, ৬ জুন, ২০১৪

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

বাজেটের আড়ালে আবারও সাফল্যের ঢেঁকুর


বিষয়বস্তু হিসেবে বাজেটের চাইতে রসকসহীন আর কিছু যে হতেই পারে না সে কথা নিশ্চয়ই বলাবাহুল্য। জীবনে যতবার এই বাজেট নিয়ে লিখতে বসেছি ততবার ত্যক্ত-বিরক্ত হয়েছি। বিরক্ত এখনো না হয়ে পারি না। কিন্তু উপায় নেই, যেহেতু রাষ্ট্রের শুধু নয়, বিষয়টি প্রত্যেক নাগরিকের ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত সেহেতু বাজেটকে আবার পাশও কাটানো যায় না। সে কারণে ৫ জুন দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য ‘নির্বাচিত’ আওয়ামী লীগ সরকারের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জাতীয় সংসদে ২ লাখ ৫০ হাজার ৫০৬ কোটি টাকার যে বিশাল বাজেট পেশ করেছেন সে বাজেটের কিছু দিক নিয়ে সংক্ষেপে হলেও কিছু কথা বলতেই হবে। কিন্তু তারও আগে একই সরকারের আরেক কীর্তিমান মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের একটি মন্তব্য স্মরণ করা দরকার। পাঠকদেরও মনে পড়তে পারে, গত অর্থবছরের বাজেট পেশ করার পরপর অর্থমন্ত্রীকে সোজা ধোলাই করেছিলেন যোগাযোগমন্ত্রী। ২০১৩ সালের ২৭ জুন ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের কাছে বলেছিলেন, অর্থমন্ত্রীর নাকি ‘মেমোরি ডাউন’ হয়ে গেছে! সহজ বাংলায় কথাটার অর্থ দাঁড়ায়, মিস্টার মুহিতের স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। বয়সের ভারে অনেক সময় কথার খেই হারিয়ে ফেলেন তিনি। ঠিকমতো কিছু মনেও রাখতে পারেন না। সেজন্যই অর্থমন্ত্রী নাকি পদ্মা সেতুর সম্ভাবনা সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করে নেতিবাচক মন্তব্য করেছিলেন। উল্লেখ্য, এর আগেরদিন অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের কাছে বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহ্বান করা হলেও ডিসেম্বরের মধ্যে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু করা যাবে কিনা, সে ব্যাপারে তার সন্দেহ রয়েছে। অর্থমন্ত্রী আরও বলেছিলেন, সরকার ‘টাইট শিডিউলের’ মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলেই তিনি ‘নিশ্চিত’ নন। অমন মন্তব্যের জবাবেই তেড়ে উঠেছিলেন যোগাযোগমন্ত্রী। অনেকাংশে শেখানোর সুরে বলেছিলেন, অর্থমন্ত্রী নিজের মন্ত্রণালয় সম্পর্কে কথা বলুন এতে আপত্তি নেই। কিন্তু অন্য মন্ত্রণালয়ের ব্যাপারে তিনি এভাবে বলতে পারেন না। তাছাড়া এটা সেতু বিভাগের টেকনিক্যাল কমিটির বিষয়। সে কমিটিই শুধু বলতে পারে। এ পর্যায়ে এসেই অর্থমন্ত্রীকে নিয়ে তামাশা করেছিলেন যোগাযোগমন্ত্রী। বলেছিলেন, অর্থমন্ত্রীর বয়স হয়ে গেছে, তার ‘মোমোরিও ডাউন’ হয়ে গেছে। মিস্টার মুহিতের বিরুদ্ধে অতিকথনের অভিযোগও এনেছিলেন ওবায়দুল কাদের।
আমাদের অবশ্য ওবায়দুল কাদেরের মতো সৎসাহস নেই। তাছাড়া গুম ও খুন ধরনের কর্মকা-ের কারণে ভয়ভীতি তো রয়েছেই। সে কারণে ব্যক্তি মুহিতের গুণকীর্তন করার পরিবর্তে সরাসরি বাজেট নিয়ে আলোচনায় যাওয়াটাই নিরাপদ। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেট সম্পর্কে আলোচনার আগে বলা দরকার, লাফিয়ে বেড়ে চলা পণ্যমূল্যের চাপে মানুষের জিহ্বা বেরিয়ে এলেও সরকার এবারও যথারীতি মূল্য নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি। ফলে জাতীয় সংসদে বাজেট পেশ করার আগেই বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। বেড়েছেও কয়েকদিন আগে থেকে। শুধু তা-ই নয়, এবারও ব্যবসায়ীরা দাম হাঁকাচ্ছেন যথেচ্ছভাবে। অথচ নিয়ম হলো অর্থমন্ত্রী প্রথমে সংসদে প্রস্তাব আকারে বাজেট পেশ করবেন। সে প্রস্তাবের নানাদিক নিয়ে সংসদ সদস্যরা আলোচনা করবেন। সবশেষে ৩০ জুন বা তার দু-একদিন আগে বাজেট প্রস্তাব পাস হবে। যদি বাড়ানো হয়, তা হলে পণ্যের দাম বাড়বে ১ জুলাই থেকে। কোনো কোনো পণ্যের এমনকি দাম কমারও সম্ভাবনা থাকে। অন্যদিকে আমাদের দেশে বাজেট আসছে কথাটা প্রচারিত হতে না হতেই ব্যবসায়ী-মহাজনরা দাম বাড়ানোর জন্য দৌড়ঝাঁপ শুরু করে দেন। এ নিয়ম চলে আসছে বহুদিন ধরে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সেটা আরও দৃঢ় ভিত্তি পেয়েছে এজন্য যে, ব্যবসায়ী-মহাজনদের সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের লেনদেনের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সোজা কথায়, ব্যবসায়ী-মহাজনদের কাছ থেকে চাঁদা ও কমিশন আদায় করা হয় বলে সব জেনেও সরকার একদিকে চোখ বুঁজে থাকে, অন্যদিকে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন ব্যবসায়ী-মহাজনরা। মাঝখান থেকে সাধারণ মানুষের পকেট কাটা যায়, তাদের জিহ্বা বেরিয়ে আসে। এবারও ব্যতিক্রম হয়নি, বরং সরকার ও ব্যবসায়ী-মহাজনসহ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষই সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় এমন কোনো পণ্যের নাম বলা যাবে না, যার দাম লাফিয়ে না বেড়েছে।
কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য হলো, জনগণের এই কঠিন দুর্দশার মধ্যেও ক্ষমতাসীনদের, বিশেষ করে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের চেহারায় কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়নি। তারা বরং ষষ্ঠবারের মতো বাজেট দিতে পারার সাফল্যে উল্লসিত অবস্থায় আছেন। অর্থমন্ত্রীর কথা তো বলাই বাহুল্য। কারণ বাংলাদেশের মতো গরিব একটি দেশে তিনি এবার ২ লাখ ৫০ হাজার ৫০৬ কোটি টাকার বিশাল এক বাজেট নিয়ে হাজির হয়েছেন। এত অর্থ তিনি ঠিক কোন ধরনের কতগুলো খাত থেকে জোগাড় করবেন সে প্রশ্ন তো রয়েছেই, ৬৭ হাজার ৫৫২ কোটি টাকার ঘাটতি রাখার মধ্য দিয়েও তিনি গভীর সংশয়ের সৃষ্টি করেছেন। মূল্যস্ফীতির মতো অনিবার্য কিছু বিষয়ও রয়েছে, যেসব বিষয়ে সত্য এড়িয়ে যাওয়ার এবং মিথ্যা আশ্বাস দেয়ার ব্যাপারে মিস্টার মুহিত আগেই রেকর্ড করে রেখেছেন। যেমন ২০১১-১২ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির হার যেখানে ছিল ১৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ সেখানে অর্থমন্ত্রী শুনিয়েছেলেন ১০ দশমিক ৪৯ শতাংশের কথা। পরবর্তীকালেও তথ্য-পরিসংখ্যান দেয়ার ক্ষেত্রে সত্য এড়িয়ে গেছেন তিনি। কিন্তু এসব বিষয়ে মোটেও নজর নেই অর্থমন্ত্রীর। তিনি বরং বাজেটে রাজস্ব আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটানোর আয়োজন করেছেন। কিন্তু মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি আয়ের পরিমাণও যখন কমতে থাকবে মানুষ, তখন কীভাবে বেশি বেশি পরিমাণের টাকা কর দেবে এবং করের পরিমাণ না বাড়লে সরকারই বা প্রকল্প বাস্তবায়নসহ ব্যয় মেটানোর অর্থ কোথায় পাবেÑ এসব প্রশ্নের কোনো সদুত্তর নেই বাজেটে। আরো অনেক মৌলিক প্রশ্নেরও জবাব দেননি অর্থমন্ত্রী। এসব বিষয়ে পরবর্তী সময়ে নজর দেয়া যাবে। কিন্তু যে কথাটা না বললেই নয় তা হলো, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর টেন্ডার বাণিজ্য থেকে শুরু করে প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ করা পর্যন্ত নানা ধরনের কেলেঙ্কারি অপ্রতিহতভাবে বেড়ে চলেছেÑ যার ফলে বহু প্রকল্পই অবাস্তবায়িত রয়ে গেছে। গত অর্থবছরের অনেক প্রকল্পও মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। কিন্তু এসব বিষয়ে টুঁ শব্দটিও করেননি অর্থমন্ত্রী। পাশাপাশি রয়েছে বিপুল পরিমাণে রেমিট্যান্স এবং বৈদেশিক সাহায্য ও রফতানি আয় কমে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো। রয়েছে গার্মেন্ট খাতের বিরাট বিপর্যয়ও। অন্যকিছু কারণেরও উল্লেখ করা দরকার। যেমনÑ লম্বা অনেক আশ্বাস শুনিয়ে ক্ষমতায় এলেও আওয়ামী লীগ সরকার এখনও গ্যাস ও বিদ্যুৎসহ জ্বালানির সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে পারেনি। ফলে পণ্যের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে শিল্পপতিরা লোকসান সামাল দেয়ার জন্য পণ্যের দাম না বাড়িয়ে পারেননি। কথা শুধু এটুকুই নয়, চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করতে না পারলেও সরকার দফায় দফায় গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং পেট্রোল, অকটেন ও সিএনজিসহ জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে বাহাদুরের মতো। ফলে উৎপাদন ব্যয় তো বটেই, পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে গেছে যথেষ্ট পরিমাণে। সবকিছুর জন্যই শেষ পর্যন্ত বাড়তি দাম গুনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। বাজার নিয়ন্ত্রণে শুধু নয়, সামগ্রিকভাবে আর্থিক ব্যবস্থাপনাতেও সরকার ক্ষতিকর ব্যর্থতা দেখিয়ে এসেছে। এজন্যই বলা দরকার, চারদিকে শুধু নেই আর নেই-এর মধ্যেও এত বিশাল আকারের বাজেট পেশ করে অর্থমন্ত্রী চমক সৃষ্টি করেছেন সত্য; কিন্তু জনগণকে মোটেও আশান্বিত করতে পারেননি। জনগণ বরং ভীষণভাবে হতাশ ও ভীত হয়ে পড়েছে।
এসব কারণেই বাজেটে অর্থের পরিমাণ বাড়ানোর পরিবর্তে সাধারণ মানুষের স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়াটাই অর্থমন্ত্রীর কর্তব্য ছিল। অন্যদিকে নিজে বিরাট বপুর মানুষ বলেই কিনা সেটা একটি প্রশ্ন বটে, তবে আওয়ামী লীগ সরকারের অর্থমন্ত্রী হওয়ার পর প্রথম থেকেই বিরাট বপুর বাজেট পেশ করে চলেছেন জনাব আবুল মাল আবদুল মুহিত। লক্ষ হাজার কোটি টাকার নিচে কথাই বলেন না তিনি! এবার তো টাকার পরিমাণের দিক থেকে রেকর্ডই করেছেন অর্থমন্ত্রী। সংসদে দেয়া বাজেট বক্তৃতায় যথেষ্ট বাগাড়ম্বর করলেও অর্থমন্ত্রী কিন্তু তাই বলে মানুষের মনে মোটেও আস্থা সৃষ্টি করতে পারেননি। একটি কারণ হিসেবে এসেছে ৬৭ হাজার ৫৫২ কোটি টাকার ঘাটতির প্রসঙ্গ। বস্তুত বিরাট বপুর বাজেটের মধ্যে ঘাটতির পরিমাণও বিরাটই। প্রথম ধাক্কাটাও খেতে হয়েছে এখানেই। কারণ টাকার খবর নেই তবু মানুষকে স্বপ্ন দেখানোর কসরত করেছেন অর্থমন্ত্রী। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে, ঘাটতি পূরণের জন্য কল্পিত ৬৭ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা যদি জোগাড় না করা যায়, তা হলে কীভাবে উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দেবে সরকার? টাকা জোগাড়ের সম্ভাব্য খাতগুলোও লক্ষ্য করার মতো। যেমনÑ অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ঘাটতি পূরণের জন্য বৈদেশিক সূত্র থেকে নাকি আসবে ২৪ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা! অথচ বৈদেশিক সাহায্য হিসাবে এত বেশি পরিমাণ অর্থ পাওয়ার কোনো দৃষ্টান্ত নেই বাংলাদেশের। তারওপর আবার পদ্মা সেতুকেন্দ্রিক ঘুষ-দুর্নীতিসহ নানা কেলেঙ্কারির কারণে অনেক আগেই মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে বিদেশীরা। ঘাটতির বাকি ৪৩ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা নাকি আসবে অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন খাত থেকে, যার মধ্যে ৩১ হাজার কোটি টাকাই সরকার ঋণ নেবে ব্যাংকিং খাত থেকে। সরকারের জন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়াটা স্বাভাবিক হলেও মুহিত সাহেবরা প্রথম থেকে সীমা তো ছাড়িয়েছেনই, রেকর্ডও করে ফেলেছেন। ২০১২-১৩ অর্থবছরেও তারা ২৩ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছেন। অথচ ওই বাজেটে ব্যাংক ঋণের প্রাক্কলনই ছিল ১৮ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা। ঋণের সুদও সরকারকে যথেষ্টই গুনতে হয়েছে। এদিকে সরকার একাই ব্যাংক থেকে এত বিপুল পরিমাণ ঋণ নেয়ার ফলে ব্যাংকগুলো তো বিপন্ন হচ্ছে এবং হতে থাকবেই, দেশের অর্থনীতিও মারাত্মক বিপর্যয়ের অতলে হারিয়ে যাবে। কারণ সরকার বিপুল ঋণ নেয়ায় একদিকে ব্যাংকগুলোকে ২৩ শতাংশ পর্যন্ত সুদের বিনিময়ে কলমানি মার্কেট থেকে টাকা ধার করতে হয়েছে, অন্যদিকে শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীরা ব্যাংক থেকে ঋণ পাননি বললেই চলে। ফলে নতুন বিনিয়োগ হয়নি, অনেকের পুরনো ব্যবসাও লাটে উঠেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের রফতানি খাত। টাকা না পাওয়ায় হাজার হাজার কোটি টাকার অর্ডার বাতিল হয়ে গেছে। সে অনুপাতে কমেছে রফতানি আয়ও। এজন্যই শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীরা তাদের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলেছেন এবং এ কথাই সত্য যে, সরকারের নেয়া ঋণের কারণে ব্যাংকগুলো চাইলেও শিল্পোদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে পারবে না। ফলে নতুন শিল্প-কারখানা তো স্থাপন করা যাবেই না, অনেক বেশি সুদে ঋণ নিতে হবে বলে পুরনোগুলোকেও ধুঁকে ধুঁকে চলতে হবে। পাল্লা দিয়ে বাড়বে মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়ও লাফিয়ে বাড়তে থাকবে। আর এজন্য পকেট কাটা যাবে সাধারণ মানুষের।
অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে কথায় অবশ্য পেরে ওঠা মুশকিল। যেমন সমাধানের একটি পথ বাতলাতে গিয়ে তিনি আগেভাগেই বলে রেখেছেন, দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার দিকে তাকিয়ে না থেকে ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা যদি বিদেশ থেকে ঋণ এনে সেই অর্থ দেশে বিনিয়োগ করেন তাহলে অর্থনীতির বিপদ কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হতে পারে। অর্থাৎ সরকারের নিজের হাতে বিপদ কাটিয়ে ওঠার কোনো বিশেষ পথ বা উপায় নেই। এজন্য সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করতে হবে কিছু ‘যদি’ ও ‘তবে’র ওপরÑ ‘যদি’ ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা বিদেশ থেকে ঋণ এনে সে ঋণের অর্থ শিল্পে বিনিয়োগ করেন ‘তাহলে’ সঙ্কট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হলেও হতে পারে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, এই ‘যদি’ও কিন্তু সর্বতোভাবেই অনিশ্চয়তাপূর্ণ। কারণ শিল্প-কারখানা স্থাপনের পরিবর্তে বিশেষ করে কালো টাকার মালিকরা বিনিয়োগও বেশি করেন আমদানি-রফতানি ধরনের বিভিন্ন ট্রেডিং-এ, যার মাধ্যমে চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হয় না। তাছাড়া ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা বিদেশ থেকে ঋণ আনতে চাইবেন কিনা, তারা চাইলেই বিদেশীরা দুর্নীতিপরায়ণ সরকারের অধীনস্থ কোনো দেশের ব্যবসায়ীদের ঋণ দেবে কিনা এবং দিলেও ঋণের সম্পূর্ণ অর্থ উৎপাদনশীল ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাতগুলোতে বিনিয়োগ করা হবে কিনা এ ধরনের অনেক প্রশ্নই রয়েছে। সরকার যেহেতু কিছু ‘যদি’ ও ‘তবে’র ওপর ভরসা করে বসে আছে সেহেতু বিনিয়োগ ও চাকরির ব্যাপারে আশা করার কিছু নেই বললেই চলে। ফলে আগামী অর্থবছরেও অর্থনৈতিক সঙ্কট মারাত্মকই হবে। এভাবে খাত ধরে ধরে পর্যালোচনায় দেখা যাবে, মুহিত সাহেবরা কেবল বাজেট পেশ করেই ‘খালাস’ হয়ে গেছেন। ওদিকে পকেটের সঙ্গে মানুষের গলাও যে কাটা হচ্ছে এবং কাটা হতে থাকবে সেসব দিকে নজরই নেই তাদের।
সংসদে দেয়া বাজেট বক্তৃতায় শুধু নয়, তার আগের বিভিন্ন উপলক্ষেও যথেষ্টই শুনিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এসব বক্তব্যে বাজেট প্রস্তাবের পক্ষে সাফাই-ই কেবল গাননি, এমন আরো কিছু কথাও বলেছেন যেগুলো সমালোচনার ঝড় তুলেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি অর্থনীতিবিদরাও ব্যাখ্যা সহকারে বুঝিয়ে দিয়েছেন, বাজেটটি অবাস্তব কল্পনার ফসল। অর্থাৎ এর বাস্তবায়ন করা অন্তত বর্তমান সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। অনেক কারণের মধ্যে তারা বিশেষভাবে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও ঠিকাদার নামধারীদের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। উদাহরণ দিতে গিয়ে একটি প্রধান বিষয় হিসেবে এডিপি বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির কথা বলেছেন। এই খাতে ৮০ হাজার ৩১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছেন অর্থমন্ত্রী। বলা হচ্ছে, এসব বরাদ্দের প্রধান উদ্দেশ্য আওয়ামী লীগের নির্বাচনী তহবিল স্ফীত করা। আর স্ফীত করার কাজটুকু যেহেতু নেতা-কর্মীরাই করবে সেহেতু তাদের পকেটও খুব অল্প সময়ের মধ্যে ফুলে-ফেঁপে উঠবে। বলা দরকার, এমন মন্তব্যের কারণও বর্তমান সরকারই তৈরি করেছে। বিগত অর্থবছরগুলোতে দেখা গেছে, অবকাঠামো ও পল্লী উন্নয়নের জন্য নানা বাহারী নামে নেয়া উন্নয়ন প্রকল্পের হাজার হাজার কোটি টাকার বেশিরভাগই দলীয় লোকজনের পকেটে ঢুকেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে খয়রাতি চাল, গম ও নগদ অর্থ নিয়ে হরিলুটের প্রতিযোগিতায় নেমেছে ক্ষমতাসীন দলের লোকজন। সারা বছর বসে থাকার পর সংসদে বাজেট পেশ হওয়ার প্রাক্কালে এসে হঠাৎ তারা তৎপর হয়ে ওঠে এবং প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে দেখিয়ে মে মাসেই চাল, গমসহ বরাদ্দকৃত অর্থ তুলে নেয়। বলাবাহুল্য, সব কাজেরই ঠিকাদারি পেয়েছে ক্ষমতাসীন দলের লোকজন। তাদের কারণে উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা সম্ভব না হলেও টাকার ‘শ্রাদ্ধ’ কিন্তু প্রতিবারই হয়েছে। এজন্যই বলা হচ্ছে, এবারের বাজেটেও আওয়ামী লীগের কর্মীদের পকেট ভারি করার ব্যবস্থা করেছেন অর্থমন্ত্রী।
এভাবে খাত ধরে ধরে আলোচনা করলে দেখা যাবে, এই বাজেট কোনোদিক থেকেই সাফল্যের কাছাকাছি যেতে পারবে না। এই না পারার প্রকৃত কারণ হলো, বাজেটের উদ্দেশ্য সমৃদ্ধি বা মন্ত্রীর কথানুযায়ী ‘জনতুষ্টি’ অর্জন নয়, জনগণের স্বার্থ দেখাও নয়, নানা চটকদার কথার আড়ালে নিজেদের পকেট এবং দলের তহবিল ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তোলার লক্ষ্য নিয়েই এবারের বাজেট তৈরি করেছেন অর্থমন্ত্রী। সে কারণে ‘হরিলুট’ এবং টাকার ‘শ্রাদ্ধ’ করা কাকে বলে জনগণকে তা টের পেতে হবে হাড়ে-হাড়েই!
আহমদ আশিকুল হামিদ 
0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

‘আগে শৌচাগার পরে মন্দির’


প্রতিবেশী দেশ ভারতকে আমরা অসভ্য বলে আখ্যায়িত করতে চাই না। বিরাট এ দেশটির কেউ এখনও সভ্যতার আলো থেকে দূরে থাকুক, তাও আমাদের কাম্য নয়। বিজ্ঞান-প্রযুক্তির দিক থেকেও দেশটি প্রতিবেশীদের চেয়ে এগিয়ে। কিন্তু একটি বিষয়ে ভারত অনেক পিছিয়ে আছে। সেটি যেমন পরিবেশ দূষণ ও স্বাস্থ্যহীনতার কারণ, তেমনই দৃষ্টিকটূ ও লজ্জাজনক। বিষয়টি খোলাসা করেই বলা যাক। যারা ভারতে দীর্ঘ রেলভ্রমণ করেছেন তারা নিশ্চয়ই দেখেছেন, সকালে রেললাইনের দু’ধারে হাজার হাজার নারী-পুরুষ ছেলে-বুড়ো বসে বসে প্রাতঃকর্ম সম্পন্ন করছেন। খোলামেলা অবস্থায় প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বসে পড়েছেন। রেলগাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকানো বেশ বিব্রতকর। বিশেষত কলকাতা-দিল্লির পথে রেলগাড়িতে যাতায়াতকারীদের এ অভিজ্ঞতা অনেক পুরনো। সমগ্র উত্তর প্রদেশ, বিহার, এমনকি পশ্চিম বাংলায়ও এমন দৃশ্য রেলযাত্রীদের এড়ানোর উপায় নেই। মধ্যপ্রদেশ, উড়িষ্যা, অন্ধ্র সবখানেই সকালবেলা রেলযাত্রীদের এমন প্রাতঃক্রিয়ার দৃশ্য অবলোকন করতেই হয়। এর ফলে শুধু দেশটির পরিবেশই নষ্ট হয় না, মানুষের মধ্যে নানা রোগ-বালাইও ছড়িয়ে পড়ে। বহু মানুষ মারাত্মক মহামারিতেও আক্রান্ত হয়ে অকালে মৃত্যুবরণ করে।
আশার কথা হচ্ছে, ভারতের নতুন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দামোদরদাস নির্বাচনের আগে ঘোষণা দিয়েছিলেন, দেশটির ঘরে ঘরে শৌচাগার করে দেবেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবার পরপরই তিনি আবারও ঘোষণা করেন, “আগে শৌচাগার পরে মন্দির।” অর্থাৎ উপাসনালয়ের চেয়ে শৌচাগারের গুরুত্বের দিকটা তিনি প্রথমে বিবেচনায় এনেছেন। নিশ্চয়ই এটা একজন জনপ্রিয় নেতার শুভ উদ্যোগ বৈকি। এছাড়া গুজরাটের একজন অতি সাধারণ পরিবারের মানুষ হয়ে তিনি নিজ প্রদেশের মানুষের জীবনযাত্রা গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন। তিনি উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন যে, আগে তো মানুষের পবিত্রতা, তারপর না পুজো-অর্চনা। মানুষ যদি পাক-পবিত্রই না থাকে, তাহলে তারা পুজো-অর্চনা কীভাবে সম্পন্ন করবে। ভারতের নতুন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এ মহৎ উদ্যোগকে অবশ্যই সাধুবাদ জানাতে হবে। উল্লেখ্য, মোদির সরকার ঘরে ঘরে শৌচাগার তৈরি করে দেবার জন্য দেড় লাখ কোটি রুপি খরচের পরিকল্পনা করেছে। এ কাজ হয়তো অল্প সময়ে এবং এতো অল্প রুপিতে শেষ করা যাবে না। আরও অর্থ ও সময় লাগবে। কিন্তু উদ্যোগটা যে মহৎ এবং সুদূরপ্রসারি, তা না বললেই নয়। মোদি সরকারের স্বপ্ন বাস্তবায়নে এগিয়ে এসেছেন ‘সুলভ শৌচাগার’ এর প্রতিষ্ঠাতা বিন্দেশ্বর পাঠক নামক এক ব্যক্তি। তিনি বলেন, তাদের কাছে দু’হাজার থেকে পঞ্চাশ হাজার রুপির মধ্যে বিভিন্ন মডেলের শৌচাগার রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় পরিচ্ছন্নতা মন্ত্রণালয়কে বিন্দেশ্বর পাঠক এ ব্যাপারে চিঠি দেবার উদ্যোগ নিয়েছেন। কম খরচে সারা দেশের ঘরে ঘরে শৌচাগার নির্মাণে তিনি সহযোগিতা করতে আগ্রহী। এ ব্যাপারে তিনি তরুণদের প্রশিক্ষণও দিতে চান।
পবিত্রতা হচ্ছে ঈমানের অঙ্গ। প্রাকৃতিক প্রয়োজন সম্পন্ন করে কীভাবে পাকসাফ হতে হয় মুসলমানদের তা জানা আছে। অসচেতনতা এবং সীমাবদ্ধতার জন্য ‘শৌচাগার সমস্যা’ আমাদের দেশেও রয়েছে। এ ব্যাপারে আমরাও উদ্যোগী হতে পারি। এটা করলে অনেক দূষণ ও রোগ-বালাই থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব খুব সহজেই।

বৃহস্পতিবার, ৫ জুন, ২০১৪

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

রাজনীতির আসল রূপ


রাজনীতি এখন যতই রক্তাক্ত ও ভয়াবহ হচ্ছে এবং সমাজজীবন যতই বিপদ সঙ্কুল হচ্ছে, ততই নানা উপাদেয় আলোচনার সূত্রপাত হচ্ছে। সম্প্রতি শোনা যাচ্ছে, ক্ষতিকর ফরমালিন ও রাজনীতির মধ্যকার সম্পর্কের নানা কথা। খাদ্যের পচনরোধে অপব্যবহৃত-ক্ষতিকর ফরমালিন এখন রাজনীতির দরবারেও আলোচিত হচ্ছে। অর্থাৎ কাঁচাবাজার থেকে ফরমালিন এসে পৌঁছেছে রাজনীতির মহাহাটে। কথাটা এখন খোদ রাজনীতিবিদরাই বলছেন। বর্ষীয়ান আইনজীবী ড. কামাল হোসেনও বলেছেন। এমনকি, ফরমালিন ও রাজনীতি নিয়ে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীও মুখ খুলেছেন। বিশিষ্ট সংবিধান প্রণেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে বিষাক্ত ফরমালিন দূর করার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে,  ‘বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে ফরমালিন দূর করতে হবে। খাবারে ফরমালিন দিয়ে পচা ও নষ্ট জিনিসকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়, আমাদের রাজনীতিতেও সেভাবে ফরমালিন দেয়া হচ্ছে।’  অন্যদিকে, ‘সরকারকে পচতে সময় দিয়েছি’, খালেদা জিয়ার এমন বক্তব্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করলে শেখ হাসিনা জাপান থেকে প্রত্যাবর্তনের পর আহূত সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বিএনপিই পচে গেছে। এখন ফরমালিন দিয়ে আমরাই বিএনপিকে তাজা রাখছি।’ কাগজে আরও দেখলাম, শিশুদের ফরমালিনের কবল থেকে বাঁচাতে মানববন্ধন হয়েছে। মনে হচ্ছে, ফরমালিনই এখন দেশের শীর্ষ আলোচ্য বিষয়। রেলের দুর্নীতির সময়, দুর্নীতির বদলে যেমন ‘কালো বিড়াল’ নিয়ে মুখরোচক আলাপ-আলোচনা শুরু হয়, এখনও আসল সমস্যার বাইরে ফরমালিন নিয়ে কথা হচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনীতির আসল বা প্রকৃত রূপের ছটার পেছনের যে ফরমালিনের হাত আছে, সেটাও এই সুযোগে জানা গেল। তার মানে, ফরমালিন সরিয়ে ফেলা হলে রাজনীতির প্রকৃত রূপটি কেমন হবে, সেটাও বোঝতে অসুবিধা হচ্ছে না। এমনই রাজনীতির হাত ধরে বাংলাদেশ এখন চলেছে প্রকৃত গণতন্ত্রের অধীনে আইনের শাসনের প্রত্যাশায়। সঙ্গে নিয়ে চলেছে স্বৈরতান্ত্রিক-গডফাদার সংস্কৃতি। যে সংস্কৃতির রূপ দেখা যাচ্ছে ফেনীতে, নারায়ণগঞ্জে এবং বিরোধী দলের বিরুদ্ধে।
বাংলাদেশের জনগণের প্রায়-সকলেই জানেন যে, খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিনের ব্যাপক উপদ্রব চলছে। মাছে-মাংসে-ফলে-মূলে-শাক-সবজিতে ফরমালিন ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য বিরাট বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এজন্য ফরমালিন শনাক্ত করার পদ্ধতি সম্পর্কে মানুষের কাছে প্রচার করা হচ্ছে এবং মাঝে মাঝেই ফরমালিনবিরোধী অভিযানও পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু রাজনীতিতে ফরমালিনের বিষয়টি সদ্য উত্থাপিত হয়েছে। ফলে সেটি শনাক্তকরণ ও প্রতিরোধের বিষয়টি এখনও ব্যাপকতা পায়নি। খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিন যেমন শরীর-স্বাস্থ্যের বারোটা বাজাচ্ছে, রাজনীতির ফরমালিনও সমাজ আর রাজনীতির বিরাট ক্ষতি করবে, এতে সন্দেহের কোনও কারণ নেই। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হলো, বাজারে ফরমালিনবিরোধী অভিযান যতটা সরব, রাজনীতিতে ততটা নয়।
১/১১-এর সময় থেকেই রাজনীতিকে দুর্নীতিমুক্ত, সন্ত্রাসীমুক্ত করার কথা শোনা যায়। পেশীশক্তি, কালো টাকার কবল থেকে রাজনীতিকে বাঁচাতে ডাক দেয়া হয়। রাজনীতিকে দুর্বৃত্তায়নের দুষ্টচক্র থেকে মুক্ত করতেও কথা বলেন অনেকেই। এখন ফরমালিনমুক্ত করার কথাও শোনা যাচ্ছে। এতে যদি রাজনীতির গুণগত মান বৃদ্ধি পায়, তবে তো ভালোই। রাজনীতির পাশাপাশি নেতাদেরও ফরমালিনের আওতা থেকে বের করতে হবে। পচা মাছে যেমন ফরমালিন দিলেও স্বাস্থ্যকর হয় না, দূষিত নেতারাও ফরমালিন দিয়ে পাপ ঢাকতে পারবেন না। বরং ফরমালিনযুক্ত খাদ্যের মতোই ফরমালিনযুক্ত রাজনীতি ও নেতৃত্ব সমাজের জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। বাজার ও রাজনীতির যৌথ বিপদ মানুষ ও সমাজের জন্য বড়ই ভয়ের বিষয়। মানুষকে বাজারে যেতেই হবে; রাজনীতিতেও সংশ্লিষ্ট থাকতেই হবে। আর সেখানেই যদি ওঁৎ পেতে থাকে ফরমারিনের প্রলেপ দেয়া ভেজাল, পচা, বাসি মাল, তাহলে তো সবার নাভিশ্বাস।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, একদা সুখাদ্যের জন্য বাংলা বিখ্যাত ছিল। বিদেশীরা বলতেন, স্বর্গের মতো দেশ। গোলা ভরা ধান আর গোয়াল ভরা গরুর কথাও আছে। অতীত ও ইতিহাসে ভেজাল ও পচা মালের বিবরণ বলতে গেলে নেই। অন্যদিকে, অতীতের ইতিহাসে রাজনীতি ও নেতৃবৃন্দ মানুষ ও সমাজের জন্য আদর্শস্বরূপ ছিলেন। তাদের ত্যাগ, পরহিত, কৃচ্ছ্রতা ছিল প্রবাদপ্রতীম। তাদের প্রতি রাজনৈতিক কারণে কিছু সমালোচনা ছিল বটে; কিন্তু এমন কোনও দুর্গন্ধ ও পচনশীলতা তাদের ছিল না যে, আতর বা ফরমালিন ব্যবহার করে তারা নিজেকে রক্ষা করতেন। এখন ফেনী, নারায়ণগঞ্জ, লক্ষ্মীপুরে যেসব নেতার কথা শোনা যাচ্ছে এবং যেরূপ রাজনীতি দেখা যাচ্ছে, সেটাকে কি বলা যায়? শেকড় থেকে শীর্ষ পর্যন্ত রাজনীতি ও নেতৃত্বের দুর্গন্ধ ও পচনশীলতার কার্যকারণগত সম্পর্কও মানুষের অজানা নেই। সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় হলো, বাজারে বা রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান সমস্যা ও বিপদ নিয়ে এন্তার লেখালেখি, আলাপ-আলোচনা হলেও কর্তৃপক্ষ পারস্পরিক দোষারোপের কাজেই ব্যস্ত। অপরের দিকে দোষ ঠেলে দেয়াই যেন সমস্যার সমাধান! সম্মিলিতভাবে সমস্যা ও বিপদ মোকাবিলার কথা কেউ বলছেন না। ঐক্যে যে লাভ, সেটাই মনে হয় অনেকে বিশ্বাসই করেন না। অথচ বারবার বলা হচ্ছে ঐক্য ও সমঝোতার কথা। সেটা গণতন্ত্র বাঁচানো, বিনিয়োগ বাড়ানো, দেশের ভাবমূর্তি বৃদ্ধিতে বা বাজার ও রাজনীতি থেকে ফরমালিন হটাতেও সত্য। এ সত্যটিই এখন বিস্মৃত হয়েছে। বরং মিথ্যাকে ফরমালিন দিয়ে সত্যের মাথায় বসিয়ে দেয়া হয়েছে। পচা মাছ, পচা রাজনীতি, পচা নেতা, পচা কথা (মিথ্যা) ইত্যাদি যদি ফরমালিনের জোরে জনতা ও সমাজের মাথায় চেপে বসে, তাহলে খাঁটি ও আসলের উপায় কি? রূপকথায় সিন্দাবাদেও কাঁধে চেপেছিল দৈত্য। সে আর নামতে চায়নি। আমাদের কাঁধে চেপে বসেছে ফরমালিন মাখানো ভেজাল, পচা, দুর্গন্ধযুক্ত মালামাল। দৈত্য সিন্দাবাদকে বিব্রত করেছিল, জীবনের হানি করেনি। আজকের ফরমালিনযুক্ত মালামাল শুধু বিব্রতই করছে না, জীবন বিপন্ন করার মতো স্বাস্থ্যগত, সমাজগত, আইন-শৃঙ্খলাগত-রাজনৈতিক কারণও ঘটাচ্ছে। সর্বত্র বিরাজমান ও ফরমালিনে চুবানো এই আধুনিক-বীভৎস দৈত্যকুলের কবল থেকে মানুষ ও সমাজের মুক্তির উপায় কি? যারা ফরমালিনের কারবার করেন সমাজে ও রাজনীতিতে, কিংবা যারা বিজ্ঞানের গবেষণায় ফরমালিন নিয়ে চর্চা করেন, তারা হয়ত উত্তরটি জানাতে পারেন।
খাদ্যদ্রব্যের মতোই রাজনীতি, সমাজ, সংসার, অর্থনীতি পচে গেলে বা দূষিত হয়ে গেলে, সেটাকে ফরমালিন দিয়ে আপাতত ঢেকে রাখা যায়। কিন্তু এই আড়াল করার মাধ্যমে কাজের কাজ কিছুই হয় না। পচাকে তাজা বানানো তো যায়-ই না। ফরমালিন হলো প্রবঞ্চনার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। প্রহসনের আধুনিক উপায়। এসব বৈজ্ঞানিক বা আধুনিক উপায় প্রয়োগ করে সাময়িক লাভ কিছু হলেও হতে পারে, কিংবা আপাতত পচা গোপন করা যেতে পারে। কিন্তু প্রকৃত অবস্থার উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব হতে পারে না। এক-দুইবার ব্যবহারের পর কোনো খাবারে ফরমালিন আছে বা নেই, সেটা যেমন মানুষ টের পায়, রাজনীতিতেও কে ফরমালিন-মাখানো সেটাও স্বল্পসময়ে টের পেয়ে যায়। আদর্শ ও পচার মধ্যকার পার্থক্য মানুষ নিজস্ব বিবেক, বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা দিয়ে উপলব্ধি করতে পারে। মানুষের এই উপলব্ধি বড়ই কঠিন। প্রকৃত উপলব্ধি ফিরে পেলে মানুষ কথিত ভেজাল বস্তুকে প্রত্যাখ্যান করতে মোটেও কসুর করে না। একজন বা কয়েকজনকে কয়েক দিনের জন্য ধোঁকা দেয়া যায়। কিন্তু ব্যাপক জনতাকে সারা জীবনের জন্য ধোঁকা দেয়া কোনও মতেই সম্ভব নয়। এটাই ইতিহাসের শিক্ষা এবং সভ্যতার নিয়ম।
আমরা অবশ্যই আশা করি, মানুষের প্রকৃত বোধোদয় একদিন হবেই। বাজার ও রাজনীতি থেকে মানুষই নিজ সচেতনতায় ফরমালিন বা ভেজালকে উচ্ছেদ করবেই। উচ্চ আদর্শ, নৈতিকতা, মূল্যবোধ ইত্যাদি উন্নত বিষয়ই মানুষের কাক্সিক্ষত হবে। ভেজাল বা ফরমালিন নয়। গায়ের জোরে, ফরমালিনের প্রহসনের জোরে, বিদেশী প্রভুর জোরে ভেজাল ও পচা বস্তু বা মালকে বাজারে যেমন চালানো যায় না, সমাজে ও রাজনীতিতেও চালানো যায় না। সমাজ ও রাজনীতি শেষ পর্যন্ত শুদ্ধতার প্রতিই নিজের আনুগত্য প্রকাশ করে। এভাবেই প্রতিষ্ঠা পায় মানুষের আকাক্সক্ষা ও অধিকার। বাংলাদেশের মানুষ সংগ্রামের ঐতিহ্যে ভেজাল ও পচা অতিক্রম করে বিশুদ্ধতার প্রতিই নিজের সমর্থন ও আস্থা জ্ঞাপন করবে। বাজার ও রাজনীতির পচনশীলতা আর ফরমালিন-প্রবণতার সঙ্কুল সময়ে দাঁড়িয়েও আমরা মানুষের শুদ্ধতম অভিযাত্রার প্রতিই তাকিয়ে থাকতে আশাবাদী হই। কেননা, গণমানুষের প্রবল শক্তিই সকল বিরূপতা ও অব্যবস্থাকে পরাজিত করার সামর্থ্য রাখে। যারা গণতন্ত্রকে বিশ্বাস করেন এবং মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা রাখেন, তারা মুক্তির পথ হিসেবে গণশক্তির উত্থানই কামনা করবেন ফরমালিন, পচা বা গডফাদার বা স্বৈরাচারের বিকাশ কামনা করবেন না। কিংবা চলমান গুম, খুনসহ আইন-শৃঙ্খলা ও শাসনের অবক্ষয় কখনওই চাইবেন না। কোনও সুস্থ, গণতান্ত্রিক, বিবেকবোধ সম্পন্ন মানুষই নেতিবাচক বা ক্ষতিকর কিছু চাইতে পারেন না। আমরাও বাজারে বা রাজনীতিতে ফরমালিন চাই না এবং ফরমালিনওয়ালাদেরকেও না। আমরা চাই শুভবোধ সম্পন্ন বাজার ও রাজনীতি।
0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

ঘিরে ধরেছে ভয়-আতঙ্ক


বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের সদস্যরা অস্ত্র তাক করে রয়েছেন। নিচে খবর দেয়া হয়েছে সীমান্ত প্রহরী বিজিবির এক সদস্য নিহত। মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী নাসাকা তাকে গুলি করে হত্যা করেছে। একটি পত্রিকা প্রথম পাতার ওপরের অংশে অর্ধেকজুড়ে ছবি ও খবর ছেপেছে। অন্যান্য পত্রিকাও গুরুত্বের সাথে এ খবর দিয়েছে। কয়েক বছর ধরে বিজিবির তৎপরতা নিয়ে অনেক খবর এসেছে, সেগুলো সীমান্ত পাহারা নিয়ে নয়। যদিও প্রায় প্রতিদিন বাংলাদেশীদের লাশ পড়ছে সীমান্তে। এ সময় তারা দেশের অভ্যন্তরে সরকারবিরোধী আন্দোলন দমাতে সশস্ত্র অভিযানে ব্যস্ত ছিল। ব্যাপারটা এমন ছিল, মিয়ানমার ও ভারতের সীমান্তরক্ষীদের কাজ বাংলাদেশী নাগরিকদের ওপর নির্যাতন করা। বিজিবিরও একই দায়িত্ব, তবে বিএসএফ ও নাসকা যেহেতু বাংলাদেশের সীমান্তে এ কাজ করছে, তাই বিজিবি সেটা করছে দেশের অভ্যন্তরে এসে। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এ সময় প্রথম এক দিনে ৫০ জনের বেশি মানুষ পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন। 

নাসাকা চালানো আকস্মিক আক্রমণে ছত্রভঙ্গ হয়ে যান বিজিবি সদস্যরা। একটি জাতীয় দৈনিক ঠিক এভাবে বর্ণনা দিয়েছে। সহকর্মীর লাশটি কুড়িয়ে আনা যায়নি। লাশ ফেরতের জন্য কয়েক দিন ধরে তাদের কাছে ধরনা দিতে হয়েছে। বর্তমান সরকারের আমলে বেশ কয়েকবার বিজিবি ও পুলিশ সদস্যকে ধরে নিয়ে যায় মিয়ানমার সীমান্তরক্ষীরা। বাংলাদেশের বাহিনীগুলোর অবস্থা আমাদের প্রতিবেশী দেশের সীমান্ত প্রহরীরা ভালো করেই জানে। বিডিআরের শৌর্যবীর্য ও সাহসিকতার দীর্ঘ ইতিহাস পিলখানায় দুমড়েমুচড়ে গেছে। নাম বদল করে তাদের মর্যাদার এক ধাপ অবনমন করা হয়। দুরন্ত ‘রাইফেলসের’ মর্যাদা নেমে আসে স্থবির ‘গার্ডে’। বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) ছিল সাহসিকতা, গতি আর ক্ষীপ্রতার প্রতীক। নামটি পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে ‘বর্ডার গার্ড’, যা ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের নামের কাছাকাছি। 

এ বাহিনীর হারানো মনোবল দ্রুত ফিরিয়ে আনা যখন সবচেয়ে জরুরি ছিল, তখন কয়েক বছর ধরে বিজিবি সদস্যদের হাতে-পায়ে ডাণ্ডাবেড়ি পরিয়ে বিশ্বের সামনে প্রদর্শন করা হয়েছে। বিজিবির অনেক সদস্যের রহস্যজনক মৃত্যুও এ সময় ঘটেছে। প্রতিযোগী বাহিনীগুলো দেখেছে এ অঞ্চলের সবচেয়ে চৌকস বাহিনীর পেছনে কিভাবে জিল্লতি আর মানসিক দুর্বলতা নেমে এসেছে। এর মাধ্যমে বাইরের পৃথিবীতে তাদের সম্মান গৌরব মলিন হয়ে যায়। ঠিক এ সময় আমাদের সীমান্তরক্ষীরা দেশের অভ্যন্তরে ক্রসফায়ার, গানফাইট, বিচারবহির্ভূত হত্যার জন্য অন্য বাহিনীগুলোর সাথে অভিযুক্ত হয়। দেশের অভ্যন্তরে তারা হয়ে ওঠে মূর্তিমান আতঙ্ক। নিরস্ত্র নিরীহ মানুষের বিরুদ্ধে আধুনিক শক্তিশালী অস্ত্র নিয়ে দাঁড়ালে সবাই বীর। মতিঝিলে হেফাজতের সমাবেশে সেই অভিযানে বিজিবির ভূমিকা সমালোচিত হয়েছে। সাউন্ড গ্রেনেড গুলি ও বোমার মুহুর্মুহু বিস্ফোরণ শুধু সমাবেশে অংশগ্রহকারীদের নয়, পুরো ঢাকা শহরে চরম ভীতি ছড়িয়ে দেয়। কোনো শত্রুবাহিনীর আক্রমণ ছাড়াই ঢাকাকে তখন মনে হয়েছিল যুদ্ধ-আক্রান্ত। 

সীমান্তে বাংলাদেশের মানুষের জানমালের নিরাপত্তায় নিয়োজিত বাহিনী দেশের অভ্যন্তরে নাগরিকদের বিরুদ্ধে কেন সশস্ত্র অভিযান চালাল, সে দিন অনেকেই সে প্রশ্ন তুলেছিলেন। সীমান্তে প্রতিনিয়ত হত্যা, খুন, গুম ও নৃশংসতার শিকার বাংলাদেশী নাগরিকেরা নিরাপত্তার জন্য জোরালো ভূমিকা চায় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কাছে। অন্য দিকে একটি বিতর্কিত অভিযানে তারা অংশ নিয়েছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। বিজিবির দায়িত্বশীল কর্মকর্তা সে দিন রাজনৈতিক দলের সমান্তরাল বক্তব্য দিয়ে সবাইকে হতবাক করে দেন। প্রকৃতপক্ষে আমরা শত্রুমিত্র চিহ্নিত করতে পারছি না। লিপ্ত হয়েছি আত্মবিনাশী অন্তর্ঘাতী একটি যুদ্ধে। যেখানে প্রতিপক্ষ নিজের দেশের নাগরিক যারা সশস্ত্র নয়; তারা যুদ্ধের কোনো কৌশলও জানে না। অন্য দিকে যারা নিরস্ত্রদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে, তাদের রয়েছে অত্যাধুনিক অস্ত্র। নিরস্ত্র নাগরিকদের বিরুদ্ধে অভিযানে বীরত্ব প্রদর্শন অর্থহীন। প্রকৃত সশস্ত্রবাহিনীকে মোকাবেলা করা এ ধরনের বীরদের জন্য পরে কঠিন হয়ে যায়।

প্রতিপক্ষ আমাদের দুর্বলতা ঠিকই চিহ্নিত করেছে। এখন তাই পতাকা বৈঠকের আহ্বান জানালে গোলাবর্ষণ করে তার জবাব দেয়া হচ্ছে। আমরা কোনো ধরনের যুদ্ধ-বিগ্রহের পক্ষে নই। উৎসাহী কোনো সামরিক অভিযানেরও বিপক্ষে আমরা। তবে যারা এগুলো চাপাতে চাইছে তাদের ঠেকানোর জন্য যে মনোবল দরকার তা অটুট রাখার পক্ষে আমরা। নিরস্ত্র সাধারণ মানুষকে মেরে হাত পাকালে ভর করে ভীরু কাপুরুষতা। পরে সশস্ত্র আধুনিক কোনো বাহিনীকে মোকাবেলা করতে গেলে চেপে ধরবে মানসিক দুর্বলতা। দেশপ্রেম জাগ্রত হওয়া তো অনেক দূরের বিষয়। এখন অর্থের বিনিময় দেশের নাগরিকদের হত্যার অভিযোগ উঠেছে সশস্ত্রবাহিনীর বিপথগামী কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে। অবশ্য নিজস্ব বাহিনী থেকে তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। তাদের বিচার এখন প্রক্রিয়াধীন। এর বাইরে আরো অনেকের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ করে আসছে স্বজন হারানোরা। 

‘পুতরে কেন তরে বিদেশে পাঠাইলাম’ শিরোনামের ওপর শোকের রঙ্গ কালো ব্যাকগ্রাউন্ডে সাদা কালিতে লেখা, ‘কফিন জড়িয়ে স্বজনদের কান্না’। তার ওপর একটি ছবি বুকফাটা আর্তনাদের। সৌদি আরবে কারখানায় আগুন লেগে নিহত ছয়জনের লাশ দেশে এসেছে। সব পত্রিকা সপ্তাহের প্রথম দিন এ খবর দিয়েছে। প্রবাসে বাংলাদেশীদের জীবনের নিরাপত্তা নেই। যে দেশে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় নিজের নাগরিকদের হত্যা করে তার নাগরিকদের বিদেশীরাও নিরাপত্তা দেয়ার গরজ অনুভব করে না। 

মিয়ানমার সীমান্তে উত্তেজনা প্রশমনে সরকার যখন ব্যর্থ হচ্ছে, তখন অপর সীমান্তে থেকে হুমকির খবর আসছে। আসাম বিজেপির বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে ‘অবৈধ বাংলাদেশী’ বিতাড়নের কার্যক্রম শুরু করার। একজন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রীর পৃষ্ঠপোষকতায় আগামী ১৫ দিনের মধ্যে তাদের আসাম ছাড়ার আলটিমেটাম দেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নির্বাচন পূর্ববর্তী বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোয় প্রচারাভিযানে এ বিষয় নিয়ে জোরালো বক্তব্য দিয়েছেন। 

এখন দেশের ভেতরে পরিস্থিতিটা দেখা যাক। আমরা শুধু সপ্তাহের প্রথম দিন শনিবারের পত্রিকার প্রথম পাতার সংবাদগুলো দেখছি। ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠন স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা হুমায়ুন কবীরকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে সন্ত্রাসীরা হত্যা করেছে। তার ডান হাত ও ডান পা কুপিয়ে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে তারা। হুমায়ুনের বাবা এগিয়ে এলে সন্ত্রাসীরা তার হাত-পায়ের রগও কেটে দেয়।

১০ সেকেন্ডে কিভাবে কিলিং মিশন সমাপ্ত হলো তার বর্ণনা দিয়েছে সিঙ্গেল কলামে। সরস বর্ণনা আর ফিল্মি অভিযানের এই হত্যাকাণ্ড সংবাদমাধ্যমের প্রধান শিরোনাম হতে পারত। হত্যা, খুন, গুম দুর্যোগের ঘনঘটার মধ্যে পত্রিকা এটিকে সিঙ্গেল কলামে জায়গা দিতেও বেগ পেতে হয়েছে। পত্রিকাটি লিখেছে, ‘বেলা ১১টা। মকবুল প্লাজার ঠিক সামনে চায়ের দোকানের পাশে একটি পালসার মোটরসাইকেলে দু’জন এসে দাঁড়ালেন। দু’টি ফাঁকা গুলি করলেন মোটরসাইকেলের পেছনে থাকা ব্যক্তি। এরপর মোটরসাইকেল থেকে নেমে সুলতান আহমদকে লক্ষ্য করে আরো তিনটি গুলি করে মুহূর্তের মধ্যে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন ওই দুই ব্যক্তি। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সুলতান প্রাণ হারান।’

ঘটনার উত্তেজনাকর ফিল্মি স্টাইলের বর্ণনা দিতে গেলে জায়গা হবে না। সংক্ষেপে হত্যার পেছনে যে কারণ পত্রিকা বর্ণনা করেছে তা জানা প্রয়োজন। সুলতান আহমদ দীর্ঘ দিন পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঠিকাদারি করতেন। ঠিকাদারি ব্যবসা নিয়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকুর ঘনিষ্ঠ আফজাল হোসেনের সাথে তার বিরোধ চলছিল। এর মধ্যেই সাত কোটি টাকার একটি কাজ পান সুলতান। এ কাজের জন্য আফজাল তার কাছে দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে। টাকা না পেয়ে সুলতানকে অপহরণ করা হয়। সেই মামলার বিচারে ভরা কোর্টে সুলতানকে দেখে নেয়ার হুমকি দেন আফজাল। এভাবে রাস্তায় হত্যা করার মাধ্যমে তার সেই হুমকি বাস্তবায়ন হয়েছে বলে খবরে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। 

পাঁচ টাকা দামের পত্রিকাটির এদিন প্রধান শিরোনাম খুন-আতঙ্কে আওয়ামী লীগ। বিস্তারিত বিবরণে পত্রিকাটি লিখেছে, খুন-আতঙ্ক ঘিরে ধরেছে আওয়ামী লীগকে। কোন্দলে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটেই চলেছে। রাজপথ থেকে শুরু করে মাঠঘাট সবুজ প্রান্তর সর্বত্রই নিজেদের রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে আওয়ামী লীগ। কি নেতা, কি তৃণমূল কর্মী রক্ত ঝরছে সবারই। পত্রিকাটির প্রথম পাতায় আর চারটি সংবাদ শিরোনাম যথাক্রমে গুলিতে বিজিবি সদস্য নিহত; রাসেলের হুকুমে গুলি করে রিপন; হত্যার কিছুক্ষণ আগে একরামের গাড়ি থেকে নামেন বেলাল এবং নারায়ণগঞ্জের সাত খুন র‌্যাবের সাবেক দুই কর্মকর্তা ফের পাঁচ দিনের রিমান্ডে।

পত্রিকাটির প্রথম পাতায় আর তিনটি সংবাদের একটি সেনা অভ্যুত্থান সংক্রান্ত। একজন পাঠকের মনে হতে পারে এটি একটি অপরাধসংক্রান্ত পত্রিকা। উন্নত দেশে এ ধরনের বিশেষায়িত দৈনিক রয়েছে। খুন হত্যার দুষ্প্রাপ্যতার জন্য সেসব দেশে অপরাধসংক্রান্ত বেশির ভাগ পত্রিকা বন্ধ হওয়ার পথে। আর বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিকগুলো একপলক দেখে মনে হবে এগুলো সব অপরাধবিষয়ক পত্রিকা। প্রকৃতপক্ষে যা নয়। খুন হত্যা গুমের মধ্যে যে ভয়াল পরিবেশ বাংলাদেশে তৈরি হয়েছে জাতীয় গনমাধ্যমে তারই প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠছে। 

শনিবারের প্রত্যেকটি পত্রিকা শুরু হয়েছে হত্যা ও মৃত্যুর খবর দিয়ে। একটি পত্রিকা শেষও হয়েছে ভবিষ্যৎ বিপর্যস্ত বাংলাদেশের খবর দিয়ে, যা বাংলাদেশের জাতীয় বিনাশের চিত্র তুলে ধরেছে। শেষের পাতার নিচে পত্রিকাটি শিরোনাম করেছে, ‘সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের মুখে দেশ’। তার ওপর চার কলাম ছবিতে দেখা যাচ্ছে অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবালকে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদ জানাতে স্ত্রীসহ তিনি হাজির হয়েছেন জাতীয় শহীদ মিনারে। তার ভাবভঙ্গিতে জোর দেয়া হচ্ছে অপরাধের প্রতি। কারা এ অপরাধ করছে তার বিরুদ্ধে তিনি জোরালো কোনো বক্তব্য এখনো দেননি। ছবির পাশে আর একটি মাত্র খবর দিয়ে পত্রিকাটি শেষ হয়েছে তার শিরোনাম, ‘এবার শিক্ষক নিবন্ধন প্রশ্ন ফাঁস রাজশাহীতে’। সম্ভবত প্রশ্ন ফাঁসের তালিকায় এই একটি মাত্র পরীক্ষা বাদ ছিল। জাফর ইকবালের প্রতিবাদী অবস্থানের দিন সেই প্রশ্নটিও ফাঁস হলো। 

অন্য একটি পত্রিকা প্রথম পাতার প্রথম কলামের ওপরে শিরোনাম করেছে ‘খুন-খারাবির চেয়েও মারাত্মক অপরাধ প্রশ্ন ফাঁস’। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলামের মন্তব্য আতঙ্ক বাড়িয়ে দেবে। তিনি বলেছেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া নকলপ্রবণতার চেয়েও ভয়াবহ বিষয়।... সাম্প্রতিক সময়ে যেসব অভিযোগ উঠেছে তা সরকারের পক্ষ থেকে লুকানোর কোনো বিষয় নয়, বরং তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া উচিত, না হলে দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। প্রশ্নপত্র ফাঁসের পরিণতি ব্যাখ্যা করে বলেন, এ ধরনের পরীক্ষায় যারা পাস করেছে তাদের ওপর মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলে। ফাঁস হওয়া প্রশ্ন কে পেয়েছে না পেয়েছে তা বিবেচনায় না এনে সবার প্রতি অনাস্থা সৃষ্টি হয়। যারা নিয়মিত পড়াশোনা করে তারা সারাক্ষণই একটা ভয়ের মধ্যে থাকে যে অন্য কেউ পড়াশোনা না করেই ভালো ফল করতে পারে। যার ফলে শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি শিক্ষার্থীর অনাস্থা সৃষ্টি হয়। ফাঁকি দিয়ে পাস করে কেউ ভবিষ্যতে এগিয়ে যেতে পারে না। তারা নিজেরাই এর মাধ্যমে নিজেদের ক্ষতি করছে। আন্তর্জাতিকভাবেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশে একধরনের নকলের প্রবণতা তৈরি হয়। নকলের চেয়েও প্রশ্নপত্র ফাঁস বেশি মারাত্মক ও ক্ষতিকর। ’

একই দিন সিরাজুল ইসলামের পাশেই শিক্ষামন্ত্রীর ছবিসহ ‘প্রশ্নফাঁস আমরাই উদঘাটন করেছি’ শিরোনামে মন্ত্রীর মন্তব্য ছাপা হয়। শিক্ষামন্ত্রী ‘প্রশ্নফাঁস’ উদঘাটনের দাবি করে আত্মতুষ্টির ঢেঁকুর তুলছেন। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের দিকে অগ্রসর হচ্ছে আর শিক্ষামন্ত্রী সুদূর অতীতের কোনো একটা সফলতা নিয়ে খুশিতে ডগমগ। যোগ্য শিক্ষামন্ত্রীই বলতে হবে বৈকি! 

পরের দিনের পত্রিকার একটি খবর দিয়ে শেষ করছি। ভবিষ্যতে এ দেশে বীভৎসতা কোন দিকে যাবে তার ইঙ্গিত তাতে রয়েছে। জীবন্ত মানুষের একটি পা নিয়ে চলে গেছে সন্ত্রাসীরা। ক্ষমতাসীন দলের এক নেতার পা ওটি। হত্যা করে শরীর কয়েক টুকরো করে বীভৎসতা দেখানো বাংলাদেশে একেবারে স্বাভাবিক ঘটনা। এবার মানুষকে জীবিত রেখে পা কেটে নেয়ার রেওয়াজ চালু হলো। চার দিকে যখন বিপদের ঘনঘটা জাতীয় রাজনীতিতে তখন চলছে ফরমালিন কমেডি। একজন আরেকজনকে কথার ঘোরপ্যাঁচে ফেলে মহা তুষ্ট।

জসিম উদ্দিন


 

বুধবার, ৪ জুন, ২০১৪

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

হবিগঞ্জের জঙ্গলে অস্ত্র উদ্ধারের প্রশ্ন


গত মঙ্গলবার হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার সংরক্ষিত সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের অভ্যন্তরে গভীর জঙ্গলের দুটি বাংকার থেকে বিপুল পরিমাণ সমরাস্ত্র উদ্ধার করেছে র‌্যাব। বিভিন্ন উপজাতির আবাসভূমি ওই এলাকাটি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্ত ঘেঁষা। সেখান থেকে সীমান্তের দূরত্ব মাত্র তিন-চার কিলোমিটার। ওই উদ্যানের অভ্যন্তরে আরো কয়েকটি বাংকার বা পরিখা রয়েছে বলে র‌্যাব জানিয়েছে। রকেট লাঞ্চার ও ট্যাংক বিধ্বংসী বিস্ফোরক থেকে মর্টার শেল ও চার্জারসহ এমন সব ভারি সমরাস্ত্রই সেখানে পাওয়া গেছে, যেগুলো সাধারণত কোনো রাষ্ট্র শক্তির বিরুদ্ধে বড় ধরনের ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে ব্যবহার করা হয়। তথ্যাভিজ্ঞরা জানিয়েছেন, যে স্থানটিতে সমরাস্ত্রগুলো পাওয়া গেছে সেখানে এক সময় অল ত্রিপুরা টাইগার ফোর্স বা এটিটিএফ-এর আস্তানা ছিল। সশস্ত্র এ গ্রুপটি ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার জন্য তৎপরতা চালাতো। বর্তমানে এটিটিএফ দুর্বল হয়ে পড়েছে। উল্লেখ্য, ২০০৩ সালের এই জুন মাসেই বগুড়ার কাহালু থেকে একই ধরনের ও পরিমাণের সমরাস্ত্র উদ্ধার করেছিল চার দলীয় জোট সরকার। ওই সমরাস্ত্রের সঙ্গেও ত্রিপুরার এটিটিএফ-এর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল। এদিকে হবিগঞ্জের সমরাস্ত্রগুলো ঠিক কোন দেশের কোন বাহিনী বা সশস্ত্র গ্রুপের সে বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে জানাতে পারেনি র‌্যাব। তবে সমরাস্ত্রের সঙ্গে পাওয়া একটি পুস্তিকার মলাটে লেখা আছে, ‘কেন ত্রিপুরীরা তাদের স্বাধীনতা ফিরে পাওয়ার সংগ্রাম করছে’।  এ থেকে ধরে নেয়া হয়েছে, সমরাস্ত্রগুলো সম্ভবত এটিটিএফ-এরই। অন্যদিকে র‌্যাবের মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক যথারীতি তদন্তসাপেক্ষে বিস্তারিত তথ্য জানানোর কথা বলেছেন। তিনি আরো জানিয়েছেন, সমরাস্ত্রগুলো কোনো একটি দেশের নয় বরং প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের তৈরি। র‌্যাবের ধারণা, যে পরিমাণ উদ্ধার হয়েছে তার চাইতে দ্বিগুণেরও বেশি সমরাস্ত্র পাওয়া যেতে পারে। সে কারণে র‌্যাবের উদ্ধার অভিযান চলতে থাকবে। এদিকে সমরাস্ত্রগুলো তৈরির সময়কাল নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ, পর্যবেক্ষণের পর র‌্যাবের পাশাপাশি তথ্যাভিজ্ঞরাও জানিয়েছেন, এগুলো অনেক পুরনো, এমনকি ১০-১২ বছর আগেরও হয়ে থাকতে পারে। একটি রকেট লঞ্চারের গায়ে ১৯৯০ সাল লেখা রয়েছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, হবিগঞ্জের গভীর জঙ্গলে দুটি মাত্র বাংকার বা পরিখার ভেতর থেকে এত বিপুল পরিমাণ ভয়ংকর ধরনের ভারি সমরাস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টি নিঃসন্দেহে আশংকাজনক। কারণ, সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান একটি সংরক্ষিত এলাকা এবং সেখানে যার-তার বা সাধারণ মানুষের পক্ষে যাওয়া, গিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বাংকার খনন করা এবং বাইরে থেকে সমরাস্ত্র এনে মজুত করা সম্ভব হওয়ার কথা নয়। কিন্তু যখনই হয়ে থাকুক না কেন সে অসম্ভবকেই সম্ভব করা হয়েছে। অমন একটি কর্মকা- সম্পর্কে সরকার এবং গোয়েন্দা সংস্থাসহ বিভিন্ন বাহিনী এতদিন জানতো না কথাটা বিশ্বাস করা কঠিন। তা সত্ত্বেও আমরা র‌্যাবকে আন্তরিক মোবারকবাদ জানাই। অনেক বিলম্বে হলেও র‌্যাব জাতিকে মারাত্মক কোনো পরিণতির কবল থেকে রক্ষা করেছে। কারণ, এই সমরাস্ত্রগুলো দেশের ভেতরে ব্যবহার করা হলে পুরো দেশই বিপন্ন হয়ে পড়তো। কিন্তু র‌্যাবের তৎপরতায় সে আশংকা দূর হয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে একটি কথা অবশ্য বলা হচ্ছে, ঘটনাপ্রবাহে র‌্যাবের ইমেজ বা ভাবমর্যাদা পুনরুদ্ধার করার এবং র‌্যাবকে তার আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্য কাজ করতে পারে। প্রকৃত তথ্য যা কিছুই হোক না কেন, আমরা কোনো নেতিবাচক আলোচনায় যাওয়ার পক্ষপাতি নই। বর্তমান পর্যায়ে বড় কথা হলো, র‌্যাব একটি বিরাট সাফল্য অর্জন করেছে। সে কারণে র‌্যাবকে অবশ্যই ধন্যবাদ দেয়া দরকার। আমরা একই সঙ্গে আশা করতে চাই, হবিগঞ্জের ওই গভীর জঙ্গলে অন্য যে কয়টি বাংকার বা পরিখা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে সেগুলোর সব ক’টি থেকেই সমরাস্ত্র উদ্ধার করার ব্যাপারে র‌্যাবের চেষ্টা ও তৎপরতা অব্যাহত থাকবে। আমরা আরো আশা করতে চাই, হবিগঞ্জে উদ্ধার করা সমরাস্ত্রগুলোকে নিয়ে কোনো নোংরা রাজনীতি করা এবং প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা চালানো হবে না। কোন সরকারের আমলে ঠিক কোন দেশী বা বিদেশী গোষ্ঠীর উদ্যোগে এসব আনা হয়েছিল এবং আনার পেছনে ঠিক কোন উদ্দেশ্য ছিল এ ধরনের বিতর্কের পরিণতি জাতির জন্য শুধু অকল্যাণই বয়ে আনবে। কারণ, কোনো সরকারই নিজের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার জন্য বাইরে থেকে এত বিপুল পরিমাণ সমরাস্ত্র আনতে এবং সেগুলো সশস্ত্র কোনো গ্রুপের হাতে তুলে দিতে পারে না। এজন্যই কোনো বিতর্কে যাওয়ার বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা চালানোর পরিবর্তে সরকারসহ সকল পক্ষের উচিত সতর্ক থাকা, যাতে কোনো গোষ্ঠীর পক্ষেই ভবিষ্যতে আর কখনো এভাবে সমরাস্ত্র নিয়ে আসা এবং বাংলাদেশের ভূখন্ডের কোথাও মজুত করা সম্ভব না হয়। এই সাথে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হওয়ার প্রয়োজন। অন্তত গত ৫ বছরে অনুপ্রবেশকারী বাহিনী ও অস্ত্রের সন্ধানে গোটা সীমান্ত চষে ফেলা হয়েছে। এরপরও এই অস্ত্র ধরা পড়লো না কেন। এটা একটা বড় প্রশ্ন।

Ads