মঙ্গলবার, ১৭ নভেম্বর, ২০১৫

গণতন্ত্রই জঙ্গিবাদের প্রতিষেধক


এটা আর মোটেও নতুন খবর নয় যে, রাজনৈতিক সংকট এবং গণগ্রেফতারসহ দমন-নির্যাতনের কারণে সামগ্রিক পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকায় দেশের সকল মহলে গভীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে। জনগণও প্রবল আতংকের মধ্যে রয়েছে। সরকার ও ক্ষমতাসীনরা ছাড়া অন্য সকলের পক্ষ থেকে গ্রেফতার ও দমন-নির্যাতন বন্ধ করে সংকট কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যে পদক্ষেপ নেয়ার দাবি উঠেছে একযোগে। এ প্রসঙ্গে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা বলেছেন সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দ। গত সোমবার অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে চলমান গণগ্রেফতারকে ‘বিভীষিকাময়’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বার সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন, বিশেষ যৌথ অভিযানের নামে কোনো মামলা ও ওয়ারেন্ট ছাড়াই বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি হাজার হাজার সাধারণ মানুষকে গ্রেফতার করা হচ্ছে। এমন অবস্থায় আইনশৃংখলা বাহিনীর ভয়ে মানুষ বাধ্য হয়ে ঘর-বাড়ি ছেড়ে বনে-জঙ্গলেও আশ্রয় নিচ্ছে। এভাবে দেশ চলতে পারে না। তিনি আরো বলেছেন, পরিস্থিতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন না ঘটলে ঘরছাড়া মানুষ এক সময় বিদ্রোহী হয়ে উঠবে, যার পরিণতি কারো জন্য শুভ হবে না। একই দিন কারাবন্দী নেতা-কর্মীদের মুক্তির দাবিতে আয়োজিত এক সমাবেশে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, সরকার যদি অব্যাহতভাবে জনগণের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয় এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করার সুযোগ না দেয় তাহলে এদেশ অচিরেই সত্যি সত্যি জঙ্গি রাষ্ট্রে পরিণত হবে। কারণ, গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা না থাকলে জঙ্গিবাদের সৃষ্টি হয়। অমন অশুভ ও ভয়ংকর পরিণতি এড়ানোর উদ্দেশ্যে বিএনপির এই নেতা অবিলম্বে নির্দলীয় সরকারের অধীনে এবং সব দলের অংশগ্রহণে নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নেয়ার জন্য ক্ষমতাসীনদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। ওদিকে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে লন্ডন থেকে দেয়া এক বিবৃতিতে বিএনপি চেয়ারপার্সন ও ২০ দলীয় জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, মানুষের ভোটের অধিকার হরণকারী বর্তমান সরকারের আমলে শুধু গণতন্ত্র ও জনগণের মৌলিক অধিকারগুলোই বিপন্ন হয়নি, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তাও হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। ধূলায় লুণ্ঠিত হচ্ছে মানবাধিকার। গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আজীবন সংগ্রামী মওলানা ভাসানীর ভূমিকার উল্লেখ করে বেগম খালেদা জিয়া নতুন পর্যায়ে আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
আমরা মনে করি, ওপরে সংক্ষেপে উল্লেখ করা হলেও প্রত্যেকের বক্তব্যই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তারা একদিকে বাস্তব পরিস্থিতির সঠিক চিত্র তুলে ধরেছেন অন্যদিকে সরকারের উদ্দেশে বলেছেন তার দায়িত্ব ও করণীয় সম্পর্কে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এ ধরনের নিন্দা-প্রতিবাদ এবং দাবি ও আহ্বান জানানো হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরেই। কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত কল্পনা ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলেও ক্ষমতাসীনরা এখনো জাতিকে বিভক্ত করার এবং সংঘাত ছড়িয়ে দেয়ার ভয়ংকর কর্মকা-েই ব্যস্ত রয়েছেন। তারা বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধী দলগুলোর বিরুদ্ধে এমনভাবে অভিযান চালাচ্ছেন দেশ যাতে দল ও রাজনীতিহীন হয়ে পড়ে। কথায় কথায় সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের ষড়যন্ত্র খুঁজে বেড়ানোর ফলেও পরিস্থিতির কেবল অবনতিই ঘটছে না, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের ভাবমর্যাদা ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এমন অবস্থায় সঙ্গত কারণেই ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে অপরাজনীতির অভিযোগ উঠেছে। বলা হচ্ছে, নিছক সংকীর্ণ রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে বিএনপি ও জামায়াত বিরোধী অভিযান চালানোর পরিবর্তে সরকারের উচিত দেশ ও জনগণের স্বার্থে গণগ্রেফতারের অভিযান এবং দমন-নির্যাতন বন্ধ করে গণতন্ত্রসম্মত পথে ফিরে আসা। উচিত দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়া। এমন উদ্দেশ্যের ভিত্তিতেই বেগম খালেদা জিয়া শুধু আন্দোলনের প্রস্তুতি নেয়ার কথা বলেননি, তারও আগে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্যও আহ্বান জানিয়েছেন। একই আহ্বান উচ্চারিত হয়েছে অন্য সকল মহলের পক্ষ থেকেও। এই আহ্বানের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করার কোনো সুযোগ নেই। সরকারের বিরুদ্ধে অপরাজনীতি করার অভিযোগও অকারণে ওঠেনি। প্রাসঙ্গিক উদাহরণ দেয়ার জন্য জঙ্গিবাদের উল্লেখ করলে দেখা যাবে, বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রীসহ ক্ষমতাসীন দলের নেতারা পরস্পর বিরোধী বক্তব্য রেখে চলেছেন। কেউ বলছেন দেশে জঙ্গিবাদী সংগঠন আছে আবার কেউ বলছেন নেই। এ ধরনের বক্তব্য সত্ত্বেও বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীকে কথিত জঙ্গিবাদের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলার প্রচেষ্টা চলছে বিরামহীনভাবে। অন্যদিকে অনস্বীকার্য সত্য হলো, সরকারের অপরাজনীতি, উস্কানিমূলক বক্তব্য এবং বিরোধী দলের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অবস্থান অভিযানের কারণেই দেশে আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে চলেছে। ঘটছে হত্যাকাণ্ড এবং ভয়ংকর সব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। 
আমাদের মতে, এখানেই রয়েছে একটি কঠিন সত্য অনুধাবন করার বিষয়। বিএনপি নেতা হাফিজ উদ্দিন আহমদ যথার্থই বলেছেন, জনগণের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয়ার পাশাপাশি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করার সুযোগ না দেয়া হলে বাংলাদেশ অচিরেই সত্যিকারের জঙ্গি রাষ্ট্রে পরিণত হবে। কারণ, গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা না থাকলেই জঙ্গিবাদের সৃষ্টি হয়। ক্ষমতাসীনদের উচিত কথাটা যথোচিত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নেয়া এবং তার ভিত্তিতে নতুন পর্যায়ে কর্মকৌশল নির্ধারণ করা। বছরের পর বছর ধরে প্রমাণিত এ সত্যও মনে রাখা দরকার যে, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী জঙ্গিবাদী সংগঠন নয় বরং দল দুটি দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার দীর্ঘ সংগ্রামে অংশ নিয়েছে ও নেতৃত্ব দিয়েছে। অন্যদিকে গণতন্ত্রকামী অমন দুটি দলকেই সরকার জঙ্গিবাদী বানিয়ে ফেলার উন্মত্ত চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে স্বল্পকালের মধ্যে সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদীরা সারা দেশে মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে, যার লক্ষণ এরই মধ্যে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। এজন্যই সরকারের উচিত গণগ্রেফতার ও দমন-নির্যাতন বন্ধ করা এবং বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ গণতন্ত্রমুখী সকল দলকে সঙ্গে নিয়ে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া। সরকারকে একই সাথে নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নতুন জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানেরও পদক্ষেপ নিতে হবে। 
আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার এবং নতুন জাতীয় নির্বাচনের উদ্যোগ নেয়া হলে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে যাবে। দেশে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটার আশংকাও থাকবে না।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads