শুক্রবার, ২৪ অক্টোবর, ২০১৪

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

গণতন্ত্র এবং আওয়ামী লীগের ‘সংগ্রাম’


প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সর্বশেষ একটি হুমকির কথা পাঠকরাও নিশ্চয়ই শুনেছেন এবং লক্ষ্য করেছেন। সাম্প্রতিক ইতালি সফর সম্পর্কে অবহিত করার জন্য বেছে বেছে তিনি গত ২৩ অক্টোবর বিকেলে ঠিক সে সময়ই এক সংবাদ সম্মেলন করেছেন ২০ দলীয় জোটের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যখন নীলফামারীতে এক বিশাল জনসভায় ভাষণ দিচ্ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যের মধ্যে কোনো অস্পষ্টতা ছিল নাÑ যার ফল ভোগ করতে হয়েছে বিশেষ করে বেসরকারি টেলিভিশনগুলোকে। কারটা রেখে কার বক্তব্য প্রচার করবে- এ নিয়ে মহাবিপদেই পড়তে হয়েছিল তাদের। ওদিকে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী যে হুমকি উচ্চারণ করেছেন সেটাও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেছেন, ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত (ভোটারবিহীন ও একতরফা) নির্বাচনের সময় তার নেতৃত্বে যে সরকার ছিল সেটা ছিল একটি ‘ট্রানজিট সরকার’। তখন ‘অনেক কিছু’ করতে পারেননি প্রধানমন্ত্রী। সে কারণে বিএনপি-জামায়াতসহ বিরোধী দলগুলো ইচ্ছামতো মানুষ খুন করার সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু এখন তার সরকার ‘নির্বাচিত’, তিনি নিজেও ‘নির্বাচিত’ প্রধানমন্ত্রী। সুতরাং আন্দোলনের নামে মানুষ খুন করতে দেবেন না তিনি। বক্তব্যের এ পর্যায়ে এসেই হুমকি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বলেছেন, ‘একটা মানুষের গায়ে হাত দিয়ে দেখুক।’ এর পরিণতি কি হয় তা দেখিয়ে ছাড়বেন তিনি!
এই হুমকি যে কেবলই কথার কথা নয় সে সম্পর্কে শেখ হাসিনার সরকার অবশ্য প্রথম থেকেই দেখিয়ে এসেছে। প্রধানমন্ত্রীও বুঝিয়ে দিয়েছেন, যখন যা বলেন তা তিনি ‘মিন’ও করেন।  অর্থাৎ করেও দেখান। এজন্যই তার সরকারের বিভিন্ন ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরতান্ত্রিক পদক্ষেপ এবং র‌্যাব-পুলিশ ও দলীয় সন্ত্রাসী-ক্যাডারদের হামলায় বিরোধী কোনো দল মিছিল-সমাবেশ পর্যন্ত করতে পারছে না। গ্রেফতার ও রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতনের পাশাপাশি বাড়ছে গুম-খুন ও মিথ্যা মামলার সংখ্যাও। ওদিকে গণতন্ত্রের প্রধান কেন্দ্র জাতীয় সংসদকে পঙ্গু করা হয়েছে সুচিন্তিত কৌশলের ভিত্তিতে। নবম সংসদ থেকে বিরোধী দলের এমপিদের বাইরে ঠেলে দিয়ে এবং ভোটারবিহীন নির্বাচনে দশম সংসদ গঠন করার মাধ্যমে জাতীয় সংসদকেই অকার্যকর করে ছেড়েছেন প্রধানমন্ত্রী। পরিষ্কার হয়েছে, জাতীয় সংসদের ব্যাপারে মোটেও আগ্রহ নেই বর্তমান ক্ষমতাসীনদের। গণতন্ত্রকে তো নির্বাসনে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেই, রাষ্ট্রীয় জীবনের অন্যসব ক্ষেত্রকেও একেবারে তছনছ করে ফেলেছে শেখ হাসিনার সরকার। জনপ্রশাসন থেকে বিচার বিভাগ পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রই দলীয়করণ নীতির অসহায় শিকার হয়েছে।  অর্থাৎ মানুষের সর্বশেষ ভরসার স্থল হিসেবেও কোনো প্রতিষ্ঠানকে থাকতে দিচ্ছে না সরকার। এভাবেই চূড়ান্ত স্বৈরশাসনের পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে সরকার।
ইতিহাস সম্পর্কে যাদের ধারণা আছে তারা অবশ্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিজের এবং আওয়ামী লীগ সরকারের কর্মকান্ডে মোটেও বিস্মিত হননি। কারণ ‘গণতান্ত্রিক’ ও ‘সংগ্রামী’ দল হিসেবে পরিচিতি থাকলেও ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে আওয়ামী লীগ এ ধরনের পন্থাই নিয়েছে। জনগণের সঙ্গে তো বটেই, অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও আওয়ামী লীগ সব সময় প্রতারণামূলক কৌশলই অবলম্বন করেছে। প্রতিটি উপলক্ষে প্রমাণিত হয়েছে, গণতন্ত্র বা জনগণের অধিকার আদায়ের আড়ালে ক্ষমতায় যাওয়ার এবং দলগত স্বার্থ উদ্ধার করার বাইরে দলটির উদ্দেশ্যের মধ্যে আর কিছু নেই। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা এবং ১৯৫৭ সালের জুলাই পর্যন্ত সভাপতি ছিলেন মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। তখন আওয়ামী লীগের প্রধান কর্মসূচি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের জন্য স্বায়ত্তশাসন আদায় করা। দাবিটি আদায়ের লক্ষ্য নিয়ে অবিভক্ত বাংলার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও কৃষক-শ্রমিক পার্টির নেতা ‘শেরে বাংলা’ আবুল কাশেম ফজলুল হকের সঙ্গে যুক্তফ্রন্ট গঠন করেছিলেন মওলানা ভাসানী। হক-ভাসানীর পাশাপাশি তৃতীয় প্রধান নেতা ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানকেন্দ্রিক নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বেই ১৯৫৪ সালে আওয়ামী লীগ শেরে বাংলার সঙ্গে যৌথভাবে পূর্ব পাকিস্তানের ক্ষমতায় গিয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন শেরে বাংলা ফজলুল হক। কিন্তু মূলত আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্রের রাজনীতি গণতন্ত্রের সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করেছিল। ৯২-ক ধারার আড়ালে জারি হয়েছিল জরুরি অবস্থা।
আওয়ামী লীগ দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসেছিল ১৯৫৬ সালে। সেবার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন আতাউর রহমান খান। সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানসহ দলের অন্য নেতারাও মন্ত্রিত্ব পেয়েছিলেন। একই সময়ে অর্থাৎ ১৯৫৬ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের কেন্দ্রেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গিয়েছিল। মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি হিসেবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরই তিনি পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে পরিপন্থী অবস্থানে চলে গিয়েছিলেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দী এমনকি একথা পর্যন্ত ঘোষণা করেছিলেন যে, পূর্ব পাকিস্তান নাকি ৯৮ শতাংশ স্বায়ত্তশাসন পেয়ে গেছে! এর প্রতিবাদে এবং স্বায়ত্তশাসন আদায় ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার প্রশ্নে মওলানা ভাসানী ‘আসসালামু আলাইকুম’-এর জন্য বিখ্যাত কাগমারী সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে সংঘাতের পরিণতিতে মওলানা ভাসানীকে তাঁর নিজের গড়ে তোলা আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে গিয়ে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠন করতে হয়েছিল। ওই দিনগুলোতে শেখ মুজিবুর রহমান কিন্তু মওলানা ভাসানীর তথা পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে ভূমিকা পালন করেননি। শুধু তা-ই নয়, ১৯৫৭ সালের ২৫ ও ২৬ জুলাই পুরনো ঢাকার ‘রূপমহল’ সিনেমা হলে যখন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির প্রতিষ্ঠাকালীন অধিবেশন চলছিল তখন শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী গুন্ডারা হামলা চালিয়ে অধিবেশনকে বাধাগ্রস্ত করেছিল। দ্বিতীয় দফা হামলা চালানো হয়েছিল পল্টন ময়দানের সমাবেশে। আওয়ামী গুন্ডারা মওলানা ভাসানীর এবং ‘সীমান্ত গান্ধী’ নামে পরিচিত খান আবদুল গাফফার খানসহ পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আগত নেতাদের অনেকেরই মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিল। ইট-পাটকেলের ঢিল শুধু নয়, লাঠির আঘাতও সহ্য করতে হয়েছিল মওলানা ভাসানীকে। ফলে পল্টন ময়দানের সমাবেশ ভন্ডুল হয়ে গিয়েছিল। এই একটি ঘটনাই প্রমাণ করে, গুন্ডামি করার এবং সন্ত্রাসী হামলা চালানোর শিক্ষাটাও উত্তরাধিকার হিসেবেই পেয়েছে বর্তমান আওয়ামী লীগ।
পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগের গুন্ডামি ও বর্বরতা আরো মারাত্মকই হয়েছে। পাকিস্তানযুগে মওলানা ভাসানীর ন্যাপ ছাড়া অন্য কোনো রাজনৈতিক দল বিশেষ করে পল্টন ময়দানে বাধাহীনভাবে সমাবেশ করতে পারেনি। প্রতিটি সমাবেশে ঝাঁপিয়ে পড়েছে আওয়ামী গুন্ডারা। বাংলাদেশ হওয়ার পর দলটির বর্বরতা সীমা ছাড়িয়ে গেছে। মিছিল সমাবেশে হামলা তো চালিয়েছেই, ব্যক্তিগত পর্যায়েও অনেককে জখম ও খুন করেছে আওয়ামী গুন্ডা-সন্ত্রাসীরা। পুলিশ এবং রক্ষীবাহিনীকেও দলীয় কর্মীর মতো ব্যবহার করেছে মুজিব সরকার। ভাসানী ন্যাপসহ বিরোধী দলের অনেক নেতাকেই আওয়ামী গুন্ডা-সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হতে হয়েছে। ন্যক্কারজনক সে বর্বরতাই এখনো চালাচ্ছে দলটি।
প্রসঙ্গক্রমে গণতন্ত্রের প্রশ্নে আওয়ামী লীগের মনোভাব ও কৌশল সম্পর্কে বলা দরকার। ১৯৫০-এর দশকে শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন দলটি স্বায়ত্তশাসনের তো বটেই, গণতন্ত্রের বিরুদ্ধেও ভূমিকা পালন করেছে। এরপর এসেছে ১৯৬০-এর দশক। এখন কথার মারপ্যাঁচে নানা গালগল্প শোনানো হলেও সত্য হচ্ছে, গণতন্ত্রের জন্য কোনো আন্দোলনেই আওয়ামী লীগ যথাযথ ভূমিকা পালন করেনি। দলটি বরং প্রতারণাপূর্ণ কৌশলের মাধ্যমে অন্যের সাফল্যকে দখল করেছে। একটি উদাহরণ হিসেবে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের কথা উল্লেখ করা যায়। শেখ মুজিব ১৯৬৬ সালের মে থেকে বন্দী থাকায় আওয়ামী লীগের অবস্থা তখন ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। দলটি তখন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতেই হিমশিম খাচ্ছিল। যুক্তফ্রন্টের ২১ দফার ১৯ নম্বর দফাকে ছয়টি ভাগে আলাদা করে শেখ মুজিব তার ছয় দফা পেশ করেছিলেন ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। ছয় দফার প্রশ্নেই ১৯৬৭ সালে আওয়ামী লীগ দ্বিখ-িত হয়েছিল। শেখ মুজিব ছিলেন ‘ছয় দফাপন্থী’ আওয়ামী লীগের সভাপতি, অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের ধুরন্ধর নেতা নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খানের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছিল ‘পিডিএমপন্থী’ আওয়ামী লীগ। ‘ছয় দফাপন্থী’ আওয়ামী লীগের অবস্থা সে সময় এতটাই খারাপ ছিল যে, ১৯৬৮ সালের জানুয়ারিতে শেখ মুজিবকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় প্রধান আসামী বানানোর পরও দলটির পক্ষ থেকে আন্দোলন গড়ে তোলা দূরের কথা, ওয়ার্কিং কমিটির এক প্রস্তাবে বরং তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়ার জন্য ‘আবেদন’ জানানো হয়েছিল।
এখন যতো গালগল্পই শোনানো হোক না কেন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সূচনা করেছিলেন মওলানা ভাসানী। ১৯৬৮ সালের ডিসেম্বরে তিনি ‘ঘেরাও’ নামের এক নতুন ধরনের আন্দোলন শুরু করেন, ৪ ডিসেম্বর তাঁর নেতৃত্বে ছাত্র-জনতা পল্টন ময়দানের সমাবেশ থেকে গিয়ে গবর্নর হাউস (বর্তমান বঙ্গভবন) ঘেরাও করে। পুলিশের গুলীতে আন্দোলনকারীদের মৃত্যু ও সরকারি দমন-নির্যাতনের প্রতিবাদে মওলানা ভাসানী পরপর দু’দিন হরতালের ডাক দিয়েছিলেন। তাঁর এই ঘেরাও আন্দোলনের পথ ধরেই ১৯৬৯ সালের জানুয়ারিতে ঘোষিত হয়েছিল ছাত্র সমাজের ১১ দফা, আর ১১ দফাভিত্তিক গণঅভ্যুত্থানেই মুক্তি পেয়েছিলেন শেখ মুজিবসহ রাজনৈতিক বন্দীরা। কিন্তু প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দিয়ে আন্দোলনকে বিভ্রান্ত এবং শেষ পর্যন্ত ভ-ুল করেছিলেন শেখ মুজিব। যে ১১ দফার ভিত্তিতে তিনি মুক্তি পেয়েছিলেন সে ১১ দফা পরিত্যাগ করে নিজের ছয় দফাকে সামনে আনার মাধ্যমেও তিনি নিজের প্রতারণাপূর্ণ মনোভাব ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন।
জনগণের সঙ্গে তো বটেই, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও আওয়ামী লীগ সব সময় প্রতারণামূলক কৌশল অবলম্বন করেছে। উদাহরণ দেয়ার জন্য বাকশালী শাসনের পতন-উত্তরকালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোর দিকে দৃষ্টি ফেরানো যায়। প্রতিটি নির্বাচনে অংশ নেয়ার প্রক্রিয়াতেই আওয়ামী লীগ কোনো না কোনোভাবে প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে। ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনের কথা উল্লেখ করা যাক। আবদুল মালেক উকিল তখন সভাপতি। আওয়ামী লীগ সেবার নির্বাচনে অংশ নেয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে সেনাবাহিনী থেকে জেনারেল জিয়াউর রহমানের পদত্যাগ এবং ১৯৭৪ সালে নিজেদেরই পাস করা চতুর্থ সংশোধনী বাতিলসহ চারটি প্রধান দাবি তুলে ধরেছিল। নেতারা জনগণকে বোঝাতে চেয়েছিলেন, যেন চার দফা পূরণ না করা হলে তারা নির্বাচনে অংশ নেবেন না। অন্যদিকে কোনো একটি দাবি পূরণ করা দূরে থাকুক, মেনে নেয়ার আশ্বাস পর্যন্ত দেয়নি সরকার। তা সত্ত্বেও ১৯৭৯-এর ১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিয়েছিল। ওই নির্বাচনে দলটি ৩৯টি আসন পেয়েছিল।
১৯৮১ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেয়ার প্রক্রিয়াতেও আওয়ামী লীগ ন্যক্কারজনক প্রতারণাই করেছিল। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হত্যাকা- পরবর্তী অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দলটি আরো একবার চার দফা পূর্বশর্ত উপস্থাপন করেছিল। নির্বাচনের তারিখ পেছানো, জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার, রাজবন্দীদের মুক্তি এবং ভোটার তালিকা সংশোধনের দাবি ছিল চার দফায়। নির্বাচনে অংশ নেয়ার আগে দলটি গুরুতর দুটি প্রতারণা করেছিল। প্রথমটি ছিল পূর্বশর্ত পূরণ করার প্রশ্নে। ‘চরমপত্র’ আকারে নেতারা ঘোষণা দিয়েছিলেন, ১৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দাবি পূরণ না করা হলে তারা নির্বাচনে অংশ নেবেন না। কিন্তু পূর্বশর্ত পূরণ না করা সত্ত্বেও ১৯ সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনা নির্বাচনে অংশ নেয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। দলের প্রার্থী হয়েছিলেন ড. কামাল হোসেন। প্রতারণার দ্বিতীয় ঘটনাটি ছিল অত্যন্ত নিষ্ঠুর এবং অমানবিক। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে হত্যার অভিযোগে ফিল্ড জেনারেল কোর্ট মার্শালের বিচারে মৃত্যু দন্ডাদেশপ্রাপ্ত ১২ জন সামরিক অফিসারের আত্মীয়-স্বজনরা সে সময় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আমরণ অনশন শুরু করেছিলেন। শেখ হাসিনা অনশনরতদের আশ্বাস দিয়েছিলেন, দন্ডাদেশ বাতিল না করা হলে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নেবে না। অন্যদিকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে অনশন ভাঙানোর একদিন পরই শেখ হাসিনা নির্বাচনে যাওয়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন। ওদিকে মৃত্যু দন্ডাদেশ কার্যকর করা হয়েছিল ২৩ সেপ্টেম্বর (১৯৮১)।
প্রতারণার আরো একটি দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছিল ১৯৮৬ সালের সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে। তারও আগে বিএনপির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে আওয়ামী লীগ ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতা’ হিসেবে চিহ্নিত এরশাদের অবৈধ অভ্যুত্থানকে সমর্থন জানিয়েছিল। বিএনপির বিদায়ে উল্লসিত হয়ে দলটির মুখপত্র দৈনিক ‘বাংলার বাণী’ প্রথম পৃষ্ঠায় বিশেষ সম্পাদকীয় প্রকাশ করেছিল (২৫ মার্চ, ১৯৮২)। সামরিক শাসনের পরবর্তী নয় বছরে নানা কৌশলে এরশাদকে রক্ষাও করেছে আওয়ামী লীগ। বিস্তারিত বর্ণনায় না গিয়ে ১৯৮৬ সালের সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে এটুকু উল্লেখ করাই যথেষ্ট যে, ২১ মার্চ গভীর রাতে নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণার একদিন আগেও শেখ হাসিনা বলেছিলেন, পাঁচ দফা এবং চলমান আন্দোলনকে পাশ কাটিয়ে যারা নির্বাচনে অংশ নেবে, তাদের ‘জাতীয় বেঈমান’ হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। কিন্তু নিজেই নিজের সে ঘোষণার উল্টো কাজ করেছিলেন শেখ হাসিনা। সেবার সংসদে ৭৬টি আসনসহ আওয়ামী লীগ পেয়েছিল প্রধান বিরোধী দলের অবস্থান। শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী হয়েছিলেন।
এভাবে বিভিন্ন ঘটনা ও তথ্যের ভিত্তিতে পর্যালোচনায় দেখা যাবে, আওয়ামী লীগের কৌশলগত বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, দলীয় স্বার্থ উদ্ধারের প্রয়োজনে অন্যদের ব্যবহার করা এবং কাজ ‘উদ্ধার’ হয়ে গেলে পাশ কাটিয়ে চলা- কখনো একেবারে ছুঁড়ে ফেলা। ধারণা দেয়ার জন্য এখানে কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করা যায়। ১৯৮৬ সালে ১৫ দলে ভাঙন ঘটিয়ে এবং আন্দোলনের প্রধান সহযোগী সাত দলীয় জোটের সঙ্গে প্রতারণা করে রাতারাতি আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। গভীর রাতে এমন এক সময়ে শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছিলেন, যখন চাইলেও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সাত দলীয় জোটের পক্ষে নির্বাচনে অংশ নেয়া সম্ভব হতো না। শেখ হাসিনার এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছিল, তিনি আসলে অন্যদের সাফল্য একাই ভোগ-দখল করতে চেয়েছিলেন। জাতীয় সংসদ থেকে পদত্যাগ না করে সামরিক শাসক এরশাদকে টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টার মধ্যে রয়েছে প্রতারণার আরো একটি উদাহরণ। সেবার, ১৯৮৭ সালের নবেম্বরে আন্দোলন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যখন আওয়ামী এমপিরা পদত্যাগ করলেই এরশাদের পতন ঘটতো। জামায়াতের এমপিরা আগেই পদত্যাগ করেছিলেন, আওয়ামী লীগের এমপিরাও নেত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু আজ দেই, কাল দেই করে শেখ হাসিনা পদত্যাগপত্রগুলো জমা দেননি। ফলে এরশাদ শুধু টিকেই যাননি, সংসদের বিলুপ্তি ঘটানোর মাধ্যমে নিজের ক্ষমতা দেখানোরও সুযোগ পেয়েছিলেন।
আওয়ামী লীগ সম্পর্কে ধারণা স্পষ্ট করার জন্য খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন প্রথম বিএনপি সরকারের আমলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে পরিচালিত আন্দোলনের কথাও স্মরণ করা যেতে পারে। সঙ্গী বামপন্থীরা তো বটেই, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য সকল বিরোধী দলও এতে অংশ নিয়েছে, কিন্তু আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে কোনো দলকেই সামান্য ছাড় দেয়নি। শুধু তা-ই নয়, সরকার গঠনের সুযোগ পাওয়ার পরও দলটি আন্দোলনের সহযোগী ও কথিত মুক্তিযুদ্ধপন্থী কোনো দলের কোনো নেতাকে মন্ত্রী বানায়নি। পরিবর্তে মন্ত্রিত্ব দিয়েছিল এমন দু’জন মাত্র নেতাকে, যাদের সঙ্গে সামরিক শাসক এরশাদের বিশেষ ধরনের সম্পর্ক ছিল- একজন দীর্ঘদিন তার মন্ত্রিত্ব করেছেন (আনোয়ার হোসেন মঞ্জু), অন্যজন ছিলেন ১৯৮৮ সালের সংসদে বিরোধী দলের নেতা (জাসদের আ স ম আবদুর রব)। অর্থাৎ এক্ষেত্রেও আওয়ামী লীগ বাম ও কথিত মুক্তিযুদ্ধপন্থীদের শুধু ব্যবহারই করেছিল।
পরবর্তীকালেও আওয়ামী লীগ ঐক্যের অভিনয় থেকে সরে আসেনি। ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দলটি মহাজোট গঠন করেছিল। নাম সর্বস্ব কয়েকটি দলের সঙ্গে হাত মেলানোয় বুঝতে বাকি থাকেনি যে, জোট না করে আওয়ামী লীগের কোনো উপায় ছিল না। এর কারণ, সরকার বিরোধিতার নামে শেখ হাসিনা একদিকে দেশে-বিদেশে বাংলাদেশ বিরোধী প্রচারণা চালিয়েছেন, অন্যদিকে জনগণের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোনো একটি বিষয়েই তাকে কখনো আন্দোলন করার বিশ্বাসযোগ্য উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। জনগণকে বিপদের মধ্যে ফেলে বিদেশে পাড়ি জমানোর নজিরও শেখ হাসিনা বারবার স্থাপন করেছিলেন। এজন্যই জনগণও তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে জোট সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নেয়নি।  একই কারণে শেখ হাসিনাকে কয়েকটি নাম সর্বস্ব দলের সঙ্গে জোট গঠন করতে হয়েছিল। এই প্রক্রিয়ায় সর্বশেষ পর্যায়েও আওয়ামী লীগ তার বৈশিষ্ট্য ও স্বভাব অনুযায়ী এগিয়ে গেছে। লগি-বৈঠার হত্যা-সন্ত্রাসের মাধ্যমে নিজেদের ‘নিয়ে আসা’ সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা নিয়ে ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতায় এসেছে দলটি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি তো গণতন্ত্রকেই নির্বাসনে পাঠিয়েছেন শেখ হাসিনা। গণতন্ত্রের ব্যাপারে এতটাই সততা আওয়ামী লীগের! একই কারণে দলটির নেত্রী শেখ হাসিনার কাছে গণতন্ত্র ও জনগণের সংগ্রাম সম্পর্কে শেখার এবং জানার কিছুই থাকতে পারে না। অমন একজন ‘নির্বাচিত’ প্রধানমন্ত্রীর হুমকিতেই বা ভয় পাবে কেন গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলনরত দলগুলো?
আহমদ আশিকুল হামিদ 

বৃহস্পতিবার, ২৩ অক্টোবর, ২০১৪

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

দুর্নীতি দমন, না ‘দায়মুক্তি’ কমিশন?


এটা আর নতুন খবর নয় যে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দুর্নীতি দমন কমিশন দুদকের ‘স্বাধীনতা’ কমতে কমতে শূন্যেরও নিচে নেমে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুদক কর্তাদের নীতি ও ‘সদিচ্ছা’। নানা বাগাড়ম্বরের আড়ালে তারা আসলে সরকারকে তোষণ করতেই ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। গতকাল একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়েছে, ক্ষমতাসীন দলের লোকজনকে ‘দায়মুক্তি’ দেয়ার ব্যাপারে দুদক রেকর্ডের পর রেকর্ড স্থাপন করছে। উদাহরণও রয়েছে রিপোর্টটিতে। এতে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে ক্ষমতাসীন দলের এক হাজার ৫৯৮ জনকে দুর্র্নীতির অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি দিয়েছে দুদক। এ সময় দুর্নীতির ৯০৪টি অভিযোগের মধ্যে ৮৭০টিতে কোনো মামলাই করা হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে দৃশ্যমান ও স্পষ্ট প্রমাণ থাকলেও দুদকের কর্তাব্যক্তিরা নাকি কোনো প্রমাণই পাননি! নির্বাচন কমিশনে দেয়া হলফনামায় যাদের আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল তারা ‘ভুল হয়েছে’ বলে অজুহাত দেখিয়েই দুদকের কাছ থেকে পার পেয়ে গেছেন। চলতি বছরে শুধু নয়, ২০১১ থেকে প্রাপ্ত পরিসংখ্যানেও বিস্ময়কর তথ্যই পাওয়া গেছে। এ সময়ে ক্ষমতাসীন দলের পাঁচ হাজার ৩৪৯ জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অনুসন্ধান নথিভুক্ত করে তাদের প্রত্যেককে দায়মুক্তি দিয়েছে দুদক। সে কারণে অনেক বিশিষ্টজনই ব্যঙ্গ করে দুদককে ‘দায়মুক্তি’ কমিশন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
অন্যদিকে একই দুদক কিন্তু বিরোধী দলের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের ব্যাপারে রীতিমতো ঝাঁপিয়ে পড়ছে। সরকারবিরোধী কারো সম্পর্কে বেনামী কোনো চিঠি পেলেও কর্তাব্যক্তিদের দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়ে যাচ্ছে। সম্পদের হিসাবসহ নানাকিছু জানতে চেয়ে চিঠি হাঁকাচ্ছেন তারা। অনেকের বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের করছেন। চলছে অসম্মানিত করার কর্মকা-। রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করার ব্যাপারেও কর্তাব্যক্তিরা গায়ের ঘাম ঝরাচ্ছেন। সরকারের ইশারাকেই ‘শিরোধার্য’ হিসেবে মেনে চলছেন তারা। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীসহ ক্ষমতাসীনদের এবং তাদের কারো কারো নিকটাত্মীয়দের বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ তথ্য-প্রমাণসহ সংবাদপত্রে প্রকাশিত হলেও ‘পরীক্ষা-নীরিক্ষা’র নামে নীরবতা অবলম্বন করেছেন তারা। এই ‘পরীক্ষা-নীরিক্ষা’ কিন্তু বিরোধী দলের কারো ক্ষেত্রে করা হয়নি। এখনো করা হচ্ছে না। তাদের ব্যাপারে দৌড়ঝাঁপেরও কোনো সীমা-পরিসীমা নেই দুদকের। এমনকি তিন তিনবারের প্রধানমন্ত্রী এবং ২০ দলীয় জোটের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকেও তাড়া করে বেড়াচ্ছে দুদক। সরকারবিরোধী অনেক বিশিষ্টজনকেও তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে দুদক। এভাবে বিরোধী দলের ব্যাপারে যথেষ্ট ‘উদার’ দুদককেই ক্ষমতাসীনদের ব্যাপারে দারুণ ‘সংযমী’ দেখা যাচ্ছে। ‘দায়মুক্তি’ ও রেহাই পেয়ে যাচ্ছেন ক্ষমতাসীন দলের ছোটবড় সকলেই।
বলা দরকার, শুধু সাম্প্রতিক কার্যক্রমের কারণে দুদকের বিরুদ্ধে আপত্তি ও প্রতিবাদ ওঠেনি। বাস্তবে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দুদক ক্ষমতাসীনদের তোষণের একই নীতি ও মনোভাবের প্রকাশ ঘটিয়ে চলেছে। সরকারী দলের লোকজন বিনা টেন্ডারে শত শত কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নিলেও ঠোঁটে আঙুল লাগিয়ে বসে থেকেছে দুদক। রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্টের নামে হাজার হাজার কোটি টাকার কাজ নিলেও সরকারের পছন্দের প্রতিষ্ঠানগুলো চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করেনি বা করতে পারেনি। কিন্তু কোনো একজনের বিরুদ্ধেও মামলা দায়েরের খবর শোনা যায়নি। সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট বিশেষ গোষ্ঠীর লোকজন শেয়ার বাজার থেকে সাধারণ মানুষের ২৫ হাজার কোটি টাকা লুণ্ঠন করে নিয়ে গেছে। তারপরও চুপটি মেরে থেকেছেন দুদকের কর্তাব্যক্তিরা। ক্ষমতাসীন দলের লোকজন সম্পদের নানা আকারের পাহাড় তৈরি করেছেন। কিন্তু দুদকের মুখে রা’টি পর্যন্ত শোনা যায়নি। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া দূরে থাকুক, অধিকাংশ অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত পর্যন্ত করেনি দুদক। সংস্থাটির সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান তো একবার বলেই বসেছিলেন যে, এসব বিষয়ে তাদের নাকি কিছুই ‘করণীয় নেই’! মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও এমপিদের তথা সরকারের কারো বিরুদ্ধে ‘হুট করে’ কিছু করাও নাকি ‘ঠিক’ হবে না! বলা বাহুল্য, মূলত এই তোষণ নীতির কারণেই রেহাই পেয়ে গেছেন অন্তত পাঁচ হাজার ৩৪৯ জন। একই কারণে দুদককেও আজকাল ‘দায়মুক্তি’ কমিশন হিসেবে ব্যঙ্গ করা হচ্ছ।
আমরা দুদকের এ ধরনের নীতি ও কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে নিন্দা জানাই। দফায় দফায় আইন সংশোধনের মাধ্যমে সরকার দুদককে ‘দন্তহীন বাঘ’ বানানোর পদক্ষেপ নিয়েছে সত্য, কিন্তু তার চেয়ে বড় সত্য হলো, কর্তাব্যক্তিরা এমন ন্যক্কারজনকভাবেই চামচামো ও ধান্দাবাজির কাজ-কারবার চালিয়ে যাচ্ছেন, যার সুযোগ নিয়ে সরকার দুদকের হাত-পা এবং নখও কেটে ফেলতে পেরেছে। সব মিলিয়ে দুদক এখন ‘মিউ মিউ করা বেড়ালে’ পরিণত হয়েছে। এমন অবস্থা অবশ্যই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। দুর্নীতি দমনের প্রধান যে উদ্দেশ্য নিয়ে দুদক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল সে উদ্দেশ্য অর্জনের ক্ষেত্রে কোনোরকম গাফিলতি ও তোষণনীতি চলতে দেয়া যায় না। এর ফলে কমে যাওয়ার পরিবর্তে দুর্নীতি বরং বাড়তে থাকবে। কারণ, প্রমাণিত সত্য হলো, দুর্নীতি সব সময় ক্ষমতাসীনরাই বেশি করেন। এখনো তারাই করছেন। এভাবে চলতে থাকলে দুদক প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়ে যাবে। এজন্যই দুদক কর্তাদের উচিত কেবলই বিরোধী দলের পেছনে দৌড়ে ঘাম ঝরানোর এবং ক্ষমতাসীন দলের লোকজনকে দায়মুক্তি দেয়ার পরিবর্তে তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত সকল অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করা এবং দোষী সাব্যস্ত হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া। ‘সদিচ্ছা’ সবার বেলাতেই সমানভাবে দেখানো দরকার। তা না করে কেবলই সরকারকে খুশি করার মাধ্যমে চাকরি টিকিয়ে রাখার এবং পদোন্নতি পাওয়ার চেষ্টা করা হলে কর্তাব্যক্তিদের পরিণতি এক সময় হাস্যকর হয়ে উঠতে পারে। তখন কিন্তু সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের মতো একথা বলে হালে পানি পাওয়া যাবে না যে, দুদককেও হাত-পা বেঁধে সাঁতার কাটার জন্য নদীতে ফেলে দেয়া হয়েছিল!

মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৪

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

ফের ভর্তি হবেন শিক্ষামন্ত্রী?


কিছুকাল আগে ঝগড়াটে স্বভাবের শিক্ষামন্ত্রী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মধ্যে একটি বাহাস হয়ে গেলো। পরীক্ষায় নম্বর বাড়িয়ে দিয়ে, পরীক্ষকদের উপর চাপ সৃষ্টি করে শিক্ষামন্ত্রী এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ ও গোল্ডেন জিপিএ’র বন্যা বইয়ে দিয়েছেন। ক্লাস রুমে কী পড়াশুনা হচ্ছে বা হচ্ছে না, শ্রেণীকক্ষে কী শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে, কারা সে শিক্ষা দিচ্ছেন, প্রকৃত মেধাবীরা শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন কিনা-সেটি শিক্ষামন্ত্রী বা সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে বিবেচিত হয়নি। তারা পরীক্ষকদের ঢালাওভাবে নির্দেশ দিয়েছেন যে, খাতায় লিখুক বা না লিখুক, ভুল-শুদ্ধ যাই লিখুক, শিক্ষার্থীরা টেনেটুনে ২৮ নম্বর পেলে, তাকে ৩৩ পাইয়ে পাস করিয়ে দিতে হবে। আর কোনো ছাত্র যদি ফেল করে তাহলে ক্লাসরুম শিক্ষককে নয়, জবাবদিহি করতে হবে পরীক্ষককে।
এরকম একটি আত্মঘাতী, শিক্ষাঘাতী, ভবিষ্যত প্রজন্মঘাতী বিধি-বিধানের মধ্য দিয়ে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীকে পাস করিয়ে আনা হয়েছে। জিপিএ-৫, গোল্ডেন জিপিএ এবার লাখের ঘর ছাড়িয়ে গেছে। পরিতৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে সরকার বলেছে, ভবিষ্যতে শতভাগ শিক্ষার্থীকে পাস করিয়ে আনা হবে। সে সংবাদ আরও উদ্বেগের। শুধুমাত্র পাসই যে প্রকৃত শিক্ষার মাপকাঠি নয়, সেটি উপলব্ধি করার ক্ষমতা এই সরকারের মধ্যে কারও আছে বলে মনে হয় না। কিন্তু বেশি সংখ্যায় শিক্ষার্থী পাস করেছে এর ভেতরে বিরাট গৌরব দেখতে শুরু করেছে সরকার, বিশেষভাবে শিক্ষামন্ত্রী।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত যেমন, সমালোচনা শুনলেই- রাবিস, স্টুপিড বলে গালিগালাচ করতে শুরু করেন, তেমনি নব্য আওয়ামী লীগার শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদও কান্ডজ্ঞান হারিয়ে বসেন। ভাবখানা এমন এত ছাত্র পাস করিয়ে আনলাম, তারপরে আবার মানের প্রশ্ন কেনো। যেনো পরীক্ষায় পাসের একটা সার্টিফিকেটই জীবনের প্রধান নিয়ামক। বাংলাদেশে এখন অভিযোগ আছে যে, অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অর্থের বিনিময়ে উচ্চ শিক্ষার সার্টিফিকেট দিয়ে থাকে। কিন্তু সেইসব সার্টিফিকেটধারী কর্মক্ষেত্রে কি দক্ষতার সাক্ষ্য বহন করতে পারবে? সেটি বলতে গেলে একেবারে অসম্ভব। প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে, দেদারছে নকল হচ্ছে, শতকরা হিসাবে ছাত্ররা প্রায় শতভাগ পাস করছে-তাতে জাতির কী কল্যাণ হয়েছে, সেদিকে কেউই মনোযোগ দিচ্ছে না।
কিন্তু এর একটি বাস্তব প্রমাণ পাওয়া গেলো সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে। হাজারে হাজারে জিপিএ-৫ধারী এই পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলো। কিন্তু প্রতিযোগিতা থেকে তারা অনেক দূরে ছিটকে পড়ে গেছে। ইংরেজী বিষয়ে পাস মার্কস পেয়েছে মাত্র দুইজন ছাত্র। আসন সংখ্যা ছিলো ১৩৫। যদি ৩০০ ছাত্র পাস মার্কস পেতো তাহলে তাদের মধ্য থেকে মেধাক্রম অনুযায়ী ১৩৫জনকে ভর্তি করা হতো। বাকিরা বাইরেই থাকতো। কিন্তু দু’জন পাস করায় বিপাকে পড়ে গেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এখন পাসের শর্ত শিথিল করে তাদের ছাত্র ভর্তি করতে হবে।
এ নিয়ে সমাজে বেশ তোলপাড় সৃষ্টি হয়। দেশের খ্যাতিমান শিক্ষাবিদেরা এসএসসি ও এইচএসসি লেভেলে পাঠদান বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেন। ভর্তি পরীক্ষায় এই ফলাফলের অর্থ দাঁড়ায়, ক্লাসরুম পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিক্ষার উপর তেমন কোনো গুরুত্বই দেওয়া হচ্ছে না। ফলে জিরোকে হিরো বানাবার প্রচেষ্টা হিসেবে শিক্ষার্থীদের অধিক মেধাবী বলে চিহ্নিত করার প্রবণতা দেখা দিয়েছে। তাতে আখেরে যে কোনো লাভ হয় না, সেটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হলো।
ভর্তি পরীক্ষার এই ফলাফল নিয়ে যখন সমাজের ভেতরে তোলপাড়, শিক্ষাবিদ মহলে সমালোচনা, তখন শিক্ষামন্ত্রী রাগে একেবারে অগ্নিশর্মা হয়ে বললেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভ্রান্ত ভর্তি নীতির কারণে ভর্তি পরীক্ষায় এমন বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী নাহিদের বক্তব্য ছিলো ভর্তি পরীক্ষার প্রয়োজন কি? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গ্রেড অনুযায়ী ছাত্র ভর্তি করে নিলেই তো পারতো। অর্থাৎ শিক্ষামন্ত্রীর বাজে মালের কারখানায় যা উৎপাদিত হয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তা গ্রহণ করে জাতির বারোটা বাজাক। সে বারোটা বোধকরি অনেক আগে বেজেও গিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলেছেন যে, অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তারা এই পরীক্ষা গ্রহণ পদ্ধতি নির্ধারণ করেছেন। এবং ভর্তি পরীক্ষায় যেসব প্রশ্ন করা হয়, তার সবই পাঠ্যপুস্তক ভিত্তিক। কোনো শিক্ষার্থী যদি পাঠ্যপুস্তক যথাযথভাবে পড়ে, তাহলে তার জন্য প্রশ্নের উত্তর দেওয়া মোটেও কঠিন ব্যাপার নয়। আমরাও তো এসএসসি, এইচএসসি লেভেলে সেভাবেই পড়াশুনা করেছি। পাঠ্য বইয়ে যা কিছু আছে, তার সব কিছুই মনোযোগ দিয়ে পড়েছি। শিক্ষকরাও কখনও পরীক্ষায় কী আসবে, না আসবে, সেদিকে না তাকিয়ে পাঠ্যপুস্তকে কী আছে, সেদিকেই অধিক মনোযোগ দিয়েছেন। তাদের ঐকান্তিক যতেœ পাঠ্যপুস্তকের বিষয়াদি আমরা উপেক্ষা করতে পারিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যদি পাঠ্যপুস্তককে ভিত্তি ধরে থাকেন, তাহলে দোষের কী আছে, বোঝা গেলো না।
পত্র-পত্রিকায় রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে যে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে ইংরেজী চিঠির ড্রাফট করতে বাইরে থেকে ইংরেজি জানা লোক হায়ার করে অনতে হয়। সেটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য সম্মানজনক নয়। এর ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে জাতি হিসেবে আমাদের অস্তিত্বের বিলুপ্তি অনিবার্য। এ থেকে আর একটি জিনিস বোঝা যায় যে, শিক্ষার মানের পতন একদিনে ঘটেনি। অনেক আগে থেকেই আমাদের এ অধঃপতন শুরু হয়েছে। তার উপরে দলীয়করণের মনোবৃত্তিতে মেধাবীদের সরকারি চাকরির সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। ফলে একশ্রেণীর মেধাহীনের দল, এখন প্রশাসনে জাকিয়ে বসেছে। আর তারই পরিণতিতে ইংরেজী জানা লোক হায়ার করতে হচ্ছে।
শিক্ষাবিদ মহলে এ নিয়ে উদ্বেগের সৃষ্টি হলো। যখন প্রশ্ন উঠলো যে, এসএসসি ও এইচএসসি পাসের হার বাড়লেও শিক্ষার মান নেমে গেছে উদ্বেগজনক পর্যায়ে, এতে বাকোয়াজ শিক্ষামন্ত্রী একেবারে তিরিং-বিরিং করে লাফিয়ে উঠলেন। বললেন, শিক্ষার মান অনেক উন্নত হয়েছে। আগে শিক্ষার কোনো মানই ছিলো না।
নাহিদ সাহেব কোন মানের শিক্ষার্থী ছিলেন, কোন শিক্ষকের কাছে পাঠ গ্রহণ করেছেন- সে বিষয়ে আমার কোনো ধারণা নেই। কিন্তু আমরা যারা শিক্ষামন্ত্রীর সমসাময়িককালীন এসএসসি, এইচএসসি পরীক্ষায় পাস করেছি, তারা নিশ্চয় মন্ত্রীর ‘শিক্ষার কোনো মানই ছিলো না’ এই বক্তব্যের সাথে একমত হবেন না। আমাদের শিক্ষকেরা সে অর্থে হাত ধরে শিক্ষাদান করেছেন। আমি পড়েছি টাঙ্গাইল জেলার দেলদুয়ার উপজেলার নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এলাসিন তারেক যোগেন্দ্র হাই স্কুলে। অষ্টম শ্রেণীতে ওঠার পর মুখস্থ বিদ্যার বদলে কীভাবে যেকোন বিষয়ে ইংরেজীতে রচনা লেখা যায়, তার ব্যাকরণ ও শব্দ প্রয়োগ কীভাবে যথার্থ হবে, সেটি বারবার অনুশীলন করে শিক্ষকরা শিখিয়েছেন। মানই যদি না থাকতো, তাহলে আমরা দেশ-বিদেশে লেখাপড়া করতে পারতাম না। অবিরাম খাবি খেতে খেতে কোথায়ও হারিয়ে যেতাম।
তবে কোথায়ও কোথায়ও যে মান ছিলো না, সেটা শিক্ষামন্ত্রীর কথা থেকে বোঝা যায়। তখনও ভালো স্কুল, খারাপ স্কুল ছিলো, ভালো ছাত্র, খারাপ ছাত্র ছিলো। শিক্ষামন্ত্রী সম্ভবত সে শেষোক্তদের দলে ছিলেন। মানসম্পন্ন লেখাপড়া তিনি করতে পারেননি। তাতে দোষের কিছু নেই। আবার গৌরব করারও কিছু নেই। শিক্ষামন্ত্রী সম্ভবত তেমন কোনো মানহীন শিক্ষার ভেতর দিয়েই বেরিয়ে এসেছেন। তার যাবতীয় আচরণে সে কথাই প্রমাণিত হয়।
শিক্ষামন্ত্রীর এ ধরনের উক্তিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। ফেসবুকে কেউ কেউ লিখেছেন, আগে তো শিক্ষার কোনো মান ছিলো না, এখন যেহেতু শিক্ষামন্ত্রীর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় মানসম্পন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা চাুল হয়েছে, অতএব শিক্ষামন্ত্রীর উচিত মানসম্পন্ন শিক্ষা গ্রহণ করার জন্য আর একবার স্কুল, কলেজ পেরিয়ে শিক্ষা গ্রহণ নেওয়া। এ নিয়ে অনেকে অনেক রসালো মন্তব্যও করেছেন। কিন্তু শিক্ষার বারোটা বাজাবার জন্য এই মন্ত্রী যে কলঙ্কজনক অধ্যায় সৃষ্টি করেছেন। তার খেসারত জাতিকে দীর্ঘদিন ধরে দিতে হবে।
সরকার অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে প্রাথমিক পর্যায় থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত পাঠ্য বইয়ে শিক্ষার যাবতীয় সর্বনাশা আয়োজন সম্পন্ন করেছে। এই গোটা পর্যায়ে আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ধর্ম বিশ্বাস ভূলুণ্ঠিত। ফলে দেশাত্ববোধ, আত্মমর্যাদা, আত্মঅনুসন্ধান সবকিছুই তিরোহিত হয়ে গেছে। ইতিহাসের ভ্রান্ত বা খ-িত রূপ জানতে পারছে শিক্ষার্থীরা। যেসব মনীষীরা ছাত্রদের জন্য আদর্শ হয়ে উঠতে পারতেন, প্রেরণার উৎস হয়ে উঠতে পারতেন, মুছে দেওয়া হয়েছে তাদের নাম। যে ধারাবাহিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম, সে সংগ্রামের ইতিহাসও জানতে পারছে না শিক্ষার্থীরা। সরকারের কূকীর্তির এটাও অংশ। আর সে কারণেই সমাজের ভেতরে মূল্যবোধের অবক্ষয়। আমরা শিকড়হীন ভাসা পানির মতো অনিশ্চিত গন্তব্যে যাত্রা শুরু করেছি। সমাজের শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণীকে ভবিষ্যত প্রজন্ম ও দেশের স্বার্থে এই গড্ডালিকা প্রবাহ থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে হবে।
ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী 

রবিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১৪

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

শহীদ মিনার তুমি কার? দলের না দেশের!


গুম, খুন, অপহরণের এই দেশে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারকে নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন অপরাজনীতি। দেশের বিরাজমান পরিস্থিতিতে এমনি তো জনগণের যন্ত্রণার শেষ নেই, তারওপর আবার শহীদ মিনারের নোংরা রাজনীতিÑ তা কি মেনে নেয়া যায়? দেশের হাজারো মানুষের মতো আমারও প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করছে, শহীদ মিনার তুমি কার? আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ নাকি দলকানা এতিম বামপন্থীদের।
মহান প্রভুর দরবারে ড. পিয়াস করিমের জান্নাত কামনা করে কিছু কথা লেখার চেষ্টা করছি- চাওয়া-পাওয়ার এই পৃথিবীতে কার না ইচ্ছে করে দীর্ঘদিন বাঁচতে? মৃত্যু অবধারিত তাই তো অকালে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন সমাজবিজ্ঞানী ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. পিয়াস করিম। রাজনীতিবিদ না হয়েও যে হাজারো মানুষের মনের গহীনে স্থান দখল করে নেয়া যায় তার উদাহরণ তিনি সৃষ্টি করে গেছেন। তার জানাযার নামাযে উপস্থিতিই বলে দেয়- তিনি কেমন প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। দেশের এই ক্রান্তিকালে ড. পিয়াস করিমের বড়ই প্রয়োজন ছিলো। কিন্তু মহান প্রভুর ইচ্ছায় তিনি দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে চলে গেলেন ভিন্ন এক জগতে। তার এই শূন্যতা পূরণ হবার নয়। তারপরও ড. পিয়াস করিমের দিকনির্দেশনামূলক বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা জাতির পাথেয় হয়ে থাকবে চিরকাল।
বাংলাদেশের হাজারো মানুষ ড. পিয়াস করিমকে যেভাবে চিনত, আমিও সেভাবেই চিনতাম। তার সাথে সরাসরি কথা বলার খুবই ইচ্ছে আমার ছিলো, কিন্তু সময়ের অভাবে আর সে সুযোগ হয়নি। তবে টেলিভিশনের টকশোর মাধ্যমেই আমি তাকে চিনতাম। তার বাচনভঙ্গি, সুন্দর করে কথা বলার স্টাইল আর নির্ভয়ে সত্য ইতিহাস জাতির সামনে তুলে ধরা আমাকে মুগ্ধ করতো। তার চেয়ে বেশি মুগ্ধ করতো- দেশপ্রেম আর গণতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনামূলক জ্ঞান-গর্ব আলোচনা। গণতান্ত্রিক দেশে নাগরিকরা যে কোনো মত ও পথের বিশ্বাসী-অনুসারী হবে- এটাই তো স্বাভাবিক। ড. পিয়াস করিম কী গণতন্ত্রের বিপক্ষে কোনো ভূমিকা পালন করেছিলেন? যদি না-ই করে থাকেন, তাহলে কেন এরকম হলো ড. পিয়াস করিমের লাশ নিয়ে। কী অপরাধ ছিলো তার? সেই প্রশ্নের উত্তর আমাদের কাছে নেই। তবে লীগ সরকারের কাছে আছে বলেই তার লাশকে শহীদ মিনারে নিয়ে যেতে দেয়া হয়নি। ১৬ কোটি মানুষের ট্যাক্সের টাকা ব্যয় করে নির্মিত শহীদ মিনার কি শুধু বামপন্থী, আওয়ামীপন্থী আর ঘাদানিকদের নাকি এদেশের জনগণের। সেই প্রশ্নের উত্তর অবশ্যই রাষ্ট্রকে দিতে হবে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের স্তম্ভের সাথে জড়িত ৫৬ হাজার বর্গমাইলের ১৬ কোটি মানুষের আবেগ। ৫২’র ভাষার জন্য যারা নিজের জীবনের তাজা রক্ত রাজপথে ঢেলে দিয়েছিলেন তাদের স্মৃতির উদ্দেশ্যেই এই শহীদ মিনার। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই হৃদয়ে শহীদ মিনারের ভাবগাম্ভীর্য ধারণ করে আসছেন। বাংলাদেশের মানুষের আবেগের স্মৃতিস্তম্ভ শহীদ মিনার চত্বর কি কারো বাপ-দাদার তালুক নাকি ব্যক্তিগোষ্ঠীর নিজস্ব সম্পত্তি? ক্যাম্পাসের ভেতরে অবস্থান হওয়ায় রাষ্ট্রের প্রশাসনযন্ত্র শহীদ মিনারের যেদখভালের দায়িত্ব দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে। কিন্তু শহীদ মিনারে কারা যেতে পারবেন আর কারা যেতে পারবেন না, তা নির্ধারণ করার ক্ষমতা কি শুধু তাদের? সেই প্রশ্নের উত্তরটাও একদিন না একদিন দেয়া লাগতে পারে। আজ আমার, তো কাল তোমার।
দেশের প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার রয়েছে এই শহীদ মিনারের চত্বরে যাওয়ার। কিন্তু সংস্কৃতিচর্চা আর রাজনৈতিক প্রভাবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরকে যারা নিজেদের ঘরবাড়ি বানিয়ে ফেলেছেন তাদের খেয়ালখুশি মতোই কি নিয়ন্ত্রিত হবে? ১৬ কোটি মানুষের আবেগের এই শহীদ মিনারকে কি লীগ সরকারের নিকট ইজারা দেয়া হয়েছে? শহীদ মিনারের এই দখলদারিত্ব মুক্ত করতে হবে। আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র আশ্বিন- এই চার মাসে যেমন এক বছর হয় না, তেমনিভাবে সারা জীবন কেউ ক্ষমতার স্বাদ ভোগ করতে পারে না। মৃত্যু পথের যাত্রী আমরা সবাই। মরণের পরে আমাদের সবার মোহনা তো একটিই হবে। তাহলে কেন এত হিংসার রাজনীতি। আমরা কী পারি না একটু সহানুভূতি দেখাতে? সর্বস্তরের মানুষ যেন ড. পিয়াস করিমকে শেষবারের মতো দেখতে এবং তার প্রতি সম্মান দেখাতে পারেন সেজন্য সুশীলসমাজের পক্ষ থেকে লাশ শুক্রবার সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখার কর্মসূচি দিয়েছিলো। কিন্তু বাধা হয়ে বসেছে লীগ সরকারের অনুসারীরা। তাদের বাড়াভাতে ছাই দিতেন পিয়াস করিম। তাদের ভাষায়- পিয়াস করিম পাকিস্তানী রাজনীতির অনুসারী, জামায়াতে ইসলামীর অনুসারী। শহীদ মিনারে লাশ নেয়া হলে ভাষার মিনারকে অপবিত্র করা হবে। প্রশ্ন হলো, যারা এসব করছেন তারা কি পিয়াস করিমের রাজনৈতিক পরিচয় জানেন? পবিত্র আর অপবিত্র কীসে হয়, সেটা কি তারা বোঝেন? শহীদ মিনারের জন্ম দেয়া ভাষা মতিনের যখন তথাকথিত প্রটোকলের অজুহাতে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেয়া হয়া না, তখন কি শহীদ মিনারকে অসম্মান করা হয়নি? তারা শুধু যে ড. পিয়াস করিমকে নিয়ে রাজনীতি করেছেন তা কিন্তু নয়, অতীতে ভাষা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা মরহুম অলি আহাদের লাশ আনা ও রাখাকে নিয়েও একই মহল অপরাজনীতি করেছিলো। এর কারণ হচ্ছে অলি আহাদ আওয়ামী লীগবিরোধী ছিলেন। দেশ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বরেণ্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, বুদ্ধিজীবী, সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের শিক্ষক, পত্রিকার সম্পাদক, কলামিস্ট ও আইনজীবীসহ বিশিষ্টজনদের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে লীগ সরকারের মাস্তানরা। তাদের নিয়ে অশ্লীল ভাষায় কটূক্তি করতেও কুণ্ঠাবোধ করেনি লীগ সরকারের অনুসারীরা। অবাঞ্ছিতদের তালিকায় রয়েছেন- কলামিস্ট ও টিভি টকশোর পরিচিত মুখ ড. মাহফুজ উল্লাহ, কবি ফরহাদ মজহার, ইংরেজি দৈনিক নিউএজ সম্পাদক নূরুল কবির, দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল, প্রফেসর ড. আমেনা মহসিন, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী, সাপ্তাহিক ২০০০ পত্রিকার সম্পাদক গোলাম মর্তুজা ও সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ড. তুহিন মালিক। লীগ সরকারের বিরুদ্ধে যারাই কথা বলবেন, তাদেরই নাম ওঠবে রাজাকারের খাতায়- ধিক-শতধিক ঐসব জ্ঞানপাপীদের যারা সমাজের সর্বশ্রদ্ধেয় জাতির বিবেকবান মানুষকে খাটো করে প্রতিহিংসার রাজনীতি চর্চা করেন। পরিশেষে এতটুকু কথা লিখেই শেষ করতে চাই- লীগ সরকার ক্ষমতার দম্ভে ড. পিয়াস করিমের লাশকে শহীদ মিনারে নিয়ে যেতে বাধা দিয়েছে। ড. পিয়াস করিমের লাশ বিএনপি শহীদ মিনারের নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। তবে আমার মতে, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নিজে স্বয়ং মরহুম ড. পিয়াস করিমকে পছন্দ করেছেন বলেই অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি সৃষ্টির হাত থেকে তার লাশকে রক্ষা করেছেন।
মোঃ তোফাজ্জল বিন আমীন 
0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

মরদেহের সাহস


কখনো কখনো জীবিত মানুষের চেয়ে মরদেহের সাহস ও ক্ষমতা হয় অনেক বেশি। জীবিত-উপস্থিত ব্যক্তির চেয়ে তাঁর নিথর মৃতদেহের সামাজিক-রাজনৈতিক ক্ষমতাও অনেক সময় অধিক বলে প্রমাণিত হয়। যেমনটি আবারো প্রমাণিত হলো বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, টকশোর জনপ্রিয় বক্তা, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. পিয়াস করিমের বেলায়। কারণ পিয়াস করিম শত বাধা ও প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যুক্তি ও সাহস নিয়ে সব সময়ই লড়াই করেছেন। দলদাস বা লেজুড়ে পরিণত হননি। মৃত্যুর পরেও তাঁকে প্রতিপক্ষ ভয় পেয়েছে। তাঁর মরদেহ শহিদ মিনারে নিতে দেয়নি একটি বিতর্কিত পক্ষ ও সে পক্ষের অনুসারীরা। কিন্তু বায়তুল মোকাররমে জনতার ঢল আটকাতে পারেনি পিয়াস করিমের প্রতিপক্ষগণ। সেখানে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় সিক্ত হয়েছেন তিনি এবং এ জাতির সামনে রেখে গেছেন সত্য ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হওয়ার অনুপ্রেরণা।
প্রসঙ্গত বলা যায় যে, বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের ঝাপসা চিত্র সংশ্লিষ্টদের অজানা-অদেখা নয়। গড় ও মধ্যমানের মেধার প্লাবনে ভেসে যাচ্ছে সবকিছু। গতানুগতিক ধারায় ভাসছে সবাই। দল বা ব্যক্তির লেজুড় অধিকাংশ জন। কারো ছায়ায় বা পক্ষপুটে বেঁচে থাকাই এখন এদেশে আদর্শ ও নিরাপদ। বেশিরভাগই কোনো কোনো পান্ডা বা মোড়লের অধীনে “ঘেঁটুপুত্র কমলা”। রাজনীতির মতোই সংস্কৃতি, শিক্ষা বা বুদ্ধির জগত আচ্ছন্ন করে আছে দানবের মতো গডফাদারগণ। এমন পরিস্থিতিতে সাহস করে নিজের বিশ্বাস বা চিন্তার আলোকে কথা বলা এক বিরাট বিপদের বিষয়। বিশেষ বিশেষ ব্যক্তি বা মহল বা দলের বাইরে কিছু বলা বা করা হলেই এদেশে তীব্র আক্রমণ নেমে আসে। মধ্যপন্থা বা বিকল্প কথা বা কারো পক্ষে কিছু বলা না হলেই সমালোচনার ঝড় এসে সবকিছু তছনছ করে দেয় ক্ষমতা বা ক্ষমতার বাইরের মাফিয়াদের কাছ থেকে। বুদ্ধিবৃত্তিও এখানে অসার কর্ম মাত্র। কর্তৃপক্ষের জন্য এদেশে চাই দাসসুলভ জনশক্তি, কর্মী ও সমর্থক; কদাচ ন্যায্য সমালোচক নয়। এমনই সঙ্কুল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তির জগতে ক্ষণকালের নক্ষত্রের মতো এলেন এবং চলে গেলেন প্রফেসর ড. পিয়াস করিম। সাহস, যুক্তি, বক্তব্যের স্পষ্টতায় প্রচন্ড বিরূপ পরিস্থিতিতে তিনি একাকী দাঁড়িয়ে ছিলেন। দাঁড়িয়ে ছিলেন ভিন্নমতের যুক্তিনিষ্ঠ আলোয়। সম্মান ও শ্রদ্ধায় তিনি প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। বহুত্ববাদী গণতন্ত্রের কথা বলেছেন। নিজের মত ধারণ করে প্রবল বিরুদ্ধবাদীদের সঙ্গে তর্কবিতর্ক ও আলোচনা করেছেন। যে কোনো আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়ে একধারা বা অতিসাধারণকৃত পক্ষ বা বিপক্ষের উগ্রতা বা দ্বন্দ্ব-সংঘাতের বাইরে নানা সম্ভাব্য বিকল্পের কথা বলেছেন। মানুষকে সঙ্কট থেকে বের হওয়ার আরো অনেকগুলো পথের দিকে যেতে ইঙ্গিত করেছেন। একজন পন্ডিত, ভাবুক, চিন্তাবিদের বিশ্বজনীন দায়িত্বের প্রতিই ছিল তার অনুরাগ ও মনোযোগ। কখনো কখনো তাঁর বক্তব্যকে কোনো কোনো দলের পক্ষে বা কাছাকাছি মনে হয়েছে। কিংবা তাঁর বক্তব্যে কেউ কেউ লাভবান হয়েছেন। কিন্তু তিনি কখনোই দলীয় হননি। নিরপেক্ষতা ও গণতান্ত্রিকতাই তাঁর একমাত্র ও শেষ পরিচয়। একজন মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষাবিদ হিসেবে জ্ঞানের বা যুক্তির বা বুদ্ধির আনুগত্যই ছিল তাঁর কাছে কাম্য। গণতন্ত্র, মানবমুক্তি, প্রগতি, বহুত্ববাদকে যুক্তির সাথে, তত্ত্ব ও তথ্যের সাথে উপস্থাপন করাই তাঁর প্রধান উদ্দেশ্য। বাংলাদেশের অজ্ঞতা, কূপমণ্ডূকতা, একদেশদর্শিতার বিদ্যমান সংস্কৃতিতে তিনি ছিলেন বিরাট এক ব্যতিক্রম। তাঁকে সঠিকভাবে অনুধাবন করাও অনেক সময় নিম্নমেধার দলদাসদের পক্ষে সব সময় সম্ভব। অনেকেই তাঁকে পুরোপুরি বুঝতেও পারেনি কিংবা ভুল বুঝেছে। তারপরও অতি স্বল্পসময়ে তিনি জয় করেছিলেন বাংলাদেশ ও বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা বাংলাভাষী মানুষের হৃদয়। মনোটনোস, স্বাদহীন, দল ও চেহারা দেখানো কর্কশভাষী, যুক্তিহীন টিভি আলোচকদের সামনে তিনি ছিলেন বিরল ব্যতিক্রম। দর্শক-শ্রোতার মনোযোগের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর এবং তাঁর মতো মানুষের উপস্থিতি বাংলাদেশে যত বাড়বে ততই এদেশের চিন্তার বৈকল্য দূরীকরণ সহজ ও ত্বরান্বিত হবে। দল-উন্মাদনা ও ব্যক্তি-পূজার বাইরে যুক্তিচর্চার মাধ্যমে অর্জিত আধুনিক ব্যক্তি-অধিকার ও স্বাতন্ত্র্যের জায়গাটি প্রশস্ত হবে। মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি, আইনের প্রকৃত শাসন ও গণতান্ত্রিক সুশাসনের বাংলাদেশের পক্ষেই তিনি তাঁর কর্ম ও চেতনার সকল শক্তি ও সামর্থ্য ব্যয় করেছেন। ব্যক্তিগত স্বার্থের বাইরে এসে এ ধরনের সর্বজনীন, মানবিক কল্যাণকর উদ্যোগ সবাই নিতে পারেন না। তিনি সে কাজ ও উদ্যোগটিই একাডেমিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে যথাযথভাবে নিয়েছিলেন। এটাই তাঁর জীবনের প্রধান সাফল্য। যদিও তাঁর স্বপ্ন ও সাধ এখনই বাস্তবায়িত হয়নি এবং তার সংগ্রাম আরো অনেকদিন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ধারায় প্রকৃত গণতন্ত্রায়নের স্বার্থে চলতে থাকবে, সেহেতু বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চিন্তা-আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসচর্চার ধারা ও ইতিহাসে তিনি আরো অনেকদিন প্রাসঙ্গিক থাকবেন। তিনি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী চিন্তার আকাশে ক্ষণকালের নক্ষত্ররূপে আলোকপ্রভা বিচ্ছুরণ করতে থাকবেন। সেই আলোয় আমাদের সঠিক পথটি চিনতে হবে।
প্রসঙ্গত আরো বলা যায় যে, বাংলাদেশের জাতিসত্তাগত বিভেদের বিষয়টি ক্রমেই রাজনীতির মূল আলোচনার জায়গায় চলে আসছে। শাহবাগ বনাম শাপলার কিংবা বাঙালি বনাম বাংলাদেশী জাতীয়তার দ্বন্দ্ব থেমে থেমে উস্কেও উঠছে। সর্বশেষে ড. পিয়াস করিমের মৃত্যু-পরবর্তীতে তাঁর মরদেহ নিয়ে যে উত্তেজনা দেখা দেয়, তাতে সবকিছু ছাপিয়ে আদর্শিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতের বিষয়টিই প্রাধান্য পেয়েছে বলে মনে হয়। কারণ জীবিত পিয়াস করিমের মতো তাঁর মরদেহকেও গতিরুদ্ধ করা হয়েছে। যদিও ধর্মনিরপেক্ষ, উদার, গণতন্ত্রী পিয়াস করিম ও তাঁর পরিবার জাতীয় সংস্কৃতির কেন্দ্রস্থল শহিদ মিনার হয়ে ধর্মীয় বিধানের স্থল বায়তুল মোকাররমে মরদেহ নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শহিদ মিনারে বাধার দূর্গ গড়ে সবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো হয়েছে যে, বাংলাদেশে বিদ্যমান দূরত্ব ও মতপার্থক্য সামান্য বা মিটিয়ে ফেলার মতো নয়। যদি হতো, তাহলে মৃত্যুর পর যখন সব দেনা-পাওনা শেষ হয়, তখনই সেটা হতো। হয়নি। বরং পিয়াস করিমের মরদেহের সঙ্গে জীবিত মানুষদের ব্র্যাকেট বন্দি করে একটি রাজনৈতিক, দার্শনিক ও আদর্শিক মেরুকরণের সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিরই একটি পূর্বাভাস জানানো হয়েছে। আর ড. পিয়াম করিমের মরদেহ বাংলাদেশের জাতিসত্তা ও জাতিতত্ত্বের প্রসঙ্গে বেশকিছু প্রশ্ন উত্থাপ করে গেছে। অচিরেই এসব বিষয়ে মীমাংসা হবে বলে মনে হয় না। বরং এটা মনে করাই সঙ্গত যে, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাত তলে তলে আদর্শিক ও দার্শনিক লড়াইয়ের পথে চলে যাচ্ছে।     
আমরা জানি, একটি জাতির আশা-আকাংখা, স্বপ্ন, দর্শন, চিন্তা-ভাবনা এবং পরিচিতির একটি তাত্ত্বিক ভিত্তি থাকে। ইহুদি জাতির তত্ত্বগত দিকের সঙ্গে জার্মান জাতিসত্তার তত্ত্বগত দিক একেবারেই মিলবে না। বরং একটি আরেকটিকে মারতে চায়। যেমন হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে। বাংলাদেশের জাতিতত্ত্বের প্রসঙ্গে বলা যায়, দক্ষিণ এশিয় অঞ্চলের পাক-ভারত-বাংলাদেশ ভিত্তিক উপমহাদেশের জাতিগত পরিচয় ও তাত্ত্বিক দিক বিকাশ লাভ করে ঔপনিবেশিক আমলে; ইউরোপীয় জ্ঞানকান্ডের সংস্পর্শে এসে। তখন জাতিগতভাবে সবাই ছিলেন ব্রিটিশ-ভারতীয় বা ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ান। বিংশ শতকের শুরুতে বঙ্গভঙ্গ, বঙ্গভঙ্গ রদ (১৯০৫-১৯১১) ইত্যাদি ঘটনা প্রবাহে হিন্দু ধর্মভিত্তিক স্বাদেশিকতা তীব্র ও সশস্ত্র রূপ লাভ করে। প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্টি হয় মুসলিম পরিচিতি। ১৯৪৭ সালে সে কারণেই দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে উপমহাদেশ ভারত ও পাকিস্তানে বিভক্ত হয়। পাকিস্তানে পূর্ব বাংলার মানুষ বাঙালি পরিচিতির জন্য লড়াই করে এবং পশ্চিমাদের সঙ্গে আর্থিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক লড়াইয়ে লিপ্ত হন এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক বিজয় সূচিত হয়। এই বাঙালিত্ব কিন্তু একেবারেই বাংলাদেশের সীমানা ও রাজনৈতিক চৌহদ্দিভিত্তিক। ভারতের বাঙালিদের এই জাতীয়তার তত্ত্ব আলোড়িত তো দূরে থাকুক, স্পর্শও করতে পারেনি। তারা বরং হিন্দুত্ব-বাঙালিত্ব-ভারতীয়ত্ব ভিত্তিক একটি ত্রিভূজ রচনা করতে সক্ষম হয়েছেন এবং এটা করেছেন কলকাতাকেন্দ্রিক চিন্তা-দর্শন-জাতীয়তার ভিত্তিতে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখা যায়, বাঙালিত্ব রাজনৈতিক জাতীয়তায় বাংলাদেশীতে পর্যবসিত হয়েছে। আর এখন সে পরিচিতির মধ্যে প্রো-আওয়ামী বনাম এন্টি আওয়ামী; কিংবা প্রো-সেক্যুলার বনাম এন্টি-সেকুল্যার ইত্যাদি বিভাজন হয়েছে। দুটি চিন্তা ও দর্শন কেন্দ্র তো স্পষ্ট- শাহবাগ আর শাপলা। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হলো মাঝখানের নিরপেক্ষদের নিয়ে। শাহবাগের বিপক্ষে বা সমালোচনা বা ভিন্নমত দিলে সে শাপলার হেফাজতি। কিন্তু হেফাজতের বিরুদ্ধে বললেই শাহবাগী ব্লগার, নাস্তিক। এই চরম মেরুকরণ ও বিপরীতমুখীর মধ্যে জীবিত ড. পিয়াস করিম পড়েছিলেন। তিনি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সেসব আন্দোলনের ভালো-মন্দ দিক তুলে ধরেছিলেন। তাঁর ব্যক্তিগত মতের স্বাধীনতা গুরুত্ব ও সম্মান পায়নি। তাঁর কোনো বক্তব্য সম্পর্কে শাহবাগের কোনো ভিন্নমত ও ব্যাখ্যাও দেয়া হয়নি। তাঁকে ঠেলে বিপক্ষে পাঠিয়ে দেয়া হলো। যদিও তিনি শাপলার হেফাজতিদেরও অনেক সমালোচনা করেছেন। কিংবা বিশেষ কয়েকটি পক্ষ মৃত্যুর পরেও তাঁর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালো। অনেক সাংবাদিক-সম্পাদক, যারা টকশোতে মত দেন, ভিন্নমত দেন, তাদেরকেও এক কাতারভুক্ত করা হয়েছে। যারা উপস্থাপক হিসেবে আলোচকদের মতো শোনা ছাড়া নিজের কোনো মতামত দেন না, তাদেরকেও প্রতিপক্ষ বানানো হয়েছে, যার মধ্যে এমন একজন আছেন, যিনি স্বয়ং মুক্তিযোদ্ধা, ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা, বৃহত্তর সিলেটের একটি বিখ্যাত কলেজ সংসদের নির্বাচিত নেতা (ছাত্রলীগের প্রার্থীরূপে), বাম প্রগতিশীল পত্রিকা ‘সংবাদ’ ও স্বাধীনতা তথা আওয়ামী লীগ বা বাঙালি জাতীয়তাবাদের মুখপত্র ‘ইত্তেফাক’-এর সাবেক সাংবাদিক, বাক স্বাধীনতার জন্য স্বৈরশাসনামলে আক্রান্ত, নিগৃহীত ও কারা নির্যাতিত এবং এখন জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাত একজন নিরপেক্ষ সম্পাদক। ফলে মেরুকরণ কেবল আদর্শের নামেই হচ্ছে না; অজ্ঞতা ও উগ্রতার ভিত্তিতেও হচ্ছে। একেবারেই হিংসার বশবর্তী বা শত্রুতার কারণেও করা হচ্ছে। মহল বিশেষের এসব উৎকেন্দ্রিকতা বাংলাদেশের জাতিতত্ত্ব ও জাতিসত্তাকে কোন বিপদে ফেলে দেয়, কে জানে? মনে হয়, গোপনে কারা যেন আমাদের চারপাশে হিংসা আর ধ্বংসের বীজ বপন করছে। নইলে এমন লোকদেরও আক্রমণ করা হচ্ছে কেন, যারা বাক-ব্যক্তি-গণতন্ত্র ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পরীক্ষিত বন্ধু? আবুল আসাদের মতো এমন বর্ষীয়ান-সম্পাদককেও গ্রেফতার করা হয় কেন, যিনি একজন লেখক ও সম্মানীত ব্যক্তি। সম্পাদক মাহমুদুর রহমান জেলের বাইরে আসতে পারছেন না কেন? কেন এখনো অনেক পত্রিকা বন্ধ। এমন পরিস্থিতিতে বাক-স্বাধীনতার চর্চা করেছিলেন ড. পিয়াস করিম এবং আরো অনেকেই। কিন্তু তাঁদেরকেই আক্রমণ করা হয়েছে। এ বিষয়টি সহজভাবে নেয়া যায় না। এ আক্রমণ জাতির বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ। সবাইকে এর বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে হবে।

শনিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০১৪

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

কত নিচে নেমেছি আমরা!

জাতি হিসেবে, আধুনিক পৃথিবীর মানুষ হিসেবে, দু-চার ফোঁটা বিদ্যা ধারণকারী হিসেবে, লজ্জায়, আত্মগ্লানিতে, নিজেদের অধঃপতনে, বিবেকশূন্যতায় একেবারেই হতবাক হয়ে গেছি। ঘটনাটি একজন মৃত মানুষকে নিয়ে। তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. পিয়াস করিম। গত ১৩ অক্টোবর অত্যন্ত আকস্মিকভাবে অপরিণত বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল মাত্র ৫৬ বছর। 
ড. পিয়াস করিম ছাত্রাবস্থা থেকেই বাম রাজনীতির সাথে সংযুক্ত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ¯œাতক পড়াশোনা শেষে ১৯৮০ সালে তিনি চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে ক্যানসাস স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে নৃবিজ্ঞানে ¯œাতকোত্তর এবং পিএচইডি লাভ করেন। তারপর যুক্তরাষ্ট্রেই বেশ কিছুকাল শিক্ষকতা করেন ড. পিয়াস। ২০০৭ সালে বাংলাদেশে ফিরে এসে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা শুরু করেন পিয়াস করিম। মৃদুভাষী, সদালাপী, সদাচারী, বন্ধুবৎসল পিয়াস করিম এরপর টিভির টকশোগুলোতে আসতে শুরু করেন। চৌকস যুক্তি, সাবলীল উপস্থাপনা ভঙ্গিতে অল্প সময়ের মধ্যেই ড. পিয়াস করিম টিভির দর্শক-শ্রোতাদের একজন প্রিয় মুখে পরিণত হন। 
এ ক্ষেত্রে কখনোই ছাড় দিয়ে কথা বলেননি পিয়াস করিম। ভর করেননি আপসকামিতায়। খুব স্পষ্ট করে কোদালকে কোদাল বলেছেন। সব সরকারের অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী কার্যকলাপের সমালোচনা করেছেন। গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার পক্ষে কথা বলেছেন। ফলে এ দেশের গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষের কাছে পিয়াস করিম হয়ে উঠেছিলেন আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে সারা দেশে যেন শোকের ছায়া নেমে আসে। 
রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবী মহল থেকে বিবৃতি দিয়ে বলা হয়, তার মৃত্যুতে দেশের এই দুঃসময়ে এক গভীর শূন্যতার সৃষ্টি হলো। তার টেলিভিশন টকশোগুলো যারা দেখেছেন, তারা জেনেছেন তিনি ছিলেন আপসহীন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অকুতোভয়-উচ্চকণ্ঠ। নিজের মত প্রকাশে ছিলেন সব সময় অবিচল। ছিলেন নির্ভীক ও আত্মপ্রত্যয়ী। যেখানেই সুযোগ পেয়েছেন সেখানেই সত্য প্রকাশ করতে উপস্থিত থেকেছেন ড. পিয়াস করিম; কিন্তু এখন এই সমাজে সত্য প্রকাশ বড় বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। উচ্চারিত সত্যকে স্তব্ধ করে দেয়ার জন্য দেশের বর্তমান ফ্যাসিবাদী সরকার যেমন নানাবিধ গণতন্ত্রবিরোধী, মানুষের মৌলিক অধিকারবিরোধী, ব্যক্তিস্বাধীনতাবিরোধী আইনকানুন প্রণয়ন করেছে ও করছে; একইভাবে পেটোয়া বাহিনী দ্বারা হামলা চালিয়ে সত্যকণ্ঠ স্তব্ধ করে দেয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সরকারের এই পেটোয়া বাহিনী একাধিকবার পিয়াস করিমের কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেয়ার জন্য তার বাসভবনে বোমা হামলা চালিয়েছে। নানা ধরনের হুমকি দিয়েছে; কিন্তু পিয়াস করিম সব সময়ই ছিলেন অবিচল-অকুতোভয়। 
তার মৃত্যু সংবাদে শোক ও শ্রদ্ধা জানাতে সকাল থেকেই তার বাসভবনে হাজারো মানুষ ভিড় জমিয়েছেন। শুধু চেনা মুখ নয়, গিয়ে হাজির হয়েছিল তার অগণিত ভক্ত-শ্রোতারাও। পিয়াস করিমের পরিবার ও শুভানুধ্যায়ীরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, ১৫ অক্টোবর বেলা ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তার লাশ রাখা হবে শহীদ মিনারে। আমাদের হতবাক ও স্তম্ভিত হওয়ার শুরু সেখান থেকেই। আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগ, যারা ইতোমধ্যেই অস্ত্রবাজি, টেন্ডারবাজি, খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, ডাকাতি করে কুখ্যাতি অর্জন করেছে, তারাসহ কয়েকটি ছাত্রসংগঠন ঘোষণা করে বসল যে, পিয়াস করিমের লাশ কিছুতেই শহীদ মিনারে আনতে দেয়া হবে না। তাদের সাথে যোগ দিলো পচাগলা দু-একটি বাম ছাত্রসংগঠন। তারা শহীদ মিনারের চার পাশে ব্যানার লাগিয়ে দিলো, ‘পিয়াস করিমের ভার, বইবে না শহীদ মিনার’। 
সরকারের শীর্ষ মহলের ইঙ্গিত ছাড়া ছাত্রলীগ ও পচাগলা বাম ছাত্রসংগঠন নিজেরাই এমন ঘোষণা করেছে, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। সরকারের মন্ত্রী ও ফটর ফটর নেতারা এ নিয়ে কোনো কথা বলেননি বটে, তবে ‘শহীদ মিনার এলাকার শান্তি রক্ষার স্বার্থে’ সেখানে কয়েক শ’ পুলিশ মোতায়েন করে একেবারে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দেয়া হলো। তাতে সরকারের অবস্থান আর অস্পষ্ট থাকেনি। এর মধ্যে আমাদের আরো এক দফা বিস্মিত করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করলেন, তাদের অনুমতি ছাড়া পিয়াস করিমের লাশ শহীদ মিনারে আনতে দেয়া হবে না। পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদন হলে বিবেচনা করে দেখা হবে।
তখন বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল থেকে প্রতিবাদের ঝড় উঠল। কেননা কোনো বিবেচনায়ই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শহীদ মিনারের ইজারাদার নয়। প্রতিদিন শহীদ মিনারে কোনো না কোনো সংগঠন নানা ধরনের প্রতিবাদ-সমাবেশের আয়োজন করছে। শিক্ষকেরা সেখানে অনশন করেছেন। গার্মেন্টশ্রমিকেরা ব্যানার-ফেস্টুন সাজিয়ে সেখানে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন, এখনো অনেকে করছেন। অনুমতির প্রশ্ন আসেনি; কিন্তু দেশের প্রধান বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে এবং সরকারের নির্লজ্জ দালালিতে নিজেদের সমর্পণ করলেন। সেখানকার প্রশাসকেরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজের মুখে যেমন চুনকালি লেপে দিলেন, তেমন চুনকালিই দিলেন গোটা জাতির মুখে। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে এটা কিছুতেই প্রত্যাশিত ছিল না।
এই বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার কথা গণতান্ত্রিক চেতনা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতিভূ। কিন্তু এখানকার দলান্ধ শাসকেরা সেই মর্যাদার আসন থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান ভূলুণ্ঠিত করলেন। অর্থাৎ অযোগ্য দালাল প্রশাসকদের কারণে একটি ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয় আরেকবার তার মর্যাদা হারিয়ে ফেলল। যে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসকের চরিত্র এমন তা থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, এখানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের তারা কী শিক্ষা দিচ্ছেন। তারই প্রতিফলন ঘটেছে ছাত্রলীগ নামক সরকার দলীয় সংগঠনটির সদম্ভ ঘোষণার মধ্য দিয়ে। 
ছাত্র আমরাও ছিলাম। ’৬০-’৭০-’৮০ দশক জুড়ে সমস্ত ছাত্র আন্দোলনে আমি নিজেও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছি। এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই আমি ২২ বছর ছাত্র ছিলাম। আদু ভাই হিসেবে নয়; অনার্স, মাস্টার্স, এমফিল, পিএইচডি পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশনজটে আমাকে এই দীর্ঘ সময় ছাত্র থাকতে হয়েছিল। তখনো ছাত্রলীগ দেখেছি। তাদের ব্যালটবাক্স ছিনতাই দেখেছি। খুন-খারাবি, ছাত্রী অপহরণ, মারামারি দেখেছি; কিন্তু তার পাশাপাশি আরো যেসব ছাত্রসংগঠন ছিল তাদের গণতন্ত্রের জন্য, মানবাধিকারের জন্য, যুদ্ধ বন্ধের জন্য, শিক্ষার সুুযোগ সম্প্রসারণের জন্য লড়াই করতে দেখেছি। যথাসম্ভব এসব আন্দোলনে শরিক থেকেছি। মেধা-মনন বিকাশের পথ প্রশস্ত করার জন্য জ্ঞানচর্চামূলক সংগঠন গড়ে তুলেছি। কারো বক্তব্যের প্রতিবাদ করার জন্য সেমিনার-সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করেছি। বলিনি বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে তারা পা রাখতে পারবেন না। 
আজকে ড. পিয়াস করিমের লাশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে নিতে দেয়া হলো না ছাত্রলীগ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের দলান্ধ প্রশাসনের যোগসাজশে। শফিউল আলম প্রধান তো সত্য কথাই বলেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা শহীদ মিনার কারো বাবার সম্পত্তি নয়। এখানে যাওয়ার অধিকার সবারই আছে। ড. পিয়াস করিম এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু পুরনো ছাত্রই স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন; কিন্তু তাদের সবাইকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বা শহীদ মিনারে আনার কথা কেউ চিন্তাও করেন না; কিন্তু কেউ কেউ সর্বজনশ্রদ্ধেয় হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। তিনি বলে যান না; কিন্তু তার ঘনিষ্ঠজনেরা সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য লাশ শহীদ মিনারে নিয়ে আসে। 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তো গর্বিত হওয়া উচিত ছিল যে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক ছাত্রের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য তার লাশ শহীদ মিনারে আনা হচ্ছে; কিন্তু নীচতা ও সঙ্কীর্ণতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও তাদের প্রভু সরকারকে এমন হীন জায়গায় ঠেলে দিলো। ঘটনার এখানেই শেষ নয়, একটি ভুঁইফোড় সংগঠন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সামনে পুলিশ প্রহরায় শহীদ মিনার এলাকায় একটি ব্যানার টানিয়েছে। সে ব্যানারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. আমেনা মহসিন, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী, কবি ও প্রাবন্ধিক ফরহাদ মজহার, সিনিয়র সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ, মানবজমিন সম্পাদক ও জনপ্রিয় টিভি উপস্থাপক মতিউর রহমান চৌধুরী, নিউএজ সম্পাদক ও টকশো আলোচক নূরুল কবির, সাপ্তাহিক-এর সম্পাদক গোলাম মোর্তজা, আইনজীবী ড. তুহিন মালিককে শহীদ মিনার এলাকায় অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে সিপি গ্যাং নামের একটি সংগঠন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কি ‘আঙুল চুষছেন’, নাকি ‘নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছেন’? এদের সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র ও বর্তমান শিক্ষক। তার পরও এ রকম একটি ভুঁইফোড় সংগঠন কী ঔদ্ধত্যে এমন একটি ব্যানার টানানোর সাহস পেল। তবে কি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ রকম একটি ব্যানার টানানোয় মদদ দিলেন? এরাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক? লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে আসে। মনে হয় ছাত্রলীগকে মদদ দানের জন্য যেন এই প্রশাসনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ হিসেবে বসানো হয়েছে। মুক্তবুদ্ধি, জ্ঞানচর্চা, মানবিকতার বিকাশ, বিবেকের উদ্বোধন বা জাগরণ তাদের লক্ষ্য নয়। 
আর লক্ষ্য নয় বলেই সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মদদে এমন নির্লজ্জ গণতন্ত্রবিরোধী স্বৈরাচারমুখী কর্মকাণ্ড ছাত্রলীগ ও দু-একটি ভুঁইফোড় সংগঠন করতে পারল। ধিক এই সরকার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে। এরা মন ও মনন বিকাশের শত্রু। ইতিহাসে এরা ঘৃণার পাত্র হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবেন। 
ড. পিয়াস করিমকে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্যই তার লাশ শহীদ মিনারে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল; কিন্তু শ্রদ্ধা জানানো আর যুদ্ধ-সঙ্ঘাত এক জিনিস নয়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তার আত্মীয়স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীরা লাশ নিয়ে হানাহানির প্রচেষ্টা সৃষ্টি করতে চাননি; কিন্তু শুক্রবার সকালে যখন হিমঘর থেকে লাশ তার নিজ বাসায় নিয়ে আসা হলো, তখন তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে হাজার হাজার মানুষ সেখানে হাজির হয়েছিলেন। দোয়া করেছেন। ফুল দিয়েছেন। শোকে কাতর, পাথর হয়েছেন। এরপর যখন বায়তুল মোকাররমে বাদ জুমা তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হলো, তখনো হাজার হাজার মানুষ সেখানে তার রুহুর মাগফিরাতের জন্য সমবেত হয়েছিলেন। মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে দোয়া করেছেন, তার ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দিয়ে আল্লাহ যেন এই সত্যসন্ধিৎসু শিক্ষাবিদকে বেহেশত নসিব করেন।
সেখানেও সরকার চতুর্দিকে শত শত পুলিশ মোতায়েন করে এমন এক যুদ্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল যে, মনে হচ্ছিল ভেতরে বিরাট কী জানি হচ্ছে; কিন্তু কিছুই নয়। নামাজে জানাজা, দোয়া আর শ্রদ্ধা নিবেদন। আমিও মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে আরজ করি, তিনি যেন ড. পিয়াস করিমকে বেহেশত নসিব করেন। আল্লাহ সর্বশক্তিমান এবং ক্ষমাশীল। 
পিয়াস করিম চলে গেছেন। তিনি আর কখনো সত্য উচ্চারণ নিয়ে টিভিপর্দায় হাজির হবেন না। আর কোনো দিন তার কণ্ঠ থেকে ফ্যাসিবাদ, স্বৈরতন্ত্র ও নিবর্তকের বিরুদ্ধে সুদৃঢ় ধ্বনি উচ্চারিত হবে না। তিনি বহুকাল এ দেশের মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় সত্য প্রকাশের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবেন; কিন্তু যারা শহীদ মিনারে তার লাশ শ্রদ্ধা জানানোর পথে বাধা সৃষ্টি করলেন, তারা ঘৃণিত হিসেবেই সমাজে বিবেচিত হতে থাকবেন। তবে এই নষ্ট পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। সেই লড়াইয়ে ইনশাআল্লাহ আমরা জয়ী হবো। 
ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী
0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

পিয়াস করিমের পর বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা কিসের আলামত?


অবশেষে সংকীর্ণতা এবং নীচতার জয় হল। শালীনতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং শাশ্বত সত্যের পরাজয় হল। আপাদমস্তক ভদ্রলোক পিয়াস করিমের লাশকে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে দেয়া হল না। সরকার প্লাটুনের পর প্লাটুন পুলিশ দিয়ে শহীদ মিনার ঘেরাও করে রেখেছিল যাতে করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পিয়াস করিমের লাশ শহীদ মিনারে নিতে না পারে। এর আগে আওয়ামী লীগের লাঠিয়াল বাহিনী বিশেষ করে কয়েকটি ছাত্র সংগঠনের তথাকথিত নেতারা ঘোষণা দিয়েছিল যে পিয়াস করিমের লাশ কোন অবস্থাতেই আনতে দেয়া হবে না। আনার কোন প্রচেষ্টা হলে তারা সেটি রুখে দেবে। পিয়াস করিমের পরিবার বিনয়ী এবং ভদ্র। নাগরিক সমাজের যারা শহীদ মিনারে তাকে শ্রদ্ধা জানাতে চেয়েছিলেন তারাও সকলে ভদ্র এবং বিনয়ী। তারা কেউই আওয়ামী লীগ ও ছাত্র লীগের ঝটিকা বাহিনীর সাথে লাঠালাঠির পক্ষপাতী ছিলেন না। পিয়াস করিমের সহধর্মিনী ড. আমেনা মোহসীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের একজন অধ্যাপিকা। তিনি ভাইস চ্যান্সেলরের কাছে একটি দরখাস্ত করেন। সেই দরখাস্তে তিনি তার স্বামীকে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের অনুমতি দেয়ার জন্য ভিসি আরেফিন সিদ্দিকীকে অনুরোধ করেন। যেহেতু ছাত্রলীগ এটির বিরোধিতা করেছে তাই আরেফিন সিদ্দিকীর ঘাড়ে কয়টি মাথা আছে যে ছাত্রলীগের বিরোধিতা করে। সুতরাং আরেফিন সিদ্দিকী ড. আমেনা মোহসীনের দরখাস্ত নাকচ করেন। তখন বিএনপি এবং নাগরিক সমাজ ঘোষণা করে যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অনুমতি দিক আর নাই দিক, তারা লাশ শহীদ মিনারে নিয়ে যাবেন। ফলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং সরকারের ঠেঙ্গাড়ে বাহিনী রূপে বিপুল সংখ্যক পুলিশকে শহীদ মিনারের চারদিকে মোতায়েন করা হয়। এমন একটি পরিস্থিতিতে সরকারি দলের সাথে কোনরূপ সংঘর্ষে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে মরহুমের পরিবার এবং নাগরিক সমাজ। তখন তারা শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের স্থান হিসেবে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটকে নির্বাচন করেন। কিন্তু অগ্রপশ্চাদ বিবেচনা করে শেষ মুহূর্তে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের পরিকল্পনাও বাতিল করা হয়। স্থির হয় যে ধানমন্ডি ৭ নম্বর রোড়ে অবস্থিত তার বাসাতেই শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের ব্যবস্থা থাকবে।
উল্লেখ করা যেতে পারে যে মরহুমের লাশ স্কয়ার হাসপাতালের মরচুয়ারি বা হিমঘরে রক্ষিত ছিল। শুক্রবার সকাল ৯ টায় সেখান থেকে বের করে তার ধানমন্ডি বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। অতঃপর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে জোহরের নামাজের পর তার দ্বিতীয় জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। তারপর বনানী গোরস্থানে তাঁর লাশ দাফন করা হয়। এভাবেই একজন নিষ্পাপ নিষ্কলুষ নির্মোহ মানুষকে মৃত্যুর পরেও অপমান এবং গালিগালাজ সয়ে চির বিদায় নিতে হল। তাই তো প্রথমেই বলেছি যে অবশেষে সংকীর্ণতা এবং নীচতার জয় হল। শালীনতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং শাশ্বত সত্যের পরাজয় হল।
দুই
১৯৭১ সালে যখন মুক্তিযুদ্ধ হয় তখন পিয়াস করিমের বয়স ছিল মাত্র ১৩ বছর। ঐ বয়সে রাজাকার হওয়া যায় না। তার পিতা নাকি শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন। সেই কারণে যদি পিয়াস করিমের লাশ শহীদ মিনারে আসতে না পারে তাহলে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মীর পিতার কারণে তাদের লাশও শহীদ মিনারে আসতে পারবে না। ছাত্র লীগসহ ৭টি ছাত্র সংগঠন বলেছে যে, পিয়াস করিম নাকি একজন কুখ্যাত ব্যক্তি। তারা তাঁর একটি কুখ্যাতিও দেখাক তো। তেমনি যুদ্ধাপরাধের পক্ষে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে একটি বাক্যও তারা দেখাক। ট্রাইবুনালের স্বচ্ছতা নিয়ে তো দেশে বিদেশে অসংখ্য প্রশ্ন রয়েছে। সে প্রশ্ন তুললেই নাকি রাষ্ট্রদ্রোহী হয়ে যায়। তাহলে তো দেশে হাজার হাজার রাষ্ট্রদ্রোহী রয়েছে।
শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য ভিসি সাহেবের অনুমতি নিতে হবে এমন কথা তো বিগত ৬২ বছরে (১৯৫২-২০১৪) শুনিনি। ভিসি সাহেব এবং ছাত্র নেতারা বলুন তো, এ পর্যন্ত কত শত শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠান শহীদ মিনারে হয়েছে এবং তার মধ্যে কয়জন পারমিশন নিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। এ সম্পর্কে একটি শ্বেত পত্র প্রকাশ করা হোক।
আসল ঘটনা কি? আওয়ামী ঘরানার বিরুদ্ধে কথা বললেই এখন রাজাকার, পাকিস্তানপন্থী এবং রাষ্ট্রদ্রোহী হতে হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের উপ অধিনায়ক (অর্থাৎ জেনারেল ওসমানীর পরে সর্বোচ্চ ব্যক্তি) এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকারও আই এস আইয়ের এজেন্ট হয়ে গেলেন। ৯ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর জলিল এবং জেড ফোর্সের অধিনায়ক জেনারেল জিয়াউর রহমান তো অনেক আগেই রাজাকার এবং পাকিস্তানের দালাল হয়ে গেছেন।
তিন
যখন ধানমন্ডি থেকে বায়তুল মোকাররম পর্যন্ত প্রলম্বিত স্থানে পিয়াস করিমের লাশ দাফনের প্রক্রিয়া চলছিল তখন শহীদ মিনারে মঞ্চস্থ হচ্ছিল আরেক আজীব নাটক। এটি হল অবাঞ্ছিত করার নাটক। বাংলাদেশের ৯ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে কয়েক জন অপরিপক্ক যুবক অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে। পত্রিকান্তরের রিপোর্ট মোতাবেক গত শুক্রবার বরেণ্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, বুদ্ধিজীবী, সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের শিক্ষক, পত্রিকার সম্পাদক, কলামিস্ট ও আইনজীবীসহ নয় বিশিষ্ট জনকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে। তাদের নিয়ে অশ্লীল ভাষায় কটূক্তি করা হয়েছে।
শহীদ মিনারে এক সমাবেশে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ডসহ কয়েকটি সংগঠন এ ঘোষণা দেয়। সংগঠনগুলো বর্তমান সরকারের লেজুড় হিসেবে পরিচিত।
অবাঞ্ছিতদের তালিকায় রয়েছেন- কলামিস্ট ও টিভি টকশোর পরিচিত মুখ ড. মাহফুজ উল্লাহ, বিশিষ্ট কলামিস্ট কবি ফরহাদ মজহার, ইংরেজি দৈনিক ‘নিউএজ’ সম্পাদক নূরুল কবীর, দৈনিক ‘মানবজমিন’ পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল, প্রফেসর ড. আমেনা মহসিন, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী, ‘সাপ্তাহিক-২০০০’ পত্রিকার সম্পাদক গোলাম মর্তুজা ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. তুহিন মালিক।
চার
এদিকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন দেশের বুদ্ধিজীবী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, বিশ্লেষক, নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও আইনজীবীরা। অবাঞ্ছিত হওয়া প্রসঙ্গে ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বরেণ্য ব্যক্তির লাশ না রাখতে দেয়া নিয়ে কথা বললে যদি শহীদ মিনারে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয় তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই। দেশের মানুষ তাদের মূল্যায়ন করবে। তবে তার আগে দেখতে হবে, সংগঠনের লোকগুলো কারা, তাদের পরিচয় কি। তাদের মদদ দিচ্ছে কারা।
অবাঞ্ছিত হওয়া প্রসঙ্গে প্রাবন্ধিক, মানবাধিকার কর্মী ফরহাদ মজহার বলেন, দেশ বিরোধী শক্তি, বিদেশি শক্তির দালালদের এ ধরনের কান্ড দেখে আমি হাসছি। কেননা শহীদ মিনার ছিল এ দেশের সেক্যুলারদের প্লাটফর্ম বা প্রতীক। যারা অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে একাট্টা। কিন্তু যারা গণতন্ত্রের জন্য, জনগণের অধিকারের কথা বলে, সংগ্রাম করে, তাদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা করার মাধ্যমে তারা শহীদ মিনারকেই ফ্যাসিবাদের প্রতীক এবং দিল্লীর বেদিতে পরিণত করেছে। দেশের জনগণ এটা মেনে নেবে না।
এ বিষয়ে নিউএইজ সম্পাদক নূরুল কবির বলেন, এটা অত্যন্ত হাস্যকর। কেননা তারা যাদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে তারা প্রত্যেকেই সরকারের অগণতান্ত্রিকতা, অন্যায়-অত্যাচার, সরকারের অবৈধতা, বিরোধী দল ও বিরোধী মতের প্রতি অসহিষ্ণুতাসহ এ ধরনের বিষয়ে কথা বলেন। মুক্তিযুদ্ধ ও শহীদ মিনারকে ব্যবহার করে এ ধরনের সংগঠনগুলো অবৈধ সরকারকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে। কেউ অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে অবাঞ্ছিত ঘোষণাকারীরা তাদের বদনাম রটানোর চেষ্টা করে। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান যারা আছে তারা ভুল করছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি কোন নাগরিকের শ্রদ্ধা না থেকে পারে না। কেননা তাদের কারণেই দেশটা স্বাধীন হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা যদি আওয়ামী লীগের রাজনীতি বুঝতে পারতেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বুঝতে পারতেন, তাহলে লুটপাট ও অগণতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে যারা কথা বলছেন তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতেন না। তাদের বয়স কম। তারা যখন প্রকৃত অবস্থা বুঝবেন তখন তারা আজকের অবস্থানের জন্য পরিতাপ করবেন।
মানবজমিনের সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, এ বিষয়টি অহেতুক, আমার কোনো মতামত নেই।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. তুহিন মালিক বলেছেন, সংবিধানের মৌলিক অধিকারে দেশের যে কোনো স্থানে নাগরিকের প্রবেশ করার অধিকার রয়েছে। যদি আইনের মাধ্যমে ঐ স্থানে প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা না থাকে। কিন্তু কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে কোনো নাগরিক প্রবেশ অধিকার থাকবে, আর থাকবে না এটা কোনো আইন দ্বারা নিষিদ্ধ করা হয়নি। তাহলে জনগণের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী এ আচরণ যা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রশাসনের মদদে প্রকাশ্যভাবে ঘোষণা দিয়েছে। এটা শুধু ফৌজদারী শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয় বরং তা সংবিধানের মারাত্মকভাবে লঙ্ঘন অবমাননার শামিল যা ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীতে সংবিধানের ৭ (ক) অনুচ্ছেদে সংযোজিত করে বলা হয় যে, যে বা যারা সংবিধান লঙ্ঘন করে এবং এটাকে সহযোগিতা করবে উভয়েই মৃত্যুদ-তুল্য শাস্তি পাবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের উচিত সংবিধান অবমাননাকারীদের গ্রেফতার করা। 
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মরহুম ড. পিয়াস করিমের লাশ রাখার কথা ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে তার পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদনও করে। কিন্তু ওইদিন আরও দু’টি সংগঠনকে অনুমতি দেয়া হয়েছে এই ‘অজুহাতে’ পিয়াস পরিবারের অনুমতি প্রত্যাখ্যান করা হয়। আগেই অনুমতি দেওয়া হয় শ্লোগান ৭১ এবং মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড নামের সংগঠনকে।
২টি সংগঠন অনুমতি নিলেও গতকাল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থান করে ২০টি সংগঠন। তারা মানববন্ধন, সভা-সমাবেশ ও প্রতিবাদী গান, নাটিকা পরিবেশন করে। দেশের এসব বুদ্ধিজীবীকে প্রতিহতের ডাক দিয়ে শহীদ মিনারে ব্যানার টাঙ্গায় ‘সিপি গ্যাঙ’ নামে একটি সংগঠন। ব্যানারে লেখা ছিল- মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে সুশীল নামধারী বুদ্ধিবেশ্যাদের প্রতিহত করুন। ওই ৯ জনের ছবিতে লাল রঙের ক্রস চিহ্ন দেয়া ছিল।
এরপর দুপুরে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ডের উদ্যোগে আয়োজন করা হয় প্রতিবাদ সমাবেশ। সমাবেশ থেকে ওইসব বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ডের সভাপতি মেহেদী হাসান তাদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, দেশদ্রোহী পিয়াস করিমের লাশ শহীদ মিনারে আনার কথা বলায় এসব জ্ঞানপাপীদের শহীদ মিনারে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হলো।
তিনি বলেন, যুদ্ধের সময় রাজাকাররা প্রকাশ্যে আমাদের বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু এসব জ্ঞানপাপীরা দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিভিন্ন টেলিভিশন ও তাদের লেখনিতে দেশের বিরোধিতা করে আসছে।
সমাবেশে আরও উপস্থিত ছিলেন গণজাগরণ মঞ্চের একাংশের আহ্বায়ক কামাল পাশা চৌধুরী, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি জয়দেব নন্দী, জাসদ ছাত্রলীগের সভাপতি সামছুল ইসলাম সুমন, সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান আলী সাজু, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রীর সাধারণ সম্পাদক তানভীর রুশমত, বাংলাদেশ ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি মঞ্জুরুল ইসলাম মিঠু, ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ, স্লোগান ৭১, প্রাণের ৭১, সিপি গ্যাং ও চারুশিল্পীরা।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ ও লালনকারী সকল সংগঠনসমূহকে নিয়ে ভবিষ্যতে এ ধরনের উদ্ভট অবস্থা মোকাবিলা করার জন্য করণীয় শীর্ষক মতবিনিময় সভাসহ ঢাকা ও অন্যান্য বিভাগীয় শহর, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সভা ও সমাবেশ করার ঘোষণা দেয়া হয়। এদিকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ-প্রচারিত হলে নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে বিবৃতি দেয় বিভিন্ন সংগঠন।
পাঁচ
শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে গত শুক্রবার দুপুরে এক সমাবেশ থেকে এ ঘোষণা দেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড নামের একটি সংগঠনের সভাপতি মেহেদী হাসান। তিনি বলেন, এঁদেরকে ‘দেশের সব শহীদ মিনারে’ অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হলো।
মেহেদী হাসান  বলেন, ‘আমরা শুধু এই ৯ জনকেই অবাঞ্ছিত ঘোষণা করিনি, তাদের সঙ্গে “গং” শব্দটিও জুড়ে দেয়া হয়েছে। যারা মুক্তিযুদ্ধ ও শহীদ মিনারের চেতনা লালন ও ধারণ করে না, সেই সব গণ শত্রুদের শহীদ মিনারে আসার কোনো অধিকার নেই।’
এ ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘কী আর বলব। ফ্রি স্টাইলে চলছে সবকিছু। একটা অসুস্থ সমাজে বাস করছি আমরা। কথা নেই বার্তা নেই, তারা কীভাবে হঠাৎ অবাঞ্ছিত ঘোষণা করল? দেশে গণতন্ত্রের চর্চা না থাকায় আজ এ অবস্থা।’ তিনি বলেন, ‘যাঁদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হলো, তাঁদের ব্যাকগ্রাউন্ড দেখেন। আমি একাত্তর সালের ২৬ মার্চ সকালে রাস্তায় ব্যারিকেড দেওয়া অবস্থায় গ্রেপ্তার হয়েছি। চার দিন পর মুক্তি পাই। আমার সঙ্গে যারা গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তাদের চারজনকে পাকিস্তানি সেনারা গুলি করে মেরে ফেলেছিল।’ অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, সরকারের বিপক্ষে যাঁরা যৌক্তিক ও বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা করেন, তাঁদের হেয় করার জন্য সরকারের মদদপুষ্ট ২০-২৫ জন মানুষ এ কর্মসূচি পালন করেছে। এ ধরনের কর্মসূচি পালন করার মধ্য দিয়ে সরকারের ফ্যাসিবাদী চেহারার আরেকটা রূপ ফুটে উঠেছে। তাঁর মতে, যাঁরা এই কর্মসূচি পালন করেছেন, তাঁরা যদি সত্যিকার অর্থে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী হয়, তাঁদের উচিত সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া। কারণ এই সরকারই গণতন্ত্র ধ্বংস ও দুর্নীতির মহোৎসব করে।
 শেষ করার আগে একটি নিবেদন। সরকারের উদ্দেশ্যে বলছি, দয়া করে শহীদ মিনারকে দলীয়করণ করবেন না। রাজনৈতিক লাইনে অনেক কিছুরই বিভাজন হয়েছে। রাজনৈতিক লাইনে অনেক শ্রদ্ধাভাজন প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তি দ্বিখন্ডিত হয়েছেন। ১৬ কোটি মানুষের প্রাণ প্রিয় শহীদ মিনারের ওপর মেহেরবানী করে বিভাজনের খড়গ চালাবেন না। ব্যক্তির চেয়ে দল বড়। দলের চেয়ে দেশ বড়।
আসিফ আরসালান

বৃহস্পতিবার, ১৬ অক্টোবর, ২০১৪

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

‘চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায়’


প্রথম শহীদ মিনারটি উদ্বোধন করেছিলেন সুসাহিত্যিক-সাংবাদিক আবুল কালাম শামসু উদ্দিন। ভাষা আন্দোলনের সূচনা এবং নেতৃত্বে ছিল তমদ্দুন মজলিস। ইংরেজ আমলে যিনি লিখিত প্রস্তাব রেখেছিলেন বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে তার নাম সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী। সময় তখন ১৯২১ সাল। যে পত্রিকাটি ভাষা আন্দোলনকে বেগবান করেছিল সে পত্রিকাটির নাম ‘সৈনিক’। সম্পাদক ছিলেন আবদুল গফুর এবং শাহেদ আলী। তমদ্দুন মজলিসের মুখপাত্র ছিল এটি। রাষ্ট্র-ভাষার প্রশ্নে প্রথম পুস্তিকাও প্রকাশিত করে এরা। যার শিরোনাম ছিল ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু?’ লেখক ছিলেন অধ্যাপক কাজী মোতাহের হোসেন এবং আবুল মনসুর আহমদ। প্রকাশক, প্রচার বিভাগ তমদ্দুন মজলিস ১ম সংস্করণ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭ ইং। উল্লেখিত ব্যক্তি এবং সংগঠন কোনটিই তথাকথিত প্রগতিপন্থিদের সাথে যুক্ত ছিল না। ভাষা আন্দোলনের নিরপেক্ষ ইতিহাস এমন সত্যটি উন্মোচিত করে। তাছাড়া ভাষা-শহীদদের মূল নায়কদের কেউ বাম রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন এ রকম তথ্যও কোথাও পাওয়া যায় না। এরপরও কবুল করতেই হয় ভাষা-শহীদদের স্মরণে নির্মিত শহীদ মিনার সমগ্র দেশবাসীর আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক। কোনো গোষ্ঠী বা শ্রেণির ইজারাদারিত্বে বা দখলী স্বত্বে এই প্রাঙ্গণকে আটকে রাখা মোটেও শোভন বা বিবেচনাপ্রসূত নয়। এরপরও কেউ কেউ অবিবেচনায় জড়িয়ে যাচ্ছে। অন্যায়-অসভ্যতাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। শহীদ মিনারে কারা যাবে কারা যাবে না সেই খবরদারী তারা করতে চাচ্ছে জবরদস্তি। এমন ‘পাওয়ার অব এটর্নি’ ওরা কোত্থেকে পেল? শহীদ মিনারতো কারো একক সম্পত্তি নয়। সমগ্র দেশবাসীর, জনগণের।
জটিলতাটি উঠে এসেছে সম্প্রতি। বিষয়টি জটিল নয় তারপরও ঘোলাটে করার পাঁয়তারা করছে অতিক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠী। শিক্ষাবিদ সমাজ বিজ্ঞানী পিয়াস করিম ইন্তেকাল করেছেন গত ১৩ অক্টোবর। যার সত্য এবং সাহসী বক্তব্য বিবেকবান মানুষজনদের মুগ্ধ করতো। তার লাশ শহীদ মিনারে রাখা হবে। তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাবে জনগণ। এমন একটি সিদ্ধান্ত ঘোষণা তার ভক্তগণ এবং পরিবারের। এই ইচ্ছা এবং আয়োজন হতেই পারে। হচ্ছেও হামেসা। প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে ব্যবহৃত হচ্ছে শহীদ মিনার। গান-বাজনা, পূজা-অর্চনায়ও যে প্রাঙ্গণ মুখরিত হয় সেখানে পিয়াস করিম নিষিদ্ধ হবে কেন ? তাও জীবিত নয় তার লাশ।
সবার মত এক হবে এমনতো কোন দিব্যি নেই। আমি যা ভাবব অন্যকেও তাই ভাবতে বাধ্য করাতে হবে এমন ইচ্ছা যারা পোষণ করে, হয় এরা মস্তিষ্ক বিকৃত নয়তো সভ্যতার আলো এখনো এদের অন্তরে প্রবেশ করেনি। গণতান্ত্রিক সমাজের রীতিনীতিও এমনটি নয়। এরকম ধারণা স্বৈর-মনোভঙ্গিকে উচ্চকিত করে। অসভ্যতাকেই বিস্তৃত করে। যারা ঘোষণা দিচ্ছে পিয়াস করিমের লাশ শহীদ মিনারে রাখা যাবে না তারা নিজেদের পরিচয়কে পুনরায় খোলাসা করল নতুনভাবে, নতুন মাত্রায়। দুএকটি বিবৃতিও প্রকাশ পেয়েছে  পত্রিকায় ছাত্র-জনতার নামে। এরা ছাত্রসমাজ বা জনতার কত শতাংশ তা অবশ্য খোলাসা করা হয়নি। উশৃঙ্খল-বিশৃঙ্খল পরিবেশকে যারা প্রণতি জানায় এদের সংখ্যা শুদ্রই হয়। তাছাড়া পশ্চাতে মুরুব্বি থাকলে তো কথাই নেই। তখন শহীদ মিনার কেন সমগ্র দেশ দখলে আনতে অসুবিধা থাকার কথা নয়। এমনটাই যেন ঘটতে যাচ্ছে বা ঘটানো হচ্ছে পিয়াস করিমের (লাশ) বেলায়। পিয়াস করিমের অপরাধ (?) ছিল তিনি মিথ্যার মুখোশ উন্মোচন করতে দ্বিধা করতেন না।  অন্যায় ও অপশাসনের বিপক্ষে অবস্থান নিতেন। বিদ্বেষ বিভ্রান্তিকে ঘৃণা করতেন। এই সু এবং সাহসী আচরণই পিয়াস করিমকে একটি শ্রেণীর কাছে শত্রু তালিকায় তুলে দিয়েছে। যে শ্রেণীটি গণতন্ত্রের আলখেল্লা জড়ালেও অভ্যন্তরে ভিন্ন মতকে ঘৃণা করে প্রচ-ভাবে, ভয়ও করেন। ভিন্ন মতের কারণেই হয়তো পিয়াস করিম ওদের শত্রু। ভয়ের বহিঃপ্রকাশও হতে পারে এ জাতীয় ওচাটন-উদ্যোগ। বিশ্ববিদ্যায় কর্তৃপক্ষও না রাজি জানিয়েছেন পিয়াস করিমের স্ত্রীর আবেদনের প্রেক্ষিতে। যদিও পিয়াস করিমের স্ত্রীও শিক্ষিকা। তাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। পত্রিকায় এসেছে এমন খবর। অর্থাৎ পিয়াস করিমের লাশ শহীদ মিনারে আনা যাবে না, রাখা যাবে না। ওদের মতে এতে করে নাকি শহীদ মিনার অপবিত্র হয়ে পড়বে। ঘৃণা কতটা প্রবল হলে ধারণাকে প্রভাবিত করে এমন কুৎসিতভাবে।
এরি মধ্যে পুলিশ ডেকেছে কর্তৃপক্ষ। বিবৃতি দানকারীরা তো ইতোমধ্যে শহীদ মিনারের আশপাশে অবস্থান নিয়েছে, মৃত পিয়াস করিমকে প্রতিহত করবে এ উদ্দেশে। কারণ জীবিত পিয়াস করিম ছিল অপ্রতিরোধ্য। তাই এই অভিনব ব্যবস্থা। পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে এসব খবর, কয়েকদিন থেকেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শহীদ মিনারের জিম্মাদার। তাদেরকে বৈরী করে কোন কিছু করাও সঠিক নয়। আপাত নজরে তাই মনে হয়। কিন্তু অতীত ইতিহাস টানলে তো ভিন্নচিত্র হাজির হবে। এই মিনারে তো কতদৃশ্যই মঞ্চস্থ হচ্ছে প্রায়শই। কতটি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের জ্ঞ্যাতে আর কটা অজ্ঞ্যাতে হয়েছে এর হিসাব কি তাদের কাছে আছে। অন্যগুলো যদি নির্বিঘেœ সমাধা হতে পারে পিয়াস করিমের বেলায় এতটা রুদ্রমূর্তি কেন? এখানে তো এমন কিছুই ঘটার কথা নয় যাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে। পিয়াস করিমের লাশ রাখা হবে, সর্বস্তরের মানুষ শ্রদ্ধা জানাবে, ক’দিন আগেও ভাষা মতিনের লাশের বেলায় যা হয়েছে। অন্যান্যের বেলায়ও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। বিপত্তি কেবল পিয়াস করিমের বেলায়। আসলে পিয়াস এখানে মুখ্য নয়, মুখ্য তার চিন্তা-চেতনা। মতামত ভিন্ন হলেই কি তাকে অচ্ছুৎ গণ্য করতে হবে? বিশ্ববিদ্যালয় দেশের একটি সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান। এখান থেকে এ জাতীয় নিচু মনোভঙ্গি দেশের বিবেকবান মানুষ প্রত্যাশা করে না। যে প্রাঙ্গণে শিক্ষার আলো এবং ভব্যতার বিচ্ছুরণ হবার কথা সে প্রাঙ্গণ থেকে সেই অপ্রত্যাশিত সংবাদটি ঘোষিত হল। যে ঘোষণাতে বিবেক-বিবেচনার লেশমাত্র অবশিষ্ট নেই। এটি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অবজ্ঞা-অবহেলারই নামান্তর। পিয়াস করিম কি এতটাই অবহেলার পাত্র ছিলেন?
পিয়াস করিমের লাশ শহীদ মিনারে আনলে বা রাখলে তার ইজ্জত শতগুণ বৃদ্ধি পাবে আর না আনলে বা না রাখা হলে চন্দ্রসূর্য অশুদ্ধ হয়ে যাবে এমন তো নয়। বরং যারা বা যেসব প্রতিষ্ঠান প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে এ বিষয়ে, তারাই ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবে যে কোন বিবেচনায়। পিয়াস করিমের মতের সাথে শাসকশ্রেণীর লেজুড়বৃত্তি করে সেই বুদ্ধিজীবী-বুদ্ধিব্যবসায়ীদের বেমিল ছিল। থাকতেই পারে। সবার মত এক তালিকায় উঠে আসবে এমন তো নয়। জগতের কোন রীতিতেই একে সারিবদ্ধ করা যায় না। এরপরও কতিপয় স্বার্থ-শিকারী মানুষ ভিন্ন মত শুনলেই রুষ্ট হন, ত্যাক্ত হন। এ ত্যাক্ততা এখন বাংলাদেশের কিছু মানুষের মনোজগতে। এরা শাসকশ্রেণীর আশ্রয়পুষ্ট হওয়ায় দুর্দমনীয়, আচারে ব্যবহারে। পিয়াস করিমকে নিয়ে ক’দিন যাবত যা ঘটছে সেসব ব্যাপারে ওরা একেবারেই শীতল। ওদের এই শীতলতা বিবেকবান মানুষকে বিস্মিত করে। তাদের বেলায়ও যে আগামীতে এমন ঘটতে পারে না বা ঘটবে না তা কি করে চিন্তার বাইরে রাখা যায়? কবি নজরুল বোধ হয় এমন বিচিত্র চরিত্রের মানুষদের উদ্দেশ্য করে লিখেছিলেন ‘চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায়/আজিকে যে রাজাধিরাজ কাল সে ভিক্ষা চায়।’
সাজজাদ হোসাইন খান

বুধবার, ১৫ অক্টোবর, ২০১৪

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

ধর্মনিরপেক্ষতার মুখোশ


বিএনপির চেয়ারপারসন ও ২০ দলীয় জোটের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, ধর্মনিরপেক্ষতা আওয়ামী লীগের মুখোশ। এই মুখোশ পরে আওয়ামী লীগ সরকার দেশের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে প্রতারণা করছে। ধর্মনিরপেক্ষতায় নয়, তাদের বিশ্বাস আসলে ধর্মহীনতায়। এ জন্যই তারা সব ধর্মকে অবমাননা করে। সব ধর্মের মানুষের ওপর আঘাত করে। নিজেদের অপকর্ম ও অপরাধের দোষ অন্যের ওপর চাপিয়ে দিয়ে পার পেতে চায় আওয়ামী লীগ। গত মঙ্গলবার শুভ বিজয়া উপলক্ষে হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে এক শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে এসব অভিযোগের সমর্থনে একের পর এক উদাহরণ দিয়ে এবং বিভিন্ন ঘটনার উল্লেখ করে বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, মুখে হিন্দুপ্রীতির কথা বললেও আওয়ামী লীগের আমলেই হিন্দুরা বেশি হত্যা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এখনো হচ্ছে। সরকার এমনকি র‌্যাব ও পুলিশকে দিয়েও বিশিষ্ট হিন্দু ব্যক্তিদের হত্যা করিয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগের গুন্ডা-সন্ত্রাসীরা হিন্দুদের মন্দিরে হামলা ও লুটপাট চালাচ্ছে। তাদের হাত থেকে খ্রিস্টানদের গীর্জাও রেহাই পাচ্ছে না। হিন্দুদের জায়গা-জমি এবং দোকানসহ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও আওয়ামী লীগের গুন্ডা-সন্ত্রাসীরাই দখল করে নিচ্ছে। তাদের নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে প্রাণ বাঁচানোর জন্য অনেক হিন্দু দেশত্যাগ করতে এবং ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। সে ধারা এখনো চলছে। শেখ হাসিনার অতি বিশ্বস্ত মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীর ইসলাম ও মুসলিম বিরোধী চরম উস্কানিমূলক সাম্প্রতিক বক্তব্যের উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেছেন, এ সরকারের অধীনে কোনো ধর্ম ও বর্ণের মানুষই নিরাপদ নয়। সে জন্যই সরকারকে হটিয়ে আওয়ামী লীগের কবল থেকে দেশ ও জনগণকে রক্ষা করার আন্দোলনে অংশ নেয়ার জন্য হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন ২০ দলীয় জোটের নেত্রী।
আমরা মনে করি, বেগম খালেদা জিয়ার কথাগুলো খুবই সরাসরি এবং সুস্পষ্ট। পেছনের ঘটনাবলী ও ইতিহাস সম্ভবতঃ তার কথার পক্ষেই  সাক্ষ্য দিচ্ছে স্বাধীনতার পর থেকে অসংখ্য ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে, ধর্মনিরপেক্ষতার পরিচয়দানকারীরাই আড়াল নিয়ে আওয়ামী লীগই হিন্দুদের ওপর নানামুখী নির্যাতন অনেক বেশি চালিয়েছে। ‘সংখ্যালঘু’ হিসেবে চিহ্নিত করে হিন্দুদের সম্পত্তি ও ব্যবসা-বাণিজ্যও আওয়ামী লীগাররাই বেশি দখল করেছে। এসব বিষয়ে দলটির জেলা পর্যায়ের শুধু নয়, কেন্দ্রীয় অনেক নেতার নামও সংবাদপত্রের রিপোর্টে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু কারো বিচার বা শাস্তি হয়নি। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন বরং পরবর্তীকালে পুরস্কার হিসেবে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর পদ পেয়েছেন। অনেকে এমপি হয়েছেন। অন্যদিকে আওয়ামী নির্যাতনের শিকার হয়ে ভারতের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে যে হিন্দুরা গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন বাংলাদেশ এবং মুসলিম বিরোধী কৌশলের ভিত্তিতে তাদেরকে উল্টো আওয়ামী লীগের সমর্থক বানানো হয়েছে। বামফ্রন্ট তথা কমিউনিস্ট পার্টির বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের মতো মুখ্যমন্ত্রীকে দিয়ে এই প্রচারণা পর্যন্ত চালানো হয়েছিল যে, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে গঠিত চারদলীয় জোট সরকারের দমন-নির্যাতনের কারণেই নাকি লাখ লাখ হিন্দু দেশত্যাগ করতে এবং ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে! সে প্রচারণা হালে পানি পায়নি সত্য কিন্তু সাধারণভাবে ভারতীয় হিন্দুদের মধ্যে এখনো এমন ধারণাই রয়েছে যে, বাংলাদেশে একমাত্র আওয়ামী লীগই অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ দল এবং এ দলটি ক্ষমতায় থাকলেই সংখ্যালঘু তথা হিন্দুরা নিরাপদে বসবাস করতে পারে! এ ধরনের ধারণা ও বিশ্বাস যে মোটেই সত্য নয় বরং আওয়ামী লীগের আমলেই যে হিন্দুরা বেশি নির্যাতিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে- সে কথাটাই স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন বেগম খালেদা জিয়া। উদাহরণও তিনি যথার্থই দিয়েছেন। যেমন পুরনো ঢাকার মেহনতী যুবক বিশ্বজিৎ থেকে নারায়ণগঞ্জের অ্যাডভোকেট চন্দন সরকার পর্যন্ত বেশ কয়েকটি হত্যাকান্ডের উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, তাদের কেউই হিন্দু এবং আওয়ামী লীগ সমর্থক হিসেবে পরিচয় দিয়েও প্রাণে বাঁচতে পারেননি। প্রত্যেককে বরং নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। অ্যাডভোকেট চন্দন সরকারকে তো বিশেষ একটি বাহিনীকে দিয়ে সুচিন্তিতভাবেই হত্যা করিয়েছেন ক্ষমতাসীনরা। তার লাশও পাওয়া গেছে নদীর পানিতে।
বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন- বলে শুধু নয়, ইতিহাস এবং বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমরাও মনে করি, মুখে বললেও এবং নানা কৌশলে প্রচারণা চালালেও আওয়ামী লীগ কোনো দিক থেকেই ধর্মনিরপেক্ষ বা অসাম্প্রদায়িক দল নয়। দলটির নেতা-কর্মীরা ধর্মনিরপেক্ষতার মুখোশ পরে থাকেন মাত্র- যে মুখোশ খসে পড়ে যখন-তখন। শেখ হাসিনার বর্তমান মন্ত্রিসভায় এবং সংসদেও মুখোশ পরা অনেককেই পাওয়া যাবে। একই কারণে খালেদা জিয়ার আহ্বানে সাড়া দিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলা এবং সরকারকে বিদায় নিতে বাধ্য করা দরকার, যাতে ধর্ম নির্বিশেষে বাংলাদেশের সব মানুষই সুখে ও নিশ্চিন্তে বসবাস করতে পারেন। যাতে কোনো ধর্মের মানুষকেই ধর্মের কারণে নির্যাতিত, অসম্মানিত ও ক্ষতিগ্রস্ত না হতে হয়।

মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর, ২০১৪

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

কানাডায় হিজাবের নবসমাদর

কানাডার একমাত্র ফরাসিভাষী প্রদেশ কুইবেকের সরকার যখন মুসলিম মহিলাদের কর্মেেত্র মাথায় হিজাব পরা নিষিদ্ধ করেছে, তখন পাশের প্রদেশ অন্টারিওতে কানাডার বৃহত্তম নগরী টরন্টোতে হিজাবকে নারীদের পোশাকের সৌন্দর্যবর্ধক বলে নতুনভাবে মূল্যায়ন ও সমাদর লাভ করছে।
মুসলিম নারীদের হিজাব পরা অমুসলিম শ্বেতাঙ্গদের এমন দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে যে, কানাডার বৃহত্তম সংবাদপত্র ‘টরন্টো স্টার’ হিজাবপরা মুসলিম যুবমহিলার পূর্ণপৃষ্ঠা ছবি এবং সেই সাথে আরো একাধিক চিত্রসংবলিত করে চার কলাম বিস্তৃৃত শিরোনাম ‘মাই হিজাব ইজ মাই স্টেটমেন্ট’ (আমার হিজাব আমার বক্তব্য) দিয়ে মুসলিম যুবমহিলার বক্তব্যভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
আমি জানি না, জনসংখ্যার  ৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশ বাংলাদেশের কোনো প্রধান সংবাদপত্রে হিজাবের সমাদরে এমন জোরালো বক্তব্যসংবলিত একাধিক চিত্র দিয়ে এমন প্রায় পূর্ণপৃষ্ঠার প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে কি না। ‘টরন্টো স্টার’ প্রতিবেদনের উপশিরোনামে লিখেছে, ‘দিনা জায়েদ হ্যাজ ফাউন্ড ক্রিয়েটিভ ওয়েজ টু অনার হার রিলিজিয়াস বিলিফ্স’ (দিনা জায়েদ তার ধর্মবিশ্বাসকে সম্মান করার সৃষ্টিধর্মী প্রক্রিয়া দেখতে পেয়েছেন)।
‘
টরন্টো স্টার’ প্রায় পূর্ণপৃষ্ঠাব্যাপী প্রতিবেদনে দিনা জায়েদের হিজাব পরা দাঁড়ানো ও বসা বিভিন্ন পোজে চিত্রের পাশাপাশি প্রকাশ করেছে তার দীর্ঘ বিবৃতি। আরেক উপশিরোনামে পত্রিকাটি লিখেছে, ‘মুসলিম মহিলা তার ধর্মের প্রতি সম্মান দেখিয়ে সৃষ্টিধর্মী পোশাক সম্পর্কে সাহসী বক্তব্য রেখেছেন’ (মুসলিম উইম্যান মেইক্স বোল্ড, ক্রিয়েটিভ ফ্যাশন স্টেটমেন্টস হোয়াইল অনারিং হার রিলিজিয়ন)।
দিনা জায়েদ তার বক্তব্যে বলেছেন, ‘প্রায়শ মানুষ মনে করে যে নির্যাতনের ভয়ে বাধ্য হয়ে মুসলিম মেয়েরা হিজাব পরেন এবং হিজাব পরলে নারীকে অসুন্দর দেখায়; কিন্তু এটা সত্য নয়। হিজাব পরা একটি ধর্মীয় আচার যেটা পালন করা বা না করা নারীর ওপর বর্তায়, যেমন খ্রিষ্টানদের গির্জায় যাওয়া তাদের একটি ধর্মীয় বিধি। মুসলিম দেশগুলোতে যেহেতু বেশির ভাগ অধিবাসীই মুসলিম এবং ধর্ম পালনে আগ্রহী, সেহেতু হিজাব পরা কালক্রমে সংস্কুতির একটি অঙ্গ হয়ে গেছে।’
দিনা জায়েদ আরো বলেছেন, ‘আমার বিশ্বাস আমি হিজাব পরাতে যে একটা সামঞ্জস্য এনেছি, তা-ই আমাকে আমি কে, সে পরিচয় দিয়েছে। আমি অপরিহার্যভাবে কালো রঙের হিজাব পরি না। আমি শরীরের নিচের অংশে যে রঙের পোশাক পরি তার সাথে সুন্দরভাবে মানায় এমন রঙের হিজাব পরি। দর্শকেরা আমার হিজাব পরাকে কেবল একটি ধর্মীয় আচার পালন রূপে না দেখে আমার হিজাব পরার মধ্যে আমার একটা নিজস্ব পরিচয় ফুটে ওঠে বলে উপলব্ধি করে।’
‘
আমার হিজাব পরার জন্য আমি বেশ প্রশংসা পাই। আমি বুঝেছি মানুষ ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের তাদের ধর্ম ও সংস্কৃতিকে উজ্জ্বল রঙের মাধ্যমে প্রকাশ করছে দেখলে খুশিই হয়। অমুসলিম ব্যক্তিদের কাছ থেকে আমি প্রায়শ ‘ওহ্, আপনার স্কার্ফটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে’, ‘আপনি মাথায় যেটা (হিজাব) দিয়েছেন তাতে আপনাকে বেশ জমকালো দেখাচ্ছে’, ‘আপনার সমগ্র পোশাকে রঙের যে সুন্দর সমন্বয় ঘটিয়েছেন তা আমার খুব ভালো লাগছে’ এসব ধরনের মন্তব্য শুনতে পাই। এসব প্রশংসাসূচক মন্তব্য আমাকে বোঝাচ্ছে যে, পরিধানের সাথে হিজাবের সামঞ্জস্য করে আমি যে প্রকারের পোশাক পরিকল্পনা করি এবং পরিধান করি, তা করতে আমি যে চিন্তা ও সময় বিনিয়োগ করি মানুষ তা উপলব্ধি করে।
দিনা আরো বলেছেন, ‘আমার পোশাকে অপরিহার্যরূপে হিজাব পরার মাধ্যমে আমি বলতে চাই, কেবল ধর্মীয় আচার পালনের বাধ্যবাধকতা পালনরূপে আমি হিজাব পরি না, হিজাব পরার মাধ্যমে আমি একটা বার্তা পৌঁছাতে চাই। তা হলো, আমি একজন মুসলিম নারী এবং হিজাব পরি বলে আমাকে অসুন্দর দেখায় না। হিজাব পরেই আমি একই সময়ে আমাকে শ্রীমণ্ডিত এবং বিনয়ী করে তুলতে পারি।’
টরন্টোতে বসবাসকারী গুজরাটি মুসলিম নারীরা শিশুকাল থেকে হিজাব পরেন এবং শরীর পুরাপুরি পোশাকাবৃত রাখেন। এই নারীশিশু ও বালিকারা হিজাব পরা এবং সারা শরীর আবৃত পোশাকেই রাস্তায় সাইকেল চালায়, স্কুলের মাঠে সব ধরনের খেলাধুলা, দৌড়ঝাঁপ করে নির্দ্বিধায়। টরন্টোর কোনো কোনো এলাকায় যেখানে গুজরাটি মুসলমানেরা বেশ সংখ্যায় বাস করে, সেখানে কোনো কোনো আগন্তুকের চোখে এলাকাটিকে গুজরাট অথবা পাকিস্তানের কোনো শহরের এলাকা বলে মনে হতে পারে।
কানাডার জাতীয় মহিলা বাস্কেট বলের টিমে যেসব মুসলিম মহিলা খেলোয়াড় আছেন, তাদের খেলার মধ্যেও মাথায় হিজাব রাখার অনুমোদন দেয়া হয়েছে বছর দুয়েক আগে। মঈনুল আলম

Ads