শনিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০১৪

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

আওয়ামী লীগের অপরাজনীতি : গুম এবং খুন


অনেক দিন আগে আমাকে একজন বিশিষ্ট রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক বলেছিলেন  যে, আওয়ামী লীগের যখন জন্ম হয় তখন আকাশে রক্তাক্ত সূর্য জ্বলছিলো। এর অর্থ এই যে, আওয়ামী লীগ যত দিন রাজনীতিতে থাকবে ততদিন প্রচুর রক্তপাত হবে। তার কথাটি অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেছে। বিগত সুদীর্ঘ ৬৪ বছরে প্রমাণিত হয়েছে যে, এই দলটি যখন বিরোধী দলে থেকেছে তখন রক্তপাত ঘটিয়েছে, আবার যখন সরকারে থেকেছে তখনও রক্তপাত ঘটিয়েছে।
আওয়ামী লীগের জন্ম তারিখটি বিশ্লেষণ করুন, দেখবেন সেখানেও এক কলঙ্কময় দিনে এই দলটির জন্ম। এই দলটির জন্ম হয়েছে ১৯৪৯ সালের ২৩শে জুন। ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার প্রধান সেনাপতি মীর জাফর আলী খান পলাশীর রণক্ষেত্রে নবাবের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে। ফলে নবাবের বাহিনী বৃটিশ বেনিয়া সাম্রাজ্যবাদীদের কাছে পরাস্ত হয়। সেদিন শুধু নবাব সিরাজই পরাজিত হননি, তার পরাজয়ের সাথে বাংলার স্বাধীনতার সূর্যও ডুবে যায়। পরবর্তী ঘটনাবলী সকলেই জানেন। পরবর্তী ১৯০ বছর ধরে বাংলা (ভারতীয় বাংলা ও বর্তমান বাংলাদেশ) ইংরেজ শোষকদের শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়। ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট ভারত বিভক্ত হয় এবং ভারতের মুসলমানরা স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠন করে। পক্ষান্তরে ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট পাঞ্জাব, পূর্ব বাংলা, বেলুচিস্তান, সীমান্ত প্রদেশ ও সিন্ধু প্রদেশ ছাড়া অবশিষ্ট ভারত স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে আবির্ভূত হয়।
এইসব কথা কম বেশি সকলেরই জানা। কিন্তু যেটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে থাকে সেটি হলো, আওয়ামী লীগ তার জন্মের সময়টিকে ২৩শে জুন বেছে নেয় কেন? ২৩শে জুনের সাথে যে নামটি কলঙ্কিত হয়ে আছে, যে নামটি এখন ‘বেঈমান’ শব্দের সমার্থক, সেই মীর জাফরের বিশ্বাস ঘাতকতার দিনটিকে আওয়ামী লীগ তার জন্মলগ্ন হিসাবে বেছে নিলো কেন? ইতিহাসবিদ এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা এটি বিবেচনা করেছেন এবং এখনো বিবেচনা করে যাচ্ছেন। পাকিস্তান আমলেও আওয়ামী লীগ রাজনীতি করেছে এবং আওয়ামী বিরোধী রাজনীতিকে মাঠে দাঁড়াতে দেয়নি। কি সরকারে, কি বিরোধী দলে, যে অবস্থানে তারা থেকেছে সেই অবস্থানেই তারা বিরোধী দলের জনসভায় হামলা করেছে, মারপিট করেছে এবং তাদের গুন্ডামীকে ‘জনতার রুদ্ররোষ’ বলে চালিয়ে দিয়েছে। তাদের হামলায় বিরোধী দলের অনেক কর্মী সেদিনও শহীদ হয়েছেন। শহীদ আব্দুল মালেক সেই সব শহীদের একটি জলন্ত নজির।
দুই
কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ শুধু গুন্ডামীতেই তাদের ফ্যাসিবাদী রাজনীতিকে সীমাবদ্ধ রাখেনি, বাংলাদেশের রাজনীতিতে অপহরণ এবং গুপ্তহত্যাও চালু করেছে। এই অপহরণ এবং গুপ্ত হত্যার প্রথম শিকার ‘পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টির’ সভাপতি কমরেড সিরাজ শিকদার। তাকেও পুলিশ গ্রেফতার করে এবং ক্রসফায়ারে হত্যা করে। স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্রসফায়ারে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হত্যা করার উদ্বোধন করা হয় সিরাজ শিকদারের নিষ্ঠুর হত্যাকান্ডের মাধ্যমে। তারপর থেকে আওয়ামী লীগ সেই গুম এবং খুনের মহাজনী পথ মাড়িয়েই চলেছে।
কিন্তু গুম এবং খুনের ঘটনাবলি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে আওয়ামী লীগের বিগত মেয়াদে এবং বর্তমানের অনির্বাচিত এবং অবৈধ মেয়াদে। মানবাধিকার সংস্থা ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্রের’ (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০১৪ সালের মার্চ পর্যন্ত চার বছরে সারাদেশে ২৬৮ জন অপহৃত হয়েছে। এর মধ্যে ৪৩ জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে। অপহরণের পর ছেড়ে দেয়া হয়েছে ২৪ জনকে। পরে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে ১৪ জনকে। আর ১৮৭ জনের এখন পর্যন্ত কোন খোঁজ নেই। আসকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে ৬৮ জনকে অপহরণ করা হয়। এর মধ্যে পাঁচজনের লাশ উদ্ধার এবং ছয়জন ছাড়া পেলেও বাকি ৫৫ জনের এখনও খোঁজ নেই। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও শালিশ কেন্দ্র আসকের হিসাবে দেখা যায়, বিএনপির আমলে ২০০৪ সালে ২১০ জন, ২০০৫ সালে ৩৭৭ জন, ২০০৬ সালে ৩৬২ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় এ সংখ্যা কমে আসে। ২০০৭ সালে ১৮০, ২০০৮ সালে ১৭৫ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে নিহত হন। এরপর ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। ওই বছর এই সংখ্যা বেড়ে হয় ২২৯। অন্যদিকে পুলিশ সদর দফতর থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ২০১০ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত অপহরণের মামলা হয়েছে ৩ হাজার ৩৯১টি। এর মধ্যে ২০১০ সালে ৮৭০টি, ২০১১ সালে ৭৯২টি, ২০১২ সালে ৮৫০টি ও ২০১৩ সালে ৮৭৯টি অপহরণের ঘটনা ঘটে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে অপহরণের ঘটনা ঘটে ১৯৬টি। জানুয়ারি মাসে ৬২টি, ফেব্রুয়ারি মাসে ৫৫টি ও মার্চ মাসে ৭৯টি। (নয়াদিগন্ত : ২০ এপ্রিল, ২০১৪)। একইভাবেই আরো বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা অপহৃত হওয়ার পর দীর্ঘদিন পার হলেও তারা এখনও উদ্ধার হননি। চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থানা বিএনপির সভাপতি ও করলডেঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম বাচার অপহরণের পর খোঁজ মেলেনি। অপহৃতের পরিবারের দাবি, র‌্যাব সদস্যরা তাকে ঢাকার গাজীপুর থেকে নিয়ে অস্ত্রের মুখে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে গেছে। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির নেলাইন ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান শহীদুল আলম ঢাকার পল্টন থেকে নিখোঁজ হন ২০১১ সালের ৬ মার্চ। ওই ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয় পল্টনসহ কয়েকটি থানায়। মাসের পর মাস চলে তদন্ত। কিন্তু ফিরে আসেননি শহীদুল। তিনি বেঁচে আছেন নাকি মেরে ফেলা হয়েছে সে ব্যাপারে নিশ্চিত নয় তার পরিবার। পুলিশও উদ্ঘাটন করতে পারছে না নিখোঁজ রহস্য। গত বছরের ১২ ডিসেম্বর লক্ষীপুর চকবাজার জামে মসজিদের সামনে থেকে র‌্যাব পরিচয় দিয়ে কিছু লোক ওষুধ ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বিএনপি নেতা ইকবাল মাহমুদ জুয়েলকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। ওই ঘটনায় থানায় জিডি হলেও সন্ধান মেলেনি জুয়েলের। খুলনার কেএম শামীম আকতারকে ২০১১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় র‌্যাব পরিচয়ে অপহরণ করা হয় ঢাকা থেকে। ওই দিনই পল্টন থানায় জিডি করেন শামীমের স্ত্রী ঝর্ণা খানম। কিন্তু শামীমের কোনো হদিস মেলেনি। স্ত্রী ঝর্ণা খানম বলেন, ‘সন্তান বাবার কথা জানতে চাইলে কিছুই বলতে পারি না। তিনি (স্বামী) বেঁচে আছেন, নাকি তাকে মেরে ফেলা হয়েছে তাও জানি না।’ নারায়ণগঞ্জ জেলা যুবলীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক জহিরুল ইসলাম ভূঁইয়া পারভেজকে গুলশান থেকে অপহরণ করা হয় গত বছরের ৬ জুলাই। এ ঘটনায় গুলশান থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন তার স্ত্রী সোহানা আক্তার। কিন্তু এখনো পর্যন্ত পারভেজকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। গত ৪ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী হত্যা ও গুম নিয়ে উদ্বিগ্ন খালেদা জিয়া হোটেল ওয়েস্টিনে সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পূর্বাপর ঘটনায় তাদের তিন শতাধিক নেতাকর্মীকে হত্যা ও গুম করা হয়েছে। তিনি বলেন, বিএনপি কার্যালয়ে সংগৃহীত তথ্যানুযায়ী ২৪২ জনকে হত্যা এবং ৬০ জনকে গুম করা হয়েছে। তবে দলীয় তথ্য সংগ্রাহকদের সংশোধিত বর্তমান তালিকায় দেখা যায়, নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৬১-তে দাঁড়িয়েছে। এ সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে দায়িত্বশীল নেতারা দাবি করেছেন। নিহত ২৬১ জনের মধ্যে জামায়াতের অন্তত ৮১ জন। গুম হয়েছেন সাতজন জামায়াত নেতাকর্মী। বাকিরা বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী বলে দাবি করছেন তথ্য সংগ্রহকারীরা।
তিন
২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল রাজধানীর বনানী থেকে নিখোঁজ হন তৎকালীন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস আলী ও তার গাড়ি চালক। গাজীপুরে পোশাক শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলাম ২০১২ সালের ৪ এপ্রিল সন্ধ্যায় অপহরণের শিকার হন।  ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য চৌধুরী আলম। ২০১৩ সালের জানুয়ারির ৬ তারিখ গুম-হত্যার শিকার হন ঢাকার বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম মজুমদার। ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার আনন্দনগর গ্রাম থেকে সাদা পোশাকধারী একদল লোক র‌্যাব পরিচয়ে তাকে অপহরণ করে। পরে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার বাগুলা ইউনিয়নের আদাবাড়িয়া গ্রামের মাঠ থেকে হাতকড়া লাগানো অবস্থায় তার লাশ উদ্ধার করা হয়। তার হাতকড়ায় ‘পুলিশ’ শব্দটি খোদাই করে লেখা ছিল বলে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
গত বছরের ৬ মার্চ নারায়ণগঞ্জের বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় মেধাবী কিশোর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকি। দু’দিন পর ৮ মার্চ শীতলক্ষ্যা নদী থেকে উদ্ধার হয় তার লাশ। ত্বকি শহরের চাষাড়ার ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল এবিসি ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের একজন মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলো। ত্বকি হত্যা মামলার অভিযোগপত্রে সংসদ সদস্য নাসিম ওসমানের ছেলে আজমেরি ওসমানসহ ১২ জন অভিযুক্ত করা হলেও তারা রয়ে গেছেন ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। বাবা রফিউর রাব্বীর ওপর প্রতিশোধ নিতেই ছেলেকে হত্যা করা হয় বলে তদন্তে বের হয়ে এসেছে।
চার
বলছিলাম আওয়ামী লীগের অপরাজনীতির কথা। তারেক রহমান লন্ডন থেকে শেখ মুজিবের প্রধানমন্ত্রী হওয়া এবং বাংলাদেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট সম্পর্কে সুধী সমাবেশ ডেকে দুটি সুনির্দিষ্ট বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। তার ওই বক্তব্য ছিলো তথ্য উপাত্ত এবং যুক্তি ও ডকুমেন্টে সমর্থিত। তার বক্তব্যের সাথে দ্বিমত পোষণ করার অধিকার সকলেরই আছে। আওয়ামী লীগেরও আছে। কারণ বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। আওয়ামী লীগ যুক্তি তর্ক দিয়ে তারেক রহমানের বক্তব্য খন্ডন করতে পারে। তারেকের বক্তব্য তারা যুক্তিতর্ক দিয়ে খন্ডন না করে, গালাগালির পথ বেছে নিয়েছে। এমনকি তারেক বা তার মাতা খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহীতার মামলা করারও হুমকি দিয়েছে। এগুলো করে কি রাজনীতি, মতবাদ বা আদর্শকে হত্যা করা যায়? ইতোমধ্যে  শেখ মুজিব এবং জিয়াউর রহমানকে নিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য তথ্য সমৃদ্ধ বক্তব্য ইন্টারনেটে তথা ফেসবুকে আসছে। টুইটার এবং ইমেলেও সেগুলো আসছে। তাজ উদ্দিনের ঘনিষ্ঠ সহচর মইদুল হোসেন এবং তাজ উদ্দিনের কন্যা আমেরিকা থেকে বই প্রকাশ করে শেখ মুজিব সম্পর্কে অনেক তথ্য দিয়েছে। শেখ মুজিবের স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে ১৯৭১ সালের ৬ই নভেম্বর আমেরিকার কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্দিরা গান্ধী একটি বক্তব্য দিয়েছেন। এইগুলো এখন ইন্টারনেটের মাধ্যমে অনেকে জেনে যাচ্ছেন। এখন ওইসব বক্তব্য বিশ্লেষণ করলেই সরকার তার পুরনো অস্ত্র নিয়ে হাজির হয়। সমালোচকদের বলে রাজাকার, আলবদর, স্বাধীনতা বিরোধী, পাকিস্তানের দালাল ইত্যাদি। কিন্তু এইগুলোতো আদর্শিক বিরোধ সমাধানের কোন পথ নয়। এটা অপরাজনীতি। আওয়ামী  লীগকে অবিলম্বে এই অপরাজনীতি বন্ধ করতে হবে। আওয়ামী লীগকে মনে রাখতে হবে যে, কাঁচের ঘরে বসে অন্যের ঘরে ঢিল ছোঁড়া যায় না।
0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

প্রধানমন্ত্রীর নতুন ট্যাক্সিক্যাব উদ্বোধন : ভাড়া শুনে যাত্রীদের পলায়ন


রাজধানীতে চলমান দুর্বিসহ যানজটের মধ্যে জনসাধারণের নিরাপদ ও আরামদায়ক ভ্রমণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত ২২ এপ্রিল মঙ্গলবার কুর্মিটোলায় আর্মি গলফ ক্লাবে অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ট্রাস্ট ট্রান্সপোর্ট সার্ভিসের ট্যাক্সিক্যাব উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। উদ্বোধনের প্রথম দিনেই রাজধানীর রাস্তায় নেমেছে ৪৬টি ট্যাক্সি ক্যাব। ট্যাক্সি ক্যাবের ভাড়া প্রথম ২ কিলোমিটারের জন্য ১০০ টাকা নির্ধারণ করা হলেও প্রধানমন্ত্রী তা কমিয়ে ৮৫ টাকা করতে বলেছেন। পরে ব্যবহারের চাহিদা বাড়লে ধীরে ধীরে ভাড়া বৃদ্ধি করা হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। কিন্তু প্রথম দিনেই সাধারণ যাত্রীরা এই ট্যাক্সি ক্যাবের সুবিধা থেকে নিজেদের স্বযতেœ সরিয়ে নেন। সকলের অভিযোগ অতিরিক্ত ভাড়া নির্ধারিত হওয়ায় এ সুবিধা তারা গ্রহণ করতে পারছে না বলে পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা গেছে।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই প্রথম এদেশে ট্যাক্সিক্যাব সার্ভিস চালু হয়। কিছুদিনের মধ্যেই কালো, হলুদ, নীল রঙের ট্যাক্সিক্যাবের চলাচল দেখা গেছে রাজধানীতে। ভারত থেকে আমদানি করা ক্যাবগুলো অবশ্য বেশিদিন সেবা দিতে পারেনি। কমতে কমতে হাতে-গোনা কয়েকটি টিকে ছিল। এর ১৬ বছর পর আবারও নতুন এই ট্যাক্সিক্যাব সার্ভিস চালু করা হলেও কেন আগের সার্ভিস টিকল না সেটা খতিয়ে দেখা হয়েছে বলে শোনা যায়নি। বর্তমানে জাপানের টয়োটা থেকে আনা ৪৬টি হলুদ ট্যাক্সিক্যাব রাস্তায় নামলেও প্রথম ধাপে তা ৫০০-৬০০-তে উন্নীত হবে বলে জানা গেছে। তবে সমস্যা তৈরি হয়েছে এর নির্ধারিত ভাড়া নিয়ে। এসব ট্যাক্সিতে উঠলেই ৮৫ টাকা ভাড়া গুনতে হবে। প্রথম ২ কিলোমিটার পরে প্রতি কিলোমিটারের জন্য দিতে হবে ৩৪ টাকা করে। যাত্রাবিরতিকালে প্রতি ২ মিনিটের জন্য সাড়ে ৮ টাকা, যানজট বা অন্য কারণে পথে ৮ মিনিট আটকে থাকলে ১ কিলোমিটারের ভাড়া দিতে হবে। টেলিফোনে ডাকলে অতিরিক্ত চার্জ হিসেবে দিতে হবে ২০ টাকা। এ কাঠামোগত ব্যবস্থায় দেখা যায়, যানজটহীন অবস্থায় শুধুমাত্র আবদুল্লাপুর থেকে মতিঝিলের ২২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে গুণে গুণে ৭৬৫ টাকা ভাড়া দিতে হবে। অথচ এই দূরত্বে লোকাল বাসের ভাড়া ৩০ থেকে ৪০ টাকা। বিআরটিসির এসি বাসে ৫৫ টাকা, আর সিএনজি অটোরিকশায় ৩০০ টাকা খরচ হবে। এ অবস্থায় নতুন ট্যাক্সিতে ওঠার আগে পকেটগুলো যে ভারি রাখতে হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর তা না থাকলে নিশ্চিত বিপদে পড়তে হবে। এমন ঘটনাও পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে দেখা গেছে। বনানী থেকে যাত্রাবাড়ী যাওয়ার জন্য উঠে ক্যাবচালকের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে কথা বলে দৌড়ে নেমে গেছেন দুই যাত্রী। প্রথম যাত্রী হিসেবে অনুনয়-বিনয় করেও তাদের আটকাতে পারেননি ট্যাক্সিচালক। এখন প্রশ্ন হলো এমন গণপরিবহন কিভাবে টিকে থাকবে আর যাত্রীসেবাই বা কিভাবে দেবে?
রাজধানীতে চলাচলকারী প্রায় ১০ লাখ যানবাহনের ভিড়ে এই ট্যাক্সিক্যাব সার্ভিস কিভাবে যানজটের মধ্যে নিরাপদ ও আরামদায়ক সেবা দেবে সেটা ভেবে দেখার বিষয়। স্বাভাবিক রাস্তায় চলাচলের ভাড়াই যেখানে আশপাশের যে কোনো দেশের ট্যাক্সিক্যাব সার্ভিসের চেয়ে বহুগুণ বেশি সেখানে যানজটে আটকে থাকার পর তার পরিমাণ যাত্রীর আরামকে হারাম করে তুলবে না এটা কেউ বলতে পারে না। প্রথম দিনেই যেখানে ভাড়া শুনে পালিয়েছেন যাত্রী সেখানে পরবর্তী সময়ে অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় সেটা দেখতে অবশ্য বেশিদিন অপেক্ষা করতে হবে না।
0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

কী চমৎকার দেখা গেল!


‘তিস্তা’ নামটি এসেছে ‘ত্রিস্রোত’ থেকে। তিন নদীর সম্মিলনে তিস্তার প্রবাহের উৎপত্তি সিকিমে। উজানে ভারতের পানি আগ্রাসনে এখন বাংলাদেশের তিস্তা স্রোতবিহীন মরা নদী। গত শনিবার (১৯ এপ্রিল) এর প্রবাহের পরিমাণ ছিল ৭১৮ কিউসেক। পরদিন আরো কমে ৬৮৮ কিউসেক; কিন্তু মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় হঠাৎ ‘মরা গাঙের ভরা যৌবন’। প্রবাহ এক লাফে তিন হাজার কিউসেক! বুড়ো কোনো দিন যুবক হয় না; কিন্তু সে দিন বার্ধক্যজীর্ণ তিস্তাকে অকস্মাৎ যুবকে পরিণত হতে দেখে সবাই বিস্মিত। তবে মঙ্গলবারের এই পরিবর্তন যে আমাদের মঙ্গলের জন্য নয়, তা টের পাওয়া গেল এক দিন না যেতেই।
তিস্তার উদ্দেশে বিএনপির নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলের সাড়া জাগানো লংমার্চ ঢাকা থেকে যাত্রা করে মঙ্গলবার সকালে। পথে কয়েকটি পথসভা করে পরদিন তিস্তার কাছে গিয়ে পৌঁছে। একই সময়ে নদীটির উজানে বাঁধের গেট কিছুক্ষণ খুলে রেখে ভারত কারো বিস্ময়, কারো স্বস্তি, কারো বা আত্মতৃপ্তির জন্ম দিয়েছে। এতদিন তিস্তার সব পানি আটকে রেখে এবং চুক্তি করার সিদ্ধান্ত বাতিল করে যারা ধমক দিয়েছে বাংলাদেশকে, তাদের হঠাৎ পানি ছেড়ে চমক লাগানো সবার আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
মঙ্গলবার তিস্তার ডালিয়া পয়েন্টে যেখানে তিন হাজার কিউসেক পানি, ২৪ ঘণ্টা পরই তা অর্ধেকের বেশি কমে মাত্র এক হাজার ২৪০ কিউসেকে এসে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের এই বৃহৎ সেচ প্রকল্পের খালগুলো কার্যকর রাখার জন্য দুই হাজার ৩০০ থেকে দুই হাজার ৪০০ কিউসেক পানির প্রবাহ থাকা দরকার।
এবার এক সপ্তাহে তিস্তার পানি সাত গুণ বাড়লেও তা আগের অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে। গত দু’দিনে দুই হাজার কিউসেক পানি কমে গেছে। বুধবার প্রবাহ ছিল এক হাজার ২৪০ কিউসেক। পরদিন আরো কমে দাঁড়াল এক হাজার ১৮৬ কিউসেক। হঠাৎ পানি বেড়ে কয়েক গুণ। আবার ২৪ ঘণ্টায় প্রায় দুই হাজার ৪০০ কিউসেক কমে যাওয়া! এসব দেখে বলতে হয়, ‘লাগ ভেলকি লাগ’; কিন্তু কোনো প্রকৃত বন্ধুদেশ ভেলকিবাজি দিয়ে নয়, আন্তরিকতা ও ত্যাগের মাধ্যমেই বন্ধুত্বের বন্ধন গড়ে তোলে।
এ দিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, মঙ্গলবার তিস্তার বেশি পানি আসার অর্থ এই নয় যে, ভারত বাংলাদেশকে বেশি পানি দেয়া শুরু করেছে। এই পানি আসা অপ্রত্যাশিত। তারা জানতে পেরেছেন, ভারত তার গজলডোবা বাঁধের এক অংশ খুলে দিয়েছিল আসলে সংস্কারকাজের জন্য। ফলে ১২-১৪ ঘণ্টা পানি ঢুকেছে সীমান্ত পেরিয়ে।
মজার ব্যাপার হলো, সরকারি প্রতিষ্ঠান পানি উন্নয়ন বোর্ডের সূত্র যে তথ্য দিয়েছে, তার সাথে সংসদীয় কমিটির বক্তব্যের নেই কোনো মিল। তিস্তার হঠাৎ বেড়ে যাওয়া পানি অনেক কমে যায় বুধবার। সে দিনই পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি রমেশ চন্দ্র সেন সাংবাদিকদের বলেন, বিএনপির লংমার্চ নয়, এই সরকারের সফল কূটনৈতিক তৎপরতায় তিস্তার পানি প্রবাহ বেড়েছে।
এই তৎপরতাটা কী, তা রমেশ বাবু খোলাসা করেননি। তিস্তার পানি হঠাৎ বৃদ্ধি পাওয়া যদি কূটনৈতিক সাফল্যই হয়, তাহলে পর দিনই তা কমে যাওয়ার মানে হচ্ছে, মাত্র ২৪ ঘণ্টা না যেতেই এই সরকারের কূটনীতি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। আর এতই যদি সাফল্যের বয়ান শোনাতে হয়, তাহলে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির ব্যাপারে ভারতকে রাজি করতে পারছেন না কেন? দিদি মমতার বিজয়ে তো প্রটোকল লঙ্ঘন করে অভিনন্দন জানানো হয়েছিল। তিস্তা চুক্তি হওয়ার কথা ছিল তিন বছর আট মাস আগে, মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরকালে। অনেকেরই স্মরণ আছে, রমেশ সেন পানিসম্পদমন্ত্রী থাকার সময় পানির হিস্যা নিয়ে অযৌক্তিক ও অসঙ্গত উক্তি করে সমালোচিত হয়েছিলেন।
মোদ্দাকথা, এই খরবৈশাখী অনাবৃষ্টির দিনে তিস্তার সাময়িক পানি বৃদ্ধি ঘটেছে কাকতালীয়ভাবে। বিএনপি মনে করছে, তাদের লংমার্চই ভারতের এই শর্টটার্ম মহানুভবতার কারণ। আর আওয়ামী লীগ আসল কারণ জেনেবুঝেও এটাকে নিজেদের কৃতিত্ব বলে জাহির করছে। সাধে কি আর বলে, ‘ঠাটা পড়ে বগা মরছে, ফকিরা কয় কেরামতি হইছে’।

‘
লংমার্চ দেখার জন্য’ তিস্তার পানি এসে এক দিন ছিল  এমন খবর ও ছবি পত্রপত্রিকায় উঠেছে। তবে এটাও তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প এলাকার অনেক জায়গার জন্য সত্য নয়। যেমন  নীলফামারী জেলার ডিমলার দক্ষিণ সোনাখুলী গ্রামের ধানক্ষেতে পানিশূন্য দীর্ঘ ড্রেনের ছবি গত শুক্রবার নয়া দিগন্তে ছাপা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, দেড় মাস আগে যেমন ছিল, গত বৃহস্পতিবার দিনেও ড্রেনে তেমনি পানিবিহীন অবস্থা।
লংমার্চ দেখে হয়  তো ভারত তার চাণক্যবুদ্ধিতে কিছু পানি ছেড়ে বাংলাদেশকে বোকা বানানোর ব্যর্থ প্রয়াস পেয়েছে; কিন্তু আমাদের পানি উন্নয়ন বোর্ড সে পানিপ্রবাহের পরিমাণ তিন হাজার ৬০০ কিউসেক বলে দাবি করাটা কৌতূহলোদ্দীপক। কারণ এর চেয়ে এক হাজার কিউসেক কম পানি তিস্তা দিয়ে এলেও প্রকল্প এলাকার খালগুলোতে সেচের পানি থাকার কথা। অথচ যখন ওপার থেকে পানি এসে তিস্তা ভেসে যাচ্ছে, তখনো সোনাখুলী গ্রামের একাধিক সেচখাল এর বিপরীত নজির উপস্থাপন করেছে।
আরো লক্ষণীয়, এই শুকনা মওসুমে যখন তিস্তা মানে ধু-ধু বালুচর, তখন স্থানীয় সাংবাদিকেরা ডালিয়ায় তিস্তা প্রকল্প কর্তৃপক্ষের কাছে পানিপ্রবাহের পরিমাণ জানতে চাইলে তারা অক্ষমতা প্রকাশ করেছেন। তাদের কথামতো পাউবো হাইড্রলিক বিভাগে যোগাযোগ করা হলে জবাব মেলে, ঢাকায় যৌথ নদী কমিশন (জেআরসি) থেকে জানতে হবে। এভাবে মিডিয়াকে হয়রানি করা হচ্ছে। অপর দিকে, সরকার তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়িত হওয়ার জোর প্রচারণা চালিয়ে আসছে। যা হোক, তিস্তাপ্রবাহ সম্পর্কে তথ্য দিতে যখন পাউবোর এহেন কার্পণ্য, তখন রহস্যজনকভাবে গত মঙ্গল-বুধবার ডালিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা উৎসাহের সাথে জানান যে, তিস্তার প্রবাহ এখন তিন হাজার ৬০০ কিউসেক! এ দিকে পত্রিকায় খবর, তিস্তায় পানি বাড়া-কমার কারণ বলতে পারছেন না পাউবোর কর্তারা। নদ-নদীর ক্ষেত্রে ভারত-বাংলাদেশ তথ্যবিনিময়ের সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে এমন অজ্ঞতা পরিলক্ষিত হতো না।
এ দেশের সবচেয়ে বড় দু’টি সেচ প্রকল্প হলো, দেশের উত্তরাংশে তিস্তা ব্যারাজ এবং দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) প্রকল্প। ভারতের স্বেচ্ছাচারী মনোভাবের ফসল ফারাক্কা বাঁধ। এর মাধ্যমে পদ্মার যৌবন হরণ করে জিকে প্রজেক্ট অকার্যকর করে দেয়া হয়েছে। একইভাবে গজলডোবা বাঁধ দিয়ে তিস্তার টুঁটি চেপে হত্যার প্রয়াসে সে প্রকল্পও ধুঁকছে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়ার আমলে ১৯৭৯ সালে তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণকাজ শুরু হয়। আশির দশকের মাঝামাঝি শুরু করা হয় এর সেচ খালগুলোর কাজ। প্রকল্পটির প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ করতেই অনেক সময় চলে যায়। তখন সেচের টার্গেট ছিল এক লাখ ১১ হাজার ৪০৬ হেক্টর জমি। তবে কখনো ৮০ হাজার হেক্টর জমিও সেচের আওতায় আনা যায়নি। বরং উজানে পানি প্রত্যাহারের ফলে বছর বছর সেচযোগ্য জমি কমতে থাকে। ভারত ইদানীং এত ব্যাপকভাবে পানি সরিয়ে নিচ্ছে যে, সর্বশেষ মওসুমে ২৫ হাজার হেক্টরেও ভালোভাবে সেচ দেয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল। অথচ টার্গেট ছিল ৬০ হাজার হেক্টরের বেশি। এই লক্ষ্য পূরণের জন্য যে তিন হাজার ৬০০ কিউসেক পানি প্রয়োজন, তা বাংলাদেশ পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
আমাদের সবচেয়ে বড় পড়শি দেশটি জলপাইগুড়ির গজলডোবাসহ বিভিন্ন বাঁধ দিয়ে তিস্তার পানি সরিয়ে নিচ্ছে অনেক দিন ধরে। তার আগে বাংলাদেশে তিস্তার অবস্থা কেমন ছিল তা বুঝার জন্য শুধু এই উদ্ধৃতিই যথেষ্ট :
Until India began diverting the waters from the upstream the lean period waterflow in the Teesta in Bangladesh never fell below 6500 cusecs.
সোজা কথায়, অতীতে শুকনা মওসুমেও আমাদের তিস্তার প্রবাহ কখনো সাড়ে ছয় হাজার কিউসেকের নিচে নামেনি। গ্রীষ্মকালেও স্রোতের তোড়ে নৌকা চালানো কষ্টকর হতো অনেক সময়।
অতীতে এমনকি ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার প্রবাহ গড়ে ৯ হাজার কিউসেক পানি ছিল; কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার হলো, তিস্তা ব্যারাজের সেচকার্যক্রম যখন এগিয়ে যাচ্ছিল তখন থেকে পানিপ্রবাহ কমতে থাকে। একপর্যায়ে তা মাত্র ৪০০ থেকে ৫০০ কিউসেকে এসে ঠেকেছিল।
তিস্তা চুক্তি অবিলম্বে চূড়ান্ত করে বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় পানিপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ প্রফেসর আইনুন নিশাত। তিনি বলেন, পানির অভাবে তিস্তার সেচব্যবস্থা সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়েছে। তা ছাড়া, নদীটির জীববৈচিত্র্য ও প্রতিবেশ মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন। অভিন্ন আন্তর্জাতিক নদীর পানি গায়ের জোরে একতরফা প্রত্যাহার করা অনৈতিক।
আওয়ামী লীগের একজন কেন্দ্রীয় নেতা মাহবুব-উল-আলম হানিফ। এখন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী পদে না থাকলেও তার বড় কথা বলা বন্ধ হয়নি। তিস্তা লংমার্চ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘লংমার্চ করে দাবি আদায় করা যায় না।’ মাও সে তুং-এর ঐতিহাসিক লংমার্চের কথা না হয় না-ই বা বললাম। তাদের তো মওলানা ভাসানীর ফারাক্কা লংমার্চের গুরুত্বও বুঝতে পারার কথা নয়। মজলুম জননেতার সে লংমার্চ কিংবা এবার বিরোধী দলের তিস্তা লংমার্চ যাদের পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে, তারা হানিফদের ‘পরীক্ষিত বন্ধু’। যা হোক, ১৯৭৬ সালের ১৬ মে গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে ভাসানীর ঐতিহাসিক লংমার্চ শুধু ভারত সরকারকেই নাড়া দেয়নি, ইস্যুটি আন্তর্জাতিক পর্র্যায়েও সাড়া জাগাতে সফল হয়েছিল। সেই লংমার্চের প্রভাবে জাতিসঙ্ঘে বাংলাদেশ সরকার গঙ্গার পানির হিস্যার জোর দাবি জানিয়েছিল। সেই সাথে, এ দেশের আধিপত্যবাদবিরোধী দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক শক্তি স্বাধীনতা রক্ষার চেতনায় সংগঠিত হয়েছিল।
হানিফ সাহেবদের দলের না হয় লংমার্চের তাৎপর্য উপলব্ধি করা সম্ভব নয়; কিন্তু রাশেদ খান মেনন তো এর গুরুত্ব ভালোভাবেই জানেন। তিনি মওলানা ভাসানীর অনুসারী হিসেবে ফারাক্কা লংমার্চের একজন সংগঠক ছিলেন বলে জানি। ভাসানীর নির্দেশে তখন তিনি কৃষক সংগঠনে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এখন সেই মেনন আওয়ামী সরকারের মন্ত্রী হয়ে তিস্তা লংমার্চকে হেয় করার জন্য বক্তব্য দিচ্ছেন। ভারতের আগ্রাসী নীতি সম্পর্কে তার অতীতের দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক অবস্থানের সাথে এখনকার ভূমিকার কোনো মিল নেই।
তিস্তার পানি আনতে ব্যর্থতা যে সরকারের, তা কাউকে বলে দিতে হয় না। মমতা দিদি আর মনমোহন দাদার অত্যন্ত প্রিয় দল আওয়ামী লীগ আর অতি বিশ্বস্ত আপনজন তো এ দলের নেত্রী। তবুও আমাদের সরকার তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা পেতে সফল হয়নি। নিশ্চয়ই এর পেছনে বড় কারণ মমতার একগুঁয়েমি, অর্থাৎ ভারতের টালবাহানা। তবে নয়াদিল্লি যদি আসলেই বাংলাদেশের প্রকৃত বন্ধু হওয়ার প্রমাণ রাখতে চায় এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক আইনকানুন ও রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর দায়িত্ব বোধ করে, তাহলে (পরিমাণে কিছুটা কম হলেও) তিস্তার পানি না দিতে কলকাতার গোঁ ধরে থাকা সম্ভব ছিল না। ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা সফরের প্রাক্কালে আওয়ামী সরকার দশ মুখে প্রচার করেছিল, ‘এই সফরে অবশ্যই তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি হবে।’ কিন্তু হাসিনার চেয়ে মমতার মন রাখা যে মনমোহনের কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তা ঢাকার ক্ষমতাসীন মহল উপলব্ধি করেনি। ফল যা হওয়ার, তা-ই হলো।
মনমোহন এলেন, দেখলেন, চলে গেলেন। তিস্তার ব্যাপারে বাংলাদেশ পেলো ‘অষ্টরম্ভা’। আজ পর্যন্ত তিস্তা আমাদের আবেদন আর আকুতি, কান্না আর কাকুতির কারণ হয়ে আছে।
কিন্তু এই যে বঞ্চনা, বাংলাদেশকে এই যে প্রতারণা, ভারত সরকারের মিথ্যা আশ্বাসের পাশাপাশি উজানের আরো পানি প্রত্যাহার  এ সব কিছুর জন্য নিশ্চয়ই বাংলাদেশের বিরোধী দল, অর্থাৎ আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ বিন্দুমাত্রও দায়ী নয়। ‘পরীক্ষিত মিত্র’ দেশ দায়ী। অথচ নিজেরা তো পানি আনতে পারলেনই না, উল্টো যারা এ জন্য গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেমেছেন, তাদের ব্যঙ্গবিদ্রƒপ ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার জন্য আওয়ামী নেতারা উঠেপড়ে লেগেছেন; কিন্তু এসব অযৌক্তিক অবাস্তব প্রলাপোক্তি জনগণের সামনে সরকারের ইমেজকে আরো খেলো করে তুলছে। অপরের সমালোচনা করে নিজের অযোগ্যতা ও ব্যর্থতা ঢাকা যায় না।
পাদটীকা : তিস্তার পানি নিয়ে ভারতের ভেলকিবাজি দেখে মানুষের প্রতিক্রিয়া নানাভাবে প্রকাশ পেয়েছে। কেউ কেউ আওয়ামী লীগ সরকারের দিকে ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন, ‘চমকের সরকার এমন বন্ধু দরকার’। একটি পত্রিকা বৃহস্পতিবার সিনেমার গানের কলির ভাষায় তিস্তাকে উদ্দেশ্য করে বলেছে, ‘তুমি এসেছিলে পরশু/কাল কেন আসোনি’।

মীযানুল করীম


 

শুক্রবার, ২৫ এপ্রিল, ২০১৪

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও ভারতীয়দের উস্কানি


ইতিহাসের এমন কিছু ঘটনা ও অধ্যায় রয়েছে যেগুলোর দিকে মাঝে মধ্যে ফিরে যেতে এবং স্মরণ করতে ও করিয়ে দিতে হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এর কারণ তৈরি করেন অন্যজনরা। যেমন অতি সম্প্রতি করেছেন ভারতের চরম হিন্দুত্ববাদী প্রধান বিরোধী দল বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা সুব্রামনিয়াম স্বামী। ইতিহাসের ব্যাখ্যার আড়ালে একটি দাবি তুলে মূল কথায় তিনি বলেছেন, ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় ভারতকে ঠকিয়ে তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানকে অনেক বেশি অঞ্চল দেয়া হয়েছিল। তাছাড়া দেশ বিভাগের পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ মুসলমান ভারতে অনুপ্রবেশ করেছে। তারা এখনো অবৈধভাবে ভারতে বসবাস করছে। এই মুসলমানরা যেহেতু বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ, সেহেতু বাংলাদেশকেও তার এক-তৃতীয়াংশ ভূমি ভারতকে দিতে হবে। এ প্রসঙ্গে বিজেপি নেতার ফর্মুলা হলো, বাংলাদেশকে খুলনা থেকে সিলেট পর্যন্ত সমান্তরাল রেখা টেনে সম্পূর্ণ ভূমি ভারতের হাতে তুলে দিতে হবে। এটা নাকি বাংলাদেশের কাছে ভারতের ঐতিহাসিক পাওনা! সে কারণে বাংলাদেশের কাছ থেকে এই ভূমি আদায় করা অর্থাৎ ফেরত নেয়া হবে।
বিজেপি ভারতের কোনো সাধারণ দল নয়। জনসংঘ, রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ (আরএসএস) এবং হিন্দু মহাসভা ধরনের কয়েকটি উগ্র হিন্দুত্ববাদী দলের সমন্বয়ে গড়ে উঠা এই দলটি অটল বিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বে ভারতের ক্ষমতায় গেছে। এ সময়ে চলমান নির্বাচনের মধ্য দিয়েও বিজেপি আরো একবার ক্ষমতায় যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাছাড়া প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী এবং গুজরাটে হাজার হাজার মুসলমান হত্যার প্রধান নায়ক নরেন্দ্রনাথ মোদির নেতৃত্বে  দলটি এখনো গুজরাট রাজ্যের ক্ষমতায় রয়েছে। আরো অনেক রাজ্যেই বিজেপি প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করছে। সুতরাং অমন এক দল বিজেপির কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতা সুব্রামনিয়াম স্বামীর বক্তব্যকে হাল্কাভাবে নেয়ার পরিণতি বাংলাদেশের জন্য মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু সব জেনে-বুঝেও আওয়ামী লীগ সরকার যথারীতি নীরবতা অবলম্বন করে চলেছে। অথচ সরকারের দায়িত্ব ছিল ভারত সরকারের কাছে সুব্রামনিয়াম স্বামীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানানো। নিদেন পক্ষে বিজেপি নেতার দাবিটির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করা। কিন্তু সরকার কিছুই করেনি। সরকারের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর এবং তথাকথিত সুশীলসমাজের নীরবতাও জনগণকে নিরাশই করেছে। একমাত্র দল হিসেবে প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান এক বিবৃতিতে বিজেপি নেতার দাবি ও বক্তব্যকে প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যর্থ ও নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কারণেই বিজেপির নেতা বাংলাদেশের ভূমি দাবি করার ঔদ্ধত্য দেখাতে পেরেছেন।
বিজেপির নেতা সুব্রামনিয়াম স্বামীর এই উস্কানিমূলক দাবি ও বক্তব্যের কারণে শুধু নয়, কথা উঠেছে সাধারণভাবে ভারতীয়দের বাংলাদেশনীতির কারণেও। বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারতের নীতি-কৌশল ও কার্যক্রম সবসময় সম্প্রসারণবাদী হিসেবে চিহ্নিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়ে এসেছে। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে প্রথম থেকেই ভারত বাংলাদেশকে বিপুল ঘাটতির মধ্যে রেখেছে। ভারতের সব সরকারই ঘাটতি কমিয়ে আনার দাবি উপেক্ষা করেছে। সৎ প্রতিবেশীসুলভ মনোভাব দেখানোর পরিবর্তে ভারতীয় নেতারা বরং বাংলাদেশের লোকসান বাড়ানোর ধ্বংসাত্মক নীতিরই বাস্তবায়ন করেছেন। এর ফলে বাংলাদেশের রফতানি আয় ক্রমাগত কমছে, অন্যদিকে আমদানি ব্যয় বেড়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে। অভিন্ন নদ-নদীর উজানে বাঁধের পর বাঁধ নির্মাণ করে এবং রীতিমতো পানি আগ্রাসন চালিয়ে ভারত বাংলাদেশকে প্রায় পানি-প্রতিবন্ধী রাষ্ট্রে পরিণত করে ফেলেছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতেও ভারতের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ ঘটছে। সবমিলিয়ে প্রমাণিত সত্য হলো, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের জন্য যত আন্তরিকভাবেই আমরা চেষ্টা চালাই না কেন, বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারতের রাজনৈতিক নেতারা সবসময় আধিপত্যবাদী, শোষণমূলক ও ধ্বংসাত্মক নীতি-কৌশলই অনুসরণ করে এসেছেন। ক্ষমতায় পরিবর্তন ঘটলেও এবং উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের স্থলে কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টির মতো ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল নামধারীরা সরকার গঠন করলেও বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারতীয়দের নীতি-কৌশল ও মনোভাবে কখনো সামান্য এদিক-সেদিক হয়নি; হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। বাস্তবে বাম-ডান নির্বিশেষে ভারতের সকল নেতা, সেনা অফিসার, গোয়েন্দা এবং কূটনীতিক ও সাংবাদিকদের মধ্যেই বাংলাদেশের প্রতি চরম বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব লক্ষ্য করা যায়। উদাহরণ দেয়ার জন্য ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর একটি ‘উপদেশের’ কথা স্মরণ করা যেতে পারে। ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ থেকে বিদায় নেয়ার আগে পরামর্শের আড়ালে বলেছিলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্ত ‘নতুন করে’ চিহ্নিত করা দরকার। পিনাক রঞ্জনের কাছে তখন নতুন কিছু ভয়ঙ্কর তথ্যও জানা গিয়েছিল। যেমন তিনি বলেছিলেন, ‘নতুন করে’ সীমান্ত চিহ্নিত করার বিষয়টি নিয়ে দু’দেশের প্রধানমন্ত্রী নাকি দুইবার বৈঠক করেছেন এবং আলোচনাও নাকি ‘এগিয়ে’ রয়েছে। বাংলাদেশকে নাকি যে কোনো সময় ‘সারপ্রাইজ’ দেখতে হতে পারে। বিষয়টি আসলেও ‘চমকে’ উঠার মতোই ছিল। কারণ, ‘নতুন করে’ সীমান্ত চিহ্নিত করার ব্যাপারে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে এবং দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে চুক্তি এখন সময়ের ব্যাপারÑ এমন তথ্য পিনাক রঞ্জন না জানালে বাংলাদেশের মানুষ জানতেই পারতো না!
আরো অনেক উদাহরণই দেয়া সম্ভব। কিন্তু উদাহরণের ভিড়ে যাওয়ার পরিবর্তে বলা দরকার, ভারতীয়দের বাংলাদেশবিরোধী ধারাবাহিক কর্মকা-ের সূত্র ধরেই এবার দৃশ্যপটে এসেছেন বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা সুব্রামনিয়াম স্বামী। তিনি কিন্তু মুদ্রার একটি মাত্র দিকই তুলে ধরেছেন। লক্ষ্য করেননি যে, ‘কান টানলে মাথা আসে’ বলেও একটা প্রবাদ রয়েছে। কথাটা বলার কারণ, একদিকে তিনি বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষকেÑ তা-ও আবার মুসলমানদের ভারতে ঢুকিয়ে ছেড়েছেন, অন্যদিকে স্বীকার করেননি যে, ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগকালে সবদিক থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল পূর্ব-পাকিস্তানকেÑ আজকের বাংলাদেশকে। দীর্ঘ সে ইতিহাসের আলোচনা এখানে সম্ভব নয়। পাঠকরা মরহুম আবুল মনসুর আহমদের ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ গ্রন্থটি পড়ে দেখতে পারেন। ইংরেজি দৈনিক ‘স্টার’-এর সম্পাদক মাহফুজ আনামের পিতা এবং প্রখ্যাত রাজনীতিক-সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদ ব্রিটিশ ভারতে প্রথমে শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হকের নেতৃত্বে কৃষক-প্রজা পার্টির এবং পরে অল-ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের বৃহত্তর ময়মনসিংহ এলাকার একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন। পাকিস্তানের রাজনীতিতেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। ১৯৫৬ সালে হোসেন মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে প্রধানমন্ত্রী করে সরকার গঠন করার পর তিনি কেন্দ্রীয় শিল্পমন্ত্রী হয়েছেন। একাধিকবার ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন। তার গ্রন্থ ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ এখনো এদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস জানার একটি প্রধান অবলম্বন। গ্রন্থের কোথাও কোনো ভুল তথ্য রয়েছে কিংবা লেখক ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো তথ্য বিকৃতি ঘটিয়েছেনÑ এমন অভিযোগ কখনো কেউ করেছেন বলে জানা যায়নি। পাকিস্তান আন্দোলন সম্পর্কে তো বটেই, বিশেষ করে ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগকালীন ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কেও বিস্তারিতভাবে লিখেছেন আবুল মনসুর আহমদ।
‘কলিকাতার দাবি’ শিরোনামে এক উপ-অধ্যায়ে তিনি জানিয়েছেন, ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে পূর্ব-পাকিস্তানের ভাগে অবিভক্ত বাংলার কোনো কোনো এলাকা আসবে সে বিষয়ে ইংরেজ গভর্নর স্যার আর জে ক্যাসির সঙ্গে কথা বলেছিলেন বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। গভর্নর ক্যাসি প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীকে জানিয়েছিলেন, কলকাতা এবং দার্জিলিং হবে উভয় বাংলার অর্থাৎ ভারতের বর্তমান রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ এবং পূর্ব-পাকিস্তান তথা আজকের বাংলাদেশের ‘কমন’ শহর। এছাড়া কলকাতাসংলগ্ন চব্বিশ পরগনার বারাকপুর, বারাসত, ভাঙ্গর ও বশিরহাটসহ বেশকিছু এলাকা পূর্ব-পাকিস্তানের ভাগে পড়ার কথা ছিল। অন্যসব সূত্রেও জানা গেছে, পলাশীর যুদ্ধের জন্য বিখ্যাত মুর্শিদাবাদ এবং করিমগঞ্জসহ আসামের বিরাট অঞ্চলও পূর্ব-পাকিস্তানকে দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে জওয়াহেরলাল নেহরু ও সরদার বল্লভভাই প্যাটেলদের মারপ্যাঁচ এবং ইংরেজ গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটেনের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে পূর্ব-পাকিস্তান বঞ্চিত হয়েছিল সর্বাত্মকভাবে। এই বঞ্চনা শুধু অঞ্চল না দেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, ক্ষতিপূরণ বাবদ নগদ অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রেও পূর্ব-পাকিস্তানকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। উদাহরণ দেয়ার জন্য আবারও আবুল মনসুর আহমদের ওই গ্রন্থের সাহায্য নেয়া যায়। তিনি জানিয়েছেন, কথা ছিলÑ কলকাতার বিনিময়ে পূর্ব-পাকিস্তানকে নগদে ৩৩ কোটি টাকা দেয়া হবে। ঢাকাকে আন্তর্জাতিক মানে রাজধানী হিসেবে সাজিয়ে তোলার খরচ হিসেবে তখনকার দিনে ৩৩ কোটি টাকা যথেষ্ট ছিল। কিন্তু একেবারে শেষ মুহূর্তে নেহরু-প্যাটেলরা চাণক্য হিসেবের কূটচাল চেলেছিলেন। তারা বলেছিলেন, কলকাতার বিভিন্ন স্থাপনার দাম নির্ধারণ করা হবে ‘বুক ভ্যালু’র ভিত্তিতে। অর্থাৎ যখন যেটা নির্মিত হয়েছিল, তখন যত টাকা খরচ হয়েছিল সেটাই হবে বিনিময় মূল্য। অন্যদিকে পাকিস্তানপন্থীরা ক্ষতিপূরণ চেয়েছিলেন ওই সময়ের অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের বাজার দরে। এর ভিত্তিতে টাকা দিতে গেলে ভারতকে শত কোটি টাকার ওপর গুনতে হতো। এজন্যই নেহরু-প্যাটেলরা ‘বুক ভ্যালু’র তত্ত্ব এনেছিলেন। বাস্তবে পূর্ব-পাকিস্তান কিন্তু ‘বুক ভ্যালু’র ভিত্তিতেও টাকা পায়নি। কারণ, এরই মধ্যে আবার ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ পূর্ব-পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন শহরের বিনিময়ে অর্থ দাবি করেছিলেন নেহরু-প্যাটেলরা। রীতিমতো অঙ্ক কষে তারা দেখিয়েছিলেন, ভারতের কাছে পূর্ব-পাকিস্তানের পাওনার পরিমাণ মাত্র ৩ কোট টাকা, অন্যদিকে পূর্ব-পাকিস্তানের কাছে ভারতের পাওনার পরিমাণ ৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ শত কোটি বা ৩৩ কোটি টাকা পাওয়া দূরে থাকুক, পূর্ব-পাকিস্তানকেই উল্টো ৬ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে! এমন এক বিচিত্র পরিস্থিতির বর্ণনা দিতে গিয়ে আবুল মনসুর আহমদ লিখেছেন, “সত্য যুগে ছিল : ‘শুভঙ্করের ফাঁকি, তেত্রিশ থনে তিনশ গেলে তিরিশ থাকে বাকি’; আর কলিযুগে : ‘শুভঙ্করের ফাঁকি, তেত্রিশ থনে শূন্য গেলে দেনা থাকে বাকি’! (পৃষ্ঠাÑ ২৫৭-২৬৭)
বলা দরকার, নেহরু-প্যাটেলদের কূটকৌশলই পূর্ব-পাকিস্তানের বঞ্চিত হওয়ার একমাত্র কারণ ছিল না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল অন্য একটি বিশেষ কারণ। পশ্চিম পাকিস্তানের অবাঙ্গালী নেতৃত্বের পূর্ব-বাংলাবিরোধী নীতি-কৌশলের সুযোগে এ ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা রেখেছিলেন ভারতের শেষ ইংরেজ গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটেন। তার স্ত্রীর সঙ্গে আগে থেকেই নেহরুর প্রশ্নসাপেক্ষ ও রহস্যময় সম্পর্ক ছিল। তার ওপর ‘জাতির পিতা’ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ নিজেই পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল হয়ে বসায় মাউন্টব্যাটেন খুবই ক্ষুব্ধ ও অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। তার  ইচ্ছা ছিল, তিনি ভারত ও পাকিস্তান উভয় রাষ্ট্রেরই গভর্নর জেনারেল হবেন। ভারত এতে রাজি হয়েছিল। কিন্তু অস্বীকার করেছিলেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। এ অসন্তোষেরই ঝাল ঝেড়েছিলেন লর্ড মাউন্টব্যাটেন। এ সম্পর্কে ঐতিহাসিক অনেক তথ্যেরই উল্লেখ করা এবং বিভিন্ন গ্রন্থেরও উদ্ধৃতি দেয়া সম্ভব। এখানে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধান নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রন্থ ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ থেকে কিছু উদ্ধৃতি দেয়া যাক। দেশ বিভাগকালীন ঘটনাপ্রবাহের বর্ণনা দিতে গিয়ে শেখ মুজিব লিখেছেন, ‘বড়লাট মাউন্টব্যাটেন তলে তলে কংগ্রেসকে সাহায্য করছিলেন। (জিন্নাহ নিজেই গভর্নর জেনারেল হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার পর) মাউন্টব্যাটেন ক্ষেপে গিয়ে পাকিস্তানের সর্বনাশ করার চেষ্টা করলেন।...’ (পৃষ্ঠাÑ ৭৪)
শেখ মুজিব আরো লিখেছেন, ‘অর্থাৎ দার্জিলিংও আমরা পাব। ... মাউন্টব্যাটেন সুযোগ পেয়ে যশোর জেলায় সংখ্যাগুরু মুসলমান অধ্যুষিত বনগাঁ জংশন অঞ্চল কেটে দিলেন। নদীয়ায় মুসলমান  বেশি, তবু কৃষ্ণনগর ও রানাঘাট জংশন ওদের দিয়ে দিলেন। মুর্শিদাবাদে মুসলমান বেশি, কিন্তু সব জেলাই দিয়ে দিলেন। মালদহ জেলায় মুসলমান ও হিন্দু সমান সমান তার আধা অংশ কেটে দিলেন, দিনাজপুরে মুসলমান বেশি বালুরঘাট মহকুমা কেটে দিলেন যাতে জলপাইগুড়ি ও দার্জিলিং হিন্দুস্তানে যায় এবং আসামের সাথে হিন্দুস্তানের সরাসরি যোগাযোগ হয়। উপরোক্ত জেলাগুলো কিছুতেই পাকিস্তানে না এসে পারতো না। এদিকে সিলেটে গণভোটে জয়লাভ করা সত্ত্বেও (মাউন্টব্যাটেন) মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ করিমগঞ্জ মহকুমা ভারতবর্ষকে দিয়েছিলেন। আমরা আশা করেছিলাম, আসামের কাছাড় জেলা ও সিলেট জেলা পাকিস্তানের ভাগে না দিয়ে পারবে না। আমার বেশি দুঃখ হয়েছিল করিমগঞ্জ নিয়ে।... যে কলকাতা পূর্ব-বাংলার টাকায় গড়ে উঠেছিল, সেই কলকাতা আমরা স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিলাম।... কলকাতা পাকিস্তানে থাকলে পাকিস্তানের রাজধানী কলকাতায় করতে বাধ্য হতো। কারণ, পূর্ব-বাংলার লোকেরা দাবি করত, পাকিস্তানের জনসংখ্যায়ও তারা বেশি আর শহর হিসেবে তদানীন্তন ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ শহর কলকাতা।...’ (পৃষ্ঠা- ৭৮-৭৯)
দেখা গেল, বয়সে প্রবীণ আবুল মনসুর আহমদ থেকে কিছুটা নবীন নেতা শেখ মুজিবুর রহমান পর্যন্ত প্রত্যেকেই যে বর্ণনা দিয়েছেন, সে অনুযায়ী দেশ বিভাগকালে পূর্ব-পাকিস্তান তথা আজকের বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে ব্যাপকভাবেই বঞ্চিত হয়েছিল। কথাটা বিশেষ করে সুব্রামনিয়াম স্বামীরা মনে রাখলে সবার জন্যই মঙ্গল। প্রসঙ্গক্রমে এখানে ঐতিহাসিক অন্যকিছু তথ্যেরও উল্লেখ করা দরকার। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ভারতের বঙ্গ নামক কলকাতাকেন্দ্রিক প্রদেশের অংশ ছিল। পরিচিতি ছিল পূর্ববঙ্গ নামে। কিন্তু ধর্মীয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণে মুসলিম প্রধান এ অঞ্চলের সঙ্গে মূল ভারতের দ্বন্দ্ব ক্রমাগত বাড়তে থাকে। দু-চারজন ছাড়া জমিদারদের প্রায় সবাই ছিলেন হিন্দু। মুসলমান কৃষকদের ওপর হিন্দু জমিদাররা যথেচ্ছ শোষণ-নির্যাতন চালাতেন। মুসলমানরা এমনকি জমিদার বাড়ির আশপাশ দিয়ে জুতো পরে বা ছাতা মাথায় দিয়ে যাতায়াত করতে পারতেন না। ব্যবসা-বাণিজ্য ও চাকরি ছিল হিন্দুদের দখলে। শিক্ষাতেও হিন্দুরাই একচেটিয়াভাবে এগিয়ে ছিল। সবমিলিয়েই মুসলমানরা ছিলেন নির্যাতিত, উপেক্ষিত ও পশ্চাৎপদ অবস্থায়।
হিন্দুদের প্রাধান্য বহাল রেখে মুসলমানদের পক্ষে যেহেতু উন্নতি-অগ্রগতি অর্জন করা একেবারেই সম্ভব ছিল না, সেহেতু মুসলিম প্রধান পূর্ববঙ্গ ও প্রতিবেশী রাজ্য আসামকে নিয়ে পৃথক একটি প্রদেশ গঠনের দাবিতে মুসলমানরা আন্দোলন গড়ে তোলেন। আন্দোলনের চাপে ব্রিটিশ সরকার ১৯০৫ সালে পূর্ববঙ্গ ও আসামকে নিয়ে নতুন একটি প্রদেশ গঠন করে। ঢাকাকে এর রাজধানী করা হয়। এটাই ইতিহাসে ‘বঙ্গভঙ্গ’ নামে পরিচিত। এর ফলে ঢাকাসহ বর্তমান বাংলাদেশের দ্রুত উন্নতি হতে থাকে। কিন্তু মুসলমানদের এই উন্নতি ও সম্ভাবনার বিরুদ্ধে হিন্দুরা পাল্টা তৎপরতা শুরু করে। কারণ, হিন্দুদের দৃষ্টিতে এটা ছিল তাদের ‘বঙ্গমাতা’কে দ্বিখ-িত করার পদক্ষেপ। কলকাতায় বসবাস করে পূর্ববঙ্গের ওপর যারা শোষণ-নির্যাতন চালাতেন এবং এখানকার অর্থবিত্ত লুণ্ঠন করে নিয়ে গিয়ে সেখানে বসে যারা নাচ-গান ও আনন্দ-ফূর্তি করতেন, সেই হিন্দু জমিদারদের প্রত্যক্ষ সাহায্যে ও উস্কানিতে সন্ত্রাসবাদী কর্মকা- দুর্বার হয়ে উঠে। হিন্দুরা একে সন্ত্রাসবাদী ‘আন্দোলন’ নাম দেয়। এ সময়ই বঙ্গভঙ্গের তথা বাংলাদেশের বিরোধিতা করে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি লিখেছিলেন। ইতিহাসের নির্মম পরিহাস হলো, যে দেশের বিরুদ্ধে লেখা, সে বাংলাদেশেই গানটিকে তার জাতীয় সঙ্গীত বানিয়েছে! উল্লেখ্য, হিন্দুদের সন্ত্রাসবাদী কর্মকা-ে ভীত হওয়ার অভিনয় করে মুসলিমবিরোধী ব্রিটিশ সরকারও হিন্দুদের ইচ্ছার কাছে নতি স্বীকার করে। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করা হয়, ঢাকাসহ পূর্ববঙ্গ আবারও কলকাতার এবং হিন্দুদের অধীনস্থ হয়ে পড়ে। হিন্দুদের মধ্যে যে ‘বঙ্গমাতা’র জন্য প্রীতির লেশমাত্র ছিল না এবং মুসলিম বিদ্বেষই যে ‘বঙ্গভঙ্গ’ বিরোধিতার প্রধান কারণ ছিলÑ তার প্রমাণ পাওয়া গেছে একটি বিশেষ ঘটনায়। সন্ত্রাসের অভিযোগে শত বছরের রাজধানী কলকাতাকে পরিত্যাগ করে ব্রিটিশ সরকার এ সময় ভারতের রাজধানী নিয়ে গিয়েছিল দিল্লীতে। কিন্তু হিন্দুরা কোনো প্রতিবাদই করেনি। এ ব্যাপারেও রবীন্দ্রনাথের উদাহরণ না দিয়ে উপায় নেই। ‘বাঙালী’ হিসেবে দায়িত্ব যেখানে ছিল রাজধানী সরিয়ে নেয়ার বিরোধিতা করা রবি ঠাকুর সেখানে উল্টো ইংরেজ রাজার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে বিনয় ও ভক্তির ন্যক্কারজনক প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন। রাজাকে ভারতের ‘ভাগ্য বিধাতা’ হিসেবে উল্লেখ করে লিখেছিলেন, ‘জয় হে, জয় হে!’ স্মরণ করা দরকার, ‘ভাগ্য বিধাতা’ ও ‘জয় হে’যুক্ত রবীন্দ্রনাথের সে গানটিই এখন ভারতের জাতীয় সঙ্গীত! বলা দরকার, ‘বাঙালী’ রবীন্দ্রনাথরা মুসলিমবিরোধী ইংরেজের কাছে মাথা নত করে ধন্য হলেও ভারতের মুসলমানদের হিন্দু ও ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ক্রমাগত আরো শক্তিশালী ও সর্বাত্মক হয়েছিল। পর্যায়ক্রমে সেটাই মুসলমানদের পৃথক আবাসভূমির আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ছিল সে আন্দোলনেরই সফল পরিণতি।
পরবর্তীকালে ‘পশ্চিম-পাকিস্তান’কেন্দ্রিক শাসক-শোষকদের বিরুদ্ধে পর্যায়ক্রমিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জন করলেও বাংলাদেশের জনমনে ভারত সম্পর্কে মনোভাবে পরিবর্তন ঘটেনি। ভারত নিজেই তা ঘটতে দেয়নি। ভারত বরং শত্রুতাপূর্ণ আচরণ করেছে। ভারতীয়দের নীতি-অবস্থান ও কর্মকা- যে এখনো একই রকম রয়েছেÑ তার সর্বশেষ প্রমাণ পাওয়া গেছে বিজেপি নেতার দাবি ও বক্তব্য থেকে। এখানে শুধু একটি কথা জানিয়ে রাখা দরকার। মিস্টার স্বামীদের কথামতো অতীতের দিকেই যদি ফিরতে হয়, তাহলে মুর্শিদাবাদ ও দার্জিলিং হয়ে কলকাতার পাশাপাশি আসাম ও ত্রিপুরা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা উল্টো বাংলাদেশকেই দিতে হবেÑ এটাই ইতিহাস নির্ধারিত সত্য। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে অবশ্য কিছুই আশা করা যায় না। সুব্রামনিয়াম স্বামীদের দাঁতভাঙা জবাব দেয়াসহ যা কিছু করার সবকিছু দেশপ্রেমিকদেরই করতে হবে। দেশপ্রেমিকরা নিশ্চয়ই অনুধাবন করবেন, স্বাধীন হলেও রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ এখনো ভৌগোলিক দিক থেকে অসম্পূর্ণ রয়েছে।
0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

সরকারের পররাষ্ট্রনীতি


আওয়ামী লীগ সরকারের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে নতুন পর্যায়ে প্রশ্ন ও তীব্র আপত্তি উঠেছে। তিস্তার পানি নিয়ে রীতিমতো শত্রুতাপূর্ণ কার্যক্রম এসেছে প্রধান একটি কারণ হিসেবে। ওই নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার এবং উজানে বাঁধের মাধ্যমে আটকে দেয়া পানি ছেড়ে দেয়ার দাবিতে দেশজুড়ে যখন আন্দোলন জোরদার হচ্ছিল, বিএনপি যখন তিস্তা অভিমুখে লং মার্চ করছিল তখনও ভারত নোংরা ও ধ্বংসাত্মক খেলাই খেলেছে। পানি ছেড়ে দেয়ার অভিনয় করেছে দেশটি। লং মার্চকে ব্যর্থ করার লক্ষ্য নিয়ে ভারত হঠাৎ সাত-আটশ কিউসেক পানি ছেড়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট সকল সূত্রে এ সম্পর্কে জানা গেলেও আমাদের সরকার ভারতের বিরুদ্ধে কোনো শব্দ পর্যন্ত উচ্চারণ করেনি। ক্ষমতাসীন কোনো কোনো নেতা বরং এমনভাবে বিএনপির সমালোচনা করেছেন যেন লং মার্চের কারণে ভারতের সঙ্গে পানি সংক্রান্ত আলোচনা নস্যাৎ হতে চলেছে! অন্যদিকে প্রমাণিত সত্য হলো, পশ্চিম বঙ্গের আপত্তি ও বিরোধিতার অজুহাত দেখিয়ে ভারতই তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষর করা থেকে বিরত রয়েছে। এর ফলে কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটসহ বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে চাষাবাদ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, পুরো এলাকা মরুভূমির পরিণতিও বরণ করতে যাচ্ছে। তিস্তার পানি নিয়ে সর্বনাশা এই রাজনীতির পাশাপাশি অন্য একটি কারণও সম্প্রতি দেশপ্রেমিকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া ঘটিয়েছে। সে কারণ ভারতের প্রধান বিরোধী দল বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা সুব্রামনিয়াম স্বামীর বাংলাদেশ বিরোধী কিছু বক্তব্য। মূলকথায় তিনি বলেছেন, ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ মুসলমান ভারতে অনুপ্রবেশ করেছে। তারা এখনো অবৈধভাবে ভারতে বসবাস করছে। তারা যেহেতু মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ সেহেতু বাংলাদেশকেও তার এক-তৃতীয়াংশ ভূমি ভারতকে দিতে হবে। ফর্মুলাও দিয়েছেন বিজেপির এই নেতা। বলেছেন, খুলনা থেকে সিলেট পর্যন্ত সমান্তরাল রেখা টেনে বাংলাদেশের সম্পূর্ণ ভূমি ভারতের হাতে তুলে দিতে হবে। যুক্তি দেখাতে গিয়ে মিস্টার স্বামী শুধু এক-তৃতীয়াংশ বাংলাদেশী মুসলমানের অনুপ্রবেশ ও বসবাসের তথ্য তুলে ধরেননি, একই সঙ্গে আরো বলেছেন, দেশ বিভাগের সময় ভারতকে ঠকিয়ে নাকি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে অনেক বেশি অঞ্চল দেয়া হয়েছিল! সে কারণেও বাংলাদেশের কাছ থেকে ভূমি আদায় করতে হবে।
আমরা মনে করি, বিজেপির এই কেন্দ্রীয় নেতার দাবি ও বক্তব্যকে হাল্কাভাবে নেয়ার পরিণাম বাংলাদেশের জন্য ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু সব জেনে-বুঝেও আওয়ামী লীগ সরকার যথারীতি মুখ বন্ধই রেখেছে। অথচ রাষ্ট্রের ক্ষমতায় রয়েছে বলে সরকারের উচিত ছিল দাবিটির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং ভারত সরকারের কাছে সুব্রামনিয়াম স্বামীকে গ্রেফতার করার এবং তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানানো। কারণ, কথায় কথায় ক্ষমতাসীনরা ভারতের সঙ্গে তথাকথিত বন্ধুত্বের যে দোহাই দিয়ে থাকেন সুব্রামনিয়াম স্বামী সে বন্ধুত্বে ফাটল ধরানোরই উদ্যোগ নিয়েছেন। অন্যদিকে বিএনপির লং মার্চ কর্মসূচির মধ্যে বন্ধুত্ব নস্যাতের ষড়যন্ত্র আবিষ্কার করলেও বিজেপি নেতার বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ দখলের দাবির মধ্যে সরকার কোনো অসতোদ্দেশ্যই দেখতে পায়নি! সরকারের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর এবং তথাকথিত সুশীল সমাজের নীরবতাও জনগণকে নিরাশই করেছে। এ ব্যাপারে ব্যতিক্রম ঘটিয়েছে কেবল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান এক বিবৃতিতে বিজেপি নেতার দাবি ও বক্তব্যকে প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যর্থ ও নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কারণেই বিজেপির নেতা বাংলাদেশের ভূমি দাবি করার ঔদ্ধত্য দেখাতে পেরেছেন। আমরা জামায়াত নেতার সঙ্গে সম্পূর্ণ একাত্মতা প্রকাশ করি। আমরা একই সঙ্গে ১৯৪৭ সালের দেশবিভাগকালীন বঞ্চনার ইতিহাসও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। কারণ, ঐতিহাসিকরা তো বটেই, আবুল মনসুর আহমদের মতো রাজনীতিক-সাহিত্যিকও ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত লিখে গেছেন। এমনকি স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানের অসাধারণ গ্রন্থ ‘আসমাপ্ত আত্মজীবনী’তেও পূর্ব পাকিস্তানের বিভাগকালীন বঞ্চনা সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্যের উল্লেখ রয়েছে। ঐতিহাসিকদের বিভিন্ন গ্রন্থের পাশাপাশি এ দুটি গ্রন্থ থেকেও জানা যায়, কোলকাতা এবং দার্জিলিং পূর্ব পাকিস্তানের ভাগে পড়ার কথা ছিল। কোনো কারণে না দেয়া গেলে কোলকাতাকে পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম বঙ্গের ‘কমন’ শহর করার ব্যাপারেও সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এছাড়া কোলকাতা সংলগ্ন চব্বিশ পরগণার বারাকপুর, বারাসত, ভাঙ্গর, বশিরহাট ও মুর্শিদাবাদসহ বেশ কিছু এলাকা এবং করিমগঞ্জসহ আসামের বিরাট অঞ্চলও পূর্ব পাকিস্তানকে দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে জওয়াহেরলাল নেহরু ও সরদার বল্লভভাই প্যাটেলদের কূটকৌশল এবং ইংরেজ গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটেনের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে পূর্ব পাকিস্তান বঞ্চিত হয়েছিল সর্বাত্মকভাবে। শেখ মুজিবুর রহমান জানিয়েছেন, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা হওয়া সত্ত্বেও যশোর জেলার বনগাঁ জংশন অঞ্চল, নদীয়ার কৃষ্ণনগর ও রানাঘাট জংশন, সম্পূর্ণ মুর্শিদাবাদ জেলা, মালদহের অর্ধেক অংশ, দিনাজপুরের বালুরঘাট মহকুমা এবং জলপাইগুড়ি ও দার্জিলিং ভারতকে দিয়েছিলেন মাউন্টব্যাটেন। অথচ শেখ মুজিব মনে করতেন, ‘উপরোক্ত জেলাগুলি কিছুতেই পাকিস্তানে না এসে পারতো না।’ ওদিকে সিলেটের গণভোটে জয়লাভ করা সত্ত্বেও মাউন্টব্যাটেন মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ মহকুমা করিমগঞ্জকেও তুলে দিয়েছিলেন ভারতের ভাগে। এই বঞ্চনা শুধু অঞ্চল বা ভূমি না দেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, ক্ষতিপূরণ বাবদ নগদ অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রেও পূর্ব পাকিস্তানকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। কথা ছিল, কোলকাতার বিনিময়ে পূর্ব পাকিস্তানকে নগদে ৩৩ কোটি টাকা দেয়া হবে। ঢাকাকে আন্তর্জাতিক মানে রাজধানী হিসেবে সাজিয়ে তোলার খরচ হিসেবে তখনকার দিনে ৩৩ কোটি টাকা যথেষ্ট ছিল। কিন্তু একেবারে শেষ মুহূর্তে নেহরু-প্যাটেলরা চানক্য হিসাবের কূটচাল চেলেছিলেন। বাজার দরের পরিবর্তে ‘বুক ভ্যালু’র ভিত্তিতে মূল্য নির্ধারণ করায় এবং ইংরেজ সরকার সে দাবি মেনে নেয়ায় পূর্ব পাকিস্তানেরই উল্টো দেনা দাঁড়িয়েছিল ছয় কোটি টাকা। এভাবে ভৌগোলিক এবং অর্থনৈতিকÑ সবদিক থেকেই পূর্ব পাকিস্তানকে তথা আজকের বাংলাদেশকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। সুতরাং বাংলাদেশের কাছে ভূমি দাবি করার আগে সুব্রামনিয়াম স্বামীদের উচিত ইতিহাস স্মরণ করা। কারণ, অতীতের দিকে যদি ফিরতেই হয় তাহলে মুর্শিদাবাদ ও দার্জিলিং হয়ে কোলকাতার পাশাপাশি আসাম ও ত্রিপুরা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা উল্টো বাংলাদেশকেই দিতে হবে। এটাই ঐতিহাসিক সত্য। কিন্তু জাতির দুর্ভাগ্য, এমন এক দল দেশের ক্ষমতায় রয়েছে যার কাছে দেশপ্রেমিক কোনো নীতি-অবস্থান ও ভূমিকাই আশা করা যায় না। সরকারের নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কারণে দিন দিন দেশের ভবিষ্যৎই বরং অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। এই সরকার দেশের মানচিত্রকেও অক্ষত রাখতে পারবে কি না সংশয় দেখা দিয়েছে এমনকি সে ব্যাপারেও।

বৃহস্পতিবার, ২৪ এপ্রিল, ২০১৪

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

ভোট ডাকাতি ও বিবেকের তাড়না


৫ জানুয়ারি ভোট ছাড়াই ১৫৩ জন সংসদ সদস্য বিজয়ী, পরে প্রহসনের একতরফা নির্বাচনে ‘বিজয়ী’ এমপিরা এবং ফেব্র“য়ারি-মার্চ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র দখল করে অপরের বিজয় ছিনিয়ে জয়ী উপজেলা চেয়ারম্যানেরা। আপনারা জনগণের ভোটাধিকার ছিনিয়ে নিয়েছেন। এ কাজ করতে গিয়ে নিরপরাধ প্রতিবাদী বহু মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। ভোটাধিকারবঞ্চিত লাধিক মানুষকে গ্রেফতার করা হলো। সরকার লাখ লাখ নিরপরাধ মানুষের নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করেছে। বাড়িছাড়া করা হলো হাজার হাজার মানুষ, গুম করে চমক সৃষ্টি করা হচ্ছে, দুর্নীতির প্রতিবাদকারী ভোটাধিকারবঞ্চিত মানুষ  বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার। মানুষ যাতে সরকারের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে কথা বলতে না পারে সে জন্য বিােভ করতে দেয়নি। প্রতিবাদী অনেক বেসরকারি গণমাধ্যম বন্ধ। 

আপনারা বিবেকের কাছে পরাজিত। আপনারা নিশ্চয় বিশ্বাস করেন আল্লাহ আছেন এবং আপনাদের সব কর্মের হিসাব আখেরাতে দিতে হবে। এখন হয়তো অনেকেই মতার দম্ভে নামাজ-রোজা করেন না, মৃত্যুপরবর্তী জীবনকে তুচ্ছ বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন।

বয়সের ভারে যখন আপনি ন্যুব্জ হয়ে পড়েছেন, তখন ভোট ডাকাতি করে বিজয়ী হওয়ার বিষয়ে বিবেক আপনাকে তাড়িয়ে বেড়াবে। তখন মোটেই শান্তি পাবেন না। আপনার বিবেক বলবে : ‘তুমি ভোট ডাকাত, ভোট চোর !’ যেসব কেন্দ্র দখল করে আপনি বিজয়ী হয়ে অপরের অধিকার কেড়ে নিয়েছিলেন, এমনই একটি কেন্দ্রের সামনে দিয়ে যখন যাচ্ছেন, তখনি বিবেক বলে দেবে, ‘এই কেন্দ্র দখল করে তুমি এমপি বা উপজেলা চেয়ারম্যান হয়েছিলে।’ যখন এমপি বা উপজেলা চেয়ারম্যান থাকবেন না, আপনার আর মতা নেই, আপনার দরবারে তোষামোদকারীরা আসবে না। কেউ আপনার কথা আর শুনবে না। তখন আপনি মৃত্যুর জন্য শুধু অপো করছেন, ভীত হয়ে পড়েন, কষ্ট পান; ভোট ডাকাতির কথা মনে করে। যদি বিজয়ী হওয়ার জন্য কাউকে হত্যা করে থাকেন, ওই প্রতিবাদী মানুষের চেহারা ভেসে উঠবে এবং আপনি মনে মনে বলবেন : এই নিরপরাধ মানুষকে আমার হুকুমে হত্যা করা হয়েছিল। বিবেক বলবে, ‘মানুষটার আত্মা তোমাকে অভিশাপ দিচ্ছে।’ এই ভেবে কষ্ট পাবেন, ‘আজরাইল তো এখনি আমার জান নিয়ে পাড়ি দেবে, কেন তাহলে এত কিছু করে এমপি বা উপজেলা চেয়ারম্যান হয়েছিলাম?’

জুমার নামাজ আদায়ের জন্য আপনি মসজিদে গেছেন, ইমাম সাহেব মানুষের অধিকার হরণের পরিণাম সম্পর্কে আলোচনা করার সময় দু’টি হাদিস শোনানÑ একটি হলো : হজরত আবু হুরাইরাহ রা: বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সা: সাহাবিগণকে জিজ্ঞাসা করলেন : তোমরা কি জানো নিঃস্ব কোন ব্যক্তি? তারা বললেন : আমাদের মধ্যে তো নিঃস্ব সেই ব্যক্তি যার অর্থকড়ি ও সহায় সামগ্রী নেই, তখন তিনি বললেন : আমার উম্মতের মধ্যে নিঃস্ব তারা, যারা কিয়ামতের দিন সালাত, সাওম, জাকাত ইত্যাদি নিয়ে উপস্থিত হবে, সেই সাথে এগুলোও নিয়ে আসবে যে, সে কাউকে গালি দিয়েছে, কাউকে অপবাদ দিয়েছে, কারো অর্থসম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগদখল করেছে, কাউকে অন্যায়ভাবে মেরেছে বা খুন করেছে। ফলে কিয়ামতের দিন সেই লোকদের তার নেক আমল থেকে তিপূরণ দিয়ে দেয়া হবে; কিন্তু মানুষের তিপূরণ দিয়ে শেষ করার আগেই যদি তার নেক আমল ফুরিয়ে য়ায়, তখন তাদের পাপগুলো এনে তার ওপর চাপানো হবে। অতঃপর তাকে জাহান্নামে ফেলে দেয়া হবে (সহিহ মুসলিম)। অপরটি হলো: হজরত আবু হুরাইরাহ রা: বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন : যে কেউ তার কোনো (মুসলিম) ভাইয়ের প্রতি ইজ্জত বা অন্য কোনো অধিকার হরণের মাধ্যমে জুলুম করেছে, সে যেন আজই তা মিটমাট করে নেয়। কারণ কিয়ামতের দিন তো কারো কাছে অর্থকড়ি থাকবে না, ভালো আমল যা থাকবে তা ওই জুলুমের বিনিময়ে দিয়ে দিতে হবে। আর যদি তার নেকি বা ভালো আমল পাওয়া না যায়, তাহলে মজলুমের পাপ এনে তার ঘাড়ে চাপানো হবে (সহিহ মুসলিম)।

এ হাদিস দু’টি শোনার পর বিবেক আপনাকে পীড়া দিচ্ছে যে, আপনি হাজার হাজার মানুষের ভোটাধিকার হরণ করেছেন। সত্যিকার অর্থে যিনি বিজয়ী হতেন তার অধিকার হরণ করেছেন। তখন হয়তো কোনো মানুষকে খুন, কোনো মানুষকে আহত করা হয়েছে।

মানুষের অধিকার নষ্ট করলে ওই অধিকার বঞ্চিত ব্যক্তি যদি মাফ না করে তাহলে কেউ মাফ পাবে না। আপনার মন বলছে, ওই মানুষগুলোকে যদি পেতাম তাহলে মাফ চেয়ে নিতাম; কিন্তু তাদের অনেকেই মারা গেছে, অনেককেই চেনেন না। অনেকেই আপনার দলীয় কর্মীদের নির্যাতনে এলাকাছাড়া। কষ্ট পাচ্ছেন পরকালের কথা ভেবে। 

উপজেলা চেয়ারম্যান হয়ে অবৈধ টাকা প্রচুর আয় করেছেন। বড় অঙ্কের ভাতা তো ছিলই। এসব আয় দিয়ে নিশ্চয়ই একটি সুন্দর বাড়ি বানিয়েছেন। শেষ বয়সে মাথায় টুপি দিয়ে বাড়ির বারান্দায় বসে রাস্তায় কর্মব্যস্ত মানুষের যাওয়া-আসা দেখছেন। একদিন দেখতে পেলেন, রাস্তা দিয়ে লাশ নিয়ে যাচ্ছে দাফন করার জন্য। মৃত মানুষটিকে দেখে নিজের মৃত্যুর কথা মনে করে ভীত হয়ে পড়েন। আপনার ব্লাড প্রেসার বেড়ে গেছে, হাঁপানি বেড়ে গেছে। মাঝে মাঝে এমন হয় যেন এখনি আপনার জীবনটা চলে যাবে।

এমপি বা উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে অনেক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেছিলেন। কোনো এক ইসলামি অনুষ্ঠানে আপনাকে অর্থসহ কুরআন শরীফ দিয়েছিল। তা বাড়িতে এনে রেখে দিয়েছিলেন। সে সময়ে হয়তো কুরআন পড়েননি। জীবনের এই পড়ন্ত বেলায় সকাল বিকাল সেই কুরআন শরীফ অর্থসহ পড়ার চেষ্টা করেন। হয়তো আজ কুরআন শরীফের সূরা ইব্রাহীমের ২১ নম্বর আয়াত অথবা সূরা সাবার ৩১-৩৩ নম্বর আয়াত অথবা সূরা মুমিনের ৪৭-৫০ নম্বর আয়াত পড়ছেন। অথবা সূরা সাফফাত ২৭--৩২ আয়াত ‘আর সেই লোকেরা যখন একত্র হয়ে আল্লাহর সামনে উন্মুক্ত হবে, তখন এদের মধ্যে যারা পৃথিবীতে দুর্বল (অনুসারীরা) ছিল তারা, যারা বড়লোক (নেতৃস্থানীয়) ছিল, তাদেরকে বলবে : পৃথিবীতে আমরা তোমাদের অধীন ছিলাম। আজ আমাদেরকে তোমরা আল্লাহর আজাব থেকে বাঁচাতে কিছু করতে পারো কি? তারা বলবে : আল্লাহ যদি আমাদেরকে মুক্তির কোনো পথ দেখাতেন তবে অবশ্যই আমরা তোমাদেরকে (মুক্তির) পথ দেখাতাম। এখন আহাজারি করি কিংবা ধৈর্য ধারণ করি উভয়ই আমাদের জন্য সমান, আমাদের রা ও মুক্তির কোনো উপায় নেই’ সূরা ইব্রাহীম : ২১। 

এবার সূরা সাফফাত পড়তে গিয়ে দেখেন ২৭-৩২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘তারা একে অপরকে ল্য করে কথা কাটাকাটি করবে। সাগরেদরা নেতাদেরকে বলবে, আমাদের কাছে তোমাদের আগমন দাপট ও প্রভাবসহকারে হতো। নেতারা বলবে, বরং তোমরাই ঈমান আনো নাই। তোমাদের ওপর আমাদের কোনো প্রভাব ছিল না। বরং তোমরা নিজেরাই দুষ্কর্মকারী ছিলে, সুতরাং আমাদের সবারই ওপর আমাদের রবের এ কথা সাব্যস্ত হয়ে গেছে যে, আমরা শাস্তি ভোগ করব। আসলে আমরা তোমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছি। কেননা আমরা নিজেরাই পথভ্রষ্ট ছিলাম। ’

এই আয়াতগুলো পড়ার পর আতঙ্কিত হয়ে উঠবেন। আর বলবেন সর্বনাশ! আমি কাকে নেতা বানিয়ে রাজনীতি করেছি। আর আমাকে কারা নেতা মেনে অনুসরণ করেছে, আমার কথায় যারা ভোট ডাকাতি ও কারচুপি করেছে এরা সবাই আমার শত্র“ এবং আমিও তাদের শত্র“; জাহান্নামের সঙ্গী। আপনি যখন কুরআন শরীফের সূরা মায়ারিজের ১০-১৪ নম্বর আয়াতে ‘সে দিন কোনো প্রাণের বন্ধু নিজের প্রাণের বন্ধুকেও জিজ্ঞাসা করবে না। অথচ তাদের পরস্পর দেখা হবে। অপরাধীগণ সে দিনের আজাব থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য নিজের সন্তান, স্ত্রী, ভাই, তাকে আশ্রয়দানকারী নিকটবর্তী পরিবার এবং পৃথিবীর সমস্ত লোককে বিনিময় দিয়ে হলেও মুক্তি পেতে চাইবে।’ পড়বেন আর শুধু ক্রন্দন করতে থাকবেন। আর বলবেন : ‘ভোট ডাকাতি করে এমপি বা উপজেলা চেয়ারম্যান হয়ে অবৈধ বেতনভাতা নিয়েছি, বিভিন্ন প্রকল্প থেকে ভাগ নিয়েছি, চাঁদাবাজি করেছি। তা দিয়ে সুন্দর বাড়ি করেছি, ছেলে মেয়ে, স্ত্রী ও আপনজনদের পেছনে সব ব্যয় করেছি, তা আজ আর আমার কোনো কাজে লাগছে না।’ যাদের পেছনে আপনি ব্যয় করেছেন, তারা আপনাকে নিয়ে ভাববে না। যেমন আপনি পরিণাম ভাবেননি। একদিন জুমার দিনে ইমাম সাহেব খুৎবায় বললেন : নেক সন্তান মৃত বাবা-মায়ের জন্য দোয়া করলে আল্লাহ দোয়া কবুল করেন। আপনি ভোট ডাকাতি করে অপরের অধিকার ছিনিয়ে আমলনামা শূন্য করে ফেলেছেন। ফলে তা পরকালে আপনার জান্নাতে যাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। তখন কি সন্তানেরা আপনার জন্য আল্লাহর কাছে হাত তুলবে! কিন্তু হয়তো তারা নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকবে।

ভাবতে ভাবতে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়বেন। সবাই আপনাকে আল্লাহর নাম স্মরণের জন্য পরামর্শ দেবে। এ সময় আপনার মনের আয়নায় ভেসে উঠবে কারচুপি, ভোট ডাকাতি, অপরের অধিকার হরণ, মানুষ খুন-গুম। দুনিয়ার বাহাদুরি আজ আর কোনো কাজে লাগছে না। 

এমন সময় মৃত্যুর ফেরেশতা আজরাইল এসে যাবেন জান কবজের জন্য। কুরআন শরীফের সূরা আনফালের ৫০ নম্বর আয়াত : ‘তোমরা যদি সেই অবস্থা দেখতে পেতে, যখন ফেরেশতারা কাফিরদের জান কবজ করবে! জান কবজের সময় ফেরেশতারা তাদের মুখমণ্ডল এবং পৃষ্ঠদেশে আঘাত করতে থাকে আর বলতে থাকেন যাও, এবার আগুনে জ্বলবার শাস্তি ভোগ করগে!’এভাবেই আপনার মৃত্যু হয়ে গেল। যদি আপনি সারা জীবন আল্লাহর বিধান অনুযায়ী মানুষের কল্যাণে কাজ করতেন তাহলে আপনার মৃত্যু কেমন হতো? আল্লাহ বলেন, ‘সেসব লোক যাদেরকে পবিত্র জীবনের অধিকারী (মুত্তাকি) অবস্থায় ফেরেশতারা জান কবজ করতে আসে, তাদেরকে বলে : তোমাদের প্রতি সালাম, শান্তি বর্ষিত হোক। তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করো, তোমাদের আমলের বিনিময়ে’ (সূরা নাহল-৩২)।

এবার আপনাকে দাফন-কাফনের জন্য সবাই ব্যস্ত। গোসল দিয়ে সাদা কাপড়ে মোড়ানো হলো। দলের নেতাকর্মীরা আপনাকে নিয়ে রাজনীতি করল, তারা দলীয় পতাকা আর ফুল দিয়ে সাদা কাপড়ে মোড়ানো লাশ ঢেকে দিলো। নামাজে জানাজার জন্য নিয়ে যাওয়া হলো শহরের বড় মসজিদে। অন্ধকার কবরে দাফন করে যে যার মতো ফিরে গেল, একেকজন একেক মন্তব্য করতে করতে। আপনি দুনিয়াতে সমালোচিত হলেন এবং পরকালও আপনার শূন্য হয়ে গেল। 

মুহাম্মদ শাহাবুদ্দীন বিশ্বাস


 

Ads