বুধবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৩

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

বেগম খালেদা জিয়ার আহ্বান


গত ২ ডিসেম্বর রাতে দেয়া এক বিবৃতিতে ১৮ দলীয় জোটের নেত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আন্দোলনরত নেতা-কর্মী ও জনগণের পাশাপাশি সরকার, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে যার যার ভূমিকা পালন করার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। সরকারকে বলেছেন, উৎপীড়ন ও নির্মূল অভিযান এবং চক্রান্ত ও অন্তর্ঘাতের পথ ছেড়ে সমঝোতার মাধ্যমে শান্তি ফিরিয়ে আনার পথে এগিয়ে আসার জন্য। নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশে বলেছেন, বিশেষ দলের ক্রীড়নক হওয়ার পরিবর্তে একতরফা নির্বাচনের ঘোষিত তফসিল স্থগিত করতে। প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বলেছেন, দেশপ্রেমিক অবস্থান নিয়ে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে। আর আন্দোলনরত নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে বলেছেন, সরকারের গু-া-সন্ত্রাসীরা পৈশাচিক হত্যাকা- ও ধ্বংসাত্মক নানা কর্মকা-ে তৎপর রয়েছে বলেই তাদের লক্ষ্য রাখতে হবে, যাতে একজন নিরীহ মানুষও কোনো হামলার শিকার না হয় এবং কোথাও যাতে সাধারণ মানুষের কোনো সম্পদের ক্ষতি না হয়। নির্বাচনকালীন নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে ও জনগণের প্রতি সে আন্দোলনে অংশ নেয়ার আহ্বান জানিয়ে বিবৃতির শেষাংশে বেগম খালেদা জিয়া ঘোষণা করেছেন, ‘ইনশাআল্লাহ বিজয় আমাদের সুনিশ্চিত ও অতি নিকটবর্তী।’
আমরা দেশপ্রেমিক প্রধান জাতীয় নেত্রীর অবস্থান থেকে দেয়া বেগম খালেদা জিয়ার এই আহ্বানকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োচিত মনে করি। কারণ, কোনো একটি প্রসঙ্গেই তিনি যুক্তি ও তথ্য ছাড়া কিছু বলেননি। যেমন সরকারের অপকৌশল ও কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ১৮ দলীয় জোটসহ বিরোধী দলগুলো যখন দেশ এবং দেশের মানুষকে বাঁচানোর জন্য আন্দোলন করছে, তখন মিথ্যা মামলা দায়ের ও গ্রেফতার করার এবং দমন-নির্যাতন চালানোর পাশাপাশি সরকার নিয়েছে জনগণ এবং আন্তর্জাতিক জনমতকে বিভ্রান্ত করার কৌশল। তিনি যুক্তি ও ব্যাখ্যাসহ অভিযোগ করেছেন, আওয়ামী লীগের গু-া-সন্ত্রাসীরাই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ছত্রছায়ায় সুপরিকল্পিতভাবে অগ্নিসংযোগ ও মানুষ হত্যার নৃশংস কর্মকা- চালিয়ে বিরোধী দলের ওপর দোষ চাপানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এ দুর্বৃত্তরাই চলন্ত যানবাহনে পেট্রল ঢেলে ও আগুন জ্বালিয়ে পৈশাচিকভাবে নারী, শিশু, বৃদ্ধসহ মানুষ পুড়িয়ে মারছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার মধ্যে নিরাপদে থেকে ক্ষমতাসীন নেতারা সব দোষ চাপাতে চাচ্ছেন আন্দোলনকারী নেতা-কর্মীদের ওপর। তারা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করছেন।
বলার অপেক্ষা রাখে না, বেগম খালেদা জিয়ার কথাগুলোর মধ্যে অনস্বীকার্য যুক্তি রয়েছে। বিশেষ করে চলন্ত যানবাহনে পেট্রল ঢেলে ও দগ্ধ করে মানুষ হত্যার ব্যাপারে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে তিনি যে গুরুতর অভিযোগ এনেছেন, তার পেছনে চারদলীয় জোট সরকারের সময় শেরাটন হোটেলের সামনে বাসে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মানুষ হত্যার মতো ‘ঐতিহাসিক’ সত্যতা রয়েছে। তাছাড়া দুটি প্রশ্নেরও উত্তর লক্ষ্য করা দরকার। প্রথম প্রশ্নটি হলো, আন্দোলনরত বিরোধী দল কেন এমন নৃশংস কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়বে যার কারণে জনমত তাদের বিপক্ষে চলে যাবে? দ্বিতীয় প্রশ্নটি হলো, ক্ষমতাসীনরা পুড়িয়ে মানুষ হত্যার অভিযোগ তুললেও আজও পর্যন্ত কেন বিরোধী দলের একজন কথিত দুর্বৃত্তকেও গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হয়নি বা হচ্ছে না? প্রশ্ন দুটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ এ কারণে যে, বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যথেষ্ট যোগ্য ও সক্ষম। সুযোগ দেয়া হলে দুর্বৃত্তদের চিহ্নিত ও গ্রেফতার করা তাদের জন্য কয়েক মিনিটের বিষয় হওয়ার কথা। তা সত্ত্বেও একদিকে কোনো একজন প্রকৃত দুর্বৃত্তকেই গ্রেফতার করা হচ্ছে না এবং অন্যদিকে বিএনপির শীর্ষ ও বয়সে প্রবীণ নেতাদের বোমা হামলা, অগ্নিসংযোগ ও হত্যার অভিযোগে কারাগারে ঢোকানো হচ্ছে বলেই বেগম খালেদা জিয়া প্রশ্ন দুটি না তুলে পারেননি। পর্যালোচনায় কিন্তু তার অভিযোগের সত্যতাই প্রমাণিত হবে। আসলেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি দলীয় গু-া-সন্ত্রাসীদের দিয়ে হত্যার পৈশাচিক অভিযান সরকারই চালাচ্ছে। উদ্দেশ্য সম্পর্কেও বেগম খালেদা জিয়া যথার্থই বলেছেন। ক্ষমতাসীনরা বিরোধী দলের ওপর দোষ চাপাতে এবং জনগণকে নিজেদের পক্ষে টানতে চাচ্ছেন। কিন্তু সুচিন্তিত হলেও ক্ষমতাসীনদের এই ষড়যন্ত্র হালে পানি পায়নি বরং তাদের নোংরা উদ্দেশ্যই ধরা পড়ে গেছে। সাধারণ মানুষও বুঝে ফেলেছে, র‌্যাব পুলিশ ও গোয়েন্দাদের চোখের সামনে যানবাহনে আগুন আসলে কারা দিচ্ছে এবং কারা মানুষ পুড়িয়ে মারছে।
সমগ্র এ প্রেক্ষাপটেই ক্ষমতাসীনদের উচিত মানুষ হত্যার পৈশাচিক অভিযান বন্ধ করা এবং প্রকৃত দুর্বৃত্তদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা। এ ব্যাপারে প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদেরও উচিত দেশপ্রেমিক অবস্থান নেয়া এবং বেগম খালেদা জিয়ার আহ্বানে সাড়া দিয়ে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করা। তারা সততার সঙ্গে তৎপর হলেই দুর্বৃত্তরা ধরা পড়বে বলে জনগণ বিশ্বাস করে। বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে নির্বাচন কমিশনকেও প্রহসনের নির্বাচন অনুষ্ঠানের চেষ্টা থেকে সরে আসতে হবে। কারণ, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে তাদের কর্তব্য সব দলের অংশগ্রহণকে নিশ্চিত করা, দলবিশেষকে ক্ষমতায় আনার সিঁড়ি নির্মাণ করা নয়। কমিশনের তাই সরকারের ক্রীড়নক হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া উচিত নয়। বরং বেগম খালেদা জিয়ার আহ্বানে সাড়া দিয়ে এবং প্রহসনের নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্যে ঘোষিত তফসিল স্থগিত করে কমিশন এখনো জাতীয় স্বার্থে অবদান রাখতে পারে। সেটাই কমিশনের কর্তব্যও। সরকারের জন্যও এখনো সময় ও সুযোগ রয়েছে। আওয়ামী মহাজোটের দ্বিতীয় প্রধান শরিক দল জাতীয় পার্টিও নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেয়ার ফলে সরকারের সামনে সব পথই বন্ধ হয়ে গেছে। ইনু-মেনন ধরনের দু’চারজন মাত্র নিন্দিত ও গণধিকৃত ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে কোনো নির্বাচন করলে তার ফলাফল প্রত্যাখ্যাত হবে তাৎক্ষণিকভাবে। সুতরাং ক্ষমতাসীনদের উচিত জনগণের ভাষা ও পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করা এবং সংকীর্ণ রাজনীতির পথে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা ছেড়ে গণতন্ত্রসম্মত পথে ফিরে আসাÑ যার আহ্বান বেগম খালেদা জিয়া জানিয়েছেন। একথাও বুঝতে হবে যে, নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে চলমান আন্দোলনে নিশ্চিতভাবেই বিজয় অর্জন করবে। সুতরাং বেগম খালেদা জিয়ার আহ্বানে সাড়া দিয়ে যার যার অবস্থান থেকে জাতীয় স্বার্থে ভূমিকা পালন করার মধ্যেই সকলের জন্য কল্যাণ নিহিত রয়েছে। তেমন ভূমিকা পালন করাই এখন সকলের দায়িত্ব।
0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

এই দুঃসময় কখন কীভাবে শেষ হবে


দেশের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে আমরা অবগত। এমন দেশ তো আমরা চাইনি যে দেশে দমন-অবদমন, গুলী, ককটেল, ভাংচুর আর অগ্নিশিখায় রাজপথ-রেলপথ অবরুদ্ধ হয়ে থাকবে। প্রতিযোগিতামূলক বর্তমান বিশ্বে প্রগতির পথে হাঁটার বদলে আমরা জুলুম-নির্যাতন ও সহিংসতার এ কোন পথে চলছি। এমন দৃশ্য দেশের কোনো নাগরিকেরই কাম্য নয়। কিন্তু না চাইলেও ধ্বংসের এ পথ আমাদের জন্য কেন অনিবার্য হয়ে উঠলো? আমরা কি কখনো সততার সাথে ঘটনার পর্যালোচনা করে দেখেছি, কখনো কি নিজ নিজ অবস্থান থেকে আত্মসমালোচনার দায়িত্ব পালন করেছি? আমরা যে দায়িত্ব পালন করিনি, তার প্রমাণ দেশের বর্তমান পরিস্থিতি। দেশ তো কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী, কিংবা দলের নয়। দেশ হলো একটি জনপদ, এই জনপদ জনগণের তথা সব মানুষের। দেশের প্রকৃত মালিক জনগণ বিধায় শাসকদের চলতে হয় গণতন্ত্রের পথে। কিন্তু দুঃখের সাথে উল্লেখ করতে হয়, গত পাঁচটি বছর আমাদের প্রিয় স্বদেশ গণতন্ত্রের পথে চলতে পারেনি। শাসকগোষ্ঠী গণতন্ত্রের পথে চলতে দেয়নি দেশকে। চাতুর্য, প্রহসন আর স্বৈরাচারী মনোভাব দেশকে ভুল পথে পরিচালিত করেছে, দ্বন্দ্ব-সংঘাত আর কলহের মাত্রা বৃদ্ধি করেছে। এর পরিণাম হলো দেশের বর্তমান সহিংস রাজনীতি। ইতিহাসের পাঠক মাত্রই একথা জানেন যে, ক্ষমতার উত্তাপে অন্ধ শাসকরা যখনই বিরোধী পক্ষ ও ভিন্ন মতকে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে, দমন-পীড়নের মাধ্যমে বিপর্যস্ত করতে চেয়েছে তখনই সংশ্লিষ্ট দেশে লক্ষ্য করা গেছে রাজনীতির সহিংস রূপ। যে রূপ এখন আমরা বাংলাদেশে লক্ষ্য করছি।
নির্বাচনকালীন এই সময়ে দেশে প্রয়োজন ছিল শান্তিপূর্ণ পরিবেশ। কিন্তু ক্ষমতার মোহে একদলীয় নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের আগ্রহের কারণে দেশে এখন বিরাজ করছে সহিংস ও অশান্ত পরিবেশ। এমন পরিবেশ থেকে দেশের জনগণ মুক্তি চায়। জনগণের আকাক্সক্ষার পক্ষে কথা বলেছেন দেশের বিশিষ্টজনরা, কথা বলছেন বিদেশী কূটনীতিকরা, বার্তা পাঠিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিবও। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। বর্তমান সংঘাতময় পরিবেশ দূর করার ক্ষেত্রে অর্থপূর্ণ দায়িত্ব পালন করার কথা সরকারের। কিন্তু সরকার সেপথে হাঁটছে না। কিন্তু কেন? এ কেন’র জবাব খুঁজতে গেলে সরকারের ত্রুটি যেমন ধরা পড়ে, তেমনি ধরা পড়ে বিদেশীদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের বিষয়ও। কোনো দেশের সরকার যখন এমন পাঁকে জড়িয়ে পড়ে তখন দেশের বিপদ ও জনগণের দুঃখের মাত্রাই শুধু বাড়ে। জানি না এমন দুঃসময় কখন, কীভাবে শেষ হবে?
নির্বাচনের আর মাত্র ক’টা দিন বাকী। এ সময় একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রয়োজন ছিল লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড। এ ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করার কথা বর্তমান নির্বাচনকালীন সরকার ও নির্বাচন কমিশনের। কিন্তু তেমন কোনো উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এমন কি আমাদের বাকপটু তথ্যমন্ত্রীর বিবেচনায়ও নির্বাচনকালীন আবহ সৃষ্টির কোনো উপলব্ধি আছে কিনা তা আমরা জানতে পারিনি। উপলব্ধি থাকলে নির্বাচনকালীন এই সময়টায় দিগন্ত টিভি, ইসলামিক টিভি ও আমার দেশ পত্রিকা বন্ধ থাকে কেমন করে? গত মঙ্গলবার তথ্য মন্ত্রণালয়ে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর সাথে বৈঠককালে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা দিগন্ত টিভি, ইসলামিক টিভি ও আমার দেশ পত্রিকা চালুর আহ্বান জানান। তখন আমাদের তথ্যমন্ত্রীর কেমন লেগেছে তা আমরা জানি না, তবে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের এ আহ্বানে আমরা লজ্জিত হয়েছি। কারণ গণতন্ত্রের প্রবক্তা ও প্রগতিশীল রাজনীতির ধারক আমাদের তথ্যমন্ত্রী এতদিনেও উপলব্ধি করতে পারলেন না যে, ভিন্নমতের প্রচার মাধ্যম বন্ধ করে রাখার মধ্যে কোনো বীরত্ব বা সুশাসনের লক্ষণ নেই। কাপুরোষোচিত এমন মানসিকতার কারণেই একজন তথ্যমন্ত্রীকে বিদেশী রাষ্ট্রদূতের নসিহত শুনতে হলো।
মঙ্গলবার যখন ভিন্নমতের গণমাধ্যমগুলো চালু করার নসিহত করা হলো আমাদের তথ্যমন্ত্রীকে, তখন গণমাধ্যম সম্পর্কিত আরেকটি খবর লক্ষ্য করা গেলো পত্রিকার পাতায়। ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় তিনদিনব্যাপী অনুষ্ঠানরত তৃতীয় আন্তর্জাতিক ইসলামী মিডিয়া সম্মেলনের উদ্বোধনকালে মুসলিম দেশগুলোর গণমাধ্যমে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে ইসলাম এবং মুসলিম দেশগুলোর ইতিবাচক ভাবমর্যাদা তুলে ধরার আহ্বান জানানো হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রী সুরায়া ধর্মা আলী ও মুসলিম ওয়ার্ল্ড লীগের সেক্রেটারি জেনারেল ড. আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মোহসিন আল তুর্কি এই সম্মেলনের উদ্বোধন করেন। সম্মেলনে বিভিন্ন মুসলিম দেশের সরকার ও মিডিয়ার চার শতাধিক মিডিয়া প্রতিনিধি অংশ নিয়েছেন। এই সম্মেলনে তো মুসলিম দেশগুলোর গণমাধ্যমসমূহের পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে ইসলাম, মুসলমান ও মুসলিম দেশসমূহের ইতিবাচক ভাবমর্যাদা তুলে ধরার আহ্বান জানানো হয়েছে। কিন্তু এ ব্যাপারে আমাদের সরকার ও তথ্যমন্ত্রীর ভূমিকাটা কেমন? তাদের কর্মসূচিতে ইসলাম ও মুসলমানদের ভাবমর্যাদা সমুন্নত করার তেমন লক্ষণ দেখা যায় না। বরং বিশ্বব্যাপী বর্তমানে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে জঙ্গি ও সাম্প্রদায়িকতার উদ্দেশ্যমূলক যে প্রোপাগান্ডা চালানো হচ্ছে, অনেক সময় তাদের সাথেই এদের কণ্ঠ মেলাতে দেখা যায়। এমন ভূমিকা বাংলাদেশের জনগণ পছন্দ করে না। আমাদের তথ্য মন্ত্রণালয় যে, ইসলাম ও মুসলমানদের ভাবমর্যাদা সমুন্নত করার ব্যাপারে আগ্রহী নন তার বড় প্রমাণ, ইসলাম ও মুসলমানদের স্বার্থ সংরক্ষণে সচেতন দিগন্ত টিভি, ইসলামিক টিভি ও আমার দেশ পত্রিকা বন্ধ করে রাখা।
আমরা একথা শুনতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি যে, বর্তমান পৃথিবী যেন একটি বড় গ্রাম। ফলে আন্তর্জাতিক সভ্যতা ও রাজনীতির প্রভাব আমাদের এই ছোট্ট দেশ বাংলাদেশেও এসে পড়ে। আমরা হান্টিংটনের ‘ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশনের কথা জানি। এ গ্রন্থে তিনি স্পষ্ট করেই  বলেছেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পাশ্চাত্য সভ্যতার জন্য এখন ইসলামই বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ ইসলাম একটি সভ্যতা। পাশ্চাত্য এখন অস্ত্র, অর্থ ও মিডিয়া শক্তিতে প্রবল। এইসব ক্ষেত্রে দুর্বল মুসলমানদের ওপর আঘাত হানার এখনই সময়। সে আঘাতের চিত্র আমরা বিভিন্ন মুসলিম দেশে লক্ষ্য করেছি। সে আঘাত এসে পড়ছে বাংলাদেশেও।
বাংলাদেশে কথায় কথায় কিছু লোককে আমরা জঙ্গি ও সাম্প্রদায়িকতার বুলি আওড়াতে দেখি। এরা গণতন্ত্র প্রসঙ্গে ভারতের উদাহরণ দিতে গদগদ হয়ে পড়েন, কিন্তু ভারতের জঙ্গি ও সাম্প্রদায়িক তৎপরতা সম্পর্কে মুখ বন্ধ করে রাখেন। সচেতন যে কোনো ব্যক্তিই একথা স্বীকার করবেন যে, বাংলাদেশ একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। মাঝে মাঝে এখানে সংখ্যালঘুদের ওপর যে দু’একটি হামলার ঘটনা ঘটে, তাতে সংশ্লিষ্ট থাকে কিছু দুর্বৃত্ত ও ক্ষমতাসীন দলের কিছু ভ্রষ্ট নেতা-কর্মী। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা পাবনার সাঁথিয়ায় সংখ্যালঘু পরিবারের ওপর হামলার যে ঘটনা ঘটতে দেখেছি তাতেও জড়িত ছিল সরকারি দলের লোকজন। এটি আসলে দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচারের চিত্র। এমন অত্যাচার থেকে দুর্বল মুসলমানরাও রক্ষা পায় না। আর বাংলাদেশে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিচ্ছিন্ন যে দু’একটি ঘটনা লক্ষ্য করা গেছে, তার সাথে জড়িত থাকতে দেখা গেছে দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রকারীদের উদ্যোগে বিভ্রান্ত কিছু মানুষকে। প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশে মূল ধারার ইসলামী রাজনৈতিক দল কিংবা মুসলিম জনসাধারণের এজেন্ডায় জঙ্গিবাদ কিংবা সাম্প্রদায়িকতার বিষয়গুলো নেই। কিন্তু এ সত্য উচ্চারণ করবে কে?
একপেশে এই বিশ্ব ব্যবস্থায় ন্যায় ও সত্যের দুর্ভিক্ষ চলছে। যার জোর বেশি, যার প্রোপাগান্ডার শক্তি ব্যাপক তার ইচ্ছাই সত্য বলে মেনে নিচ্ছে বর্তমান সভ্যতা। প্রকৃত সত্য কী, ন্যায় কি তা জানার মতো সাহস ও নৈতিক শক্তি যেন হারিয়ে ফেলেছে বর্তমান সময়ের মানুষ। ফলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই যুগেও আমাদের বসবাস আলো ঝলমলে এক জাহেলিয়াতে। নইলে সাম্প্রদায়িকতা ও সন্ত্রাসের মতো ঘটনায় শুধু মুসলমানদের অভিযুক্ত করা হবে কেন? আর কেউ কি সন্ত্রাস করছে না? সাম্প্রদায়িক হিংসার অনল জলছে না? ন্যায় ও সত্যবিমুখ বর্তমান সভ্যতার চ্যাম্পিয়নদের কাছে এ প্রশ্নের কোনো জবাব নেই। অথচ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, সত্য ও ন্যায়ের বিকাশ না ঘটলে কোনো সমাজ ও সভ্যতায় কাক্সিক্ষত শান্তি আসতে পারে না। এ কারণেই হয়তো বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থার কুশীলবরা নানাভাবে শান্তির ললিতবাণী উচ্চারণের পরও বিশ্বে ক্ষোভ ও হিংসার মাত্রা বেড়েই চলছে। তাই বিশ্বের বিবেকবান মানুষকে এখন ন্যায় ও সত্যের পক্ষে মেরুদ- সোজা করে দাঁড়াতে হবে। এটাই সময়ের দাবি।
বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় নানাভাবে মুসলমানরা নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। ফলে ‘মুসলিম’ ও ‘মজলুম’ শব্দ এখন সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ২৪ নবেম্বর অ্যাঙ্গোলায় পবিত্র ধর্ম ইসলামকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মুসলমানদের মসজিদ ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। এমন ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মুসলিম সংস্থাসমূহ। এর আগে বার্মা ও ফিলিপাইনে মুসলিম সংখ্যালঘুদের ওপর নজিরবিহীন নিষ্ঠুর আচরণ করা হয়েছে। কাশ্মিরে ও ফিলিস্তিনে দীর্ঘদিন ধরে চলছে মুসলমানদের ওপর জুলুম-নির্যাতন। এমনকি উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত সুইডেনেও মুসলমানদের মসজিদে হামলার ঘটনা ঘটেছে। সুইডেনের স্টকহোমের দক্ষিণে অবস্থিত ফিতজা মসজিদে ভাংচুরের পর ভেতরে শুকরের মল নিক্ষেপ করা হয়েছে। বর্তমান সভ্যতায় এসব ঘটনার প্রতিকার না হওয়ায় মুসলমানরা একদিকে জুলুম-নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, অপরদিকে তাদের কোণঠাসা করার জন্য চলছে অপপ্রচার ও কৌশলী প্রোপাগান্ডা। এসব অপকর্ম ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে মুসলমানদের শুধু নিন্দা জানালে চলবে না, এর সঙ্গত ও জ্ঞানদীপ্ত জবাব দানের যোগ্যতাও অর্জন করতে হবে।
অ্যাঙ্গোলায় মুসলমানদের মৌলিক অধিকার ক্ষুণœ হওয়ার পর অ্যাঙ্গোলার কর্তৃপক্ষ অবশ্য দেশটিতে ইসলাম ধর্ম নিষিদ্ধের খবর অস্বীকার করে। কিন্তু এতে আশ্বস্ত হয়নি ওআইসিসহ আন্তর্জাতিক মুসলিম অভিভাবক সংস্থাসমূহ। ওআইসি ইতোমধ্যে অ্যাঙ্গোলার মুসলমানদের ধর্মীয় অধিকার হরণ, মসজিদ ধ্বংস ও মুসলিম নির্যাতনের খবরে উদ্বেগ ও হতাশা প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি দেশটিতে মুসলমানদের প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য একটি তদন্তকারী দল পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। উল্লেখ্য যে, গত রোববার আফ্রিকান এবং অ্যাঙ্গোলার সংবাদ সংস্থা ও সংবাদপত্রসমূহে অ্যাঙ্গোলার সংস্কৃতি মন্ত্রী রোসাক্রুজের একটি বক্তব্য উদ্ধৃতি করে দেশটিতে ইসলাম ধর্ম নিষিদ্ধের খবরটি প্রকাশিত হয়। রোসাক্রুজ সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, “ইসলাম ধর্মকে বৈধতা দেয়ার যে প্রক্রিয়া বিচার ও মানবাধিকার মন্ত্রণালয় শুরু করেছিল তা অনুমোদিত হয়নি। পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত মসজিদসমূহ বন্ধ থাকবে।” এদিকে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর মুসলিম স্কলারস (আইইউএমএস)-এ ধরনের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করার জন্য অ্যাঙ্গোলার সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি এ ঘটনার নিন্দা জানানোর জন্য জাতিসংঘ ও আফ্রিকান ইউনিয়নের প্রতি দাবি জানানো হয়েছে। মুসলিম কাউন্সিল অব অ্যাঙ্গোলার প্রেসিডেন্ট ডেভিড জ্যা এএফপির সাথে এক সাক্ষাৎকারে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, অ্যাঙ্গোলার ৬০টি মসজিদের সবগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে এবং গত দু’বছরে ৮টি মসজিদ ধ্বংস করা হয়েছে। এ মুসলিম নেতা আরো জানান, জনসম্মুখে মুসলিম নারীদের ওড়না পরতে দেয়া হয় না। অ্যাঙ্গোলার আইনে ইসলামী প্রতিষ্ঠানসমূহের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। দীর্ঘদিনের ধর্মীয় বৈষম্যের ধারাবাহিকতায় এসব করা হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, যে কেউ ইসলাম ধর্মের অনুসরণ করতে চাইবে তাকেই অ্যাঙ্গোলার আইনের বিরুদ্ধাচারী হওয়ার হুমকিতে পড়তে হবে। এই হলো বর্তমান বিশ্ব সভ্যতায় মুসলমানদের মানবাধিকার লাভের চিত্র। এরপরও মুসলমানদেরই সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক হিসেবে চিহ্নিত করার প্রচারণা অব্যাহত রয়েছে। এটাই কি বর্তমান সভ্যতার সত্য ও ন্যায়? এরপরও কি আমাদের ভাবতে হবে যে, আমরা এক উন্নত সভ্যতার বাতাবরণে বসবাস করছি? এসব প্রশ্ন বর্তমান সভ্যতা ও বিশ্ব ব্যবস্থার ধারক-বাহকদের মনে কোনো বোধোদয় ঘটাতে সক্ষম হয় কি না সেটাই এখন দেখার বিষয়। আমাদের দেশের তথাকথিত প্রগতিবাদীদের কাছেও ওই প্রশ্ন রাখা যায়।
0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

এক যাত্রায় দুই রকম পরিণতি হয় না


বিরোধী দলের প্রায় সব নেতা কারাগারে। হুলিয়া মাথায় আত্মগোপনে রয়েছেন অসংখ্য নেতা। মামলার খড়গ ঝুলছে হাজার হাজার নেতাকর্মীর ওপর। তারপরও শক্ত অবরোধে দেশ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। যে নির্বাচন করার জন্য শাসক দল মরিয়া, সে নির্বাচন কতটা প্রহসন ও তামাশার বিষয়, সেটা নির্বাচন কমিশন নিজেই বারকয়েক প্রমাণ করেছে। সর্বশেষ মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার ‘হিড়িক’ উদোম করে দিলো নির্বাচন কমিশন ও শাসক দলের যৌথ প্রযোজিত নাটকের পর্দা। এরপরও লজ্জাশরমের মাথা না খেলে এই নাটুকেপনার উপসংহার টানা জরুরি। বিশ্বসম্প্রদায় অবাক বিস্ময়ে দেখল অনেক বিরোধী দল তো বটেই ছোটখাটো দলগুলোও নির্বাচনে গরহাজির।
প্রধান বিরোধী জোট শক্ত ও কার্যকর প্রতিরোধ আন্দোলনে। পরপর ও টানা অবরোধ কর্মসূচির কারণে সারা দেশের জনজীবন স্থবির ও অচল। রাজনৈতিক সঙ্ঘাত-সহিংসতা এবং পুলিশের বাড়াবাড়িতে মানুষ মারা যাচ্ছে প্রতিদিনই। গত ক’দিনে লাশের সংখ্যা পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই। বাস-ট্রেনসহ যানবাহনে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেই চলছে। সর্বশেষ উত্তরবঙ্গে লাইনচ্যুত ট্রেনের অপঘাতে পাঁচ প্রাণ ঝরে গেল। সব কিছু মিলিয়ে জনমনে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। দেশের প্রত্যেক নাগরিক নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। অজানা এক আশঙ্কায় সারা দেশের মানুষ উৎকণ্ঠিত। দেশের ভবিষ্যৎ ভেবে মানুষ অসহায় বোধ করছে।
এ রকম ভীতিকর ও রাজনীতিহীন অগণতান্ত্রিক পরিস্থিতিতে একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সরকার। এ যেন জেদের দাম কোটি টাকা। প্রধান বিরোধী জোট ও দলবিহীন এই নির্বাচন মনোনয়নপত্র দাখিলের মধ্য দিয়ে প্রহসনের আরেকটি ধাপ অতিক্রম করল। এরশাদ অবস্থান পরিবর্তন করে পরিস্থিতির ঘনত্ব বাড়িয়ে দিলেন। কৌতুকের বিষয় যে, এরই মধ্যে সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ছয়জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে চলেছেন। তাদের বিপরীতে নাকি আর কেউ মনোনয়নপত্র দাখিলই করেননি। বাহ! জনপ্রিয়তার কী শ্রী!
দেশে এর আগে ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে আমরা ধানের ক্ষেতে ব্যালট বাক্স প্রত্যক্ষ করেছি। ১৯৮৮ ও ১৯৯৬ সালে এ ধরনের একতরফা নির্বাচন হলেও তার পরিণতি ভালো হয়নি। ’৮৮-এর নির্বাচনের দুই বছরের মধ্যে আন্দোলনের মুখে সেই সরকারের পতন ঘটে। আর ’৯৬-এর ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক বিল পাস করেই শেষ, সেই অপুষ্ট সরকার দেড় মাসও টেকেনি। এবার সে রকম পরিস্থিতি সৃষ্টির চেয়েও ভয়াবহ কিছু হওয়ার আশঙ্কা করছেন অনেকেই। কারণ এক যাত্রায় দুই রকম ফলাফল পাওয়া কোনোভাবে সম্ভব হয় না। এবারো সম্ভব হওয়ার কোনো সুযোগ নেই, কারণও নেই। এ জন্য অনেকেই বলছেন, এবার মেরুকরণ অনেক বেশি ঋজু। তা ছাড়া সম্প্রসারণবাদী গোষ্ঠী জনগণকে ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। তাদের হিংস্র নখর প্রদর্শন করেছে। আগে স্বৈর মানসিকতাচ্ছন্ন সরকার এরশাদের এক চটিতে পা দিয়ে পা পিছলে পড়েছে। বর্তমান সরকারপ্রধান একই সাথে দুই চটিতে পা ঢুকিয়ে দিয়েছেন। তাই জাতির কপালে অপ ও দুঃশাসন চাপিয়ে দিয়েও হাসতে পারছেন। শাসকদের ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারে গিয়ে বড়লোকি দেখিয়ে মনোনয়নপত্র দাখিলের ভড়ংও জাতি প্রত্যক্ষ করল।
মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদসহ সরকারি ঘরানার ক’টি দল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলে ৩০০ আসনে এক হাজার ১০৭ জন মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। আওয়ামী লীগ ছাড়া একেবারেই নামসর্বস্ব দু’টি দল ও দু’জন নেতানির্ভর ুদ্র দু’টি দলের বাইরে অবশিষ্টরা নির্বাচনকে ‘না’ বলে দিয়েছে। তা ছাড়া সরাকরি পৃষ্ঠপোষকতা ও নির্বাচন কমিশনের স্বউদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত বিটিম বি-এনএফও মনোনয়নপত্র দাখিল করল। এই বিএনএফের জন্মই আজন্ম পাপের পরিচয় বহন করছে। তাদের জন্মবৃত্তান্ত প্রমাণ করে রাজনৈতিকভাবে সতীত্বহীনদের দৌড়ঝাঁপ ছাড়া তাদের মহৎ কোনো উদ্দেশ্য নেই। এর বাইরে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত ধর্মভিত্তিক দলগুলোর বেশির ভাগই একতরফা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। মহাজোটের মিত্র ও অনুগত হিসেবে পরিচিত কথিত ধর্মভিত্তিক সাতটি দলের মধ্যে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে মাত্র দু’টি দল। বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন ও বাংলাদেশ ইসলামিক ফ্রন্ট দু’টি দলই সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হয়।
দেশে ধর্মভিত্তিক কমপক্ষে ২০টি রাজনৈতিক দল সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে রাজনৈতিক দল হিসেবে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন আছে ১১টি দলের। নিবন্ধিত আরো দু’টি দল ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ ও জাকের পার্টি মতাসীন মহাজোটের মিত্র হিসেবে পরিচিত। কিন্তু দল দু’টিও নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না।
নিবন্ধিত অপর সাতটি দলের মধ্যে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ঐক্যজোট, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও খেলাফত মজলিস বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের শরিক দল। এর মধ্যে জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। তবে এ বিতর্কের অবসান ঘটেনি। ১৮ দলীয় জোটের বাইরে থাকা চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ১৮ দলীয় জোটবহির্ভূত অংশটিও নির্বাচনে যায়নি।
অনিবন্ধিত ধর্মভিত্তিক সরকার অনুগত দলগুলোর মধ্যে মিছবাহুর রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ইসলামী ঐক্যজোট, বিতর্কিত ও দরবারি আলেমখ্যাত ফরিদ উদ্দিন মাসউদের নেতৃত্বাধীন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের একাংশ ও সম্মিলিত ইসলামী জোট আওয়ামী লীগের মিত্র। এর মধ্যে একটি দল সংবাদ সম্মেলন করে বলেছে, একতরফা নির্বাচনে তারা যাবেন না। বিতর্কিত ফরিদ উদ্দিন মাসউদ বলেছেন, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকায় তার দলও নির্বাচনে যেতে পারেনি। সরকার অনুগত অন্য একটি দলের নিবন্ধন না থাকায় অন্য দলের ব্যানারে মনোনয়নপত্র জমা দিতে গিয়েছিলেন; কিন্তু ততণে জমা দেয়ার সময় পার হয়ে গেছে বলে জমা দিতে পারেননি। অতএব তাদের আর নির্বাচনে যাওয়া হলো না।
এ কথা সত্য যে, বাংলাদেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ। তারা ধর্মভিত্তিক দল অপছন্দ করে না। তবে সরকারের অনুগত মতলববাজ ও দরবারি খ্যাতদের কোনো দিন আমলে নেয়নি। ধর্মভিত্তিক দল হিসেবে তারা যাদের বেশি পছন্দ করে সেগুলোর কোনোটি নির্বাচনে যায়নি। কোনো কোনোটি আন্দোলনে সক্রিয় রয়েছে।
আওয়ামী লীগ এবার ক্ষমতায় এসে মুক্তিযুদ্ধকে পুঁজি করে রাজনীতি করার চেষ্টা করেছে। জনগণ মুক্তিযুদ্ধকে রাজনীতির উপাত্ত বানাতে নারাজ। তারা ধর্মবিদ্বেষ ছড়িয়ে বাম ও বিদেশী প্রভুত্বের সিমপ্যাথি পেতে চেয়েছেন। তাও ভরসা জোগায়নি। এখন কিছু অগ্রহণযোগ্য ও বিতর্কিত পোষমানা দলকে ইসলামপন্থী সাজিয়ে ইসলামের মূল ধারা ও আলেমদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। এত অপকৌশল গ্রহণ করেও আওয়ামী লীগ এবার যে রূপে আবির্ভূত হলো সেটা অপ্রকাশিত থাকাই ছিল তাদের জন্য কল্যাণকর। তাতে দলটি ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে, মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়ার বরাতে জনমনে সব সময় একটা জায়গা পেয়ে যেতে পারত। অথচ এবার আওয়ামী লীগ ইতিহাসের বৃন্তচ্যুত দলের মেজাজে কাজ করেছে। তাদের অনুসৃত পররাষ্ট্রনীতি ও ধর্মনীতি তাদের জন্য বুমেরাং হয়ে এসেছে। বিপরীতে প্রতিপক্ষের জন্য হলো শাপে বর। একতরফা নির্বাচনের জেদ তাদের ক্ষমতার দাপটই প্রমাণ করেনি, তাদের হঠকারিতার মুখোশও খুলে দিয়েছে। সঙ্গত কারণেই একটি হঠকারিতা অনেক হঠকারিতা অনিবার্য করে দিয়েছে। সম্ভবত তারই পরিণতি অপেক্ষা করছে। নানা কারণে বিরোধী দলের আন্দোলন হোঁচট খেতে পারে। বাঁক ঘুরতে পারে। কিন্তু মুখথুবড়ে পড়ার কোনো কারণ নেই। অপর দিকে সরকারি দল দাপট দেখানোর শেষ অস্ত্রটাও প্রয়োগ করে ফেলেছে। এবার চোখে অন্ধকার দেখা শুধু সময়ের ব্যাপার। জরুরি অবস্থায়ও কোনো ত্রাণ নেই। অবৈধ সরকারের মেয়াদ বাড়বে মাত্র। সেই সাথে বাড়বে পাপের বোঝা। জনগণ এখন দলনিরপেক্ষ অবস্থানে দাঁড়িয়ে রাজনীতির মুণ্ডুপাত করছে এটা যেমন সত্য, তেমনি একটি পরিবর্তন যে অনিবার্য তা-ও জানান দিচ্ছে। বিরোধী দলের সাফল্য এতটুকু যে, তারা জনমনে পরিবর্তনের হাওয়া বইয়ে দিতে পেরেছেন। এই হাওয়া একটি পরিবর্তনের ঝড় অনিবার্য করে তুলবেÑ শুধু সময়ের অপেক্ষা। 


 

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

সহিংসতা থামান : গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চাই


বিগত ২৯ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় শাহবাগ মোড়ের কাছে চলন্ত বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ১৯ যাত্রী আহত হলে সাধারণ মানুষ বিশেষ করে যাত্রীসাধারণ ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। আহতদের কয়েকজন পরে হাসপাতালে মারা যান। চিকিৎসাধীন কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। বিরোধী বিএনপি শিবিরে তার প্রতিক্রিয়া হয় অন্য রকম। ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই আক্রমণের জন্য সরকারি দলকে দায়ী করেন। আন্দোলনের কাজে ব্যস্ত, আরো অনেক মামলায় জামিনপ্রাপ্ত বেশ কয়েকজন সিনিয়র বিএনপি নেতাকে বাসে অগ্নিসংযোগের মামলার আসামি করায় তাদের মধ্যে ধারণা হয় যে হরতাল বা আন্দোলনের কর্মসূচিবিহীন শুক্র-শনিবারে গ্রেফতার আরো বাড়বে। হলোও তাই। ফলে অধিকতর গ্রেফতার ঠেকানোর কৌশল হিসেবে ছুটির দিন শনিবার থেকে তারা দিলেন নতুন অবরোধ কর্মসূচি। শুক্রবার দিবাগত রাতে বিএনপির কেন্দ্রীয় অফিস ভাঙচুর করে গ্রেফতার করা হয় যুগ্মমহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ কয়েকজন নেতাকর্মীকে। চট্টগ্রামের শীর্ষস্থানীয় নেতাকর্মীসহ সারা দেশে গ্রেফতার হন আরো অনেকে। অন্যান্য ঘটনায় সারা দেশে নতুন করে বেশ কিছু মামলা দায়ের করা হয় হাজার হাজার বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীর বিরুদ্ধে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপির অফিস ভাঙচুর এবং নিষিদ্ধ ঘোষণা করায় দলের নেতৃত্বের আশঙ্কা প্রমাণিত হয়। বাংলাদেশের মানুষ নির্বাচন নিয়ে সহিংসতা বা মানুষ হত্যা কোনোটাই চায় না, কিন্তু সুষ্ঠু নির্বাচন চায়। এখানে নির্বাচনই মুখ্য। কারণ, নির্বাচনের মাধ্যমেই ঠিক হবে পরের পাঁচ বছর কারা সরকার চালাবেন। সরকার ও বিরোধী দলের মতপার্থক্য থাকবেই। কিন্তু কিছু মৌলিক বিষয়ে একমত না হলে তারা গণতন্ত্রের সর্বনাশ ডেকে আনবেন।
 
যেহেতু প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্রের নিরিখে তারাই শাসক শ্রেণী, তাদের গ্রহণযোগ্যতা রক্ষার কিছু নিয়মনীতি তারা নিজেরাই মেনে না চললে বর্তমান ব্যবস্থাও কি হুমকির মুখে পড়বে? সপ্তাহ দুয়েক আগে এ দেশের একজন খ্যাতনামা রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও লেখক মন্তব্য করেছেন, দেশে এখন সংসদীয় গণতন্ত্রের ধ্বংসযজ্ঞ চলছে। জাসদ নেতা আ স ম আবদুর রব তার বহুলপ্রচারিত দুই কক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট গঠনের দাবি তুলে বলেছেন, নির্দলীয় ব্যক্তিদের দিয়ে গঠিত উচ্চকক্ষের সদস্য নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার করলে তা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। যারা বাম রাজনীতি করেন তারা বলছেন বিএনপি-আওয়ামী লীগ মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ, গুণগত কোনো পার্থক্য নেই। ইসলামি আদর্শের রাজনীতিকদের অনেকে মনে করেন বড় দুই দলকে দিয়ে যত দূর সম্ভব ইসলামের কাজ করিয়ে নেয়া ভালো। তবে চূড়ান্ত লক্ষ্য হবে ইসলামি বিপ্লব। ওপরের বিশ্লেষণে এটা স্পষ্ট প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্রের ধারক ও বাহক বুর্জোয়া শ্রেণীর মধ্যে এখন যে টানাপড়েন দেখা দিয়েছে, তা সাধারণ জনগণ থেকে শুরু করে সব শ্রেণী ও পেশার মানুষের ধৈর্যের সীমানায় এসে গেছে। কারণ এটা সবাই বোঝে একটা মামুলি বিষয় নিয়ে এত মারামারি-কাটাকাটি হতে পারে না। নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা অপরিহার্য। এটা কোনো বাড়তি দাবি নয়, এ দাবি সবারÑ তা এ দেশের মানুষ বহু মতামত জরিপের মাধ্যমে জানিয়েছে। কেউ এ দাবির জন্য আন্দোলন করলে তা অন্যায় নয়। আন্দোলনকারীদের দুষ্কৃতকারী আখ্যা দিয়ে তাদের ওপর যেকোনো নিপীড়ন হালাল করা যাবে না। অন্য দিকে সহিংসতাও কাম্য নয়।
বিএনপি ও তার জোটভুক্ত শরিক দলগুলোর বহু দিনের অভিযোগÑ এরা সরকারি বাধার জন্য সভা সমিতি, মিটিং মিছিল করতে পারছে না। হরতাল ডাকলে লাঠি, গুলি, টিয়ার গ্যাস, টিকিট কালোবাজারিদের মতো রাস্তায় রাজনৈতিক কর্মীদের ভ্রাম্যমাণ আদালতে বিচার করে জেলে পাঠানো, গ্রেফতার এবং বাড়িতে বাড়িতে হানা কোনো ধরনের দমন-নিপীড়ন বাদ যাচ্ছে না। তাদের দাবিও মানা হচ্ছে না। তাহলে আন্দোলন ছাড়া তাদের করণীয় কী? নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের আন্দোলন অতীতেও হয়েছে। নব্বইয়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সমাপ্তিতে এসে উভয় দলের তথা জোটের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি না পাওয়া যাওয়ায় সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে মেনে নেয়া হয়েছিল। পরবর্তী ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পরিচালিত আন্দোলনের কারণেই নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এখন এই ব্যবস্থা পাকিস্তান ও নেপাল গ্রহণ করেছে। সুপ্রিম কোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে গণতন্ত্রের সাথে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করেন। তবে তিনি পরবর্তী দু’টি নির্বাচন এই ব্যবস্থার অধীন করার পক্ষে তার দেয়া রায়ে মতপ্রকাশ করেন। পরবর্তীকালে সংসদে পাস করা ১৫শ সংশোধনীর মাধ্যমে তা সম্পূর্ণভাবে বাদ দেয়ার পরই বর্তমান জটিলতার জন্ম হয়। জাতীয় সংসদের সংশ্লিষ্ট স্থায়ী কমিটির রিপোর্ট ছিল তা রাখার পক্ষে। এমনকি প্রধানমন্ত্রীও দু’টি শর্ত জুড়ে দিয়ে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা রেখে দেয়ার পক্ষে মতপ্রকাশ করেছিলেন বলে জানা যায়। বিরোধী দল আগাগোড়া ১৫শ সংশোধনীর বিরোধিতা করেছে।
১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের প্রণেতা ড. কামাল হোসেন বলেছেন, সরকার চাইলে এক মিনিটে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। এ বক্তব্যের কারণে তিনি ক্ষমতাসীনদের মারাত্মক বিরাগভাজন হয়েছেন। পরে তিনি দুঃখ করে বলেছেন, গণতন্ত্রে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ঐকমত্য সৃষ্টি হয়, তা নিয়ে সমালোচনামুখর হওয়ার কিছু নেই। বর্তমানে সরকারি মন্ত্রী-এমপিরা সরকার চালাচ্ছেন আবার নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সাথে সাথে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রক্ষমতা প্রয়োগ করছেন। নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর তোফায়েল আহমেদ বলেছিলেন তাদের কাজ হবে শুধু নির্বাচন সম্পন্ন করার সীমিত কাজ করা। তার কাছ থেকে এখন আর কিছু শোনা যাচ্ছে না। অন্যেরা অনেক বাড়তি কথা বলেছেন বিরোধী দলের বিরুদ্ধে। কয়েক দিন পরপর ঠিক হচ্ছে নির্বাচনের সময় ক্ষমতাসীনদের কার কী ভূমিকা হবে। এমন নির্বাচনী কাজে এ দেশের মানুষ অভ্যস্ত নয়। এই প্রক্রিয়ার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী দল ও প্রার্থীদের মধ্যে সমতাভিত্তিক লড়াই কী করে সম্ভব? বিরোধী দল কি বলার অধিকার রাখে না, তাদের ওপর অসম নির্বাচন চাপিয়ে দিয়ে তা বর্জন করতে বাধ্য করা হচ্ছে? তারা সমতাভিত্তিক নির্বাচনে সরকারকে বাধ্য করার জন্য আন্দোলন করছেন। সরকার তা দমনের পথ বেছে নিয়েছে, যা কাম্য ছিল না। ফলে মানুষ হত্যা ও সহিংসতা বেড়েই চলেছে। এর শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। যাত্রীবাহী চলন্ত বাসে অগ্নিসংযোগ ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। এর জন্য সরকার ও বিরোধী দল একে অন্যকে দায়ী করেছে। অপরাধী যেই হোক আমরা তার শাস্তি চাই। কিন্তু বাসে অগ্নিসংযোগ একটা কার্যকারণ সম্পর্কহীন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। যেমন নয় আন্দোলনের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত স্কুলপরীক্ষা। এগুলো একটা বড় কারণের প্রতিক্রিয়া বা ফলাফল। কারণটার সমাধান হলে তার আর কোনো প্রতিক্রিয়া হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না।
হরতাল, অবরোধের মারাত্মক আরো অনেক সামাজিক প্রতিক্রিয়া থাকে। মানুষের মধ্যে সমঝোতার পরিবর্তে সংঘর্ষের মনোভাব তৈরি হয়। যারা রাজনীতি করেন তাদের বুঝিয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না এ ধরনের সর্বশেষ রাজনৈতিক অস্ত্র প্রয়োগ করা কত কঠিন। কয়েক সপ্তাহ ধরে বিরোধী দল ও জোটের সফল হরতাল-অবরোধ তাদের দাবির প্রতি জনসমর্থনেরও ইঙ্গিত বহন করে। পত্রপত্রিকার মাধ্যমে পর্যবেক্ষকেরা ধারণা পোষণ করেছেন বিরোধী দল শেষ পর্যন্ত আন্দোলন করে যাবে। কারণ নিরপেক্ষ নির্বাচন না হলে তাদের মাটিতে পা রাখার জায়গা থাকবে না। আন্দোলন ও তা দমনের কর্মসূচি বর্তমান পরিস্থিতিকে আরো মারাত্মক করে তুলবে। সাধারণ মানুষের আশা সরকার ও বিরোধী দল যেন সমঝোতার পথে পা বাড়ায়। নিরপেক্ষ ও সবার অংশগ্রহণভিত্তিক নির্বাচনে যেন মানুষ তাদের পছন্দের প্রতিনিধিদের বেছে নিতে পারে। 


 

মঙ্গলবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৩

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

ধরো অস্ত্র করো রণ

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী :
 হরতালে অবরোধকালে বাসে বোমা হামলায় যারা দগ্ধ হয়েছেন, আমরা তাদের প্রতি গভীর সহমর্মিতা জানাই। এ ধরনের সহিংসতা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই সহিংসতা কিংবা মানবতাবিরোধী কাজ কারা করেছে? আজকাল প্রধানমন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগের মন্ত্রী ও নেতাদের মধ্যে ‘হুকুমের আসামী’ নামে এক ধরনের প্রজাতির সৃষ্টি হয়েছে। আর সেই হুকুমের আসামী হিসেবে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিএনপি’র শীর্ষস্থানীয় ৩২ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। হ্যাঁ, হুকুমের আসামী কেউ থাকতে পারে। এবং অবশ্যই সেটা খুঁজে বের করা সরকারের পবিত্র কর্তব্য।
তবে ইতিপূর্বে বাংলাদেশে আরো এমন নির্মম, নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী দলে থাকার সময় চট্টগ্রামে তার দলের নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, আপনারা কি চুড়ি পরে থাকেন? একটি লাশ পড়লে দশটি লাশ ফেলে দেবেন। তারপর চট্টগ্রামে অনেক লাশ পড়েছে। হুকুমের আসামী হিসেবে শেখ হাসিনাকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়নি। বিডিআর বিদ্রোহে পিলখানায় ৫৭ জন চৌকস সেনা কর্মকর্তা খুন হন। সেক্ষেত্রে হুকুমের আসামী কারা ছিলো, তা নির্ধারণ করা হয়নি। তার আগে লগি-বৈঠা নিয়ে ঢাকায় এসে তার নেতা-কর্মীদের তা-ব সৃষ্টি থেকে নরহত্যার উস্কানি দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। হুকুমের আসামী হিসেবে তখনও তাকে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়নি। সুতরাং হুকুমের আসামী বলে বিএনপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ নেতাদের দশবার চিন্তা করা উচিত ছিলো।
অবরোধের সময় মৎস্য ভবনের কাছাকাছি কড়া নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকায় বাসে কারা বোমা মেরেছে, তা এখনও সম্ভবত তদন্তাধীন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে তার পারিষদ দল এবং অনুগত মিডিয়া অবিরাম প্রচার করে যাচ্ছে যে, ঐ বোমা হামলা অবরোধকারীরাই করেছে। কেউ গ্রেফতার হয়নি, কেউ আটক হয়নি তাহলে কোন বস্তুনিষ্ঠতায় ১৮ দলীয় জোটকে ঐ হামলার জন্য দায়ী করা হচ্ছে? ইতিপূর্বে আমরা দেখেছি, বাসে বোমা হামলা চালায় সাধারণত আওয়ামী লীগাররাই। এ ব্যাপারে তাদের ক্ষমতাও সর্বজনবিদিত। বিরোধী দলে থাকাকালে হোটেল শেরাটনের সামনে যাত্রীবাহী দোতলা বাসে আগুন দিয়ে ১১ জন মানুষকে মৃত্যুর মুখোমুখি ঠেলে দিয়েছিলো আওয়ামী লীগাররাই। সেখানে ‘হুকুমের আসামী’ও শনাক্ত  হয়েছিলো। কিন্তু তেমন কিছুই হয়নি।
আসলে দেশব্যাপী জনগণ এই সরকারের বিরুদ্ধে যে ঘৃণার আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে, যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, তার থেকে মানুষের দৃষ্টি সরিয়ে নেয়ার জন্যই, বিরোধী দলের প্রতি জনগণের ঘৃণার উদ্রেক করার জন্যই সরকার ও সরকারের অনুগত মিডিয়া অবিরাম প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছে। তারা বলছেন, এই যে মানুষের আহাজারি আর্তনাদ, দুইজন মানুষের মৃত্যু এ সব কিছুর জন্য বিরোধীদল দায়ী। বিরোধীদলের তরফ থেকে শক্তভাবে এর প্রতিবাদ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ তাদের অধিকাংশ নেতা-কর্মী এখন কারাগারে অথবা আত্মগোপনে। এমনকি বিএনপি’র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী যিনি বিএনপি’র কার্যালয় থেকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কর্থাবার্তা বলছিলেন, গত ৩০শে নবেম্বর পুলিশ মই বেয়ে উঠে, দরজা ভেঙে, টেনে-হিঁচড়ে রিজভীকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। আর ভেঙে তছনছ করে দেয় বিএনপি অফিসের প্রতিটি কক্ষ। এখন আর এক যুগ্ম মহাসচিব সালাউদ্দিন আহমেদ অজ্ঞাত স্থানে থেকে মাঝে মধ্যে ভিডিও বিবৃতি দিচ্ছেন। অন্য নেতারা আত্মগোপনে।
এই পরিস্থিতিতে সরকারের জন্য বিরোধী দলের প্রতি বিষোদ্গার অনেক বেশি স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। দোষী চিহ্নিত হয়নি, অথচ দায় চাপানো হচ্ছে বিরোধী দলের ওপর। শুধু তাই নয়, হাসপাতালে গিয়ে শেখ হাসিনা বলে বসলেন, এই বোমা হামলার জন্য বিরোধী দলীয় নেত্রী দায়ী এবং তিনি গণহত্যায় উস্কানি দিচ্ছেন। ৫ মে শাপলা চত্বরে যখন হাসিনা সরকারের পুলিশী হামলায় শতসহস্র ধর্মপ্রাণ মুসল্লি প্রাণ হারালেন, তখন বিরোধী দলীয় নেত্রী তাকে গণহত্যা বলে অভিহিত করেছিলেন। সে সময় শেখ হাসিনা ও তার স্তাবকেরা একেবারে রা রা করে উঠেছিলেন। তারা বলছিলেন, গণহত্যা শব্দটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। অতএব, ঐ ঘটনাকে গণহত্যা বলে বেগম খালেদা জিয়া মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি চরম অসম্মান প্রদর্শন করেছেন। ভালো কথা। সেই সব স্তাবক এখন সাহস থাকলে বলুক দেখি যে, শেখ হাসিনা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি চরম অসম্মান প্রদর্শন করলেন। শেখ হাসিনা যদি বলেন, তবে সব ঠিক। আর অন্য কেউ বললেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা একেবারে ধুলিসাৎ হয়ে যায়। এটা বাংলাদেশের রীতিতে পরিণত হয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সরকারি দলের লোকেরাই মানুষের দৃষ্টিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্যই বাসে বোমা হামলা চালিয়েছে। এই বোমা হামলার জন্য অশ্রুপাত করলেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু গত কয়েকটি দিনে তার পেটোয়া পুলিশ বাহিনী আর আওয়ামী সন্ত্রাসীরা যে সারাদেশে ৩০ জনেরও অধিক আদম সন্তানকে হত্যা করলো, তার জন্য শেখ হাসিনার অশ্রুপাত কোথায়?
শেখ হাসিনা ও তার পারিষদেরা এখন বলছেন, অবরোধ ডেকে ঘরে বসে থাকেন কেনো, রাস্তায় নামুন, দেখা যাক কার কতো শক্তি। দারুণ আহ্বান। এই আহ্বান শুনে ছেলেবেলায় দেখা ‘রূপভান যাত্রা’র কথা মনে পড়ে গেলো। রূপভান ১২ দিনের শিশু রহিম বাদশাহকে স্বামী হিসেবে বরণ করে ১২ বছরের জন্য বনবাসে যায়। সেখানে অনেক কাহিনী। রহিম বাদশাহকে বাঘে খেতে আসে। রূপভান বাঘের কাছে গান গেয়ে কান্নাকাটি করে। আস্তে আস্তে রহিম বাদশাহ’র ১২ বছর বয়স হয়। তখন সে মন্ত্রীকন্যা তাজেলের প্রেমে পড়ে। এ নিয়েও অনেক কথা। তাজেলের বাবা এটা মানতেই চান না। তারপর একদিন শেষ পর্যন্ত তিনি রহিম বাদশাহকে ‘ধরো অস্ত্র করো রণ’ বলে যুদ্ধে আহ্বান জানায়। তারপর শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। সে যুদ্ধে রহিম বাদশাহ জয়ী হন। রূপভান তো তার স্ত্রী আছেই। তারপরও তিনি তাজেলকেই বিয়ে করেন। আর শেষে সুখে শান্তিতে জীবন কাটাতে শুরু করেন।
আওয়ামী নেতাদের বিএনপি নেতৃবৃন্দকে রাস্তায় নেমে আসার আহ্বান জানিয়ে তেমনি এক যাত্রাভিনয় শুরু করেছেন। যদি তাই হয়, তাহলে আপনারাও নামুন দেখি রাস্তায় পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও সশস্ত্র মাস্তান ছাড়া। জনগণ আপনাদের একেবারে ছিন্নভিন্ন করে ফেলবে। তার প্রমাণ কি এই অবরোধের মাধ্যমে পাচ্ছেন না? বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ ১৭ শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে গত ২৯ নবেম্বর যখন গাড়ী পোড়ানোর মামলা দিলো সরকার। তখন ১৮ দল ৩০ নবেম্বর সকাল থেকেই ৩ ডিসেম্বর মঙ্গলবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ৭২ ঘণ্টা অবরোধের ডাক দেয়। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ কি লক্ষ্য করেছেন যে, দেশের জনগণ আর পরদিন সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করেনি। তৎক্ষণাৎ রাস্তায় নেমে এসে প্রতিবাদ বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিলো? কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অচল করে দিয়েছিলো সারাদেশ। এখনও অবরোধ কর্মসূচি চলছে। দেশ অচল হয়ে আছে। রাজধানী ঢাকা কার্যত বিচ্ছিন্ন। কই, আপনারা রাস্তায় নামুন। এই জনতাকে প্রতিরোধ করুন। সে শক্তি কি আপনাদের আছে? কোনো মন্ত্রী, এমপি, নেতা এখন কি ঢাকার বাইরে যাবার ক্ষমতা রাখেন? এই জাগ্রত জনতাই ১৮ দলীয় জোটের ক্ষমতা। এই শক্তির বিরুদ্ধে লড়ে, এমন সাধ্য কারও নাই।
আওয়ামী লীগে যারা এখনও ফটর ফটর করেন, তারাও তা করেন বিবি এভিনিউ বা ধানম-ি কার্যালয়ে এসি রুমে বসেন। ঘর থেকে বের হন পুলিশ পাহারায়। দৌড় এখন আপনাদের এই পর্যন্তই। সুতরাং, অত বেশি ফটর ফটর ভালো নয়। সরকার কিংবা তার পেটোয়া বাহিনীর নির্যাতনের প্রতিবাদে এখন প্রতিদিন এই অবরোধের মধ্যেও ছয়-সাত জেলায় হরতাল হচ্ছে। সেসব হরতাল কেন্দ্রীয়ভাবে ডাকা হচ্ছে না। অত্যাচার, নির্যাতনে অতিষ্ঠ মানুষ যার যার মতো প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। যেখানেই নির্যাতন সেখানেই প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, হরতাল। আবার কোথায়ও কোথায়ও আওয়ামী লীগের নিজ দলের লোকেরাও হরতাল ডাকছে। সড়ক অবরোধ করছে। শেখ হাসিনার অতি পেয়ারের সাবেক মন্ত্রী ‘দেশসেরা দেশপ্রেমিক’ সৈয়দ আবুল হোসেন মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে মাদারীপুরে সড়ক অবরোধ করেছেন। কোন পথে পালাবেন? পালাবার পথ নেই। জনগণ তাদের প্রতিরোধের অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেছে। আপনারা ধারালো তরবারি নিয়ে এগিয়ে দেখুন, একেবারে ছত্রখান হয়ে যাবেন।
এর মধ্যেও একদলীয় নির্বাচন করে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার অনৈতিক লিপ্সায় সরকার মদমত্ত। সে নির্বাচন হবে কিনা এখনও বলা যায় না। জনগণ দেখিয়ে দিয়েছে, তারা দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ প্রতিরোধ টিকিয়ে রাখতে সক্ষম। এই প্রতিরোধ অব্যাহত থাকলে সরকারের সেবাদাস বা ক্রীতদাস নির্বাচন কমিশনের পক্ষে নির্বাচন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। তখন তারা কাজ একটাই করতে পারবে। তা হলো শেখ হাসিনা তার হাতে যে তালিকা ধরিয়ে দেবেন সেই তালিকাভুক্তদের বিজয়ী ঘোষণা করে তিনি তার আনুগত্য পুনরায় প্রমাণ করতে পারবেন। সকল শক্তি শেখ হাসিনার হাতে। সকল ক্ষমতা শেখ হাসিনার হাতে। যেনো বাংলাদেশে এখন রাজতন্ত্র কায়েম হয়েছে। রাজতন্ত্র কায়েম করলেও অন্যান্য রাজতান্ত্রিক দেশের মতো তাকে স্বাধীন পার্লামেন্ট দিতে হবে। তখন আর তার রাজতন্ত্রের কোনো মূল্য থাকবে না। তাছাড়া এদেশের মানুষ সে রাজতন্ত্র কোনদিন মেনেও নেবে না। এখানকার মানুষের জীবনধারা গড়ে উঠেছে লড়াইয়ের মাধ্যমে। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে এরা হাজার হাজার বছর টিকে আছে। এরা জলের ঐশ্বর্য কেড়ে জীবনের উপাদান আনে। গহীন সমুদ্রে নৌকা ভাসায় সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ অতিক্রম করে আরব্ধ অর্জন করে। এদের বশীভূত করা সহজ কাজ নয়।
0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

বিরোধী দলের অভিযোগ এখন সত্য প্রমাণিত হচ্ছে


দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে পত্র-পত্রিকায় যেসব বিশ্লেষণ প্রকাশিত হচ্ছে, তাতে আশাবাদী হওয়ার মতো তেমন কোনো উপাদান নেই। বরং দেশের দুই রাজনৈতিক জোটের বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে রাজনৈতিক সহিংসতায় রাষ্ট্রযন্ত্রই বিকল হতে বসেছে বাংলাদেশের। ভেঙ্গে পড়ছে রাষ্ট্রের মূল স্তম্ভগুলো। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির এতটাই অবনতি ঘটেছে যে, দেশে এখন চরম নৈরাজ্য বিরাজ করছে। ধসে পড়ছে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সামগ্রিক অর্থনীতি। বিপর্যয় দেখা দিয়েছে শিক্ষাঙ্গনেও। এমন অবস্থায় প্রধান দুই জোটের নেতৃবৃন্দের মধ্যে সংলাপের মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটতে পারে। কিন্তু কাক্সিক্ষত সেই সংলাপের কোনো লক্ষণ নেই। দেশের বিশিষ্ট নাগরিক এমন কি জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের আহ্বানের পরও কাক্সিক্ষত সংলাপ অনুষ্ঠিত হলো না। সংলাপ অনুষ্ঠানের ব্যাপারে মূল দায়িত্ব বর্তায় সরকারের ওপর। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এমন দায়িত্বশীল ভূমিকা গ্রহণ করা হয়নি। বরং সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে এমন সব খোঁচা দেয়া কথা বলা হয়েছে, যাতে সংলাপের পথ রুদ্ধ হওয়ার পথে। এতদিন বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে,  সরকার সংলাপের ব্যাপারে আন্তরিক নয় বরং তারা একতরফা নির্বাচনের ব্যাপারে বদ্ধপরিকর। বিরোধী দলের সেই অভিযোগের সত্যতা এখন জনগণ সুস্পষ্টভাবেই লক্ষ্য করছে। একতরফা এমন নির্বাচনের জন্য তো জনগণ এতদিন ধরে অপেক্ষা করেনি। আর এমন নির্বাচন তো গণতন্ত্রসম্মত নয়।
একতরফা কোনো নির্বাচন জনগণের কাছে গ্রহণীয় হবে, না আন্তর্জাতিক মহলে সে নির্বাচন স্বীকৃতি পাবে। এমন নির্বাচনে দেশে সংঘাত ও অশান্তির মাত্রাই বাড়বে এবং দেশের অর্থনীতি ও সমৃদ্ধি পড়বে বিপর্যয়ের মুখে। তারপরও এমন একটি অগণতান্ত্রিক নির্বাচনের দিকে সরকার কেন এগিয়ে যাচ্ছে, সেই রহস্য জনগণের কাছে স্পষ্ট নয়। হয়তো আগামীতে সে রহস্য জনগণের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠবে।
বর্তমানে বিরোধী জোটকে রাজপথের আন্দোলনে অনেক ক্ষেত্রে সহিংস হতে দেখা যাচ্ছে। এ নিয়ে সরকার বিরোধী দলের তীব্র সমালোচনা করছে। সরকারি প্রচার যন্ত্রও বিরোধী দলের ভাংচুর ও ককটেল ফোটানো নিয়ে বেশ সরব। তবে এখানে বলে রাখা ভাল যে, সমালোচনার কাজটি যতটা সহজ, আত্মসমালোচনার কাজটি ততটাই কঠিন। আমাদের রাজনীতিতে আত্মসমালোচনার সংস্কৃতি চালু থাকলে দেশের পরিস্থিতি আজ এ পর্যায়ে পৌঁছাতো না। আত্মসমালোচনায় অভ্যস্ত হলে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের ভুলত্রুটি উপলব্ধি করে সংশোধনের পথে হাঁটতে পারতো। সামান্য আত্মসমালোচনা করলেও সরকার বুঝতে পারতো, বিরোধী দল বর্তমান সময়ে কেন এতটা উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে? বিগত পাঁচটি বছরে সরকার কী বিরোধী দলকে ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকার দিয়েছে? বরং জুলুম-নির্যাতনের স্টিম রোলার চালিয়ে এবং আইনি চাতুর্যে বিরোধী দলকে দমন ও বিপর্যস্ত করতে চেয়েছে। নির্বাচনকালীন বর্তমান সময়েও একই চিত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ কারণেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের সাথে বর্তমান নির্বাচনকালীন সরকারের মধ্যে কোনো পার্থক্য লক্ষ্য করছে না জনগণ। ফলে তাদের মধ্যে হতাশার মাত্রা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে।
সংলাপ বা সমঝোতা নয়, দমন-অবদমনের মাধ্যমেই যেন বর্তমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানের পথে হাঁটছে সরকার। এ কারণেই পর্যবেক্ষক মহল মনে করছেন, একদলীয় ও একপেশে নির্বাচনই এখন সরকারের লক্ষ্য। এ লক্ষ্যেই সরকার বিরোধী জোটের শীর্ষ নেতাদের নামে মামলা করছে ও একের পর এক গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠাচ্ছে। এতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরো সহিংস হয়ে উঠছে। সংঘাত-সংঘর্ষের এমন এক পরিবেশে সরকার বিরোধী জোটকে বাদ দিয়ে একপেশে নির্বাচনী অভিযাত্রায় এগিয়ে যাওয়ায় নির্বাচন অনুষ্ঠানসহ সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরো জটিল আকারধারণ করেছে। ফলে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন আর অভ্যন্তরীণ বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দুঃখজনক হলেও এটা এখন পরিপূর্ণভাবে একটি আন্তর্জাতিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এই প্রথম বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট এবং নির্বাচনের বিষয়টি একটি আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠলো। এর পরিণতি কি হতে পারে ইতোমধ্যে তা দেশী-বিদেশী বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। সরকার এ বিষয়টিকে কতটা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে তা আমরা জানি না। তবে আমরা মনে করি, রাজনীতি ও নির্বাচন যদি দেশ জনগণের স্বার্থে হয়, তাহলে বর্তমান পরিস্থিতিতে সংলাপ ও সমঝোতার কোনো বিকল্প নেই। এর বদলে যদি ক্ষমতার মোহ ও সংকীর্ণ স্বার্থে একপেশে নির্বাচনের পথেই সরকার অবিচল থাকে, তাহলে তা শুধু দেশ ও জনগণের জন্যই বিপর্যয় ডেকে আনবে না, আখেরে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বর্তমান শাসকগোষ্ঠীও। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সবাই উপলব্ধি করলেই মঙ্গল।
0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

অদ্ভুত আঁধার এক নেমেছে এ দেশে

এখন বাংলাদেশে চরম রাজনৈতিক সঙ্কট। তার প্রভাবে ও প্রতিক্রিয়ায় অর্থনৈতিক সঙ্কট সৃষ্টি হচ্ছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে। সরকারের একগুঁয়েমির বিপরীতে বিরোধী দলের অনড় মনোভাব। এমন অস্বাভাবিক পরিস্থিতির স্বাভাবিক উপসর্গ হিসেবে হরতাল ও অবরোধ এবং আনুষঙ্গিক নেতিবাচক ক্রিয়াকর্ম। অপর দিকে, গত পাঁচ বছরের ধারাবাহিকতায় ক্ষমতাসীনদের ক্রমবর্ধমান স্বেচ্ছাচারিতার বহিঃপ্রকাশ। তার কিছু নজির, বিভিন্ন বাহিনীর চরম দমননীতি, দলীয় ক্যাডারদের বেপরোয়া সন্ত্রাস, মামলা-গ্রেফতার-রিমান্ড-নির্যাতন-কারাবাস এবং কোথাও কোথাও অপহরণ ও গুম। বিশেষ করে গত এক মাসে প্রশাসনিক কঠোরতা আর পাল্টা প্রতিরোধ মিলে হতাহত অনেক; গ্রেফতার শত শত, মামলা ডজনে ডজনে, বহু যানবাহন ভস্মীভূত, আগুনে পোড়া-আধপোড়া অনেকে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন; তাদের কয়েকজন মারাও গেছেন। ভাঙচুর, ককটেল, সংঘর্ষ, ধাওয়াÑ এসব তো নেহাত মামুলি। অনেক ক্ষেত্রে বিরোধী দল মিছিল বা পথসভা করার জন্য রাস্তায় নামতেই পারে না। কোথাও সুযোগ পেলে নেতাকর্মীরা সার্বক্ষণিক উদ্বেগ ও সতর্কতার মাঝে খানিকটা পথ পার হলেই পুলিশের হামলা। বুলেটপ্রুফ বর্ম পরিহিত, রণসাজের পুলিশ অকস্মাৎ পেছন থেকে হানা দেয়, নতুবা সামনে থেকে এগোতে এগোতে বন্দুক তাক করে বুলেট ছোড়ে। রাবার বুলেট খেলনা নয়; বুকে-মাথায়-চোখে লাগলে এটাও ঘাতক হয়ে ওঠে। এ অবস্থায় হরতাল-অবরোধকারীরা জীবনপণ করে সংঘর্ষে লিপ্ত। টিভির ছবিতে দেখা যাচ্ছেÑ ঢিলের জবাবে কাঁদানে গ্যাস, ইটের জবাবে বুলেট ছোড়ার নিত্যকার চিত্র। বৃহস্পতিবার টিভিতে দেখা গেছে, পটুয়াখালী মহিলা দল নেত্রী জেসমিন দাঁড়িয়ে আছেন। এক দল পুলিশ ছুটে গিয়েই ঘিরে ধরে সর্বশক্তি দিয়ে লাঠিপেটা করছে। আমাদের প্রগতিশীল ও নারীবাদী নেত্রীরা কিন্তু এসব দেখেন না। 

একটি পত্রিকায় প্রথম পৃষ্ঠার খবর গত ২৮ নভেম্বর : উপদেষ্টারা যেখানে মন্ত্রণালয়ের কোনো ফাইলেই স্বাক্ষর করতে পারেন না, সেখানে পদত্যাগের মাত্র এক দিন আগে দুই উপদেষ্টা একটি প্রস্তাবের সারসংক্ষেপ তৈরি করে প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে অনুমোদন করিয়ে নিয়েছেন। অনুমোদিত সারসংক্ষেপটি গতকালই (২৭ নভেম্বর) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সারসংক্ষেপটি পুলিশের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিসংক্রান্ত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা একে পুলিশের জন্য ‘নির্বাচনী’ প্যাকেজ হিসেবে দেখছেন। সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, ‘সচিবালয় নির্দেশমালা ও রুলস অব বিজনেসে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।’ অর্থাৎ, জেনেশুনেই নীতিনির্ধারকপর্যায়ে সরকারি বিধিবিধান লঙ্ঘন করা হয়েছে। তা-ও নির্বাচনে দলীয় ফায়দা ওঠানোর সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে। 

এখন নাকি ক্ষমতায় আছে ‘নির্বাচনকালীন সরকার’। তফসিল ঘোষণার পর নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সিদ্ধান্ত নেয়ার নিয়ম নেই। তা কিন্তু এ সরকার মানছে না। নিজের করা নিয়ম নিজেই ভেঙে গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। প্রথম আলো জানিয়েছে, ‘এ প্রসঙ্গে নির্বাচনী দায়িত্বে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের নানা সুযোগ সুবিধা দেয়া হচ্ছে। নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়ন করা হচ্ছে।’

‘সর্বদলীয় সরকার’ নির্বাচনকালীন বলে কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেবে না এবং কেবল রুটিন ওয়ার্ক করবে। এমন কথা ক্ষমতাসীন নেতানেত্রীরা বারবার বলে এলেও বাস্তবে টিকফা চুক্তির মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজও করে ফেলেছে নিজেদের ওই ঘোষণা লঙ্ঘন করে। এ দিকে কয়েকজন ‘ভারপ্রাপ্ত’ সচিবকে ‘ভারমুক্ত’ করে আরো ‘ভারী’ পদে উন্নীত করা হয়েছে। যখন প্রশাসনের শীর্ষপর্যায়ে রদবদল, নিয়োগ-পদোন্নতির বিষয়টি রাজনৈতিক কারণে খুবই স্পর্শকাতর ও তাৎপর্যপূর্ণ, তখনই এটা ঘটল। পত্রিকার রিপোর্টে জানা যায়, রাষ্ট্রপতির ১০ শতাংশ কোটায় পাঁচজন সচিব নিয়োগ দেয়া যায়। এ বিধান অমান্য করে এবার ছয়জনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বহুলালোচিত সচিব, আইন মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন নিয়ে বিতর্কিত একজন সচিব (অন্য একটি মন্ত্রণালয়ের) এবং পুলিশের সাবেক একজন আইজি ও দু’জন এডিশনাল আইজি। বর্তমান সরকারসমর্থক একটি পত্রিকা জানায়, জানুয়ারির মধ্যে অবসরে যাচ্ছেন সরকার সমর্থক কয়েকজন সচিব। তাদের অবসর নেয়ার কথা গত বছর। অথচ তাদের ধরে রাখার জন্য সরকারি চাকুরেদের অবসর বয়সসীমা এক বছর বাড়ানো হয়েছে। এখন ওই সচিবদের কয়েকজনকে চুক্তিতে সচিব পদে রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সে জন্য শিথিল করা হয়েছে রাষ্ট্রপতির কোটা।

নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী প্রচারণার পোস্টার তুলে ফেলা এবং বিলবোর্ড সরানোর নির্দেশ দিতে ঢিলেমির পরিচয় দিয়েছে। বলা বাহুল্য, এসব পোস্টার, ব্যানার, বিলবোর্ড প্রায় সবই আওয়ামী লীগের। এ ক্ষেত্রে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ঘোষিত সময়সীমা শেষ হওয়ার পরে গতকাল সোমবারও দেখা গেছে, খোদ নির্বাচন কমিশন কমপ্লেক্সের পূর্ব দিকে সীমানা ঘেঁষে আওয়ামী লীগের বিশাল বিলবোর্ড। নির্বাচন কমিশন ভবনের চার দিকের রাস্তা বন্ধ করে পুলিশ পাহারা; গেটে ট্যাংকসদৃশ এপিসি যান। অথচ দলীয় প্রচারণার উপকরণ বহাল তবিয়তে। এর কারণ কমিশনের ভীতি, নীতি না অন্য কিছু?

বাংলাদেশের রাজনীতিসহ জাতীয় জীবনে বাঙালি বনাম বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের দ্বন্দ্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। এটা চলে আসছে, বলা যায়, দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন থেকেই। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর থেকে এই আদর্শের সমর্থক মহলে ভাঙন ধরানোর নানা প্রয়াস শুরু হয়। নির্বাচিত বিএনপি সরকারকে সংবিধানবিরোধী ও অগণতান্ত্রিক পন্থায় উৎখাত করে ক্ষমতায় আসেন প্রধান সেনাপতি এরশাদ। তখন সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে এবং গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে বিএনপির একটা গ্রুপকে মাঠে নামিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা চলে। কারণ এরা শহীদ জিয়ার আদর্শ বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী বলে নিজেদের তুলে ধরছিল। কিছু দিন পরে বিএনপির এই অংশ, খন্দকার মোশতাকের ডেমোক্রেটিক লীগের একটা বড় অংশ, আওয়ামী লীগ (মিজান)-এর একাংশ প্রভৃতি নিয়ে প্রথমে জনদল, পরে জাতীয় পার্টি গঠিত হয়। এরশাদের রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে এর জন্ম। দলটিকে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের প্রকৃত প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে দেখানোর কৌশল চলে দেশীবিদেশী ষড়যন্ত্রকারীদের পক্ষ থেকে। উদ্দেশ্য ছিল, বিএনপিকে দুর্বল করা। তবে বিশেষ করে, ১৯৯৬-এর নির্বাচনের পর থেকে এরশাদ ও তার দলের আওয়ামীপন্থী ও ভারতবান্ধব অবস্থান জনগণের সামনে স্পষ্ট। এতে জাপা বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী আওয়ামী লীগের ‘বি’ টিম হিসেবেই নিজেকে কার্যত উপস্থাপন করে আসছে।

একইভাবে এবার বিএনপিতে ভাঙন ধরানোর জন্য বিএনএফ নামে একটি নতুন সংগঠনকে ব্যবহার করার যথাসাধ্য প্রয়াস চালানো হয়েছে। বিএনপির নির্বাচনী প্রতীক ধানের শীষ। বিএনএফ চাইল গমের শীষ। এ দুটো দেখতে প্রায় একই। রহস্যময় ক্ষুদ্র দলটির এই বৃহৎ দাবি থেকেই সবাই বুঝে যান, ‘দাল মে সির্ফ কুছ নেহি, জিয়াদা কালা হ্যায়।’ এই বিএনএফ সামনে রেখেছে অপরিচিত এক লোককে। সাথে আছেন বিএনপির একজন সাবেক প্রতিমন্ত্রী এবং জিয়া আমলের একজন উপমন্ত্রী। তারা বিএনপি ছেড়ে প্রথমে আরেক দল করেছিলেন। যা হোক বিএনএফের মতো অখ্যাত দলের ঘোষণা, তারা সংসদের ৩০০ আসনেই প্রার্থী দেবে। দেখা যাক, কী অবস্থা দাঁড়ায়। 

জাতীয় পার্টি জন্মগতভাবেই অস্বাভাবিক। কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে, এদল ক্ষমতার ভাগীদার হতে চাচ্ছে, ছিটেফোঁটা পাচ্ছে। আবার ব্যাপক উপেক্ষা-বঞ্চনার কারণে আধা বিরোধী দলের ভঙ্গিতে কথা বলার চেষ্টা করছে। গাছের ফল খাওয়া আর তলারটাও কুড়ানোÑ দুটোই করতে চাইলে আম ও ছালা দু’টিই হারাতে হয়। বিশেষ করে গত পাঁচ বছরে জাপা জাতীয় রাজনীতিতে অনেকটা !x-এর মতো অবস্থানে ছিল। এবার নির্বাচন নিয়ে এরশাদ দুই রকম কথা বলায় ড. কামাল হোসেন তাকে ‘থুতু সাহেব’ অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, এরশাদ একসাথে সরকারেও আছেন, বিরোধী দলেও আছেন। বিশ্বের ইতিহাসে এটা নজিরবিহীন ঘটনা।’

জাপা মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার শেখ হাসিনার ‘সর্বদলীয় সরকারে’ মন্ত্রী হয়েছেন। তবে বিরোধী দলের মতো নিজেও এটাকে ‘সর্বদলীয়’ মনে করেন না। বলেছেন, এই সরকারে থাকলেও আমাদের অবস্থান হুবহু আওয়ামী লীগের মতো নয়। হাওলাদার বলেছেন, জাতীয় পার্টি ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের মধ্যস্থতাকারী হবে। অর্থাৎ তাদের অবস্থান ‘মাঝামাঝি’। এমন দ্বৈত ভূমিকা পালনকারী দল আর কোনো দেশে আছে কি না জানা নেই। মজার ব্যাপার হলো, মহাসচিব বর্তমান সরকারকে ‘সর্বদলীয়’ বলে না মানলেও দলের চেয়ারম্যান এরশাদ এটাকে ‘সর্বদলীয়’ সরকার মনে করেন। ২৪ নভেম্বরের একটি পত্রিকায় একই দলের দু’জনের এই দুই রকম বক্তব্য একই পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছে।

আওয়ামী লীগের প্রার্থী নয়, প্রতীক দেখে ভোট দেয়ার আহ্বান এসেছে শীর্ষপর্যায় থেকে। প্রধানমন্ত্রীতনয়ও ভোটযুদ্ধে জয় পেতে নৌকা মার্কা দেখে ব্যালটে সিল মারতে বলেছেন। আওয়ামী প্রতীকের ব্র্যান্ডিং মূল্য আছে বলেও তিনি সম্প্রতি উল্লেখ করেছেন। এসব দেখেশুনে মনে হচ্ছে, মানুষের চেয়ে বস্তু বড় এবং দল জিতলে প্রার্থী নয়, তাদের প্রতীক দেশ চালাবে। কিন্তু মার্কার চেয়ে মানুষ অনেক বড়। জনগণ মনে করে, প্রার্থী সৎ, যোগ্য, জনদরদি ও দেশপ্রেমিক হলে যেকোনো দল তাদের প্রার্থীদের গুণগুলো তুলে ধরে ভোট প্রার্থনা করে। আর যাদের প্রার্থীর যোগ্যতা ও সততার অভাব, যাদের প্রার্থী ভোটারদের আস্থাভাজন নন, তারাই প্রার্থী বাছবিচার না করে বিশেষ কোনো মার্কায় সিল মারার কথা বলতে পারেন। 

গত পাঁচ বছরে যেসব কাণ্ডকীর্তির রেকর্ড ক্ষমতাসীনেরা গড়েছেন, এতে প্রার্থীদের অপেক্ষাকৃত সৎ ও যোগ্য হিসেবে তুলে ধরা তাদের জন্য কঠিন। এ অবস্থায় কোনো স্পর্শকাতর জাতীয় ইস্যু ব্যবহার করে সহজ-সরল সাধারণ মানুষের আবেগ উসকে ফায়দা নেয়ার চেষ্টা করবে ১৪ দল।

যা হোক, মাঝিমাল্লা কেমন দক্ষ ও নির্ভরযোগ্য, তা না দেখে নৌকাটা দেখেই ভোট দেয়ার আহ্বানে একজন কলামিস্ট লিখেছেন, ‘দলে দলে কলাগাছে ভোট দিন’। মনে পড়ছে ১৯৭০ সালের কথা। আওয়ামী লীগের তখনকার অন্যতম শীর্ষ নেতা মিজানুর রহমান চৌধুরী। আমাদের ফেনী জেলায় অনুষ্ঠিত জনসভায় মিজান চৌধুরী বলেছিলেন, ‘নৌকা প্রতীক নিয়ে কলাগাছ দাঁড়ালে তাকেও ভোট দিতে হবে।’

রাজধানীর সব আসনেই ১৪ দল মনোনয়ন দিচ্ছে বর্তমান এমপিদের। তাদের প্রায় সবার বিরুদ্ধে বড় বড় অভিযোগ রয়েছে। তদুপরি তারা ছিলেন দলীয় নেতাকর্মী থেকে বিচ্ছিন্ন। আমি যে এলাকায় থাকি, সেখানে যিনি আওয়ামী এমপি, তার বাসা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দুটোই অন্য দু’টি আসনের এলাকায়। তিনি এমপি হয়ে একটি স্বনামধন্য স্কুলের বহু শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করেছেন আওয়ামী লীগ সমর্থক নয় বলে। সে স্কুলে ভর্তি করা হয়েছে অনেক বেশি শিক্ষার্থী। এর পেছনে মোটা অঙ্কের লেনদেনের কথা শোনা গেছে। সাংবাদিক লাঞ্ছনার অভিযোগও রয়েছে এই এমপির নামে। এলাকার মানুষের কাছে তিনি বহিরাগত। তবু আবারো তিনি পেলেন দলের মনোনয়ন।

সরকার সমর্থক ‘আমাদের সময়’ পত্রিকায় শুক্রবার জানানো হয়েছে, ঢাকায় একজন মন্ত্রী ও একজন প্রতিমন্ত্রীসহ আটজন এমপির বদলে কিন ইমেজের প্রার্থী সন্ধান করা হয়েছিল। তবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না থাকায় পুরনোরাই দশম জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হয়ে নির্বাচনে অংশ নেবেন।’ অর্থাৎ এসব জবরদস্ত আওয়ামী নেতানেত্রী আনকিন বা কলঙ্কিত বলে দলই স্বীকার করে নিয়েছে। যে নির্বাচনে এমন প্রার্থীর ছড়াছড়ি, সেটা কিন হয় কী করে?

পাদটীকা : বাল্টিক অঞ্চলের ুদ্র ইউরোপীয় দেশ লাটভিয়া। সেখানে এবার একটি মার্কেট ধসে অর্ধশতাধিক ব্যক্তি মারা গেছেন। এই দুর্ঘটনার দায় পুরোটাই কাঁধে নিয়ে পদত্যাগ করেছেন সরকার প্রধান ভালদিস দোমব্রোভস্কিস। আর আমাদের বাংলাদেশে জাতীয় জীবনে রাজনৈতিক মহা ধস নেমেছে। এতে এ যাবৎ প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত কয়েক শ’ মানুষ। না, এখানে কেউ পদত্যাগ করেননি, তার সম্ভাবনাও নেই। বরং এই অদ্ভুত দেশে পদত্যাগের চেয়ে নিজের দু’টি পদকে ত্যাগ করা সহজ। আর কখনো যদি মন্ত্রীরা পদত্যাগ করেনও, মন্ত্রিত্ব তাদের ত্যাগ করে না।


 

Ads