শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী, ২০১৫

বিদেশী কূটনীতিকদের তৎপরতা এবং তারানকোর সেই ফিরে যাওয়া


বাংলাদেশে আবারও বিদেশী কূটনীতিকদের তৎপরতা শুরু হয়েছে। কূটনীতিকরা সাধারণত সব সময়ই তৎপরতা চালিয়ে থাকেন কিন্তু সেটা দৃশ্যমান ও আলোচিত হয় বিশেষ বিশেষ সময়ে- যেমনটা হচ্ছে গত ১৪ জানুয়ারি থেকে। এবারের কারণ সৃষ্টি হয়েছে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা রিয়াজ রহমান সশস্ত্র হামলার শিকার হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে। এ প্রসঙ্গে প্রথমে বিবৃতি দিয়েছে হামলায় ‘স্তম্ভিত ও মর্মাহত’ মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর। হামলাকারীদের সনাক্ত করে কঠোর শাস্তি দেয়ার জন্য সরকারকে অনুরোধ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর প্রতিক্রিয়া এসেছে ব্রিটেনসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে। দেশগুলোর ঢাকায় নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতরা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপ শুরু করার জন্য তাগিদ দিয়েছেন। এক বিবৃতিতে বলেছেন, বাংলাদেশে ‘গণতান্ত্রিক স্পেস সংকুচিত হয়ে যাওয়ায়’ তারা শংকিত। পরদিন ১৫ জানুয়ারি রাতে তারা বিএনপি নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। আলোচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে জানা না গেলেও বলা হচ্ছে, বিএনপির প্রতিও সমঝোতা ও সংলাপের একই আহ্বান জানিয়েছেন তারা। ধরে নেয়া যায়, কূটনীতিকদের এই তৎপরতা চলতেই থাকবে, বিভিন্ন রাষ্ট্র ও সংস্থাও জড়িয়ে পড়বে পর্যায়ক্রমে।
প্রসঙ্গক্রমে বলা দরকার, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটে অতীতেও বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের তৎপরতা দেখা গেছে। ২০১৩ সালের কথাই ধরা যাক। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর ওপর ভর করে আওয়ামী লীগ সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের ঘোষণা দেয়ার পর থেকেই বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট আন্দোলন শুরু করেছিল। দাবি ছিল নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজন করার। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সংকট ঘনীভূত হয়ে ওঠায় জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন তার ‘বিশেষ দূত’ অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোকে দূতিয়ালী করার জন্য ঢাকায় পাঠিয়েছিলেন। তারনকো নিজেও ছিলেন জাতিসংঘের রাজনীতি বিষয়ক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল। এ পরিচিতির মধ্যেও তার সফরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল। বাংলাদেশের নির্বাচনকেন্দ্রিক সংকটের মীমাংসা করার ঘোষণা দিয়ে ৬ ডিসেম্বর তিনি ঢাকায় এসেছিলেন। মিস্টার তারানকোকে সামনে রেখে তৎপর হয়েছিলেন আসলে মহাসচিব বান কি মুন নিজেই। উল্লেখ্য, এর আগেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠে সুষ্ঠু ও সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে মহাসচিব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তৎকালীন বিরোধী দলের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে বার কয়েক যোগাযোগ করেছিলেন। সমঝোতা ও সংলাপের আহ্বান জানিয়ে দুই নেত্রীর কাছে প্রথম চিঠি লিখেছিলেন তিনি ২০১৩ সালের মে মাসের প্রথম সপ্তাহে। সে সময়ও, ১০ মে দুই নেত্রীর জন্য মহাসচিবের দুটি চিঠি নিয়ে বিশেষ দূত হিসেবে ঢাকায় এসেছিলেন মিস্টার তারানকো। দুই নেত্রীর সঙ্গেও বৈঠক করেছিলেন তিনি। কিন্তু মূলত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনড় মনোভাবের কারণে তারানকোর চেষ্টা সফল হতে পারেনি। এরপর ২৩ আগস্ট বান কি মুন দুই নেত্রীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন এবং সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় সমঝোতা আলোচনায় অংশ নেয়ার জন্য তাদের দু’জন করে প্রতিনিধিকে নিউইয়র্কে পাঠানোর অনুরোধ জানান। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া সম্মত হলেও প্রধানমন্ত্রী হননি বলে বান কি মুনের সে উদ্যোগ ব্যর্থ হয়ে যায়। মহাসচিব অবশ্য তার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছিলেন। দ্রুত আরো জটিল ও ঘনীভূত হতে থাকা সংকটের মধ্যে ক্ষমতাসীনরা একতরফা নির্বাচনের পথে এগিয়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বান কি মুন আবারও তার একই সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল তারানকোকে ঢাকায় পাঠিয়েছিলেন ডিসেম্বরে।
সুতরাং মিস্টার তারানকোর এই সফর মোটেও সাধারণ কোনো বিষয় ছিল না। জনগণও তার দিকে অনেক আশায় বুক বেঁধে তাকিয়ে থেকেছে। ঢাকায় আসার পর থেকেই মহা ব্যস্ত  সময় কাটিয়েছিলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধী দলের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ছাড়াও বিএনপি ও আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে পালাক্রমে  বৈঠক করেছিলেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে তো দফায় দফায় বসেছেনই, একই সঙ্গে বৈঠক করেছেন ‘নিষিদ্ধ’ ঘোষিত জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের সঙ্গেও। ঝানু এই কূটনীতিক অবশ্য আলোচনার বিষয়বস্তু নিয়ে সহজে মুখ খোলেননি। কথা বলেছিলেন মাত্র দু’বার। প্রথমে ৯ ডিসেম্বর তিনি বলেছেন, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতামুখী সদিচ্ছা এবং ছাড় দেয়ার মানসিকতা থাকলে সমস্যার জট খোলা সম্ভব হতে পারে। এ পর্যন্ত এসেই থেমে পড়েছিলেন মিস্টার তারানকো। এর কারণ আসলে ক্ষমতাসীনদের, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর একগুঁয়েমি এবং আবারও ক্ষমতায় আসার জন্য অনড় মনোভাব। এর প্রমাণও পাওয়া গিয়েছিল অনেক আগে থেকে। যেমন সংকটের সূচনা হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই বেগম খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রশ্নে ছাড় দিয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, নির্বাচনকালীন সরকারের নাম তত্ত্বাবধায়ক বা অন্য যে কোনো কিছু হতে পারে কিন্তু ওই সরকারকে অবশ্যই নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ হতে হবে। তাছাড়া শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদে বহাল থাকলে তার অধীনে কোনো নির্বাচনে তারা অংশ নেবেন না। বেগম খালেদা জিয়ার দেয়া ছাড় এবং ঘোষিত কর্মসূচির প্রতি জনসমর্থনের বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছিল। দিনের পর দিন ধরে অবরোধে অচল হয়ে পড়েছিল সারা দেশ। রাজধানীতে র‌্যাব পুলিশ ও বিজিবিকে দিয়ে গুলী চালানোর ও গ্রেফতার করার অভিযান চালাতে পারলেও সাধারণ মানুষ অংশ নেয়ায় বেশির ভাগ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকার প্রকৃতপক্ষে কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলেছিল। বহু জেলায় এমনকি নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র পর্যন্ত পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। ওদিকে রাজনৈতিক অঙ্গনেও সরকার সঙ্গীহীন হয়ে পড়েছিল। বোঝাই যাচ্ছিল, যে নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছিল সেটা একদলীয় নির্বাচনে পরিণত হবে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে উচিত যেখানে ছিল সমঝোতা প্রতিষ্ঠা ও সব দলকে নির্বাচনে নিয়ে আসাসহ গণতন্ত্রসম্মত পথে পা বাড়ানো সরকার সেখানে উল্টো পথে এগোতে শুরু করেছিল। সরকারের ফ্যাসিস্ট দমন-নির্যাতন ও হত্যার শিকার হচ্ছিল নারী-শিশু ও বৃদ্ধসহ সাধারণ মানুষ। বিরোধী দলের নেতা-কর্মীরা রাজপথে দাঁড়াতেই পারছিলেন না। সে অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় জানিয়ে দিয়েছিল, বিরোধী দল ছাড়া একতরফা বা একদলীয় কোনো নির্বাচন তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। কথাটা অনেক আগে থেকে জানিয়ে আসার ধারাবাহিকতায় ডিসেম্বরে এসেও পরিষ্কার করেছিলেন বিভিন্ন রাষ্ট্র ও সংস্থার দূত ও প্রতিনিধিরা। যেমন মিস্টার তারানকো ঢাকায় আসার প্রাক্কালে কমনওয়েলথের প্রতিনিধি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে জানিয়ে দিয়েছিলেন, সব দল অংশ না নিলে সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে তারা পর্যবেক্ষক পাঠাবেন না। ইউরোপীয় ইউনিয়নও একই কথা বলেছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইইউসহ কয়েকটি প্রভাবশালী রাষ্ট্র ও সংস্থা আবারও সংলাপ ও সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠানের তাগিদ দিয়েছিল। মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল ভারত হয়ে ওয়াশিংটনে ফিরে গিয়ে স্পষ্টভাষায় জানিয়েছিলেন, প্রধান বিরোধী দল বিএনপি অংশ না নিলে সে নির্বাচনের ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। ঘটনাপ্রবাহে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল গণচীনের ভূমিকা। প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের ব্যাপারে প্রকাশ্যে বক্তব্য রাখতে গিয়ে চীনের রাষ্ট্রদূত লি জুন বলেছিলেন, চীন শুধু উন্নত, স্থিতিশীল বাংলাদেশ নয়, ‘স্বাধীন’ বাংলাদেশও দেখতে চায়। কথাটা উল্লেখের কারণ সম্ভবত বুঝিয়ে বলার দরকার পড়ে না। চীনের কাছে নিশ্চয়ই এমন কোনো তথ্য ছিল, যা সত্য হলে বাংলাদেশ এমনকি স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বও খুইয়ে বসতে পারে।
বলা বাহুল্য, চীনের এই আশংকার কারণ তৈরি করে চলেছে সরকারের একমাত্র ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ ভারত। রাজনৈতিক সংকটের সুযোগে ভারত ওই দিনগুলোতে এমনকি কোনো রকম রাখঢাক করারও দরকার বোধ করেনি। ভারতীয় দূতাবাস প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়ে ‘সংবিধান অনুযায়ী’ এবং ‘যথাসময়ে’ নির্বাচন অনুষ্ঠানের তাগিদ দিয়েছিল। বিবৃতিটির মূলকথায় প্রধানমনস্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যেরই পুনরাবৃত্তি লক্ষ্য করা গিয়েছিল যা শুনে বুঝতে অসুবিধে হয়নি যে, ভারত সর্বতোভাবে আওয়ামী লীগ সরকারের নেয়া অবস্থানকেই সমর্থন করে চলেছে। এরপর সরাসরি কথা বলেছিলেন ভারতীয় হাই কমিশনার পংকজ শরণ। তিনি রীতিমতো ঘোষণার স্টাইলে জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে ভারত ‘সক্রিয়’ রয়েছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য কিছু দেশের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তারও আগে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে বাংলাদেশের ব্যাপারে কথা হয়েছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার কাছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং নাকি বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ওবামাও নাকি ভারতের সঙ্গে ‘একযোগে’ কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন। বলা হচ্ছিল, মূলত সে কারণেই ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা হঠাৎ করে দিল্লী গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে তাকে তার আশা ও পরিকল্পনা অনুযায়ী গুরুত্ব বা পাত্তা দেয়া হয়নি। এ থেকেও পরিষ্কার হয়েছিল, বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারতই নেতৃত্ব দখল করে নিয়েছে।
এই ব্যর্থ মিশনের পরপরই ঢাকায় ফিরে সোজা ওয়াশিংটন চলে গিয়েছিলেন ড্যান মজিনা। প্রায় দু’ সপ্তাহ ‘ছুটি’ কাটিয়ে আসার পর মিস্টার মজিনাকে আর আগের মতো সোচ্চার কিংবা তৎপর দেখা যায়নি। পরিবর্তে দৃশ্যপটে বেশি দেখা গেছে ভারতীয়দের। মিস্টার পংকজ শরণ তো বৌদ্ধদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মতো উপলক্ষেও বাংলাদেশের রাজনীতি, নির্বাচন এবং সংবিধান সম্পর্কে জ্ঞান বিতরণ করেছেন। ঘটনাপ্রবাহে অংশ নিতে ঢাকা সফরে এসেছিলেন মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল। তিনি যে ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক- সে তথ্যটি অত্যধিক গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করানোর মধ্য দিয়ে প্রকারান্তরে একথাটাই জানিয়ে দেয়া হয়েছিল যে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ব্যাপারে ওয়াশিংটন দিল্লীর সঙ্গে ‘একযোগে’ কাজ করবে- যেমনটি দেশ দুটিকে দেখা গিয়েছিল ১/১১-এর পূর্ববর্তী দিনগুলোতে। সে সময় মার্কিন রাষ্ট্রদূত হ্যারি কে টমাসের তৎপরতা এবং ‘তৃতীয় শক্তি’র ক্ষমতা দখল সম্পর্কিত ভবিষ্যদ্বাণীর কথা স্মরণ করা যেতে পারে। মিস্টার টমাসেরও আগে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিজা রাইস ভারত সফরে এসে ঘোষণা করেছিলেন, বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র ‘একযোগে পদক্ষেপ’ নেবে। সে ‘পদক্ষেপ’ই দেশ দুটি নিয়েছিল। তারই সূত্র ধরে একদিকে জেনারেল মইন ও ড. ফখরুদ্দিনরা অসাংবিধানিক শাসন কায়েম করেছিলেন, অন্যদিকে ডিজিটাল নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল আওয়ামী লীগ। মিস্টার তারানকোর সফরের প্রাক্কালেও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে একই ধরনের ষড়যন্ত্র করা হচ্ছিল বলে দেশপ্রেমিক পর্যবেক্ষকরা মনে না করে পারেননি।
এমন এক অবস্থার মধ্যে ‘উদ্ধারকারী’ হিসেবে এসেছিলেন বলেই অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর সফরকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। অন্যদিকে মিস্টার তারানকোর সম্ভাব্য সাফল্যের সামনেও ক্ষমতাসীনরাই যথারীতি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছিলেন। সর্বশেষ ১০ ডিসেম্বরের বৈঠকেও তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী পদে বহাল রাখার জন্য জেদ ধরে বসেছিলেন। এটা ছিল ‘সালিশ মানি কিন্তু তাল গাছটা আমার’ ধরনের অবস্থা! অথচ শেখ হাসিনাই ছিলেন সব সমস্যার মূলে। আবারও ক্ষমতায় আসার জন্য তার অনড় মনোভাবের কারণেই দেশী-বিদেশী সব মহলের সব চেষ্টাই তখন ব্যর্থ হয়েছিল। অন্যদিকে সংকটের সূচনা হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই বেগম খালেদা জিয়া কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রশ্নে ছাড় দিয়েছিলেন। বেগম জিয়ার দেয়া ছাড় এবং ঘোষিত কর্মসূচির প্রতি জনসমর্থনের বিষয়টি মিস্টার তারানকো ঢাকায় আসার আগেই সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছিল। সারা দেশ অবরোধে অচল তো হয়ে পড়েছিলই, বেশির ভাগ জেলা ও উপজেলায় সরকারও কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলেছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও জনমতের প্রতি সম্মান দেখানোর নাম করেননি ক্ষমতাসীনরা। মিস্টার তারানকোর উপর্যুপরি অনুরোধকেও তারা শেখ হাসিনার দোহাই দিয়ে পাশ কাটিয়েছিলেন। একই কারণে সফলতার মুখ দেখতে পারেনি মিস্টার তারানকোর মাধ্যমে নেয়া জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগ। ক্ষমতাসীনরা অবশ্য সম্পূর্ণরূপে নিরাশ করেননি মিস্টার তারানকোকে। তার মুখ রক্ষার জন্য একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে চার-চারজন নেতা গুলশানে গিয়ে বৈঠক করেছিলেন বিএনপির চার নেতার সঙ্গে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোনো সুফল বেরিয়ে আসেনি দু’ঘণ্টার সে বৈঠকে। শুধু একটি ঘোষণাই শুনিয়েছিলেন তারা। মিস্টার তারানকোর দূতিয়ালীতে যে আলোচনার শুরু হয়েছে সেটা অব্যাহত থাকবে। অর্থাৎ বিএনপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের আলোচনা চলবে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, ক্ষমতাসীনরা কিন্তু জানাননি, সমস্যার মূল কারণ প্রধানমন্ত্রীকে তারা সরিয়ে দিতে রাজি আছেন কি না। বেগম খালেদা জিয়ার তথা ১৮ দলীয় জোটের দাবি অনুযায়ী নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের প্রশ্নেও তারা চুপটিই মেরে থেকেছেন। এসবের পাশাপাশি রাজনৈতিক অঙ্গনে এ গুঞ্জনও ভাসিয়ে দেয়া হয়েছিল যে, সবই করেছেন তারা মিস্টার তারানকোর তথা মহাসচিব বান কি মুনের মান বাঁচানোর জন্য। এর কারণ, বান কি মুন সেই জাতিসংঘের মহাসচিব- যে সংস্থাটির সঙ্গে সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের নানামুখী দায়বদ্ধতা রয়েছে। জাতিসংঘের শান্তিমিশনে সুযোগ পাওয়া-না পাওয়ার মতো বিষয় তো ছিলই, জড়িত ছিল দেশের অভ্যন্তরেরও বিশেষ কিছু ব্যাপার। এসব কারণে বান কি মুনের উদ্যোগ ও পরামর্শকে প্রত্যাখ্যান করার পরিণতি প্রধানমন্ত্রীসহ ক্ষমতাসীনদের জন্য শুভ নাও হতে পারতো।
একই কারণে একদিকে ক্ষমতাসীনরা লোক দেখানো কৌশল নিয়েছিলেন অন্যদিকে ব্যর্থ হলেও মিস্টার তারানকো সরাসরি তা জানাননি। পরিবর্তে বিদায়ের আগে ‘বুঝ’ দিয়ে গিয়েছিলেন জনগণকে। এ ছাড়া তার কোনো উপায়ও ছিল না বেচারা তারানকোর। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মূলত ক্ষমতাসীনদের অনড় মনোভাব মিস্টার তারানকোর মিশনকে ব্যর্থ করেছিল। অথচ সরকারের প্রশ্নে বেগম খালেদা জিয়া আগেই ছাড় দিয়ে রাখায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সহজেই ইতিবাচক সাড়া দিতে পারতেন। দিলে লাভবানও তিনিই বেশি হতেন। সে কথাটাই তাকে বুঝিয়ে বলতে এসেছিলেন মিস্টার তারানকো। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তাকে শূন্য হাতে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তখন শোনা গিয়েছিল, তিনি নাকি রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে গঠিত সরকারের অধীনে নির্বাচনের একটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সে প্রস্তাবেও সাড়া দেয়নি আওয়ামী লীগ। মাত্র সেদিনের এই তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণেই বিদেশী কূটনীতিকদের সাম্প্রতিক তৎপরতায় খুব বেশি আশাবাদী হতে পারছেন না জনগণের সচেতন অংশ। ক্ষমতায় শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কেউ থাকলে হয়তো এমন মন্তব্য করতে হতো না!
আহমদ আশিকুল হামিদ 

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads