সোমবার, ১২ জানুয়ারী, ২০১৫

দেশকে গৃহযুদ্ধের অভিশাপ থেকে বাঁচানো প্রতিটি নাগরিকের পবিত্র দায়িত্ব


গত রোববার টঙ্গীতে তাবলীগ জামায়াতের বিশ্ব ইজতিমার প্রথম পর্যায়ের আখেরী মুনাজাতের দিন ধার্য ছিল। দেশ বিদেশের বহু লোক পরিবহন সংকট ও কনকনে শীত উপেক্ষা করে এই মুনাজাতে অংশগ্রহণ করেছেন। অন্যান্যবার বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ইজতিমা মাঠে কিংবা তার কাছাকাছি স্থানে গিয়ে মুনাজাতে অংশ নিতেন। কিন্তু এবার একটি ব্যতিক্রমী দৃশ্য টেলিভিশন চ্যানেলগুলো প্রচার করেছে। তারা উভয়েই তাদের সরকারি বাসভবন যথাক্রমে বঙ্গভবন ও গণভবনে বসে আখেরী মুনাজাতে শরিক হয়েছেন। তাবলীগ জামায়াতের পুরো কর্মসূচিতে কোথাও কোন সংঘাত সংঘর্ষ কিংবা নাশকতামূলক কোনও কর্মকান্ডের খবর পাওয়া যায়নি। ঘরে বসে মুনাজাতের কারণ শীতের তীব্রতা না ভয় তা অবশ্য জানা যায়নি।
এদিকে এই দিন মহানগরী বিশেষ করে গুলশান এলাকায় এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে। সরকার এবং তার গোয়েন্দা বাহিনী কোনও এক সূত্র থেকে এই মর্মে খবর পান যে, জামায়াত-শিবির ও বিএনপির হাজার হাজার লোক ছদ্মবেশে তাবলীগ জামায়াতে ঢুকে পড়েছে এবং তারা আখেরী মুনাজাত শেষে সদলবলে এসে ২০ দলীয় নেত্রী বেগম জিয়াকে গুলশানে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্ত করে নিয়ে যাবেন। বলাবাহুল্য ৫ জানুয়ারির আগে থেকেই তিনি গুলশানে তার রাজনৈতিক কার্যালয়ে অবরুদ্ধ অবস্থায় আছেন। তিনি যাতে ৫ জানুয়ারির ঘোষিত কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করতে অথবা নয়াপল্টন বিএনপি অফিসে যেতে না পারেন সে জন্য সরকারের নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রাস্তা থেকে ১৩টি ইট বালুবাহী ট্রাক ধরে নিয়ে তার অফিসগৃহের সামনে, ডানে এবং বাঁয়ে এমনভাবে ব্যারিকেড দিয়ে রাখে যাতে তিনি বের হতে না পারেন। তার সাথে দেখা সাক্ষাতের উপরও কড়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দৌজা চৌধুরীসহ সিনিয়র বিরোধীদলীয় নেতাদের তার সাথে সাক্ষাৎ করতে দেয়া হয়নি। সরকারের শীর্ষ মহল থেকে শুরু করে জেলা ও জাতীয় পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ তার সম্পর্কে এমন সব কথাবার্তা বলতে শুরু করেন যাকে কোনোক্রমেই শোভনীয় বলা যায় না। যাই হোক, অবরুদ্ধ অবস্থা বেশ কয়েকদিন চলার পর ইট-বালুর ট্রাকগুলো সরকার সরিয়ে নেন এবং তার অফিসের দুটি গেটের একটির একটি তালা খুলে দেন। দিন দুয়েক এই অবস্থা চলার পর হঠাৎ করে বেগম জিয়াকে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে বর্ণিত পন্থায় উদ্ধারের গুজব শুনে সরকার তার মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন এবং এ প্রেক্ষিতে গুলশানের সমস্ত প্রবেশ পথে দেয়া পুলিশী পাহারা কঠোর থেকে কঠোরতর করা হয়। গুলশানের বাসিন্দা এবং গুলশানের মাঝখান দিয়ে চলাচলকারী মানুষের ভোগান্তি চরমে উঠে।
আমার মনে হচ্ছে, সারা দেশ একটি জীবন্ত আগ্নেয়গিরিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। এর অগ্ন্যুৎপাত যে কোনও সময় একটি ধ্বংসযজ্ঞ ডেকে আনতে পারে। আবার কারো কারো মতে, বাংলাদেশের আকাশে ঈশান কোণে যে মেঘ জমেছে তা ঝড়ো হাওয়ার রূপ নিয়ে এখন প্রচ- ঘূর্ণিবার্তায় পরিণত হয়ে সারা দেশকে লন্ডভন্ড করার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এই লন্ডভন্ড অবস্থা থেকে দেশকে বাঁচাতে হলে অবিলম্বে সরকারের নমনীয় অবস্থান প্রয়োজন; জন দাবির কাছে নতি স্বীকার করে তার ভিত্তিতে নির্দলীয় নিরপেক্ষ একটি নির্বাচনের ঘোষণা দিয়ে তারা ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যবস্থা করতে পারেন। তা না হলে যে অবস্থার সৃষ্টি হবে তা কারুর জন্য সুখকর হবে না।
গতকাল আমি যখন এই নিবন্ধটি লিখছিলাম তখন সারা দেশে ২০ দলীয় ঐক্যজোটের ডাকে দেশব্যাপী আহূত অনির্দিষ্টকালের অবরোধের সপ্তম দিন অতিবাহিত হচ্ছিল। অবরোধ আহ্বানের আগে এই ঐক্যজোটের নেত্রী সরকারের কাছে ৭ দফা দাবি মেনে নেয়ার আহ্বান জানান এবং এই লক্ষ্যে একটি ফলপ্রসূ সংলাপের প্রস্তাব দেন। সরকার তার দাবি এবং সংলাপের প্রস্তাব উভয়টিই প্রত্যাখ্যান করেন, ৫ জানুয়ারির বিরোধীদলীয় সমাবেশও তাদের করতে দেয়া হয়নি। সরকার প্রকাশ্যে অস্ত্রের ভাষায় বিরোধী দল দমনের ঘোষণা দেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সরকার তার নিজস্ব দল ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের অস্ত্র সজ্জিত হয়ে বিরোধী দলকে দমনের জন্য মাঠে নামারও নির্দেশ দেন। এই নির্দেশে সারা দেশ এখন অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস মানুষের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা মার খেতে খেতে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য প্রতিরোধ শুরু করেছেন। অন্যদিকে মৌলিক মানবাধিকার, ভোটাধিকার, জীবন-সম্পদ ও মানসম্মানের নিরাপত্তাহারা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে ওষ্ঠাগতপ্রায় সাধারণ মানুষ অধিকার পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে হরতাল-অবরোধকে প্রধান অস্ত্র হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে বলে মনে হয়।
গতকাল সোমবার রাজধানীতে আওয়ামী লীগ তার টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার প্রথম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে সমাবেশ করেছিল। বলা নিষ্প্রয়োজন যে, এই মেয়াদে জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়াই নির্বাচন করে তারা পুলিশ, র‌্যাব ও অস্ত্রধারী গুন্ডাদের সহায়তায় ক্ষমতা দখল করেছিল। গণতন্ত্র হত্যার এ দিবসটি পালনের জন্য তারা বিরোধী দলকে অনুমতি দেয়নি। এখন নিজেরাই পুলিশের বিনা অনুমতিতে তা পালন করছে।
এদিকে ২০ দলীয় জোটের নেতৃত্বে অবরোধের পাশাপাশি এ দিন ঢাকাসহ দেশের ১৬টি জেলায় হরতাল পালিত হয়েছে।
অবরোধে সারা দেশে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। যাত্রীবাহী গাড়ি, পণ্যবাহী ট্রাক, প্রাইভেটকার, ট্যাক্সি, মাইক্রোবাস, লেগুনা, সিএনজি, ট্রেন প্রভৃতি হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের শিকার হচ্ছে। ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রাণান্ত চেষ্টারত সরকার তার সৃষ্ট সমস্যার সমাধা, দুঃশাসনের অবসান কিংবা সংলাপ অনুষ্ঠান কোনটিতেই রাজি হচ্ছে না, বিক্ষুব্ধ রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর জুলুম নির্যাতন ও গ্রেফতার হয়রানির মাত্রা তারা বৃদ্ধি করে দিয়েছেন। সারা দেশ একটি কারাগারে পরিণত হয়েছে। সমগ্র রাষ্ট্রযন্ত্রকে তারা দলীয়করণ করে জনগণের বিরুদ্ধে এমনভাবে ব্যবহার করেছেন যে, মানুষ রাষ্ট্রের এই অঙ্গগুলোকে এখন গণবিরোধী ভাবতে শুরু করেছেন। পুলিশ কর্মকর্তাদের বাড়িতে হামলা, বিচারকের গাড়ি-বাড়িতে হামলা, ম্যাজিস্ট্রেটের ওপর হামলা, রাস্তা কেটে যানবাহন চলাচলে বিঘœ সৃষ্টি, ককটেল ও বোমা হামলা প্রভৃতি ঘটনাকে ঘিরে মানুষের উদ্বেগ উৎকণ্ঠা সাংঘাতিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। হাইকোর্টের এজলাস ও বাথরুম থেকে বোমা পিস্তল সদৃশ বস্তু উদ্ধার শুভ লক্ষণ নয়।
সরকার যে ভাষায় কথা বলেন তাতে বিশ্বাস করতে অসুবিধা হয় না যে, বিরোধী দলকে ফাঁসানোর জন্য তারা এই কাজগুলো করাচ্ছেন। আমি নিশ্চিতভাবে এই কথা বলতে চাই না। আমি বলতে চাই যে, দেশের পরিস্থিতি দিন দিন অবনতির দিকে যাচ্ছে। ঢাকার তুলনায় মফস্বলের অবস্থা অনেক খারাপ। জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করার জন্য বিজিবির রিকুইজিশন দিয়েছেন। পুলিশ বিজিবির পাহারায় অবরোধের মধ্যে আন্তঃজেলা যানবাহন চালানোর চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু অবস্থা যা দেখা যাচ্ছে তাতে পুলিশ-বিজিবির নিরাপত্তা দেবে কে এবং কত দিন? সরকার ইতোমধ্যে সিনিয়র সরকারি কর্মকর্তা ও সরকারি দলের নেতাদের পুলিশী নিরাপত্তা দিতে শুরু করেছেন বলে জানা যায়। এরপরও অনেকে আখের গুছিয়ে বিদেশে যাবার চেষ্টা করছেন। জনগণকে ক্ষেপিয়ে ক্ষমতায় যে বেশি দিন থাকা যায় না আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ অবশ্যই তা জানেন বলে আমার ধারণা। বর্তমান পরিস্থিতির দুঃখজনক দিক হচ্ছে, একাত্তর থেকে পঁচাত্তর পর্যন্ত সরকারি এবং বেসরকারিভাবে যারা চুরি-চাকারি সন্ত্রাস দুর্নীতি ও বিভিন্ন অপকর্ম করে শেখ মুজিবুর রহমানকে ডুবিয়ে ছিলেন তাদের বেশিরভাগই এখন প্রধানমন্ত্রীর মন্ত্রী উপদেষ্টা হিসেবে তার আশপাশে রয়েছেন। তার ভুলে যাবার কথা নয় যে ঐ সময়ের দলের অপকর্মের জন্যে শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে নির্বাচনের পূর্বে হাতজোড় করে ‘আরেকটি বার সুযোগ দেয়ার জন্য’ মানুষের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন। যে অবস্থার জন্য তিনি ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন তার সরকারের এখনকার অবস্থা তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি খারাপ। গণতন্ত্র হত্যা, মানবাধিকার লঙ্ঘন, একদলীয় শাসন কায়েম, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের ধ্বংস এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয়করণ করে সরকার টিকে থাকতে চাচ্ছেন এবং জুলুম নির্যাতনের মাত্রা বাড়াচ্ছেন। তারা সিভিল-মিলিটারি ব্যুরোক্র্যাসিকে সন্তুষ্ট রাখার লক্ষ্যে তাদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা দ্বিগুণ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সিনিয়র সেক্রেটারির পদ সৃষ্টি করেছেন, সৎ, দক্ষ ও নিয়মনিষ্ঠ দেশপ্রেমিক কর্মকর্তাদের কর্মচ্যুত করেছেন। পুলিশ-র‌্যাবকে মানুষ হত্যার কাজে ব্যবহার করছেন, তাদের কেউ কেউ ভাড়ায় মানুষ মারে এবং পয়সা নিয়ে মানুষ হত্যা করে। গ্রেফতার বাণিজ্য সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। চাঁদাবাদী টেন্ডারবাজি, সন্ত্রাস ব্যাংক ও অর্থ প্রতিষ্ঠানের অর্থ লুট এখন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দেশ এখন খাদের কিনারায়। তাকে অধঃপতন থেকে উদ্ধার করার দায়িত্ব দেশবাসীর-সুশীল সমাজের আশঙ্কা অনুযায়ী আমাদের এই মাতৃভূমি গৃহযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাক আমরা কেউ তা চাই না।
ড. মোঃ নূরুল আমিন 

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads