সোমবার, ২ ডিসেম্বর, ২০১৩

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

মিয়ানমার ও ফিলিপাইনের পর অ্যাঙ্গোলায়


একপেশে এই বিশ্ব ব্যবস্থায় ন্যায় ও সত্যের দুর্ভিক্ষ চলছে। যার জোর বেশি, যার প্রোপাগান্ডার শক্তি ব্যাপক তার ইচ্ছাই সত্য বলে মেনে নিচ্ছে বর্তমান সভ্যতা। প্রকৃত সত্য কি, ন্যায় কি তা জানার মতো সাহস ও নৈতিক শক্তি যেন হারিয়ে ফেলেছে বর্তমান সময়ের মানুষ। ফলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই যুগেও আমাদের বসবাস আলো ঝলমলে এক জাহেলিয়াতে। নইলে সাম্প্রদায়িকতা ও সন্ত্রাসের মতো ঘটনায় শুধু মুসলমানদের অভিযুক্ত করা হবে কেন? আর কেউ কি সন্ত্রাস করছে না? সাম্প্রদায়িক হিংসার অনল জ্বলছে না? ন্যায় ও সত্যবিমুখ বর্তমান সভ্যতার চ্যাম্পিয়নদের কাছে এ প্রশ্নের কোনো জবাব নেই। অথচ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, সত্য ও ন্যায়ের বিকাশ না ঘটলে কোনো সমাজ ও সভ্যতায় কাক্সিক্ষত শান্তি আসতে পারে না। এই কারণেই হয়তো বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থার কুশীলবরা নানাভাবে শান্তির ললিতবাণী উচ্চারণের পরও বিশ্বে ক্ষোভ ও হিংসার মাত্রা বেড়েই চলছে। তাই বিশ্বের বিবেকবান মানুষকে এখন ন্যায় ও সত্যের পক্ষে মেরুদ- সোজা করে দাঁড়াতে হবে। এটাই সময়ের দাবি।
বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় নানাভাবে মুসলমানরা নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। ফলে ‘মুসলিম’ ও ‘মজলুম’ শব্দ এখন সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ২৪ নবেম্বর অ্যাঙ্গোলায় পবিত্র ধর্ম ইসলামকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মুসলমানদের মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়েছে। এমন ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মুসলিম সংস্থাসমূহ। এর আগে মিয়ানমার ও ফিলিপাইনে মুসলিম সংখ্যালঘুদের ওপর নজিরবিহীন নিষ্ঠুর আচরণ করা হয়েছে। কাশ্মীর ও ফিলিস্তিনে দীর্ঘদিন ধরে চলছে মুসলমানদের ওপর জুলুম-নির্যাতন। এমন কি উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত সুইডেনেও মুসলমানদের মসজিদে হামলার ঘটনা ঘটেছে। সুইডেনের স্টকহোমের দক্ষিণে অবস্থিত ফিতজা মসজিদে ভাঙচুরের পর ভেতরে শূকরের মল নিক্ষেপ করা হয়েছে। বর্তমান সভ্যতায় এসব ঘটনার প্রতিকার না হওয়ায় মুসলমানরা একদিকে জুলুম-নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, অপরদিকে তাদের কোণঠাসা করার জন্য চলছে অপপ্রচার ও কৌশলী প্রোপাগান্ডা। এসব অপকর্ম ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে মুসলমানদের শুধু নিন্দা জানালে চলবে না, এর সঙ্গত ও জ্ঞানদীপ্ত জবাব দানের যোগ্যতাও অর্জন করতে হবে।
অ্যাঙ্গোলায় মুসলমানদের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ হওয়ার পর অ্যাঙ্গোলার কর্তৃপক্ষ অবশ্য দেশটিতে ইসলাম ধর্ম নিষিদ্ধের খবর অস্বীকার করে। কিন্তু এতে আশ্বস্ত হয়নি ওআইসিসহ আন্তর্জাতিক মুসলিম অভিভাবক সংস্থাসমূহ। ওআইসি ইতোমধ্যে অ্যাঙ্গোলার মুসলমানদের ধর্মীয় অধিকার হরণ, মসজিদ ধ্বংস ও মুসলিম নির্যাতনের খবরে উদ্বেগ ও হতাশা প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি দেশটিতে মুসলমানদের প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য একটি তদন্তকারী দল পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। উল্লেখ্য যে, গত রোববার আফ্রিকান এবং অ্যাঙ্গোলার সংবাদসংস্থা ও সংবাদপত্রসমূহে অ্যাঙ্গোলার সংস্কৃতিমন্ত্রী রোসাক্রুজের একটি বক্তব্য উদ্ধৃতি করে দেশটিতে ইসলাম ধর্ম নিষিদ্ধের খবরটি প্রকাশিত হয়। রোসাক্রুজ সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, “ইসলাম ধর্মকে বৈধতা দেয়ার যে প্রক্রিয়া বিচার ও মানবাধিকার মন্ত্রণালয় শুরু করেছিল তা অনুমোদিত হয়নি। পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত মসজিদসমূহ বন্ধ থাকবে।” এদিকে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর মুসলিম স্কলারস (আইইউএমএস) এ ধরনের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করার জন্য অ্যাঙ্গোলার সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি এ ঘটনার নিন্দা জানানোর জন্য জাতিসংঘ ও আফ্রিকান ইউনিয়নের প্রতি দাবি জানানো হয়েছে। মুসলিম কাউন্সিল অব অ্যাঙ্গোলার প্রেসিডেন্ট ডেভিড জ্যা এএফপি’র সাথে এক সাক্ষাৎকারে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, অ্যাঙ্গোলার ৬০টি মসজিদের সবগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে এবং গত দু’বছরে ৮টি মসজিদ ধ্বংস করা হয়েছে। এ মুসলিম নেতা আরো জানান, জনসম্মুখে মুসলিম নারীদের ওড়না পরতে দেয়া হয় না। অ্যাঙ্গোলার আইনে ইসলামী প্রতিষ্ঠানসমূহের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। দীর্ঘদিনের ধর্মীয় বৈষম্যের ধারাবাহিকতায় এসব করা হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, যে কেউ ইসলাম ধর্মের অনুসরণ করতে চাইবে তাকেই অ্যাঙ্গোলার আইনের বিরুদ্ধাচারী হওয়ার হুমকিতে পড়তে হবে। এই হলো বর্তমান বিশ্ব সভ্যতায় মুসলমানদের মানবাধিকার লাভের চিত্র। এরপরও মুসলমানদের সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক হিসেবে চিহ্নিত করার প্রচারণা অব্যাহত রয়েছে। এটাই কি বর্তমান সভ্যতার সত্য ও ন্যায়? এরপরও কি আমাদের ভাবতে হবে যে, আমরা এক উন্নত সভ্যতার বাতাবরণে বসবাস করছি? এসব প্রশ্ন বর্তমান সভ্যতা ও বিশ্বব্যবস্থার ধারক-বাহকদের মনে কোনো বোধোদয় ঘটাতে সক্ষম হয় কিনা সেটাই এখন দেখার বিষয়।
কিছুদিন আগে প্রায় সকল পত্র-পত্রিকায় এই মর্মে একটি খবর প্রকাশিত হয়েছে যে, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ যুবলীগ, ছাত্রলীগের এক হাজার কর্মীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে নাশকতা সৃষ্টির জন্য মাঠে নামিয়েছে। তারা বিরোধীদলীয় বিক্ষোভকারীদের সাথে মিশে গিয়ে নাশকতামূলক কাজকর্ম পরিচালনা করছে। এই ভয়াবহ খবরটির সত্যতা যাচাই করা মিডিয়ার কাজ ছিল। কিন্তু তাদের বেশির ভাগ সেটা না করে সন্দেহের বশবর্তী হয়ে পক্ষাবলম্বন করে সরকারের সাথে সুর মিলিয়ে বিরোধী দলকে এর জন্য দোষারোপ করছে। সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, হত্যা, গুম, অগ্নিসংযোগ ভাংচুর অত্যন্ত নিন্দনীয় কাজ। সরকার এই নিন্দনীয় কাজকে উৎসাহিত করছেন এবং তার দোষ চাপাচ্ছেন বিরোধী দলের উপর। মই বেয়ে, গ্রীল কেটে, দরজা ভেঙে, অফিস তছনছ ও লুটপাট করে বিএনপির সহকারী মহাসচিব জনাব রিজভী আহমেদকে গভীর রাতে পুলিশ যেভাবে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের দোতলা থেকে গ্রেফতার করেছে তার নজির ইতিহাসে নেই। এই অবস্থা দেখেও কি আমরা ষোল কোটি মানুষ নাশকতার সরকারি ভার্সনে বিশ্বাস করবো? আমরা তা বিশ্বাস করতে পারি না। আবার ‘হুকুমের আসামী’ হিসেবে যদি কাউকে গ্রেফতার করতে হয়ে তাহলে আমার বিশ্বাস সর্বপ্রথম আওয়ামী লীগ প্রধান ও তার শীর্ষ নেতৃবৃন্দকেই গ্রেফতার করা বাঞ্ছনীয়। তারা লগি- বৈঠার আন্দোলন করেছেন, প্রকাশ্য দিবালোকে পিটিয়ে মানুষ হত্যা করেছেন। যুবলীগের নানক, আযম, পঙ্কজ প্রমুখ শেরাটন হোটেলের সামনে গাড়িতে আগুন দিয়ে ১৩ জন লোককে জীবন্ত পুড়িয়ে মেরেছেন। আওয়ামী লীগ নেতাদেরই এ ব্যাপারে স্বীকারোক্তি রয়েছে। তারা হরতাল অবরোধে যে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছেন তা ইতিহাসে একটি কলঙ্কিত অধ্যায় সৃষ্টি করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে তাদেরকে এখন হুকুমের আসামী করবে কে? আমি মনে করি তারা যদি আইনের শাসনে বিশ্বাস করেন, সত্যনিষ্ঠ হন তাহলে আদালতে গিয়ে তাদের দোষ স্বীকার করে আত্মসমর্পণ করা উচিত। তারা হচ্ছেন সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, হত্যা, গুম, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগের গুরু ওস্তাদ। এখন যারা করছেন বা করার চেষ্টা করছেন তারা তাদের কাছ থেকেই তা শিখেছেন। আগের অপরাধের বিচার না করে পরের অপরাধের বিচার করতে গেলে এবং অপরাধীরা বিচারকের আসনে বসলে বিচার যেমন কলুষিত হয় তেমনি নৈরাজ্যও বাড়ে আমরা এর কোনটিই চাই না।
0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিয়ে চীনা রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য ও বিদ্যমান সংকটে ভারতীয় ভূমিকা


এক ব্যক্তির ক্ষমতা লিপ্সা বাংলাদেশের ৫৫ হাজার বর্গমাইলের ১৬ কোটি মানুষকে যখন প্রজ্জ্বলিত অগ্নিকু-ে নিক্ষেপ করেছে তখন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত একটি তাৎপর্যপূর্ণ কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন যে, ‘চীন বাংলাদেশকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায়’ বাংলাদেশের বিদ্যমান অবস্থায় জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ যেখানে সারা দুনিয়ার বন্ধুপ্রতীম সংস্থা ও রাষ্ট্রগুলো দুই নেত্রী তথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মধ্যে ফলপ্রসূ সংলাপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান এবং সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নিরপেক্ষ ও অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের ওপর গুরুত্বারোপ করছেন সেখানে চীনা রাষ্ট্রদূত কর্তৃক বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্ন উত্থাপন করায় নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে চীন কি বাংলাদেশকে এখন স্বাধীন মনে করে না, অথবা বিদ্যমান অবস্থায় তারা কি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হবার আশঙ্কা করছেন? চীনা রাষ্ট্রদূতের মন্তব্যটি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এতোই গুরুত্বপূর্ণ যে, দেশপ্রেমিক প্রত্যেকটি মহল এ বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা প্রকাশ করছেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশের ঈশাণ কোণে মেঘের আনাগোনা দেখতে পাচ্ছেন।
চীন আমাদের একটি বন্ধুপ্রতীম দেশ। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের মানুষ চীনাদের বন্ধুত্বকে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করে। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার অব্যবহিত পর জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যভুক্তি প্রশ্নে চীন ভেটো প্রদান করেছিল এবং বলেছিল যে, বাংলাদেশ এখনও স্বাধীন হয়নি, কেননা ঐ দেশে তখনও বিদেশী বাহিনী উপস্থিত রয়েছে। ফলে প্রথম দফায় চীনা ভেটোর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করতে পারেনি। এই প্রেক্ষাপটে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর রহমান ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধীকে বাংলাদেশ ভূখ- থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারের চূড়ান্ত নোটিশ দেন এবং ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারের পর বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে। এই দফায় চীন বাংলাদেশকে পরিপূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করে। কিন্তু এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ৪২ বছর পর আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা যখন অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের সকল পথ বন্ধ করে বিরোধীদলকে বাইরে রেখে একতরফা ও সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার সকল পদক্ষেপ চূড়ান্ত করেছেন এবং সকল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মম নির্যাতনের শিকার বানিয়েছেন তখন চীনা রাষ্ট্রদূত কর্তৃক স্বাধীনতার প্রশ্ন তোলায় দেশপ্রেমিক মহলের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মাত্রা অনেক বৃদ্ধি করে দিয়েছে। এর কারণ অনুসন্ধান করা দরকার। এ প্রসঙ্গে ২০০৮ সালের নির্বাচনে এই সরকারের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ এবং ক্ষমতায় আরোহণের বিষয়টি প্রণিধানযোগ্য। ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, দুঃশাসন, নির্যাতন এবং দলীয় সন্ত্রাসী বাহিনী গঠন ও তাদের মাধ্যমে খুন, গুম, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, সীমাহীন দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার যে ব্যাপক দৃষ্টান্ত তারা স্থাপন করেছেন তারই প্রেক্ষাপটে ২০০১ সালের নির্বাচনে দেশের মানুষ তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং নির্দলীয় নিরপেক্ষ কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে পরিচালিত নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটকে ক্ষমতাসীন করে। চারদলীয় জোটের ক্ষমতার মেয়াদ পূর্তির পর ২০০৬ সালের শেষের দিকে দলটি অত্যন্ত বেপরোয়া হয়ে উঠে এবং নানা ছুতায় ব্যাপক সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের আশ্রয় নেয়। তারা দেশব্যাপী অবরোধ সৃষ্টি করে। লগি-বৈঠার আন্দোলনের ডাক দেয় এবং প্রকাশ্যে রাজপথে সাপের মতো পিটিয়ে মানুষ হত্যা করে। ট্রেনের বগিতে আগুন ধরিয়ে দেয় বাসের মধ্যে গানপাউডার ছিটিয়ে আগুন জ্বালিয়ে মানুষকে পুড়িয়ে মারে। বন্দর অবরোধ করে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করে। তাদের এই ধ্বংসাত্মক আন্দোলনের ফল হিসেবে সেনাসমর্থিত এক এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। তারা এই সরকারকে তাদের আন্দোলনের ফসল হিসেবে অভিনন্দন জানায়। এই সরকার অনিয়মতান্ত্রিক ও অসাংবিধানিকভাবে দু’বছর পর্যন্ত ক্ষমতা আঁকড়ে রাখে এবং এই সরকারই শেখ হাসিনাকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য বিপজ্জনক বলে আখ্যা দেয়। তারা মাইনাস টু থিওরি অনুসরণ করে দুই নেত্রীকে নির্বাসনে পাঠানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করে কিন্তু বেগম জিয়ার দৃঢ় অবস্থানের কারণে তা ব্যর্থ হয়। পরবর্তীকালে বৈদেশিক হস্তক্ষেপ বিশেষ করে ভারতীয় কূটচালে ২০০৮ সালের শেষের দিকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। শেখ হাসিনা এক এগারোর সরকারের আদেশ অধ্যাদেশ ও সংবিধান বহির্ভূত সকল কার্যক্রমের বৈধতা দেয়ার অঙ্গীকার এবং পর্দার অন্তরালে ভারতীয় রোডম্যাপ অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ব্রিটেনের প্রভাবশালী সাপ্তাহিক দ্যা ইকোনমিস্টের ভাষায়- বস্তায় বস্তায় ভারতীয় অর্থ, ভারতীয় উপদেশ এবং সহযোগিতায় আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় নির্বাচনে জয়লাভ করে। বিএনপি-জামায়াত জোট পরাজয় বরণ করে। নির্বাচনের ফলাফলে মানুষ হতভম্ব হয়ে পড়ে। তারা বলতে শুরু করে যে, ১৯৯৬-২০০১ সালের নিন্দিত আওয়ামী লীগ নন্দিত হবার জন্য এমন কোন কাজ করেনি যে, তারা এত বিপুল সংখ্যাধিক্যে জয়লাভ করবে। তাদের কাছে আঁতাত এবং ভোট কারচুপির বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে ওঠে। বিষয়টি আরো পরিষ্কার হয় যখন হিলারি ক্লিনটন ও শেখ হাসিনার টেলিফোন সংলাপের ট্রান্সক্রিপ্ট পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সেখানে কোন কোন বিষয়ে শেখ হাসিনার একগুঁয়েমি মনোভাবে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন বিরক্ত হয়ে বলতে বাধ্য হয়েছিলেন যে, ‘ম্যাডাম প্রধানমন্ত্রী, আমি ভেবেছিলাম আমাকে এতদূর যেতে হবে না। কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য, আমি ভুল ভেবেছিলাম। আপনি জানেন এবং আমরাও জানি কিভাবে আপনার সরকার ক্ষমতায় এসেছে। ভুলে যাবেন না, নির্বাচনের পর আমরা বলেছিলাম, সেটা অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে এবং আপনাকে সাহায্য করেছিলাম। প্রধানমন্ত্রী, আপনি  জানেন দিল্লীতে আমাদের বন্ধুদের নির্দেশে কিভাবে ফলাফল আগেই ঠিক করা হয়েছিল। তারা যেভাবে চেয়েছিল সেভাবেই আমরা চলেছিলাম। প্লিজ, আপনি এটা ভুলে যাবেন না যে, জেনারেল মইন যিনি আপনাকে ক্ষমতায় এনেছিলেন তিনি এখন আমেরিকাতে আছেন এবং আপনি যতখানি কল্পনা করতে পারেন, তার চেয়েও বেশি আমরা জানি।
বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার যে ভারত কর্তৃক চাপিয়ে দেয়া একটি সরকার তা আরো পরিষ্কার হয়েছে ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ২৫, ২৬ তারিখে বিডিআর বিদ্রোহের সময়। এ সময়ে বাংলাদেশে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল তাতে ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জী প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলেন যে, শেখ হাসিনার সরকারকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনবোধে ভারত সেনা হস্তক্ষেপ করবে। একটি স্বাধীন দেশে সেনা হস্তক্ষেপের এই হুমকির তাৎপর্য বোঝা খুব দুরূহ কোন ব্যাপার নয়। একই সময়ে ভারতের একজন সাবেক সেনা ‘প্রধান’ ও ‘র’ এর সিনিয়ার উপদেষ্টা শিব শংকর চৌধুরী ভারতীয় প্রভাবশালী একটি পত্রিকায় একটি নিবন্ধে বলেছিলেন যে, ‘বাংলাদেশকে ভারতীয় রাডারের দৃষ্টিসীমার বাইরে যেতে দেয়া যায় না।’ তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, ‘১৯৭১ সালে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ নিয়ে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়নি, তা এখনো অব্যাহত আছে’। জেনালে শংকরের এই মন্তব্য উপেক্ষা করার মতো নয়।
সাধারণ বাংলাদেশীদের মধ্যে এখন একটি ধারণা প্রচলিত আছে যে, বর্তমানে শেখ হাসিনা যে সরকার পরিচালনা করছেন সেই সরকার পুতুল সরকার ছাড়া আর কিছুই নয়। এই সরকারের সকল সিদ্ধান্ত আসে নয়াদিল্লী থেকে এবং প্রধানমন্ত্রী হাসিনার সরকার তা বাস্তবায়ন করে মাত্র। প্রতিদানে ভারত সরকার বিদ্যমান বাংলাদেশ সরকারকে টিকে থাকার নিশ্চয়তা দিচ্ছে। বর্তমানে নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশে যা কিছু ঘটছে বিরোধী রাজনৈতিক দল ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর যে অত্যাচার-নিপীড়ন চলছে তাও ভারতীয় নীল-নকশা অনুযায়ী চলছে বলে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ধারণা। এই ধারণা কতটুকু সত্য বাস্তব অবস্থাই তা বলে দেয়। ভারত এবং বাংলাদেশ উভয়ই দু’টি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে যে, ভারত বাংলাদেশের ব্যাপারে অতিরিক্ত নাক গলানোর অভিযোগ উঠেছে। এই দেশটি বাংলাদেশ থেকে তার সকল স্বার্থ উদ্ধার করে নিয়েছে এবং শেখ হাসিনাকে পাপেট হিসেবে ক্ষমতায় বসিয়ে তার পুরোপুরি আধিপত্য বজায় রাখার  জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে। তার এই অবস্থান সম্পর্কে বিদেশীরা যে অবহিত নয় তা নয়। চীন এই সম্পর্কে পুরোপুরি অবহিত রয়েছে। আবার কোন কোন দেশের কূটনৈতিক প্রধানরা বাংলাদেশের সঙ্কট নিয়ে আলোচনার জন্য শুধু যে দিল্লী যাচ্ছেন তা নয়, এদেশের মেরুদ-হীন রাজনীতিকদের কেউ কেউ তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে দিল্লী যেতেও দেখা যাচ্ছে। আগামীকাল ৪ ডিসেম্বর ভারতের বিদেশ সচিব শ্রীমতি সুজাতা সিং ঢাকা আসছেন বলে শোনা যাচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন যে, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর তরফ থেকে একদলীয় নির্বাচনে উৎসাহ দেয়ার জন্য তাকে বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে। পাঠকদের মধ্যে কেউ কেউ নিশ্চয়ই জানে যে, সত্তরের দশকের প্রথমদিকে সিকিমকে ভারতের অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারে লেন্দুপ দর্জিকে যিনি সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা দিয়েছিলেন তিনি ছিলেন ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর তৎকালীন মহাপরিচালক। সেই মহাপরিচালকের কন্যা হচ্ছেন এই সুজাতা সিং। কাজেই এই সঙ্কটময় সময়ে সুজাতার বাংলাদেশ সফরকে যদি কেউ রহস্যময় সফর বলে আখ্যায়িত করেন তাহলে বিস্ময়ের কিছু নেই। ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীনতা যুদ্ধে সাহায্য করেছে এটি সত্যি। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভারতীয় বাহিনীর কাছে পাকিস্তান বাহিনীর আত্মসমর্পণের পর দিল্লীর লালকেল্লায় অনুষ্ঠিত এক জনসভায় ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী এর একটি কারণ বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, ‘হিন্দুস্থান হাজার সালকা বদলা লে লিয়া। হাজার সালকা স্বপনা সফল হুয়া।’ এখন পাঠকরাই বুঝুন আমাদের অবস্থা কোথায়? চীন যদি বাংলাদেশকে পরাধীন মনে করে তার স্বাধীনতার পুনর্বহাল চায় তাহলে তাকে দোষ দেয়ার কিছু আছে কি?
দুই
বাংলাদেশে এখন সরকারবিরোধী আন্দোলন চলছে। এই আন্দোলন হরতাল অবরোধে রূপ নিয়েছে এবং সরকারের নির্যাতন নিপীড়ন ও একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাবার লিপ্সা বন্ধ না হলে সহিংস অসহযোগে রূপান্তরিত হবার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ব্যাপকভাবে গাড়ি ভাংচুর হচ্ছে, গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হচ্ছে এবং নিরপরাধ মানুষ আহত নিহত হচ্ছে। পুলিশ দেখামাত্র গুলী করছে। হাজার হাজার লোক গুলীবিদ্ধ হয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। সরকার গাড়ি ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের জন্য বিরোধী দলকে দায়ী করছেন। তারা বিরোধী দলের জন্য নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির সকল পথ রুদ্ধ করে দিয়েছেন, রাজনীতিকে অন্ধকার জগতের দিকে ঠেলে দিয়েছেন। সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি ও তৃতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয় পুলিশ বন্ধ করে দিয়েছে। দলগুলোর দফতর পুলিশী তত্ত্বাবধানে রয়েছে রাজনৈতিক সন্ত্রাসে। পুলিশের গুলীতে অথবা সংঘর্ষে কিংবা অগ্নিসংযোগের ফলে যে সব হতাহতের ঘটনা ঘটছে তার জন্য সরকার হুকুমের আসামী হিসেবে বিরোধী দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে আসামী করে তাদের গ্রেফতার করছেন, রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন চালাচ্ছেন ও কারারুদ্ধ করে রাখছেন। হুকুমের আসামী হিসেবে সম্ভবত এখন বিএনপি-জামায়াতের এমন কোন শীর্ষ ও মধ্যম শ্রেণীর নেতানেত্রী নেই যার বিরুদ্ধে সরকার মামলা করেনি। পুলিশ গুলী করে মানুষ হত্যা করছে মিডিয়ায় তা এখন খুব একটা প্রাধান্য পাচ্ছে না, প্রাধান্য পাচ্ছে আগুনে পুড়ে মানুষ মরছে বা আহত হয়েছে তা। যারা যানবাহন, দোকানপাট কিংবা কলকারখানায় আগুন লাগাচ্ছে তারা কিন্তু ধরা পড়ছে না। ধরা পড়লেও তাদেরকে পুলিশ রহস্যজনকভাবে ছেড়ে দিচ্ছে। কিছুদিন আগে প্রায় সকল পত্র-পত্রিকায় এই মর্মে একটি খবর প্রকাশিত হয়েছে যে, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ যুবলীগ, ছাত্রলীগের এক হাজার কর্মীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে নাশকতা সৃষ্টির জন্য মাঠে নামিয়েছে। তারা বিরোধী দলীয় বিক্ষোভকারীদের সাথে মিশে গিয়ে নাশকতামূলক কাজকর্ম পরিচালনা করছে। এই ভয়াবহ খবরটির সত্যতা যাচাই করা মিডিয়ার কাজ ছিল। কিন্তু তাদের বেশির ভাগ সেটা না করে সন্দেহের বশবর্তী হয়ে পক্ষাবলম্বন করে সরকারের সাথে সুর মিলিয়ে বিরোধী দলকে এর জন্য দোষারোপ করছে। সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, হত্যা, গুম, অগ্নিসংযোগ ভাংচুর অত্যন্ত নিন্দনীয় কাজ। সরকার এই নিন্দনীয় কাজকে উৎসাহিত করছেন এবং তার দোষ চাপাচ্ছেন বিরোধী দলের উপর। মই বেয়ে, গ্রীল কেটে, দরজা ভেঙে, অফিস তছনছ ও লুটপাট করে বিএনপির সহকারী মহাসচিব জনাব রিজভী আহমেদকে গভীর রাতে পুলিশ যেভাবে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের দোতলা থেকে গ্রেফতার করেছে তার নজির ইতিহাসে নেই। এই অবস্থা দেখেও কি আমরা ষোল কোটি মানুষ নাশকতার সরকারি ভার্সনে বিশ্বাস করবো? আমরা তা বিশ্বাস করতে পারি না। আবার ‘হুকুমের আসামী’ হিসেবে যদি কাউকে গ্রেফতার করতে হয় তাহলে আমার বিশ্বাস সর্বপ্রথম আওয়ামী লীগ প্রধান ও তার শীর্ষ নেতৃবৃন্দকেই গ্রেফতার করা বাঞ্ছনীয়। তারা লগি- বৈঠার আন্দোলন করেছেন, প্রকাশ্য দিবালোকে পিটিয়ে মানুষ হত্যা করেছেন। যুবলীগের নানক, আযম, পঙ্কজ প্রমুখ শেরাটন হোটেলের সামনে গাড়িতে আগুন দিয়ে ১৩ জন লোককে জীবন্ত পুড়িয়ে মেরেছেন। আওয়ামী লীগ নেতাদেরই এ ব্যাপারে স্বীকারোক্তি রয়েছে। তারা হরতাল অবরোধে যে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছেন তা ইতিহাসে একটি কলঙ্কিত অধ্যায় সৃষ্টি করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে তাদেরকে এখন হুকুমের আসামী করবে কে? আমি মনে করি তারা যদি আইনের শাসনে বিশ্বাস করেন, সত্যনিষ্ঠ হন তাহলে আদালতে গিয়ে তাদের দোষ স্বীকার করে আত্মসমর্পণ করা উচিত। তারা হচ্ছেন সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, হত্যা, গুম, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগের গুরু ওস্তাদ।

রবিবার, ১ ডিসেম্বর, ২০১৩

0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

মন্ত্রীদের পদত্যাগ ও সর্বদলীয় সরকার , সংবিধান যা বলে .


ইকতেদার আহমেদ
একটি দেশের সরকারব্যবস্থা রাষ্ট্রপতিশাসিত বা সংসদীয় পদ্ধতির যা-ই হোক না কেন, উভয়ক্ষেত্রে মন্ত্রীদের নিয়োগ ও পদত্যাগ এবং মন্ত্রিসভার গঠন পদ্ধতি সংবিধানের বিধানাবলি দ্বারা নির্ধারিত। বিভিন্ন চড়াই-উৎরাইয়ের মাধ্যমে আমরা উভয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা দ্বারা শাসিত হয়ে এলেও ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে অদ্যাবধি নির্বাচনকালীন সময়ের তিনবারের স্বল্পকালীন তত্ত্বাবধায়ক এবং একবারের প্রায় দুই বছর মেয়াদের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসন ছাড়া সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা দ্বারা শাসিত হয়ে আসছি। 
সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা অনুসৃত হয় পৃথিবীর এমন সব দেশে প্রধানমন্ত্রী সরকারপ্রধান কিন্তু সংসদীয় পদ্ধতির অন্যান্য দেশের সাথে আমাদের পার্থক্য হলো আমাদের এখানে সরকারের সব নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক প্রযুক্ত হয়, যা অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রে সরকার বা রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রযুক্ত হয়। 
প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রী নিয়োগ এবং প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রীর পদত্যাগ বিষয়ে স্বচ্ছ ও স্পষ্ট ধারণা লাভ করতে হলে আমাদের সংবিধানের অনুচ্ছেদ নং ৫৫, ৫৬, ৫৭ ও ৫৮ এর বিধানাবলির প্রতি আলোকপাত আবশ্যক। 
অনুচ্ছেদ নং ৫৫ অবলোকনে প্রতীয়মান হয়Ñ এ অনুচ্ছেদটির দফা (১), (২) ও (৩) এ পর্যায়ক্রমিকভাবে বলা হয়েছে (১) প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি মন্ত্রিসভা থাকবে এবং প্রধানমন্ত্রী ও সময়ে সময়ে তিনি যে রূপ স্থির করবেন, সে রূপ অন্যান্য মন্ত্রীর সমন্বয়ে এ মন্ত্রিসভা গঠিত হবে। (২) প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বা তার কর্তৃত্বে এ সংবিধান অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রযুক্ত হবে। (৩) মন্ত্রিসভা যৌথভাবে সংসদের কাছে দায়ী থাকবে। 
অনুচ্ছেদ নং ৫৬ এর প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে দেখা যায়, এ অনুচ্ছেদটির দফা (১), (২) ও এর শর্তাংশে এবং (৩) ও (৪) এ পর্যায়ক্রমিকভাবে বলা হয়েছে (১) একজন প্রধানমন্ত্রী থাকবেন এবং প্রধানমন্ত্রী যে রূপ নির্ধারণ করবেন, সে রূপ অন্যান্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী থাকবেন। (২) প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের রাষ্ট্রপতি নিয়োগদান করবেন; তবে শর্ত থাকে যে, তাদের সংখ্যার অন্যূন নয়-দশমাংশ সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে নিযুক্ত হবেন এবং অনধিক এক-দশমাংশ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য ব্যক্তিদের মধ্য থেকে মনোনীত হতে পারবেন। (৩) যে সংসদ সদস্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন বলে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রতীয়মান হবেন, রাষ্ট্রপতি তাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করবেন, (৪) সংসদ ভেঙে যাওয়া এবং সংসদ সদস্যদের অব্যবহিত পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্যবর্তীকালে এ অনুচ্ছেদের (২) বা (৩) দফার অধীন নিয়োগ দেয়ার প্রয়োজন দেখা দিলে সংসদ ভেঙে যাওয়ার অব্যবহিত পূর্বে যারা সংসদ সদস্য ছিলেন, এ দফার উদ্দেশ্য সাধনকল্পে তারা সদস্যরূপে বহাল রয়েছেন বলে গণ্য হবেন। 
অনুচ্ছেদ নং ৫৭ প্রধানমন্ত্রী পদের মেয়াদ সংক্রান্ত। এ অনুচ্ছেদটি (১), (২) ও (৩) এ তিনটি দফা সমন্বয়ে গঠিত। এ তিনটি দফায় পর্যায়ক্রমিকভাবে বলা হয়েছে- (১) প্রধানমন্ত্রীর পদ শূন্য হবে যদিÑ (ক) তিনি কোনো সময় রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র পেশ করেন; অথবা (খ) তিনি সংসদ সদস্য না থাকেন। (২) সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন হারালে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করবেন কিংবা সংসদ ভেঙে দেয়ার জন্য লিখিতভাবে রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শদান করবেন এবং তিনি অনুরূপ পরামর্শদান করলে রাষ্ট্রপতি, অন্য কোনো সংসদ সদস্য সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন নন এ মর্মে সন্তুষ্ট হলে, সংসদ ভেঙে দেবেন। (৩) প্রধানমন্ত্রীর উত্তরাধিকারী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীকে নিজ পদে বহাল থাকতে এ অনুচ্ছেদের কোনো কিছুই অযোগ্য করবে না। 
অনুচ্ছেদ নং ৫৮ অন্যান্য মন্ত্রীর পদ অর্থাৎ মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী সংক্রান্ত। এ অনুচ্ছেদটিতে পাঁচটি দফা রয়েছে। দফা নং (১), (২), (৩) ও (৪) এ পর্যায়ক্রমিকভাবে বলা হয়েছে- (১) প্রধানমন্ত্রী ছাড়া অন্য কোনো মন্ত্রীর পদ শূন্য হবে যদিÑ (ক) তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র প্রদান করেন; (খ) তিনি সংসদ সদস্য না থাকেন, তবে ৫৬ অনুচ্ছেদের (২) দফার শর্তাংশের অধীনে মনোনীত মন্ত্রীর ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য হবে না; (গ) এ অনুচ্ছেদের (২) দফা অনুসারে রাষ্ট্রপতি অনুরূপ নির্দেশদান করেন; অথবা (ঘ) এ অনুচ্ছেদের (৪) দফায় যে রূপ বিধান করা হয়েছে তা কার্যকর হয়। (২) প্রধানমন্ত্রী যেকোনো সময় কোনো মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে অনুরোধ করতে পারবেন এবং ওই মন্ত্রী অনুরোধ পালনে অসমর্থ হলে তিনি রাষ্ট্রপতিকে ওই মন্ত্রীর নিয়োগ অবসান ঘটানোর পরামর্শদান করতে পারবেন। (৩) সংসদ ভেঙে যাওয়া অবস্থায় যেকোনো সময় কোনো মন্ত্রীকে নিজ পদে বহাল থাকতে এ অনুচ্ছেদের (ক), (খ) ও (ঘ) উপদফার কোনো কিছুই অযোগ্য করবে না। (৪) প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলে বা নিজ পদে বহাল না থাকলে মন্ত্রীদের প্রত্যেকে পদত্যাগ করেছেন বলে গণ্য হবে; তবে এ পরিচ্ছেদের বিধানাবলি সাপেক্ষে তাদের উত্তরাধিকারীরা কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত তারা নিজ নিজ পদে বহাল থাকবেন। 
উপরিউক্ত বিধানাবলি পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রীর পদ এবং একজন মন্ত্রীর পদ শূন্য হওয়ার ক্ষেত্রে ভিন্নতা রয়েছে। একজন মন্ত্রীর পদ তিন ভাবে শূন্য হতে পারে। এর একটি হলোÑ তিনি যদি রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করার নিমিত্ত প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র প্রদান করেন এবং অপর দু’টির প্রথমোক্তটি হলো তিনি যদি সংসদ সদস্য না থাকেন আর শেষোক্তটি হলো প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের অনুরোধ রক্ষা না করায় রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তার নিয়োগের অবসান ঘটানো। 
প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রে দেখা যায়, তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র প্রদান করলে অথবা সংসদ সদস্য না থাকলে অথবা সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন হারালে তার পদ শূন্য হবে। তবে প্রধানমন্ত্রীর পদ শূন্য হওয়ার ক্ষেত্রে তার উত্তরাধিকারী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি নিজ পদে বহাল থাকবেন। অনুরূপভাবে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলে তার মন্ত্রিসভার অপর সব মন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন বলে গণ্য হবে কিন্তু তাদের ক্ষেত্রেও তাদের উত্তরাধিকারীরা কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত তারা নিজ নিজ পদে বহাল থাকবেন। 
প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রীরা সাংবিধানিক পদধারী। তাদের নিয়োগপরবর্তী শপথ গ্রহণ ব্যতিরেকে তাদের নিয়োগ কার্যকর হয় না এবং তারা পদে আসীন হন না। মন্ত্রীদের সরকারি চাকরিজীবীদের মতো পদে যোগদানের সময় যোগদানপত্র প্রদান করতে হয় না। 
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার সব সদস্য একযোগে তার কাছে পদত্যাগপত্র দাখিল করায় বিতর্ক দেখা দিয়েছে দাখিলপরবর্তী তাদের নিজ নিজ মন্ত্রী পদ শূন্য হয়েছে কি হয়নি? এ বিষয়ে প্রধামন্ত্রীসহ তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের বক্তব্য প্রধানমন্ত্রীর আকাক্সক্ষা অনুযায়ী তারা পদত্যাগের অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন এবং অভিপ্রায় ব্যক্তসংক্রান্ত পত্রে তারিখ উল্লেখ না থাকায় প্রধানমন্ত্রী যতক্ষণ পর্যন্ত না পদত্যাগপত্রগুলো কার্যকর করার জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ না করছেন ততক্ষণ পর্যন্ত তারা নিজ পদে বহাল থাকবেন এবং তাদের পদও শূন্য হবে না। অপর দিকে একই বিষয়ে দেশের অধিকাংশ আইনজ্ঞের ভাষ্যÑ একজন মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর আকাক্সক্ষা বা নিজ ইচ্ছা থেকে যে মুহূর্তে রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করার উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রীর কাছে তার পদত্যাগপত্র প্রদান করেন সে মুহূর্ত থেকেই তার পদটি শূন্য হয়ে যায় এবং শূন্য হওয়া পরবর্তী কোনো পদত্যাগী মন্ত্রী যদি নিজের আগের দায়িত্ব চালিয়ে যান অথবা আগের মতো সরকারের কাছ থেকে মন্ত্রী হিসেবে সুযোগ-সুবিধা নেয়া অব্যাহত রাখেন তবে সে ক্ষেত্রে এটি সংবিধানে নবসন্নিবেশিত ৭ক (১) (খ) এর বিধানাবলির আলোকে একজন ব্যক্তি কর্তৃক অসাংবিধানিক পন্থায় এ সংবিধান বা এর কোনো বিধানের প্রতি নাগরিকের আস্থা, বিশ্বাস বা প্রত্যয় পরাহত করার শামিল, যা রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে গণ্য এবং তার সহযোগীও রাষ্ট্রদ্রোহের সমঅপরাধে অপরাধী। আমাদের প্রচলিত আইনে রাষ্ট্রদ্রোহের সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড কিন্তু সংবিধানের প্রতি নাগরিকের আস্থা, বিশ্বাস বা প্রত্যয় পরাহতের ক্ষেত্রে সংবিধানে বলা হয়েছে অপরাধী প্রচলিত আইনের সর্বোচ্চ দণ্ডে দণ্ডিত হবেন অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। 
আইনজ্ঞরা আরো বলেন, একজন সাধারণ পদধারী সরকারি কর্মকর্তা এবং সাংবিধানিক পদধারী মন্ত্রীর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। একজন মন্ত্রী শপথ গ্রহণ করাকালীন অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি ব্যক্ত করেন যে, তিনি সংবিধানের রক্ষণ, সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করবেন। তাই সংবিধানের সুস্পষ্ট নির্দেশনার আলোকে একজন মন্ত্রী পদত্যাগের উদ্দেশ্যে বা অভিপ্রায় ব্যক্ত করে যা-ই বলা হোক না কেন, রাষ্ট্রপতির কাছে প্রদানের নিমিত্ত প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র হস্তান্তর করা মানেই পদ শূন্য হয়ে যাওয়া এবং স্বপঠিত শপথ থেকে অবমুক্ত হয়ে যাওয়া। তা ছাড়া সব মন্ত্রী যখন প্রকাশ্যে একে একে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র দাখিল করেছেন এবং পদত্যাগের বিষয়টি ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার বদৌলতে দেশবাসী জানতে পেরেছে সে ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর আকাক্সক্ষায় পদত্যাগের অভিপ্রায় ব্যক্ত বা পদত্যাগপত্রে তারিখ উল্লেখ না থাকা বা রাষ্ট্রপতির কাছে হস্তান্তরের নিমিত্ত প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র দেয়া হয়নি এসব প্রশ্ন অপ্রাসঙ্গিক। এখানে আরো প্রাসঙ্গিক যে, পদত্যাগী মন্ত্রীদের মধ্যে অন্তত পাঁচজন যাদের দু-একজন প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ তারা তাদের পদত্যাগপত্র প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তরপরবর্তী তাকে কদমবুচি করেছেন। এখন প্রশ্ন কদমবুচি কখন ও কাকে করা হয়? আমরা সচরাচর দেখে আসছি, কোনো ব্যক্তির আগমন ও প্রত্যাবর্তনের সময় কনিষ্ঠরা বয়োজ্যেষ্ঠদের কদমবুচি করে থাকেন। তা ছাড়া কেউ যদি শুভ সংবাদ পায় বা কোনো কাজে সফলতা পায় সে ক্ষেত্রেও দেখা যায় কনিষ্ঠরা বয়োজ্যেষ্ঠদের কদমবুচি করছেন। আমরা ইতঃপূর্বেও প্রত্যক্ষ করেছি আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তার দলের কতিপয় সংসদ সদস্যকে যখন মন্ত্রী পদ দ্বারা পুরস্কৃত করেন তখন শপথ গ্রহণপরবর্তী তারা প্রধানমন্ত্রীকে কদমবুচি করেছিলেন। আলোচ্য ক্ষেত্রে কতিপয় মন্ত্রী কর্তৃক পদত্যাগপত্র দাখিলপরবর্তী প্রধানমন্ত্রীকে কদমবুচি করা পদত্যাগের বার্তাবহ নয় কি? 
সরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে চাকরির সময়সীমা ২৫ বছর অতিক্রম করলে তারা স্বেচ্ছায় অবসরের জন্য আবেদন করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে একজন সরকারি কর্মকর্তা তার চাকরির বয়স ২৫ বছর হওয়া সাপেক্ষে একবার যদি কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদনপত্র দাখিলের মাধ্যমে স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন সে ক্ষেত্রে তার পক্ষে পরে এ অভিপ্রায় প্রত্যাহারের কোনো সুযোগ থাকে না। 
পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে দেখা যায়, পদত্যাগপত্রে তারিখ উল্লেখ থাকুক বা না থাকুক যে মুহূর্তে একজন মন্ত্রী সে দেশের সংবিধান অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তার পদত্যাগপত্র পেশ করেন এবং পেশের বিষয়টি প্রকাশ্যে ঘটে থাকে সে মুহূর্ত থেকে তার পদটি শূন্য হয়ে যায় এবং এ ক্ষেত্রে পদত্যাগপত্র প্রত্যাহারেরও কোনো সুযোগ থাকে না। তাই সার্বিক বিচার-বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভার যেসব মন্ত্রী গত ১১ নভেম্বর মন্ত্রিসভার সাপ্তাহিক বৈঠকপরবর্তী সচিবালয়ে তার কাছে পদত্যাগপত্র হস্তান্তর করেছেন তা হস্তান্তরপরবর্তী কার্যকর হয়ে গেছে। এখানে তাদের অভিপ্রায় কী ছিল এবং পদত্যাগপত্রে তারিখ ছিল কি ছিল নাÑ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের দৃষ্টান্ত অবলোকনে প্রতীয়মান হয় এ ধরনের প্রশ্ন উত্থাপনের কোনো সুযোগ নেই। 
এখন দেখা যাক মন্ত্রিসভা বিষয়ে আমাদের সংবিধানের বর্তমান অবস্থান কী এবং সংবিধানের বর্তমান বিধানাবলির আলোকে সর্বদলীয় মন্ত্রিসভা গঠনের সুযোগ কতটুকু? 
প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা বিষয়ে সংবিধানের অনুচ্ছেদ নং ৫৬(৩), ৫৬(১) ও ৫৫(১) প্রাসঙ্গিক। অনুচ্ছেদ নং ৫৬(৩) এ সুস্পষ্টরূপে ব্যক্ত করা হয়েছে যে, যে সংসদ সদস্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের আস্থাভাজন বলে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রতীয়মান হবেন, রাষ্ট্রপতি তাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করবেন। অনুচ্ছেদ নং ৫৬(১) ও ৫৫(১) একটি অপরটির পরিপূরক। এর প্রথমোক্তটিতে বলা হয়েছেÑ একজন প্রধানমন্ত্রী থাকবেন এবং তিনি যেরূপ নির্ধারণ করবেন সেরূপ অন্যান্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী থাকবেন। শেষোক্তটিতে বলা হয়েছে- প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি মন্ত্রিসভা থাকবে এবং তিনি যেরূপ স্থির করবেন সেরূপ মন্ত্রীসহকারে এ মন্ত্রিসভা গঠিত হবে। 
উপরিউক্ত অনুচ্ছেদ দু’টির তিনটি দফা সম্মিলিতভাবে অধ্যয়ন করলে যে চিত্রটি আমাদের কাছে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠে তা হলোÑ যে সংসদ সদস্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন হিসেবে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রতীয়মান হবেন তাকে ছাড়া অন্য কাউকে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগদানের সুযোগ নেই। প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতি তার অন্য সব কাজ প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী সম্পাদন করে থাকেন। তাই মন্ত্রী নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের ব্যত্যয়ে রাষ্ট্রপতি তার স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে কোনো সংসদ সদস্যকে বা সংসদ সদস্য বহির্ভূত কোনো ব্যক্তিকে মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগের ক্ষমতা ভোগ করেন না। 
সংসদীয় গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রতিটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন দলীয় ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হয় এবং দলীয় ব্যক্তিই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন হওয়া সাপেক্ষে নিয়োগ লাভ করেন। সংসদ নির্বাচনে কোনো দল সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে সে দলের যৌথ সরকার (কোয়ালিশন গভর্নমেন্ট) গঠনের কোনো অবকাশ থাকে না। আর যৌথ সরকারের ক্ষেত্রে যে ক’টি দল সমন্বয়ে যৌথ সরকার গঠিত হয় সে দলগুলোর বাইরে অন্য কোনো দলের সংসদ সদস্যকে মন্ত্রী নিয়োগের সুযোগ নেই। সংসদীয় গণতন্ত্রের মাহাত্ম্য হলোÑ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন। সংসদীয় গণতন্ত্রের আবরণে যদি কখনো কোনো দেশে সর্বদলীয় সরকার গঠন করা হয় তবে সে ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের কোনো অবকাশ থাকে না। আমাদের সংবিধানের যে অভিপ্রায় তাতে সর্বদলীয় সরকারের কোনো ধারণা পাওয়া যায় না। যদি কখনো জাতির ক্রান্তিলগ্নে বা জাতীয় প্রয়োজনে সর্বদলীয় সরকার গঠনের আবশ্যকতা অনুভূত হয় তাতে বর্তমান সংসদের ক্ষেত্রে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির অংশগ্রহণ ছাড়া সেটিকে সর্বদলীয় সরকার বলার সুযোগ আছে বলে প্রতীয়মান হয় না। তা ছাড়া এ ধরনের সর্বদলীয় সরকার আমাদের বর্তমান সংবিধানের যে চেতনাবিরোধী তা সংবিধানের পূর্বালোচিত বিধানাবলি থেকে স্পষ্ট। তাই বিগত সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায় যেসব দল জোটবদ্ধভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়েছিল সেসব দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্য সমন্বয়ে গঠিত সরকার কোনোভাবেই সর্বদলীয় সরকারের ধারণাকে আকৃষ্ট করে না। 
উপরিউক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট প্রতিভাত মন্ত্রীরা সম্মিলিতভাবে যেভাবে পদত্যাগ করেছেন তাতে তাদের সবার পদ শূন্য হয়ে গেছে এবং শুধু আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের সংসদ সদস্যদের নিয়ে যেভাবে সর্বদলীয় সরকার গঠন করা হয়েছে তা কোনোভাবেই সর্বদলীয় হিসেবে বিবেচিত হওয়ার অবকাশ সৃষ্টি করে না। তাই পদত্যাগী মন্ত্রীদের পুনঃশপথ গ্রহণ ব্যতিরেকে মন্ত্রী পদে অব্যাহত থাকা এবং প্রধান বিরোধীদলের অংশগ্রহণ ব্যতিরেকে মন্ত্রিসভাকে সর্বদলীয় মন্ত্রিসভা আখ্যা দেয়ায় যে সাংবিধানিক সঙ্কটের জন্ম দিয়েছে তা বর্তমান ক্ষমতাসীনেরা ক্ষমতার আধিক্য উপেক্ষা করলেও ভবিষ্যতে যে শত প্রশ্নের জন্ম দেবে না সে নিশ্চয়তা কি দেয়া যায়? 


0 Comments
Posted in Arrangement, Art, Business

কোন পথে বাংলাদেশ


গত শনিবার দৈনিক ইত্তেফাকে আবার মাইনাস ফর্মুলা! শীর্ষক একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। লিখেছেন পত্রিকাটির একজন বিশেষ প্রতিনিধি। বিশেষ প্রতিনিধি এই প্রতিবেদনে বলতে চেয়েছেন, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পদত্যাগ করে আম্পায়ারের ভূমিকায় থাকার আহ্বান জানিয়ে বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ড. কামাল হোসেন প্রকারান্তরে মাইনাস ওয়ান ফর্মুলা দিলেন। কারণ ক্রিকেট বোদ্ধারা স্বীকার করবেন, আম্পায়ার কখনো খেলেন না। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা আম্পায়ার হলে তিনিও খেলতে পারবেন না। ড. কামাল হোসেনের বক্তব্য সঠিক হলে এটি আরেকটি মাইনাস ফর্মুলা, তাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।এই বিশেষ প্রতিনিধি তার প্রতিবেদনে প্রশ্ন রাখেনÑ ‘এমনকি বিএনপিও মাইনাস ফর্মুলায় বিশ্বাস করে না। তা হলে ড. কামাল হোসেন কেন প্রধানমন্ত্রীকে প্রকারান্তরে রাজনীতি থেকে সরে যেতে বললেন? তার এ বক্তব্য অন্য কোনো ইঙ্গিত বহন করছে কি না, এটাই এখন প্রশ্ন।
বিশেষ প্রতিনিধি এ প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করেছেনÑ ড. কামাল হোসেন একই সংবাদ সম্মেলনে আরো দু-একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। তা হচ্ছে আগামীতে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে চার-পাঁচটি মৌলিক বিষয়ে সংবিধানে সংশোধনী আনার কথা তারা এখনই ভাবছেন। এই চার-পাঁচটি মৌলিক বিষয়ের মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য আনা ও দুই মেয়াদের বেশি কারো প্রধানমন্ত্রী না হতে পারা।’ ড. কামালের এ বক্তব্যকেও এই প্রতিনিধি সন্দেহের চোখে দেখে এর সাথে জেনারেল মইন ইউ আহমেদের একটি বক্তব্যের প্রসঙ্গ টানেন। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, “নিশ্চয় সবার মনে আছে, এক-এগারোর সময়ের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ তৎকালীন শেরাটন হোটেলে (বর্তমান রূপসী বাংলা) এক সুধী সমাবেশে একটি রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন, তিনি ‘নিউ ফর্ম অব ডেমোক্র্যাসি’ আনতে চান। এ ক্ষেত্রে এক প্রশ্নের জবাবে জেনারেল মইন ইউ আহমেদ বলেছিলেন, প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য এনে তিনি ‘নিউ ফর্ম অব ডেমোক্র্যাসি’ বাস্তবায়ন করতে চান।” 
এসব বিষয় উল্লেখ করে এই বিশেষ প্রতিনিধি কার্যত বোঝাতে চেয়েছেনÑ ড. কামাল এখন শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দিয়ে মাইনাস ওয়ান ফর্মুলা বাস্তবায়ন করতে চান, ঠিক এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্য যেভাবে নিয়ে আসা হয়েছিল বহুল আলোচিত মাইনাস টু ফর্মুলা। 
কয়েক দিন আগে ড. কামাল হোসেন শেখ হাসিনাকে পদত্যাগ করে নির্দলীয় সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচন দেয়ার যে কথা সাংবাদিকদের কাছে বলেছেন, এর পেছনে শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করার লক্ষ্যে ‘মাইনাস ওয়ান’ তত্ত্বতাড়িত কোনো ষড়যন্ত্র রয়েছে কি না, সেটি আমাদের পক্ষে বলা মুশকিল। তবে আমাদের কাছে মনে হয়েছে, এ সময়ে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে যে মহা রাজনৈতিক সঙ্কট চলছে, দেশে কার্যত একটা অচলাবস্থা বিরাজ করছে, যা থেকে উত্তরণের একটি উপায় হিসেবেই ড. কামাল হোসেন এ ধরনের একটি বক্তব্য দিয়েছেন। তবে ইত্তেফাকের আবার মাইনাস ফর্মুলা!শিরোনামটি যখন আমার চোখে পড়ে, তখন মনে হয়েছিল এর বিষয়বস্তু হবে খালেদা জিয়াকে মাইনাস করা সম্পর্কিত কিছু। কিন্তু তা পাঠ শেষে দেখা গেল না, সেটি শেখ হাসিনাকে মাইনাস করার একটি অনুমিত বিষয়কে অনুষঙ্গ করে লেখা। আমার এমনটি মনে হওয়ার কারণ, বর্তমান সরকারের দৃশ্যমান কার্যকলাপের মাধ্যমে দেশের মানুষকে এমনটি বিশ্বাস করতে বাধ্য করছে যে, সরকার এখন মরিয়া একতরফা নির্বাচন করে ক্ষমতায় টিকে থাকাকে দীর্ঘায়িত করতে এবং ক্ষমতা ধরে রেখে দমন-পীড়নের মাধ্যমে বিএনপি ও বেগম খালেদা জিয়াকে অস্তিত্বহীন করার ‘মাইনাস ওয়ান’ তত্ত্ব বাস্তবায়ন করতে। কেননা সরকারি দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে স্থির বিশ্বাস জমেছে, নির্দলীয় কোনো সরকারের অধীনে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে এ সরকারের জয়ী হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। সে জন্যই বর্তমান সরকার সন্ধানে নামে নানা কূটকৌশলের, যাতে করে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেয়ার কোনো সুযোগ না পায়। এরই অংশ হিসেবে সরকারের প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে আদালতের দোহাই দিয়ে সংবিধান থেকে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা তুলে দেয়া। আর দ্বিতীয় উপায় হচ্ছে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ওপর উদ্দেশ্যপূর্ণ রাজনৈতিক মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো, রিমান্ডে নিয়ে অমানবিক নির্যাতন চালানো। আর বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো যেন তাদের কোনো বক্তব্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে না পারে, সে জন্য তাদের সভা, সমাবেশ, মিছিল, মানববন্ধন ও রাজনৈতিক কর্মসূচির ওপর নানা অযৌক্তিক বিধিনিষেধ আরোপ করে বিরোধী দলকে কোণঠাসা করে অস্তিত্বহীনতার দিকে ঠেলে দেয়া। এরই অংশ হিসেবে সরকারবিরোধী পত্রপত্রিকা ও টিভি চ্যানেল বন্ধ করে দেয়ার প্রয়াসও চলে এ সরকারের পক্ষ থেকে। এর ওপর আছে সাংবাদিক নির্যাতনের নানা মাত্রিক ঘটনা। আছে রাজনৈতিক নেতাকর্মী হত্যা ও গুমের নানা অভিযোগ। বিরোধী দলের শীর্ষ সারির নেতাদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের হাস্যকর অভিযোগ এনে কারাগারে পাঠানো। রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন, বারবার জামিন আবেদন প্রত্যাখ্যান আজ যেভাবে ব্যাপকতা লাভ করেছে, তা এ দেশের রাজনীতির ইতিহাসে অভাবনীয়। রাজনৈতিক দলের অফিসে তালা ঝুলিয়ে রাখা মাসের পর মাস, দলীয় অফিসে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ঢুকতে না দেয়া, রাজনৈতিক দলের অফিসে ঢুকে অফিস তছনছ করে নেতাদের গ্রেফতার করার নজিরও বাংলাদেশে মনে হয় বর্তমান সরকারই স্থাপন করল। সর্বোপরি সরকারি দলের প্রথম সারির নেতাদের পক্ষ থেকে বিরোধীদলীয় নেতার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয় নিয়ে প্রতিনিয়ত বিষোদগার করে চরিত্র হননে আওয়ামী লীগের সমতুল্য খুঁজে পাওয়া ভার। রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে বক্তৃতা-বিবৃতিতে বেগম খালেদা জিয়াকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে বক্তব্য রাখা আওয়ামী নেতাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। 
সবশেষে উল্লেখ্য, আজকে বিভিন্ন জরিপ যেখানে চলছে, দেশের ৭০-৯০ শতাংশ মানুষ চান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচন হোক, সেখানে জনমত উপেক্ষা করে নিজেদের ইচ্ছামতো পরিবর্তন করা সংবিধানের দোহাই দিয়ে সরকার এখন সব বিরোধী দলবিহীন একতরফা নির্বাচন আয়োজনে মহাব্যস্ত। সুশীলসমাজ কেন নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের পক্ষে, সে জন্য তাদের নিয়ে নানা কথা বলছেন আওয়ামী নেতা-নেত্রীরা। এরই মধ্যে নানা কর্মসূত্রে বিতর্কিত নির্বাচন কমিশন এক দিকে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করেছে, অপর দিকে সরকার বিরোধী দলের ডজন ডজন শীর্ষসারির নেতাকে আটক করে কারাগারে বন্দী করছে। সরকার অনুগত নির্বাচন কমিশন এ ব্যাপারে টুঁ শব্দ করছে না। যদিও প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, তিনি সব দলের জন্য একটা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করবেন এবং একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করবেন। এভাবে বিরোধী দলের নেতাদের সবাইকে কারাগারে পাঠালে সরকার নির্বাচন করবেন কাকে নিয়ে? সরকার কি তা হলে খালি মাঠে গোল দেয়ার চেষ্টা করছেন? এভাবে একতরফা নির্বাচন করে জেনারেল এরশাদকে গৃহপালিত বিরোধী দল বানিয়ে দেশ চালানোর চিন্তায় কি সরকার এখন বিভোর? এমনই আরো বহু প্রশ্ন জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে। 
এক দিকে সরকারি দল ও অন্য দিকে বর্তমান সরকারের অনুগত নির্বাচন কমিশনের যৌথ প্রযোজনায় আয়োজিত হতে যাচ্ছে একতরফা প্রহসনের নির্বাচন; অপর দিকে বিরোধী দলগুলো এ নির্বাচনে অংশ না নেয়ার প্রত্যয় ঘোষণা করে রাজপথের আন্দোলনে নেমেছে। বিরোধী দলগুলোর এক কথাÑ নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে হবে। সময়ের সাথে ১৮ দলীয় এ অবস্থানের সাথে যোগ হচ্ছে বেশি থেকে বেশি রাজনৈতিক দল। বি. চৌধুরীর বিকল্পধারা, আ স ম আবদুর রবের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টিসহ আরো কয়েকটি বাম দল, চরমোনাই পীরের ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন ও আরো কয়েকটি দল একতরফা নির্বাচনে না যাওয়ার কথা ঘোষণা করেছে। এমনকি এরশাদের জাতীয় পার্টি ভেঙে কাজী জাফর ও গোলাম মসিহর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা নতুন ‘জাতীয় পার্টি’ও খালেদা জিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করে তার পরিচালিত আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেছে। সবচেয়ে মজার কথা, কয়েকজন নেতার মন্ত্রিত্ব উপহার পেয়ে মহাজোট সরকারে যোগ দেয়া জাতীয় পার্টির নেতা এরশাদ এখন বলছেনÑ নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ না, বর্তমান পরিবেশে নির্বাচন সম্ভব নয়, পরিবেশ ভালো না হলে তার দলও এই একতরফা নির্বাচনে অংশ নেবে না। এরশাদ বলেছেন, প্রধান বিরোধী দল-জোট নির্বাচনে অংশ না নিলে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না। তিনি বিএনপির প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আসুন সবাই মিলে শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন করি। এরশাদ তার দলের মনোনয়ন পাওয়া নেতাদের বলেছেন, তারা যেন মনোনয়ন দাখিলের কাগজপত্র রেডি রাখেন। প্রয়োজনে তার নির্দেশে মনোনয়ন দাখিল কিংবা প্রত্যাহার করতে হবে। কারণ তিনি তার প্রার্থীদের নিরাপত্তাহীনতার দিকে ঠেলে দিতে পারেন না। কারণ এসব প্রার্থী তার সন্তানের মতো। আসলে জেনারেল এরশাদ বিরোধী দলের আন্দোলনের ফলে যে জনরোষের সৃষ্টি হয়েছে, তার দলের প্রার্থীদের এ জনরোষের মুখে ঠেলে দিতে চান না। তা ছাড়া সরকারি দল থেকে বলা হচ্ছিলÑ বিরোধী দলের অনেক নেতাই খালেদা জিয়ার নির্দেশ অমান্য করে এ নির্বাচনে অংশ নেবেন। এসব দলছুট নেতারা তথাকথিত ‘বিএনএফ’র ছাতার নিচে সমবেত হবেন; কিন্তু এরশাদ এখন দেখছেন, কার্যত তেমনটি ঘটছে না। অনেকের অভিমতÑ এরশাদ এখন পালানোর পথ খুঁজছেন নানা কথা বলে। একসময় এরশাদ ঠিকই ভোল পাল্টাবেন। 
শুধু দেশেই নয়, জাতিসঙ্ঘসহ বিশ্বের সব দেশই চায় সব দলের কাছে গ্রহণযোগ্য ও সবার অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। এ জন্য সরকারি দল ও বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের বারবার তাগিদ দেয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে, বিরোধী দলবিহীন একতরফা নির্বাচন দেশ-বিদেশে গ্রহণযোগ্য হবে না। তা ছাড়া জাতিসঙ্ঘের স্বীকৃত বিধান হচ্ছেÑ পূর্ববর্তী নির্বাচনে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা দলের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো নির্বাচন হলে সে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হবে না। মার্কিন কংগ্রেসে আমাদের দেশের এই একতরফা নির্বাচন নিয়ে শুনানিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে রাজনৈতিক সমঝোতার তাগিদ এসেছে। জার্মান পার্লামেন্টে একই ধরনের প্রস্তাব পাস হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া বিরোধী দলের নেতাদের মুক্তি দাবি করেছে। সর্বশেষ আবারো জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব রাজনৈতিক সমঝোতার তাগিদ দিয়ে দুই নেত্রীর কাছে চিঠি দিয়েছেন। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ঢাকা আসছেন জাতিসঙ্ঘের মহাসচিবের বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো। এর পরও যদি সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা না হয়, তবে ধরে নেয়া হবে বর্তমান সরকার একতরফা নির্বাচন করে ক্ষমতায় টিকে থাকার এবং বিরোধী দল বিএনপি ও দলটির নেতা বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে বিদায় করার ‘মাইনাস ওয়ান’ ফর্মুলা নিয়ে মাঠে নেমেছে। এ ক্ষেত্রে সরকার ধনুকভাঙা পণ করে বসেছেÑ হয় উদ্দেশ্য সাধন, নয় নিজের পতন; কিন্তু এর পরিণতিতে দেশ কোথায় যাবে সেই চিন্তা আপাতত মনে হয় সরকারি দলের নেতা-নেত্রীদের মাথায় একদম নেই। 
কিন্তু বিরোধী দলের আন্দোলনের মুখে দেশ যে আজ প্রায় একধরনের অচল হয়ে পড়েছে এবং দেশ ধীরে ধীরে সহিংসতার চরম পর্যায়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে; তা অস্বীকার করার উপায় নেই। রাজনৈতিক সমঝোতা করে তা থামাতে না পারলে আমাদের সামনে অপেক্ষা করছে এক ভয়াবহ পরিণতি। কিন্তু রাজনৈতিক সমঝোতার কোনো সম্ভাবনাই আমরা এখনো দেখতে পাচ্ছি না। বরং আমার শঙ্কা ও উদ্বেগ আরো শতগুণে বেড়ে যায় যখন প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক সমঝোতা সৃষ্টির কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নিয়ে বরং দলীয় সমাবেশ থেকে বিরোধীদলীয় নেতাকে উদ্দেশ করে বলেনÑ ‘আন্দোলন কর্মসূচি দিয়ে মাঠে নামেন। আপনি মাঠে নামেন, মাঠে নামেন, মাঠে নামেন। তখন রাজপথেই দেখা যাবে কার কত শক্তি।’ প্রধানমন্ত্রীর এ ধরনের বক্তব্য রাজনৈতিক সঙ্ঘাত-সংঘর্ষকে উসকে দেবে বলে মনে হয়। রাজনৈতিক সমঝোতা সৃষ্টির পথে এ ধরনের বক্তব্য বাধা হিসেবেই কাজ করবে। তা ছাড়া প্রধানমন্ত্রী যখন বলেন, ‘যখন সরকারি দলের লোকেরা বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গাড়ির নম্বর ধরে ধরে ভাঙচুর ও পোড়ানো শুরু করবেন, তখন বিরোধী দলের নেত্রী কী করবেন’; তখনো সমঝোতার পথ তিরোহিত হয়, সঙ্ঘাত-সংঘর্ষের পথ আরো প্রসারিত হয়। প্রধানমন্ত্রীকে উপলব্ধিতে রাখতে হবেÑ রাজনৈতিক সমঝোতা সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা। আর এ পথেই সবার কল্যাণ। ভিন্ন পথে অকল্যাণ সবার। আমাদের মধ্যে যখন সে উপলব্ধির বড় অভাব, তখন দেশবাসী চেয়ে আছেন মহামান্য রাষ্ট্রপতির কার্যকর উদ্যোগের প্রতি। 
রাষ্ট্রপতি দেশের অভিভাবক। অভিভাবক ভেবেই ১৮ দলীয় জোটের নেতারা ও বিশিষ্ট নাগরিকেরা আপনার সাথে সাক্ষাৎ করে দেশকে চরম এ সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতি থেকে বাঁচানোর ব্যাপারে আপনার সহায়তা কামনা করেছেন। আপনি রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর নিজেকে যুগসন্ধিক্ষণের রাষ্ট্রপতি অভিহিত করে সে দায়িত্ব পালনে সবার সহায়তা কামনা করেছিলেন। সত্যিই জাতি এক যুগসন্ধিক্ষণের মুখে। এ সময়ে আপনি অভিভাবকত্ব গ্রহণ না করলে জাতি আপনাকে নিয়েও প্রশ্ন তুলবে। কারণ আপনিই বলেছিলেন, আমি কোনো দলের রাষ্ট্রপতি নই, সবার রাষ্ট্রপতি। 


Ads