শনিবার, ৩ মে, ২০১৪
এ সপ্তাহের লেখাটির শিরোনাম ভেবে রেখেছিলাম ‘চোর, মূসা ভাই, চোর চোর’। একটু পুরনো হলেও বিষয়টি নিয়ে
আমি গভীরভাবে ভেবেছি। সরকার নানারূপ ঢাকঢোল পিটিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে যেসব বিদেশী অবদান
রেখেছিলেন তাদের পুরস্কৃত করার জন্য স্বাধীনতা দিবসকে সামনে রেখে বাংলাদেশে ডেকে এনেছিল।
সেখানে তাদের দেয়া হয়েছে একটি করে ক্রেস্ট, ‘সোনার মেডেল’ আর সম্মাননাপত্র। দেশের সচেতন মুক্তিযোদ্ধারা প্রশ্ন তুলেছিলেন যে, বিদেশীদের ক্রেস্ট দেয়ার আগে, সম্মাননা দেয়ার আগে, দেশে মুক্তিযুদ্ধে যেসব সাধারণ মানুষ অবদান রেখেছিলেন, জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করেছিলেন, গ্রুপে গ্রুপে নিয়ে এসে তাদের
সম্মাননা দেয়া উচিত ছিল। কিন্তু এ কথা তো সবারই জানা আছে গাঁয়ের যোগী গাঁয়ে ভিক্ষা পায় না, ভিন গাঁয়ের যোগীদের তোষামোদ করে।
কাজের কাজ কিছু নেই। এ সরকার কেবল লোক দেখাতে ব্যস্ত। দেশের মানুষের কী হলো না হলো, তাদের জীবন কতটা নিরাপদ থাকল না থাকল, অর্থনৈতিক উন্নয়ন কী হলো না হলো
এসব নিয়ে সরকার থোড়াই পরোয়া করে।
শুক্রবার, ২ মে, ২০১৪
এরশাদ, তুমি কি ল করেছ কত মৌলিক বিষয়ে বাংলাদেশে দ্বিমত বা ত্রিমত কেমন শক্তিশালী
খরস্রোতা নদীর মতো বয়ে চলেছে। কেন এমন হচ্ছে ভেবে আমি দুঃখ ও বেদনায় কাতর হয়ে যাই।
যেমন ধরো, বঙ্গবন্ধু আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার কোনো ঘোষণা দিয়েছিলেন কি
না? ২৫ মার্চ রাতেই বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর কাছে ধরা দিয়েছেন।
তিনি ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডের বাড়িতেই ছিলেন। হয়তো তার কাছে খবর ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী
তাকে গ্রেফতার করবে। অথবা তিনি নিজেই ধরা দিয়েছেন। এ ব্যাপারে লিখিতভাবেই অনেকের মতামত
জারি রয়েছে।
আমি এর
আগে বহুবার বলেছি, বঙ্গবন্ধু আমাদের অবিসংবাদিত নেতা। তার ব্যাপারে কারো কোনো দ্বিমত
নেই। কিন্তু আওয়ামী লীগ তাকে বারবার বিতর্কের মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। তারা জিয়াউর রহমানকে
বঙ্গবন্ধুর প্রতিপ বা প্রতিদ্বন্দ্বী করে তুলছে। এটা এখন আওয়ামী লীগের মজ্জাগত হয়ে
গেছে। কিন্তু কারা এসব করাচ্ছে? শেখ হাসিনা কি ব্যাপারটা বুঝতে পারেন? না, আমার মনে হয় না। জিয়া ৪০০ টাকার মেজর ছিলেন। সবাইকে স্যালুট দিতেন।
তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছেন পাকিস্তানি দালাল হিসেবে। এসব আজেবাজে কথা আওয়ামী
লীগ নেতারা কেন বলেন, কে তাদের দিয়ে এসব কথা বলায়? বললে কী লাভ হয়?
ফলে ভিন্নমতের
লোকেরা বলছে বঙ্গবন্ধু কখনোই স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী
হতে চেয়েছিলেন। তিনি পাকিস্তানকে টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন যেকোনোভাবেই
হোক পাকিস্তান টিকে থাকুক। তিনি কনফেডারেশন চেয়েছিলেন। তিনি যে অখণ্ড পাকিস্তান চেয়েছিলেন
তার ভূরি ভূরি প্রমাণ এখন চার দিক থেকে আসতে শুরু করেছে। দেশে ফিরে ১০ জানিয়ারি যে
ভাষণ দিয়েছিলেন, তাতে একটি ইঙ্গিত রয়েছে যে, এখন আর কিছু করার সুযোগ নেই।
ভুট্টো সাহেব আপনারা সুখে থাকুন। পাকিস্তান থেকে লন্ডনে পৌঁছে তিনি কী বলেছিলেন তা
সিরাজুর রহমানের লেখায় বারবার প্রকাশিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু জীবিত থাকতে এ বিষয়ে তিনি
কোনো কথা বলেননি, কোনো ধরনের বিতর্কও সৃষ্টি করেননি। তার মৃত্যুর পর আওয়ামী লীগ
এই বিতর্ক তুলেছে একেবারেই মিথ্যার ওপর ভর করে।
বুঝলে
আশি, এর আগে আমি বহুবার লিখেছি, বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা দেয়ার কোনো
প্রয়োজন নেই। তিনি তো ’৭০-’৭১-এ এ দেশের একমাত্র নেতা। তার
কথায় সব চলত। কারণ তখন তিনিই একমাত্র জনপ্রতিনিধি। নেতৃত্ব দেয়ার একমাত্র বৈধ ব্যক্তিত্ব।
সে নেতৃত্ব তিনি দিয়েছেন। কোনো ধরনের ষড়যন্ত্র না হলে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী
হতেন। সে জন্য তিনি এবং তার দলের নেতারা ২৪ মার্চ পর্যন্ত আলোচনা চালিয়ে গেছেন। কী
আলোচলা করেছেন তা কিন্তু আওয়ামী নেতারা আজো প্রকাশ করেননি। শেষ পর্যন্ত কী নিয়ে আলোচনা
হয়েছিল? এসব কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ এখনো জানে না। অনেকেই বলেন, বঙ্গবন্ধু কনফেডারেশন করতে রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের বর্তমান নেতৃত্ব
কোনো কথাই শুনতে রাজি নয়। বঙ্গবন্ধু জীবিত নেই, তাই তারা তার নামে যা ইচ্ছে তাই
চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। চলমান আওয়ামী নেতৃত্বের ব্যক্তিত্ব না থাকার ফলে
তারা সব কিছুতেই দিল্লি নির্ভর হয়ে থাকেন। তারা মনে করেন এবং বিশ্বাসও করেন যে, ভারত বিশেষ করে কংগ্রেসের অন্ধ সমর্থন না থাকলে মতায় আসা যাবে না বা থাকা যাবে
না। হয়তো দিল্লির কোনো শক্তি তাদের ভয় দেখায় বাব্ল্যাকমেইল করে। দিল্লির সাথে থেকে
বা অনুগত হয়েও নেপালের রাজপরিবার বাঁচতে পারেনি। সিকিম তার স্বাধীনতা রা করতে পারেনি।
লেনদুপ দর্জি আজ একজন বেঈমান হিসেবে চিহ্নিত। শ্রীলঙ্কা বহু বছর ভারতের সাথে সমঝোতা
করে চলতে চেয়েছিল। পারেনি, শেষ পর্যন্ত শ্রীলঙ্কাকে কোমর শক্ত করে মেরুদণ্ড
সোজা করে দাঁড়াতে হয়েছে। মালদ্বীপকে ভারত সব সময় নানা রকম ভীতির ভেতর রেখেছে। আমাদের
পার্বত্য চট্টগ্রামকে পাকিস্তান আমল থেকে অশান্ত করে রেখেছে ভারত। এই হলো আমাদের প্রতিবেশী
ভারতের চেহারা। তেমনি একটি দেশের সাথে চলমান সরকার গাঁটছড়া বেঁধেছে দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি
দিয়ে শুধু জোর করে মতায় থাকার জন্য।
তুমি কি
শুনেছ আশি, তাজউদ্দীনের আমেরিকার বাসিন্দা বড় মেয়ে শারমিন আহমদ তাজউদ্দীনকে নিয়ে একটি বই লিখেছেন, যাতে অনেক না জানা ও অজানা কথা প্রকাশ করেছেন। এই বইতেও নিশ্চিত করা হয়েছে
যে, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। বরং ঘোষণা দেয়ার প্রস্তাবকে
তিনি ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন। বঙ্গবন্ধু বলেছেন, এই ঘোষণা তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগকে শক্তিশালী করবে। ওই বইতেই
বলা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন মুজিব বাহিনীর লোকেরা তাজউদ্দীনকে হত্যা
করার চেষ্টা করেছিল। শেখ মনির নেতৃত্বে মুজিব বাহিনী গঠনের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবাসী
বাংলাদেশ সরকারকে জানানো হয়নি। ওটা ছিল ভারতীয় গোয়েন্দা বাহিনী র-এর একটি কৌশল। এর
আগে দৈনিক প্রথম আলোর বাণিজ্যিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান প্রথমা থেকে প্রকাশিত বইতেও বলা
হয়েছে, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। এ বিষয়ে শারমিন আহমদের ভাষণের
একটি ভিডিও এখন ইউটিউবে পাওয়া যাচ্ছে।
যেভাবেই
হোক, বাংলাদেশ এখন একটি স্বাধীন দেশ। এটাই বাস্তব এবং সত্য। ৪৩ বছর
পরেও ঘোষণা নিয়ে তর্কবিতর্ক করে আওয়ামী লীগের নেতারা আমাদের স্বাধীনতাকেই বিতর্কিত
করে তুলেছেন। তবে স্বাধীনতার পর তাজউদ্দীনের এমন অবস্থা হলো কেন? কেন বঙ্গবন্ধুর সাথে তার দূরত্ব সৃষ্টি হলো? যে মানুষটির নেতৃত্বে একটি দেশ
স্বাধীন হলো, সে মানুষটি কী কারণে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের কাছে অপাঙ্ক্তেয়
হয়ে গেল। এ ব্যাপারে অবশ্য শারমিন আহমদের নিজস্ব ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ আছে। সেসব ব্যাখ্যা
তিনি তার বইতে দিয়েছেন। এর আগে তাজউদ্দীনের ছেলে সোহেল তাজকে নিয়ে সরকার অনেক নাটক
করেছে। সোহেলের পদত্যাগকে কেন্দ্র করে সরকার বহু লুকোচুরি করেছে। শেষ পর্যন্ত সোহেল
জাতীয় সংসদের সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে চলে গেলেন। তাজউদ্দীন একজন মেধাবী
ছাত্র ও বিদ্বান মানুষ ছিলেন। তারই বুদ্ধি পরামর্শকে বঙ্গবন্ধু খুবই গুরুত্ব দিতেন।
বড়ই বেদনার বিষয়, এমন মানুষটি বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের সাথে থাকতে পারলেন না। শারমিন
আহমদ অতি বেদনা ও ােভ থেকেই বইটি রচনা করেছেন। তার বাবা একজন রাজনীতিক ছিলেন। ফলে রাজনীতির
অন্দর মহলের অনেক কথা এসেছে। অনেক ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয়ও এসেছে। যে মানুষটির
নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে ও বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, সে মানুষটা এখন পর্দার অন্তরালে। শারমিন বলেছেন, বঙ্গবন্ধু কখনোই নয় মাসের কথা বা মুক্তিযুদ্ধের কথা জানতে চাননি। এতে তাজউদ্দীন
অবাক হয়েছেন। হয়তো বঙ্গবন্ধু শেখ মনির কাছ থেকে সব জানতে পেরেছিলেন।
তবে গবেষকেরা
বলেন, কেউ চাক বা না চাক ভারত একদিন পাকিস্তানকে ভাঙতই। ’৪৭ সালেই ভারতের নেতারা পরিকল্পনা নিয়েছেন পাকিস্তান ভাঙার । ভারতের নেতারা
এখনো পাকিস্তানের অস্তিত্ব স্বীকার করে না। মোম সময় ছিল ১৯৭১ সাল। শেখ সাহেব পাকিস্তানের
প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন। এমন কী তিনি গ্রেফতার হওয়ার পরও পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশের
কী হবে তা বলে যাননি। তাজউদ্দীন অনুরোধ করেছিলেন ঘোষণা দিতে, দলের দ্বিতীয় ব্যক্তি কে হবে তার অনুপস্থিতিতে, যিনি দলকে বা মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করবেন।
বঙ্গবন্ধু-পরবর্তী
আওয়ামী লীগ একটি মিথ্যা ইতিহাস সৃষ্টির চেষ্টা করছে। আমার এক গবেষক বন্ধু বললেন, বাংলাদেশ এখন যারা চালাচ্ছেন তাদের আপনি দেখতে পাচ্ছেন না, দেখতে পাচ্ছেন তাদের ছায়া। ছায়ার তো কোনো স্বাধীনতা থাকে না। কায়া যা চাইবে
তাই হবে। অখণ্ড বঙ্গদেশে হিন্দু জনসংখ্যা ছিল ৩০ ভাগ। মুসলমান ছিল ৫৫ ভাগ। বাকি ১৫
ভাগ ছিল বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, শিখ ও হরিজন। পূর্ব বাংলা বা পূর্ব পাকিস্তানের
জনসংখ্যার ৮০ ভাগ ছিল মুসলমান। এখন ৯০ ভাগ মুসলমান। শিতি হিন্দুদের বেশির ভাগ দেশত্যাগ
করে ভারত চলে গেছেন। মুসলমানেরা অখণ্ড বঙ্গদেশ চেয়েছিলেন, কিন্তু হিন্দু নেতারা রাজি হননি ধর্মীয় কারণে। অখণ্ড বঙ্গদেশে মুসলমানেরা ছিলেন
মেজরিটি। পরপর তিনজন প্রধানমন্ত্রীই ছিলেন মুসলমান। দিল্লি বা কলকাতার বাবুরা মুসলমান
শাসিত অখণ্ড বাংলাদেশ চাননি। ফলে ভারত বিভক্তির সাথে বঙ্গদেশও ভাগ হয়ে গেল। ঢাকায় বসে
যারা দিল্লির পদ্মভূষণ গ্রহণ করছেন তারাও ৪৭ সালে দরিদ্র পূর্ব পাকিস্তানে চলে এসে
এখানে সম্মানিত হয়েছেন, নিজেদের প্রাণ রা করেছেন। এরাই বলে থাকেন ’৪৭ সালের দেশ বিভাগ ভুল ছিল। কেন তারা এ তত্ত্ব পেশ করছেন তা তারা ভালো জানেন।
’৪৭-এর পর থেকে দিল্লি সরকারের নীতির কোনো পরিবর্তন হয়েছে বলে আমি
জানি না। মুসলমানদের প্রতি তাদের মনোভাবের কোনো পরিবর্তন আমরা দেখতে পাচ্ছি না। বেনিয়া
ব্রিটিশদের আগমনের আগে শত শত বছর ধরে ভারতে হিন্দু মুসলমান পাশাপাশি অবস্থান করেছে।
কোথাও সমস্যা হয়নি। ব্রিটিশ আমলেই সাম্প্রদায়িকতা বৃদ্ধি পায়। এখনো ভারতে প্রতি বছর
কয়েক শ’ দাঙ্গা হয়। এ ব্যাপারে শৈলেশ ব্যানার্জির দাঙ্গার ইতিহাস বইটি
পড়ার জন্য অনুরোধ জানাব। যদিও লেখক নিজেও ব্যক্তিগতভাবে নিজেকে কিছুটা পপাত দোষে দুষ্ট
ছিলেন। তবুও বইটাতে অনেক তথ্য আছে। হিন্দু মুসলমান ছাড়াও দাঙ্গা হয়। তথাকথিত ভারত সেকুলার
ভারত দাঙ্গা কখনোই বন্ধ করতে পারেনি। ’৪৭ সাল থেকে শুরু করে ২০১৪ সাল
পর্যন্ত বাংলাদেশে তেমন কোনো দাঙ্গা হয়নি। যা হয়েছে তা রাজনৈতিক কারণে রাজনীতির হাতিয়ার
হিসেবে। প্রায়ই দেখবেন, হিন্দু মন্দির বা বৌদ্ধদের টেম্পল আক্রান্ত হচ্ছে।
শুধু ফেসবুকের গুজব নিয়েও নাকি হিন্দু বা বৌদ্ধদের আক্রমণ করা হয়। বাংলাদেশের মানুষ
এমনিতেই অসাম্প্রদায়িক। মুসলমানদের ভেতর অছ্যুত বিষয়টি নেই। বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী পড়লেই
বুঝতে পারবেন তার বাল্যকালে গোপালগঞ্জের হিন্দুরা কেন সাম্প্রদায়িক ছিলেন। তিনি তো
প্রথমবার জেলে গিয়েছেন হিন্দু বন্ধুর গায়ে হাত তুলে।
’৪৯ সালের
জুন মাসে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সরকারি মুসলিম
লীগের গণবিরোধী ভূমিকার কারণে। ’৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগ পরাজিত হলে পরবর্তীপর্যায়ে
মুসলিম শব্দ বাদ দিলে কংগ্রেস ও বামপন্থী বেশ কিছু নেতা আওয়ামী লীগে ঢুকে পড়ল। ’৭০ সাল পর্যন্ত আমরা এ দলটিকে আমেরিকার দালাল বলতাম। সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই দলটি আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী নীতি সমর্থন করতে থাকে।
সেটা ’৭০ সাল নাগাদ জারি থাকে। ’৭২ সালে হঠাৎ আওয়ামী লীগ মস্কোর
দিকে ঝুঁকে পড়ে। কালক্রমে আওয়ামী লীগ একটি পুরো ভারতপন্থী দল হয়ে ভারতীয় কংগ্রেসের
ছায়াতে পরিণত হয়।
’৭৫ সালে
বঙ্গবন্ধুর পতনের পর থেকেই দলটি দিল্লির খপ্পরে পড়ে গেছে। বিশেষ করে ’৭৫ থেকে ’৮০ সাল পর্যন্ত দলটির নেতৃত্ব দিল্লিতে অবস্থান করে মহাভারতের
আদর্শে দীা লাভ করেছেন বলে অনেকেই অনুমান করেন। বিশেষ করে ২০০৭ সালের মিলিটারি সমর্থিত
ফখরুদ্দীনের সরকারের মতা গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশে ভারতের উপস্থিতি প্রকাশ্য হয়ে গেছে।
বিশেষ করে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রমাণ করেছে ভারত এখন বাংলাদেশের টুঁটি চেপে ধরেছে।
২০০৭ সালে কাঁধে দাঁত বসিয়েছিল, এখন গলায় । যেমন করে বাঘ বা সিংহ হরিণকে কাবু করে।
শারমিন
আহমদের পুরো বই-ই একটা অভিযোগের বই। এতে আক্রমণের প্রধান শিকার বঙ্গবন্ধু। বইতে বলা
হয়েছে, বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কখনোই আগ্রহ দেখাননি।
আশি, যে বিষয় নিয়ে তুমি কথা শুরু করেছিলে তা হলো বাংলাদেশের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ ও নেতাদের কে বা কারা অবিরামভাবে বিতর্কিত করে তুলছে। আওয়ামী লীগের
চাটুকারেরা শেখ হাসিনাকে চার দিক থেকে ঘিরে ফেলেছে। দেশবাসী জানে শেখ হাসিনার মতা একজন সম্রাটের মতা। তিনিই সংবিধান, তিনিই সংসদ, তিনি একাই ১৬ কোটি মানুষ। এ মতা তাকে দিয়েছে বাংলাদেশের
সংবিধান। বাকশালের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে যে মতা দেয়া হয়েছিল, তা পরে সব প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি ব্যবহার করে চলেছেন। এ দেশে গণতন্ত্র
আর সংসদ মানে একজন, তিনি প্রধানমন্ত্রী ও দলের প্রধান। একটি গণতান্ত্রিক
জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সংবিধানের সংশোধন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। জাতীয়
ঐকমত্য ও সমঝোতা প্রতিষ্ঠার জন্য অবিলম্বেই একটি জাতীয় কনভেনশন আহ্বান করা জরুরি হয়ে
পড়েছে। সংসদে এক সিট বা আসন বেশি পেলে সেই দলের নেতাই রাজা এ ব্যবস্থাকে রহিত করতে
হবে। জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ মেজোরিটি থাকলেই মৌলিক বিষয়ে সংবিধান পরিবর্তনের ব্যবস্থা
রহিত করতে হবে।
২০০৮ সালে
একটি অবৈধ সরকার একটি ফালতু নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে মতায় বসিয়ে গেছে। মইনউদ্দিন
আর ফখরুদ্দীনের সরকার ছিল একটি অবৈধ সরকার, এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই।
কেন তারা মতা দখল করেছিল তা এখন দেশবাসীর কাছে পরিষ্কার। সেই ধারা এখনো অব্যাহত আছে।
একটি বিষয় আমি বহুবার বলেছি যে, স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ টিকে থাকার প্রধান হাতিয়ার
হচ্ছে ইসলাম। কারণ, এ দেশের জনসংখ্যার ৯০ ভাগ মুসলমান। এই ৯০ ভাগের
কথামতোই দেশ চলবে। ৯০ ভাগের আশা-আকাক্সাই প্রতিফলিত হবে দেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি ও দর্শনে। কিন্তু তা হচ্ছে না। আগেই বলেছি, সংসদে একটি বেশি পেলেই চলমান ব্যবস্থা অনুযায়ী ৫১ই ১০০। ৪৯-এর দাম শূন্য। এটাই
হলো বাংলাদেশের গণতন্ত্রের নমুনা।
চলমান
সরকার সব দিক থেকেই মাইনরিটি মানসিকতার সরকার। তাদের আদর্শ হচ্ছে ধর্মকে রাজনীতি থেকে
দূরে রাখার স্লোগান দিয়ে দেশের মেজোরিটি মানুষকে মতাচ্যুত করা বা রাখা। ভারত সেকুলারিজমের
নামাবলি পরে মুসলমান ও হরিজনদের শোষণ করে, অত্যাচার করে। বাংলাদেশের সরকারও
একই নীতি অবলম্বন করে চলেছে। তবে বাংলাদেশে তথাকথিত ধর্মনিরপেতার নামে মুসলমানদের শোষণ
করা হচ্ছে। মুসলমানদের মতা থেকে দূরে রাখা হচ্ছে। ধর্মের কথা বললেই মৌলবাদী বলা হচ্ছে।
মিসরে
আলসিসি মতা দখল করেছে ইসলামকে ধ্বংস করার জন্য। জন্মগতভাবে সে একজন ইহুদি। ইহুদি মায়ের
সন্তান। তাকে সমর্থন করছে সৌদি বাদশাহ, আমেরিকা ও পশ্চিমা জগত। আর সিসি
মোবারক ও জেনারেল এরশাদের মতো জোর করে গণতন্ত্র চালু করবে।
আমাদের
ইতিহাস, বায়াদলিল পাল্টে যাবে যদি ইসলাম ও মুসলমানবিরোধী শক্তি বেশি সময়
ধরে মতায় থাকে।
এরশাদ মজুমদার
ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জ এখন প্রতিবাদ ও বিক্ষোভে উত্তাল। ত্বকীসহ কয়েকটি পরপর হত্যাকা-ের বিচার এবং হন্তারক ও অপহরকদের গ্রেফতারের দাবিতে প্রাচ্যের ডা-ি বলে খ্যাত বাণিজ্যবন্দরটি এমনিতেই প্রায় টালমাটাল ছিল কিছুদিন যাবৎ। এরপর সেখানকার প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ ৭ জনের অপহরণ ও তাদের নির্মমভাবে হত্যা করে শীতলক্ষ্যা নদীতে ভাসিয়ে দেবার ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ এখন ক্ষোভের আগুনে জ্বলছে। বিজিবি, র্যাব ও পুলিশ দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে চাইছে প্রশাসন। কিন্তু এভাবে ক্ষোভের দাবানল ঠেকানো সম্ভব হবে না বলে মনে হচ্ছে। শুধু নারায়ণগঞ্জ নয়, দেশময় ছড়িয়ে পড়ছে অপহরণ, খুন ও গুমাতঙ্ক। ৭ বছরের শিশু অপহরণ করে তার কিডনি খুলে নিয়ে যাবার ঘটনায় সিরাজগঞ্জে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে শিশুরা। ঢাকার ফ্লাইওভার ও রাস্তায় পাওয়া যাচ্ছে মানুষের ক্ষত-বিক্ষত লাশ কিংবা শরীরের বিচ্ছিন্ন অংশ। এমনই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে জীবনযাপন করতে হচ্ছে দেশের মানুষকে। তবে উত্তরের জনপদ নওগাঁয়ে ঘটেছে ব্যতিক্রম। সেখানে একটি মাইক্রোবাস নিয়ে ১১ জনের একটি অপহরক দল একজন ব্যবসায়ীকে অপহরণ করতে গেলে স্থানীয় জনগণ তাদের ধাওয়া করে ধরে ফেলে এবং গণধোলাই দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করেছে সম্প্রতি।
চৌধুরী আলমকে পাওয়া যায়নি। ইলিয়াস আলী এখনও নিখোঁজ। সম্প্রতি শামসুল ইসলাম নামের এক যুবদল নেতাকে ঢাকা থেকে অপহরণ করে অজ্ঞাতনামা একটি গোষ্ঠী। তার লাশ পাওয়া গেছে লক্ষ্মীপুরে। সাগর-রুনির হত্যাকারীদের এখনও চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। নারায়ণগঞ্জের সর্বশেষ অহরণ ও হত্যার ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া যাবে তারও নিশ্চয়তা নেই। উল্লেখ্য, চৌধুরী আলম কিংবা নিখোঁজ ইলিয়াস আলী সাহেবরা জাতীয়তাবাদী দলের হলেও নারায়ণগঞ্জের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও তার সঙ্গীরা আওয়ামী ঘরানার। এমনকি এ অপহরণ ও হত্যার ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে যাদের সন্দেহ করা হচ্ছে তারাও একই ঘরানার বলে বহুলভাবে আলোচিত। কাজেই সমগ্রদেশকে নাড়িয়ে দেয়া এ নির্মম ও লোমহর্ষক অপহরণ-হত্যার ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বের করে উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করা হবেÑ এমনটি হয়তো প্রত্যাশাই থেকে যাবে। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ অপহরণ-হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের অবিলম্বে গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়েছেন। তবে এ নির্দেশের বাস্তবায়ন কতটুকু এবং কখন হবে, তা এখনই বলা মুশকিল। অবশ্য গত ১লা মে’র শ্রমিকদলের সমাবেশে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া অপহরকদের ঘেরাও করে গণধোলাই দিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনীর হাতে তুলে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনীর সদস্যরা যথাযথ পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হবে তো? বিনাভোটে নির্বাচিত ও জোর করে ক্ষমতা দখলকারী মন্ত্রীরা বলছেন, গুম-খুনের ঘটনা নাকি এখনও সীমা ছাড়িয়ে যায়নি। অপহরণ-হত্যার ঘটনা নাকি আগের তুলনায় অনেক কম। সত্যি সেলুকাস! ক্ষমতার চশমা চোখে লাগালে এমনই দেখা যায়।
ক্ষমতাসীনদের নির্দেশে সারাদেশ থেকে জামায়াত-শিবিরের নিরপরাধ নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার করে বুলেটবিদ্ধ করা হচ্ছে। রাস্তায় ফেলে হত্যা করা হচ্ছে। জেলে পুরে নির্মম নির্যাতন চালানো হচ্ছে। একটার পর একটা মিথ্যে মামলা চাপানো হচ্ছে তাদের ওপর। প্রকৃত অর্থে জোর করে ক্ষমতাদখলকারীরা গোটা দেশকে কারাগারে পরিণত করছে। এদের আক্রোশে কেউ কোথাও স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারছে না। এ দুঃশাসনের দাপটে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা দুরাশা বৈ কিছু নয় বলেই মনে হচ্ছে। তাই দুঃশাসন ও দুষ্কর্মের বিরুদ্ধে জনগণক ঐক্যবদ্ধ হতেই হবে।
বৃহস্পতিবার, ১ মে, ২০১৪
আজ মে দিবস। এই দিবসের তাৎপর্য
নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। তবে বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষ নিয়ে কী ধরনের নোংরা রাজনীতি
হয় তার প্রমাণ রানা প্লাজা। ক্ষমতার রাজনীতির স্ফীত মেদ কত ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
সৃষ্টি করতে পারে, তা দেখার জন্য আমাদের শ্রমঘন পোশাক শিল্পের দিকে তাকানোই যথেষ্ট।
এত বড় ঘটনায় কোনো মন্ত্রী দায় নিয়ে পদত্যাগ করেনি। ফেরিঘাটের দুর্ঘটনায় আমাদের দূরপ্রতিবেশী
দেশে দায় নিয়ে মন্ত্রী পদত্যাগ করলেন। অথচ আমাদের নেতানেত্রীরা দায়বোধের ডুগডুগি বাজান, কান্নার ভান করে আবেগ ঝরিয়ে করুনা ভিক্ষা করেন। হলমার্ক, ব্যাংক, ডেসটিনি ও শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি তো অর্থমন্ত্রীকে আঁচড়ও কাটল
না।
আমরা নিজেদের দিকে তাকাতে অভ্যস্ত
নই। আত্মসমালোচনার বোধ নষ্ট হয়ে গেছে। নিজেদের ভুলত্রুটি নীতি-নৈতিকতা, সীমাহীন ঔদ্ধত্য, ক্ষমতার দম্ভ-অহমিকা কিছুই চোখে পড়ে না। অন্যরা
আমাদের দিকে কিভাবে তাকাল সেটা দেখতেই আমরা ব্যস্ত। কেউ আমাদের সমালোচনা করুক, ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিক, ভালো-মন্দ বলে দিক, এটা অসহ্য মনে হয়। ভিন্নমত, দ্বিমত পোষণ যেন পাপ। সব ব্যাপারে
একমত না হলেই শত্রু জ্ঞান করা, গুম অপহরণের ঝুঁকিতে পড়া একেবারেই স্বাভাবিক হয়ে
গেছে। তা ছাড়া এই সমাজে এখন কেউই নিরাপদ নন। তাই বলে আমাদের লজ্জা-শরম কমেছে বৈ বাড়েনি।
আমরা প্রতিনিয়ত দুই কানকাটা নির্লজ্জ মানুষের মতো আচরণ করছি। কথায় আছে এক কানকাটা মানুষ
রাস্তার এক পাশ দিয়ে হাটে। উদ্দেশ্য কাটা কানটা আড়াল করা। দুই কানকাটা মানুষ রাস্তার
মধ্য দিয়ে হাটে। কারণ কাটা দু’টা কান আড়াল করার সুযোগ থাকে না। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের
আগে এই সরকারের আচরণ ছিল এক কানকাটা মানুষের মতো। বাড়াবাড়ি করেছে কিন্তু লজ্জা পেয়েছে
এমন ভাব দেখিয়েছে। ৫ জানুয়ারির পর দুই কানকাটা মানুষের মতো এতটা নির্লজ্জের মতো আচরণ
করছে তার কোনো সংজ্ঞা নিরূপণ করা কঠিন। উপজেলায় নির্বাচনের নামে মাতলামির পর তা আরো
বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে আমাদের অতি
উৎসাহ নেই। আমরাও মনে করি কোনো রাষ্ট্রদূতই ভাইসরয় নন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র বলে কোনো কথা নেই। আমাদের জাত তুলে আঁতে ঘা দিলে নির্লিপ্ত
থাকার সুযোগ আছে বলেও মনে করি না। আমাদের অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য শুনে মনে হলো তিনি যুক্তরাষ্ট্র
সরকারের সাথে শুধুই গ্রামীণ ব্যাংক, ডক্টর ইউনূস ও পোশাক শিল্পের
স্বার্থ নিয়েই ভাবতে চান। আমরা অর্থমন্ত্রীর বয়স, অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞার সাক্ষী মানলাম-
ঘটনা কি অতটুকুনই! ক’দিন আগেও একজন মন্ত্রী বললেন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে
বোঝাপড়া ভালো। তাহলে হঠাৎ করে অস্বস্তির কারণ ঘটল কেন, সেটা স্পষ্ট হওয়া দরকার। যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ৫ জানুয়ারির
নির্বাচন মেনে নেয়নি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তো আর বিরোধীদলের মতো নয় যে, মানিনা, মানব না বলে রাজপথে নামবে। তারা কূটনৈতিক আচরণ দিয়েই তাদের মনের
ভাব প্রকাশ করবে। কূটনৈতিক শিষ্টাচার মানতে গিয়ে তারা সরকারকে কিছু বিষয়ে সহযোগিতা
দিচ্ছে, কিছু বিষয়ে আপত্তি জানাচ্ছে। প্রকাশ্যে জানান দিচ্ছে, তারা একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হোক তা চায়। বিশেষত একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন
ও একটি বৈধ সরকার গঠনের তাগিদ অব্যাহত রেখেছে। এটাতো ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে ১৪ কোটির
দাবি। আমাদের জানা মতে ভারত ছাড়া আর কোনো রাষ্ট্র, দাতা সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী, আন্তর্জাতিক ফোরাম ও সংগঠন বর্তমান সরকারকে গণতন্ত্রের
মানদণ্ডে বৈধ বলতে চাচ্ছে না। তাই রাখ-ঢাক করে কথাগুলো ঘুরিয়ে বলছে।
এটা ঠিক অনেকেই শব্দ চয়নে অবৈধ
বলছে না, কিন্তু প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত একদলীয় সরকার ও অনুগত
বিরোধী দলের উপস্থিতিকে মেনেও নিচ্ছে না। এই সংসদীয় সরকারের নামে যে তামাশা সেটাও অনুমোদন
করছে না। কেউ কেউ ঘুরিয়ে বলছেন- বর্তমান সংসদ পূর্ণ মেয়াদ থাকুক-সেটা গ্রহণযোগ্য হবে
না। একটা স্বাধীন দেশের সরকারের সাথে এর চেয়ে আর কী ধরনের ভাষা ও ভাব প্রকাশ করলে আমাদের
সরকারের কানে পানি যাবে জানি না।
অর্থমন্ত্রী যদি তার অভিজ্ঞতা
ও গণতান্ত্রিক শিষ্টাচারকে সাক্ষী মানতেন, তাহলে নির্বাচনের আগে তার মন্তব্য
স্মরণ করে আজকের ভূমিকার জন্য লজ্জিত হতেন। তার মতো লোকও যখন নীতিনৈতিকতার ভাষা বুঝতে
চান না, তখন মনের কষ্ট বাড়ে। যুক্তরাষ্ট্র আমাদের স্বার্থের বোঝাপড়ায় কতটা
বন্ধুপ্রতিম, কতটা নয়, সেটা সামনে রেখে পরিচিতিবোধ নিয়ে মন্তব্য করলে অর্থমন্ত্রী
ভালো করতেন। ‘সব কিছু জুুটা হ্যায়’ পাগলা মেহের আলীর সংলাপে মানায়।
বোগাস, রাবিশ শব্দও অর্থমন্ত্রীর সাথে যায়, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপারে কূটনৈতিক শিষ্টাচার বর্জিত মন্তব্য কোনোভাবেই
দেশের জন্য এবং খোদ অর্থমন্ত্রীর জন্য স্বস্তিদায়ক নয়। শিষ্টাচারের মধ্যে তো পড়েই না।
আমলা চরিত্রের অর্থমন্ত্রীকে খল স্বভাবের রাজনীতিবিদ ও পতিত বামদের মতো রোমান্টিক সাম্রাজ্যবাদ
বিরোধী বিলাসী মানুষ মনে না করতে পারলে আমাদেরও ভালো লাগত।
দেশের ভেতর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের
উৎসব চলছে। খুনের অবস্থা নুন এবং চুনের চেয়েও সস্তা। অপহরণ তো রুটিন ওয়ার্ক। আইনের
শাসন ভূলুণ্ঠিত। দেশে গণতন্ত্রের চর্চা করার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। মানবাধিকার অধরা
এক সোনার হরিণ। দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে ভারতের সাবেক বিচারপতিও প্রশ্ন
তুলেছেন। তিনি প্রশ্ন রেখেছেন, তাহলে বিচার বিভাগ আইন-আদালত থাকল কই। ঢাকার উত্তরায়
অপহৃত যুবদল নেতার লাশ মিলল নোয়াখালীতে। একজন নির্বোধ বালকও বুঝতে পারে এমন অপহরণ
কারা করে। কারা গুলি করে হত্যা করে, আবার লাশ উদ্ধারের নাটক করে।
সাতক্ষীরা ও নরায়ণগঞ্জে কিসের আলামত সেটাও জনগণ বোঝে।
অর্থমন্ত্রীর চোখে কি এত সব মৌলিক
বিষয় আদৌও পড়ে না। যুক্তরাষ্ট্রকে কেন যত শক্তিধর দেশই হোক বাংলাদেশ নিয়ে বিশেষত অভ্যন্তরীণ
বিষয়ে নাক গলাতে সুযোগ না দেয়ার ব্যাপারে আমাদেরও সহমত রয়েছে। কিন্তু আমাদের দৃষ্টিগ্রাহ্য
দোষত্রুটিগুলো সম্পর্কে যারা মন্তব্য করছে তাদের সাথে সুর না মিলালেও জনগণ তাদের ত্রাণকর্তা
ভাবতে চাইবে। কারণ রাষ্ট্রের সন্তানতুল্য নাগরিকদের গুম, অপহরণ ও হত্যা করে সরকার লুকাতে চায়, তারা সেটা দেখছে, বলছে। এটাকে জনগণ অপরাধ ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ মনে করবে না।
আবার অর্থমন্ত্রীর বয়স ও অভিজ্ঞতার দোহাই দিয়ে যদি প্রশ্ন করা হয়, একটি প্রশ্নবিদ্ধ সরকারের ক্যাবিনেট মন্ত্রী হওয়ার সুখানুভূতি লালন করবেন আর
দায় নেবেন না তাও কি হয়। আপনাদের দুর্বলতার জন্য, বাড়াবাড়িমূলক তৎপরতার জন্য বিশ্বের
কাছে দেশের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে। জাতি হিসেবে আমরা বিশ্ববাসীর কাছে হাসির পাত্র হচ্ছি।
তা দেখার দায়িত্ব কি বয়সে প্রবীণ, অতিজ্ঞতায় প্রাজ্ঞ অর্থমন্ত্রীরও থাকতে নেই কিংবা
তার মত মানুষেরও বিবেক স্পর্শ করবে না! এই বয়সেও কি তিনি সাদাকে সাদা বলবেন না!
আমাদের দারিদ্র্য নিয়ে কেউ কটাক্ষ
করলে আমরা হজম করি। আমাদের দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুললে নিজেদের খাছলত ও নৈতিক অবস্থার
কথা স্মরণ করে লজ্জিত হই। শোষণ, বঞ্চনা ও নানামুখী অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন
তুললেও মানতে কষ্ট হয় না। কষ্ট হয় আমাদের সরকার, সংসদ, নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, দুদক, সেবা খাতসহ প্রাতিষ্ঠানিক সরকার কাঠামোর ব্যাপারে প্রশ্ন তুললে। সরকার একটি
সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানও রাখল না যেটিকে নিয়ে বলা যাবে এটি দলান্ধ নয়। যে উপজেলা নির্বাচন
নিয়ে দেশের তাবৎ মানুষ লজ্জিত, শুধু লজ্জিত নয় সরকার ও নির্বাচন কমিশন নামে অকার্যকর
প্রতিষ্ঠানটি। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তুলে যখন বিদেশীরা বলেন- এটা নির্বাচন নয় প্রহসন, এই সংসদ নির্বাচিত নয় অর্থহীন একটি ফোরাম, এই সরকারের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ, এই আইন অকার্যকর, এই গণতন্ত্র গণতন্ত্র নয়, তখন জনগণের দেখা অভিজ্ঞতার সাথে বিদেশীদের পর্যবেক্ষণ মিলে যায়। অর্থমন্ত্রী
নিজেও জনগণের নির্বাচিত ও আক্ষরিক অর্থে বৈধ প্রতিনিধি নন। এই সরকার তো নয়ই। তাহলে
জনগণের কাছে কাদের বিরুদ্ধে মিডিয়াকে সাক্ষী মেনে নালিশ করছেন যাদের পর্যবেক্ষণের সাথে
জনগণের পর্যবেক্ষণের কোনো গরমিল নেই। বিরোধী জোট তো বটেই অনেকেই বলছেন, দেশের জনগণ আপনাদের চায় না। চায় কি চায় না সেটা খতিয়ে দেখার ঝুঁকিও আপনারা
নিতে নারাজ। এর ওপর বিদেশীরা আপনাদের অস্বস্তিতে রেখেছে। নানামুখী চাপ দিচ্ছে। ন্যায়সঙ্গত
দাবিও বিবেচনায় নিচ্ছে না। তারপরও ক্ষমতা আঁকড়ে আছেন কেন, কোন নৈতিক শক্তিতে। কিংবা কোন ধরনের দেশপ্রেমের দোহাইতে। বিশ্ববাসীর কাছে কেনই
বা নিজেদের মান-ইজ্জত খোয়ানোর পর দেশের ও জনগণের মান-ইজ্জত নিয়েও ছিনিমিনি খেলছেন।
দোহাই আল্লাহর, দেশের ও জনগণের স্বার্থে নিজেরা মুক্তির পথ খুঁজুন। জাতিকেও জবরদস্তিমূলক
শাসন-শোষণ, গুম, হত্যা ও অপহরণ থেকে মুক্তি দিন। জনগণকে বিশ্বাস
করলে হয়তো হারবেন, ক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়বেন, নিশ্চিহ্ন তো হবেন না। কিন্তু
নিয়মতান্ত্রিক ক্ষমতা পরিবর্তনের সব পাটাতন সরে গেলে কারো শেষ রক্ষা হয় না।
মাসুদ মজুমদার
অজানাকে জানার আগ্রহ মানুষের
সহজাত প্রবৃত্তি। জন্মলাভের পর শৈশব, কৈশোর, যৌবন, প্রৌঢ় ও বার্ধক্যে পদার্পণ অবধি আমৃত্যু জানার প্রবণতা মানুষের
অব্যাহত থাকে। প্রকৃতিগতভাবে কোনো ব্যক্তি স্বাভাবিক মানুষের চেয়ে অধিক জ্ঞানসম্পন্ন
হলে তিনি তার জ্ঞান বিভিন্নভাবে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে সমাজকে বিকশিত করার ক্ষেত্রে
নিবেদিত থাকেন। মানুষ অক্ষরজ্ঞানে সমৃদ্ধ হওয়ার পর প্রাথমিক পর্যায়ে পাথরে খোদাই করে
অথবা গাছের বাকলে লিখে নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করত। কাগজের ব্যবহার শুরু হওয়ার পর
হাতের লেখার প্রচলন হয়, যা ছাপাখানা আবিষ্কারের পর যুগান্তকারী পরিবর্তনের
মাধ্যমে নব অধ্যায়ের সূচনা করে। এখনকার কম্পিউটার প্রযুক্তি এ নব অধ্যায়ে বৈপ্লবিক
পরিবর্তন এনে দিয়েছে। আগামীতে নতুন কোনো ধরনের আবিষ্কার এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনকে কোথায়
নিয়ে যাবে তা এখনো আমাদের অজানা হলেও দেখার জন্য হয়তো আর বেশিকাল অপেক্ষা করতে হবে
না।
জানার পিপাসা পূরণে বর্তমানে
বই, খবরের কাগজ, রেডিও, টেলিভিশন, ইন্টারনেট প্রভৃতির ভূমিকা অপরিসীম। এখন এসব মাধ্যমে জ্ঞানের পিপাসা নিবারণে
যারা কাজ করছেন তাদের সবাই আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত। প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়
পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক শিক্ষাদানে যারা নিয়োজিত তারাও শিক্ষার্থীদের জ্ঞানকে একটি নির্দিষ্টপর্যায়ে
পৌঁছে দেয়ার কাজ করছেন।
খবরের কাগজকে এখন বলা হয় কাগুজে
গণমাধ্যমে। অপর দিকে রেডিও ও টেলিভিশনকে বলা হয় ইলেকট্রিন গণমাধ্যম। আর ইন্টারনেট হলো
রেডিও ও টেলিভিশনের ক্ষেত্রে গণযোগাযোগ এবং ফেসবুক, টুইটার, ব্লগ প্রভৃতির ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। ইন্টারনেটের বদৌলতে বিভিন্ন
খবরের কাগজ এখন ইন্টারনেট সংস্করণ বের করছে এবং প্রতিটি খবরের কাগজের ক্ষেত্রেই পরিলক্ষিত
হচ্ছে ইন্টারনেট সংস্করণের পাঠক সংখ্যা কাগুজে সংস্করণের চেয়ে অনেক বেশি।
সংবাদপত্রে একজন সাংবাদিকের লেখার
দৃষ্টিভঙ্গি এবং একজন কলামিস্টের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে। একজন সাংবাদিক
সাধারণ পাঠকের কাছে সহজে বোধগম্য হয় এমন বিষয়টিকে সামনে রেখে সংবাদ পরিবেশনের প্রয়াস
নেন। অন্য দিকে একজন কলামিস্ট একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধ লিখে
পাঠকের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জনে সচেষ্ট থাকেন। এমন অনেক সাংবাদিক আছেন যারা একই সাথে
সাংবাদিক ও কলামিস্ট। সংবাদপত্রের সব সাধারণ পাঠক কলাম পাঠক নয়। সাধারণ পাঠকের তুলনায়
কলাম পাঠকের সংখ্যা অনেক কম হলেও কলামিস্টদের বিশ্লেষণধর্মী লেখনী জনমতের ওপর ইতিবাচক
ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে দেখা যায়। কলামিস্টদের নিবন্ধের অনুরূপ বৈদ্যুতিন গণমাধ্যমের
টেলিভিশন টকশো বেশ কিছুকাল ধরে দর্শকপ্রিয় হয়ে জনমত গঠনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখছে।
একজন কলামিস্ট ও টেলিভিশনের টকশোর
আলোচক দেশের সংবিধান অনুযায়ী চিন্তা, বিবেক, বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা ভোগ করলেও তা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বৈদেশিক সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা ও নৈতিকতার স্বার্থে নিয়ন্ত্রিত। এ নিয়ন্ত্রণের পরিধি আইন দ্বারা নির্ধারিত।
এ বিষয়ে প্রধান দু’টি আইন হলো (১) অফিসিয়াল সিক্রেসি অ্যাক্ট, ১৯২৩ ও (২) তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬ । উভয় আইনের পরিপন্থী কাজকে
অপরাধগণ্য বিবেচনায় শাস্তিযোগ্য করা হয়েছে।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন
সরকার সময় সময় আইনের দোহাই দিয়ে চিন্তা, বিবেক, বাক ও ভাব প্রকাশের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করলেও এ ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল
ও অনুন্নত দেশে প্রবণতাটি বেশি পরিলক্ষিত হয়। এ ক্ষেত্রে আমাদের দেশও ব্যতিক্রম নয়।
তবে অবাক হতে হয় যখন দেখা যায় এ নিয়ন্ত্রণ খবরের কাগজ বা বেসরকারি টেলিভিশন কর্তৃপক্ষের
তরফ থেকে আসছে।
অনেক সময় খবরের কাগজ বা বেসরকারি
টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ সরকারের চাপের কারণে নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগী হয়। আবার অনেক সময় দেখা
যায় নিজ ব্যবসায়িক স্বার্থে নিয়ন্ত্রণের প্রয়াস নেয়া হচ্ছে।
অতীতে সাংবাদিকতা পেশার সাথে
সংশ্লিষ্টরা খবরের কাগজের মালিকানা, প্রকাশনা ও সম্পাদনার দায়িত্বে
থাকতেন। এখন শেষোক্ত দায়িত্বটি সাংবাদিকদের কাছে অর্পিত থাকলেও প্রথমোক্ত দু’টি দায়িত্ব খবরের কাগজের শিল্পপতি মালিক বা তার প্রতিনিধি হিসেবে পরিবারের
অপর কেউ পালন করছেন।
শিল্পপতিরা খবরের কাগজের মালিকানা
ও প্রকাশকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় ব্যবসায়িক স্বার্থ বিঘিœত হবে এ অজুহাতে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন ও তথ্যসমৃদ্ধ বিশ্লেষণাত্মক নিবন্ধ
প্রকাশে নিজেদের নিবৃত্ত রাখছেন।
খবরের কাগজের মূল আয় আসে বিজ্ঞাপন
হতে। এই বিজ্ঞাপন সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দিয়ে থাকে। সরকারি বিজ্ঞাপন
বিতরণের ক্ষেত্রে নীতিমালা থাকলেও দেখা যায় যেসব খবরের কাগজ সরকারের গুণকীর্তনে ব্যস্ত
তাদের অন্য খবরের কাগজকে বঞ্চিত করে অধিক হারে বিজ্ঞাপন দেয়া হয়। বেসরকারি বিজ্ঞাপনের
ক্ষেত্রে সরকারি নীতিমালাসংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা না থাকলেও বিজ্ঞাপনদাতা শিল্পমালিকের
ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে থাকে তিনি কোন ধরনের খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দেবেন। এ ক্ষেত্রে
বিজ্ঞাপনদাতা শিল্পমালিকের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থেকে থাকলে খবরের কাগজ কর্তৃপক্ষের
রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনা প্রাধান্য পায়।
তা ছাড়া কিছু কিছু খবরের কাগজ
ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন যেমন- বাড়ি ভাড়া, বাড়ি বিক্রয়, পড়াতে চাই, পাত্র-পাত্রী চাই, হারানো বিজ্ঞপ্তি, গাড়ি বিক্রয়, জমি বিক্রয় প্রভৃতি থেকে উল্লেখ্যযোগ্য
পরিমাণ অর্থ আয় করে থাকে। ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনদাতা সাধারণত পত্রিকার
বহুল প্রচারণার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে থাকে।
খবরের কাগজের বিক্রয়লব্ধ অর্থ
কাগজ প্রকাশের সামগ্রিক ব্যয়ের কিয়দংশ নির্বাহ করে। অবশিষ্ট বেশির ভাগ ব্যয়ের জন্য
বিজ্ঞাপনকে অবলম্বন হিসেবে দেখা হয়।
আমাদের দেশে দুই ধরনের খবরের
কাগজ রয়েছে। এর একটি হলো ডান ধারার খবরের কাগজ আর অপরটি হলো বাম ধারার খবরের কাগজ।
এর বাইরে একটি মধ্যম ধারার সন্ধান পাওয়া যায় যাকে বলা হয় নিরপেক্ষ। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে
সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা বজায় রেখে খবরের কাগজ প্রকাশ অনেক সময় দুরূহ হয়ে ওঠে।
রাজনীতিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দলের
নীতি ও আদর্শের প্রতি সহানুভূতিশীল খবরের কাগজ পড়ার পাশাপাশি দলের ব্যর্থতা জানার
জন্য বিরোধীভাবাপন্ন খবরের কাগজ পড়ে থাকেন। রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা ক্ষমতায়
থাকাকালে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিভিন্ন কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় বিরোধীভাবাপন্ন
খবরের কাগজ পড়ে তারা জনসমর্থন অনুধাবন করা বা নিজেদের ব্যর্থতা সম্পর্কে ধারণা পেতে
পারেন। সফল রাজনীতিবিদেরা সবসময় বিরোধীভাবাপন্ন খবরের কাগজ অধিক মনোযোগসহকারে পড়ে থাকেন।
নিরপেক্ষ খবরের কাগজের আবেদন সার্বজনীন।
বেসরকারি টেলিভিশনের শতভাগ আয়
আসে বিজ্ঞাপন হতে। বর্তমানে বিভিন্ন শিল্পপতি দৈনিক খবরের কাগজের মতো বেসরকারি টেলিভিশন
চ্যানেলেরও মালিক। টেলিভিশনের অন্যান্য অনুষ্ঠানের তুলনায় টকশোর ব্যয় অনেক কম। কিন্তু
দর্শকপ্রিয়তা অন্য যেকোনো অনুষ্ঠানের তুলনায় টকশোর অনেক বেশি। তাই বলে সব টকশো এবং
সব আলোচকের গ্রহণযোগ্যতা একই ধরনের নয়।
দুর্নীতি, অপশাসন, ব্যর্থতা প্রভৃতি কারণে সরকারের জনপ্রিয়তা কমা সত্ত্বেও যদি সরকারের
পক্ষাবলম্বনে নিবন্ধ লেখা ও টেলিভিশন টকশোতে বক্তব্য প্রদান করা হয় তা পাঠক বা দর্শকপ্রিয়তা
পায় না। নিরপেক্ষ লেখক ও আলোচকের গ্রহণযোগ্যতা সবসময় পক্ষপাতদুষ্টু লেখক ও আলোচকের
চেয়ে অধিক হয়ে থাকে।
খবরের কাগজ ও বেসরকারি টেলিভিশনের
মালিকানার সাথে শিল্পোদ্যোক্তারা সম্পৃক্ত হওয়ার পর থেকে তাদের অনেকের কাছে বস্তুনিষ্ঠ
ও তথ্যনির্ভর সংবাদ ও নিবন্ধের চেয়ে ব্যবসায়িক স্বার্থ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর
এই ব্যবসায়িক স্বার্থ দেখতে গিয়ে অনেক সময় জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যনির্ভর
সংবাদ ও নিবন্ধ অযাচিত হস্তক্ষেপে ছাপার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে দেখা যায়।
সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে
এমন অনেক কর্ণধার রয়েছেন যারা সরকারি ও বেসরকারি বিজ্ঞাপনকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখেন।
এদের কেউ দুর্নীতিতে নিমগ্ন হলে তাদের ব্যাপারে সংবাদ প্রকাশ, নিবন্ধ লেখা বা টেলিভিশন টকশোতে আলোচনা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অপারগতায় সম্ভব
হয়ে ওঠে না, যা প্রকারান্তরে দুর্নীতি প্রতিপালনে সহায়ক হয়।
আমাদের দেশে বর্তমানে দুর্নীতি
সর্বগ্রাসী রূপ ধারণ করেছে। এ দুর্নীতির কারণে আমাদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে।
আমরা হাতখুলে লিখতে ও মুখফুটে বলতে পারলে দুর্নীতির মাত্রা বহুলাংশে কমানো সম্ভব। দুর্নীতি
কমানো গেলে আমরা অতি অল্প সময়ে জাতি হিসেবে যে একটি সম্মানজনকপর্যায়ে পৌঁছে যাবো সে
ব্যাপারে কারো মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই। তাই দুর্নীতি নির্মূলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়িক স্বার্থে
আবদ্ধ না হয়ে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে সবার একাত্ম হয়ে ভূমিকা গ্রহণের কঠিন সিদ্ধান্ত
নিতে হবে। আর তাতেই নিহিত রয়েছে দেশ ও জাতির মঙ্গল।
একজন সাংবাদিক, নিবন্ধ লেখক বা কলামিস্ট এবং টকশোর আলোচক যদি হাতখুলে লিখতে আর মুখফুটে বলতে
না পারেন তবে পাঠক ও দর্শক বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ এবং তথ্যসমৃদ্ধ বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধ পাঠ
থেকে বঞ্চিত হবেন। অপর দিকে ঠিক তেমনি সুষ্ঠু, সুন্দর ও নিরপেক্ষ আলোচনা
উপভোগে ব্যর্থ হবেন। সব ক্ষেত্রেই লেখক, আলোচক ও পাঠকের লেখার, বলার ও জানার অপূর্ণতা থেকে যাবে যা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি অজানাকে জানার
আগ্রহে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা দেবে।
ইকতেদার আহমেদ
এতে সদস্যতা:
পোস্টগুলি (Atom)
