বৃহস্পতিবার, ১৬ অক্টোবর, ২০১৪

‘চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায়’


প্রথম শহীদ মিনারটি উদ্বোধন করেছিলেন সুসাহিত্যিক-সাংবাদিক আবুল কালাম শামসু উদ্দিন। ভাষা আন্দোলনের সূচনা এবং নেতৃত্বে ছিল তমদ্দুন মজলিস। ইংরেজ আমলে যিনি লিখিত প্রস্তাব রেখেছিলেন বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে তার নাম সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী। সময় তখন ১৯২১ সাল। যে পত্রিকাটি ভাষা আন্দোলনকে বেগবান করেছিল সে পত্রিকাটির নাম ‘সৈনিক’। সম্পাদক ছিলেন আবদুল গফুর এবং শাহেদ আলী। তমদ্দুন মজলিসের মুখপাত্র ছিল এটি। রাষ্ট্র-ভাষার প্রশ্নে প্রথম পুস্তিকাও প্রকাশিত করে এরা। যার শিরোনাম ছিল ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু?’ লেখক ছিলেন অধ্যাপক কাজী মোতাহের হোসেন এবং আবুল মনসুর আহমদ। প্রকাশক, প্রচার বিভাগ তমদ্দুন মজলিস ১ম সংস্করণ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭ ইং। উল্লেখিত ব্যক্তি এবং সংগঠন কোনটিই তথাকথিত প্রগতিপন্থিদের সাথে যুক্ত ছিল না। ভাষা আন্দোলনের নিরপেক্ষ ইতিহাস এমন সত্যটি উন্মোচিত করে। তাছাড়া ভাষা-শহীদদের মূল নায়কদের কেউ বাম রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন এ রকম তথ্যও কোথাও পাওয়া যায় না। এরপরও কবুল করতেই হয় ভাষা-শহীদদের স্মরণে নির্মিত শহীদ মিনার সমগ্র দেশবাসীর আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক। কোনো গোষ্ঠী বা শ্রেণির ইজারাদারিত্বে বা দখলী স্বত্বে এই প্রাঙ্গণকে আটকে রাখা মোটেও শোভন বা বিবেচনাপ্রসূত নয়। এরপরও কেউ কেউ অবিবেচনায় জড়িয়ে যাচ্ছে। অন্যায়-অসভ্যতাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। শহীদ মিনারে কারা যাবে কারা যাবে না সেই খবরদারী তারা করতে চাচ্ছে জবরদস্তি। এমন ‘পাওয়ার অব এটর্নি’ ওরা কোত্থেকে পেল? শহীদ মিনারতো কারো একক সম্পত্তি নয়। সমগ্র দেশবাসীর, জনগণের।
জটিলতাটি উঠে এসেছে সম্প্রতি। বিষয়টি জটিল নয় তারপরও ঘোলাটে করার পাঁয়তারা করছে অতিক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠী। শিক্ষাবিদ সমাজ বিজ্ঞানী পিয়াস করিম ইন্তেকাল করেছেন গত ১৩ অক্টোবর। যার সত্য এবং সাহসী বক্তব্য বিবেকবান মানুষজনদের মুগ্ধ করতো। তার লাশ শহীদ মিনারে রাখা হবে। তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাবে জনগণ। এমন একটি সিদ্ধান্ত ঘোষণা তার ভক্তগণ এবং পরিবারের। এই ইচ্ছা এবং আয়োজন হতেই পারে। হচ্ছেও হামেসা। প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে ব্যবহৃত হচ্ছে শহীদ মিনার। গান-বাজনা, পূজা-অর্চনায়ও যে প্রাঙ্গণ মুখরিত হয় সেখানে পিয়াস করিম নিষিদ্ধ হবে কেন ? তাও জীবিত নয় তার লাশ।
সবার মত এক হবে এমনতো কোন দিব্যি নেই। আমি যা ভাবব অন্যকেও তাই ভাবতে বাধ্য করাতে হবে এমন ইচ্ছা যারা পোষণ করে, হয় এরা মস্তিষ্ক বিকৃত নয়তো সভ্যতার আলো এখনো এদের অন্তরে প্রবেশ করেনি। গণতান্ত্রিক সমাজের রীতিনীতিও এমনটি নয়। এরকম ধারণা স্বৈর-মনোভঙ্গিকে উচ্চকিত করে। অসভ্যতাকেই বিস্তৃত করে। যারা ঘোষণা দিচ্ছে পিয়াস করিমের লাশ শহীদ মিনারে রাখা যাবে না তারা নিজেদের পরিচয়কে পুনরায় খোলাসা করল নতুনভাবে, নতুন মাত্রায়। দুএকটি বিবৃতিও প্রকাশ পেয়েছে  পত্রিকায় ছাত্র-জনতার নামে। এরা ছাত্রসমাজ বা জনতার কত শতাংশ তা অবশ্য খোলাসা করা হয়নি। উশৃঙ্খল-বিশৃঙ্খল পরিবেশকে যারা প্রণতি জানায় এদের সংখ্যা শুদ্রই হয়। তাছাড়া পশ্চাতে মুরুব্বি থাকলে তো কথাই নেই। তখন শহীদ মিনার কেন সমগ্র দেশ দখলে আনতে অসুবিধা থাকার কথা নয়। এমনটাই যেন ঘটতে যাচ্ছে বা ঘটানো হচ্ছে পিয়াস করিমের (লাশ) বেলায়। পিয়াস করিমের অপরাধ (?) ছিল তিনি মিথ্যার মুখোশ উন্মোচন করতে দ্বিধা করতেন না।  অন্যায় ও অপশাসনের বিপক্ষে অবস্থান নিতেন। বিদ্বেষ বিভ্রান্তিকে ঘৃণা করতেন। এই সু এবং সাহসী আচরণই পিয়াস করিমকে একটি শ্রেণীর কাছে শত্রু তালিকায় তুলে দিয়েছে। যে শ্রেণীটি গণতন্ত্রের আলখেল্লা জড়ালেও অভ্যন্তরে ভিন্ন মতকে ঘৃণা করে প্রচ-ভাবে, ভয়ও করেন। ভিন্ন মতের কারণেই হয়তো পিয়াস করিম ওদের শত্রু। ভয়ের বহিঃপ্রকাশও হতে পারে এ জাতীয় ওচাটন-উদ্যোগ। বিশ্ববিদ্যায় কর্তৃপক্ষও না রাজি জানিয়েছেন পিয়াস করিমের স্ত্রীর আবেদনের প্রেক্ষিতে। যদিও পিয়াস করিমের স্ত্রীও শিক্ষিকা। তাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। পত্রিকায় এসেছে এমন খবর। অর্থাৎ পিয়াস করিমের লাশ শহীদ মিনারে আনা যাবে না, রাখা যাবে না। ওদের মতে এতে করে নাকি শহীদ মিনার অপবিত্র হয়ে পড়বে। ঘৃণা কতটা প্রবল হলে ধারণাকে প্রভাবিত করে এমন কুৎসিতভাবে।
এরি মধ্যে পুলিশ ডেকেছে কর্তৃপক্ষ। বিবৃতি দানকারীরা তো ইতোমধ্যে শহীদ মিনারের আশপাশে অবস্থান নিয়েছে, মৃত পিয়াস করিমকে প্রতিহত করবে এ উদ্দেশে। কারণ জীবিত পিয়াস করিম ছিল অপ্রতিরোধ্য। তাই এই অভিনব ব্যবস্থা। পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে এসব খবর, কয়েকদিন থেকেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শহীদ মিনারের জিম্মাদার। তাদেরকে বৈরী করে কোন কিছু করাও সঠিক নয়। আপাত নজরে তাই মনে হয়। কিন্তু অতীত ইতিহাস টানলে তো ভিন্নচিত্র হাজির হবে। এই মিনারে তো কতদৃশ্যই মঞ্চস্থ হচ্ছে প্রায়শই। কতটি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের জ্ঞ্যাতে আর কটা অজ্ঞ্যাতে হয়েছে এর হিসাব কি তাদের কাছে আছে। অন্যগুলো যদি নির্বিঘেœ সমাধা হতে পারে পিয়াস করিমের বেলায় এতটা রুদ্রমূর্তি কেন? এখানে তো এমন কিছুই ঘটার কথা নয় যাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে। পিয়াস করিমের লাশ রাখা হবে, সর্বস্তরের মানুষ শ্রদ্ধা জানাবে, ক’দিন আগেও ভাষা মতিনের লাশের বেলায় যা হয়েছে। অন্যান্যের বেলায়ও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। বিপত্তি কেবল পিয়াস করিমের বেলায়। আসলে পিয়াস এখানে মুখ্য নয়, মুখ্য তার চিন্তা-চেতনা। মতামত ভিন্ন হলেই কি তাকে অচ্ছুৎ গণ্য করতে হবে? বিশ্ববিদ্যালয় দেশের একটি সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান। এখান থেকে এ জাতীয় নিচু মনোভঙ্গি দেশের বিবেকবান মানুষ প্রত্যাশা করে না। যে প্রাঙ্গণে শিক্ষার আলো এবং ভব্যতার বিচ্ছুরণ হবার কথা সে প্রাঙ্গণ থেকে সেই অপ্রত্যাশিত সংবাদটি ঘোষিত হল। যে ঘোষণাতে বিবেক-বিবেচনার লেশমাত্র অবশিষ্ট নেই। এটি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অবজ্ঞা-অবহেলারই নামান্তর। পিয়াস করিম কি এতটাই অবহেলার পাত্র ছিলেন?
পিয়াস করিমের লাশ শহীদ মিনারে আনলে বা রাখলে তার ইজ্জত শতগুণ বৃদ্ধি পাবে আর না আনলে বা না রাখা হলে চন্দ্রসূর্য অশুদ্ধ হয়ে যাবে এমন তো নয়। বরং যারা বা যেসব প্রতিষ্ঠান প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে এ বিষয়ে, তারাই ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবে যে কোন বিবেচনায়। পিয়াস করিমের মতের সাথে শাসকশ্রেণীর লেজুড়বৃত্তি করে সেই বুদ্ধিজীবী-বুদ্ধিব্যবসায়ীদের বেমিল ছিল। থাকতেই পারে। সবার মত এক তালিকায় উঠে আসবে এমন তো নয়। জগতের কোন রীতিতেই একে সারিবদ্ধ করা যায় না। এরপরও কতিপয় স্বার্থ-শিকারী মানুষ ভিন্ন মত শুনলেই রুষ্ট হন, ত্যাক্ত হন। এ ত্যাক্ততা এখন বাংলাদেশের কিছু মানুষের মনোজগতে। এরা শাসকশ্রেণীর আশ্রয়পুষ্ট হওয়ায় দুর্দমনীয়, আচারে ব্যবহারে। পিয়াস করিমকে নিয়ে ক’দিন যাবত যা ঘটছে সেসব ব্যাপারে ওরা একেবারেই শীতল। ওদের এই শীতলতা বিবেকবান মানুষকে বিস্মিত করে। তাদের বেলায়ও যে আগামীতে এমন ঘটতে পারে না বা ঘটবে না তা কি করে চিন্তার বাইরে রাখা যায়? কবি নজরুল বোধ হয় এমন বিচিত্র চরিত্রের মানুষদের উদ্দেশ্য করে লিখেছিলেন ‘চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায়/আজিকে যে রাজাধিরাজ কাল সে ভিক্ষা চায়।’
সাজজাদ হোসাইন খান

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads