মঙ্গলবার, ৯ ফেব্রুয়ারী, ২০১৬

ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে!


একটি সমাজের শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য যা কিছু প্রয়োজন, তার সব কিছু একে একে ধ্বংস করে দিচ্ছে সরকার। ভেঙে দিচ্ছে আইন-কানুন, প্রশাসন, বিচার বিভাগসহ প্রতিটি প্রতিষ্ঠান। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে বিরোধী দল দমনের অপকর্মে নিয়োজিত করতে করতে তাদের এক ভয়াবহ দানব বাহিনীতে পরিণত করেছে। বিচারের বাণী কাঁদছে নীরবে নিভৃতে। বিপন্ন মানুষের আশ্রয় চাইবার, বিপদে সাহায্য চাইবার সকল জায়গা সরকার ভেঙে দিয়েছে। আমরা সন্তানদের শিখিয়েছি, বিপদে পড়লে দ্রুত পুলিশের কাছে গিয়ে আশ্রয় নেবে। এখন শেখাই, খবরদার ভুলেও পুলিশের আশপাশে যাবে না। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছেলে দেখলাম একটি শার্ট কিনে এনেছে, যার কোনো পকেট নেই। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবার সময় ঐ শার্টটি ইন না করে প্যান্টের ওপর ঝুলিয়ে পরলো। তার ওপর চাপালো একট ব্লেজার। আমি বললাম, একি ড্রেস। প্যান্ট ইন কর। তার ওপর ব্লেজার পর। ছেলেটি হাসলো। বলল, এখন এটাই স্টাইল। বললাম কেন। সে অবলীলায় বললো, যাতে পুলিশ শার্টের পকেটে ইয়াবা ঢুকিয়ে দিয়ে আটক করতে না পারে। আর প্যান্টের পকেটে ঢুকাতে গেলে যাতে শার্টের নীচের অংশ দিয়ে প্যান্টের পকেট ঢেকে চীৎকার দিতে পারি।
এখন পুলিশ দেখলে ভয়, র‌্যাব-বিজিবি দেখলে ভয়, এমন কি আনসার দেখলেও ভয়। আর রাত এগারোটার পর বাসা থেকে বের হতে ভয়। তখন সরকারি সান্ত্রীর দল শিকারের সন্ধানে রাস্তাঘাটে ঘুরতে থাকে। বিপদ আবার এক ধরনের নয়। ১৯৭১ সালে যেমন সন্ধ্যা হলেই মিলিটারির ভয়ে লোকজন সব ঘরে ঢুকে পড়ত, এখনও তেমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। পায়ে হেঁটে ফিরছেন, পুলিশের ভয়। রিকশায় ফিরছেন, পুলিশের ভয়। স্কুটারে ফিরছেন, পুলিশের ভয়। এর ওপর সঙ্গে যদি কোনো নারী আত্মীয়-স্বজন থাকে তাহলে আরও ভয়। গত মাস দুয়েকের মধ্যে ঘটেছে এরকম সব ঘটনা। আগেও পুলিশের এই বাড়াবাড়ির ঘটনা প্রায় প্রতিদিনই ঘটেছে, এখনও নিয়মিত ঘটছে। কোনো কিছুই এর রাশ টেনে ধরতে পারছে না। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রশ্রয় দিচ্ছে, সরকার প্রশ্রয় দিচ্ছে। আর অবিরাম খাবি খাচ্ছে সাধারণ মানুষ।
শুরু করা যায় বাংলাদেশ ব্যাংকের জনসংযোগ বিভাগের কর্মকর্তা গোলাম রাব্বিকে দিয়ে। রাত এগারোটার দিকে গোলাম রাব্বি মোহাম্মদপুর এলাকার একটি এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলে বাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন। কিন্তু বুথ হতে বের হতেই তাকে শার্টের কলার চেপে নিয়ে যাওয়া হয় সংশ্লিষ্ট থানার  এসআই রফিকের কাছে। তিনি বলতে থাকেন যে, তার কাছে ইয়াবা আছে। তাকে সার্চ করতে হবে। রাব্বি ব্যাপারটা বুঝতে পেরে নিজেকে সার্চ করতে দিতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি তার পরিচয় দেন। তিনি ছাত্রলীগের নেতাদের পরিচয় দেন। কার্ড দেখান। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির পরিচয় দেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের পরিচয় দেন। কিন্তু এসআইয়ের দাবি, তাকে পাঁচ লক্ষ টাকা না দিলে ক্রস ফায়ারে দিয়ে মোহাম্মদপুর ভেড়িবাঁধে ফেলে দেওয়া হবে। রাব্বিকে তুলে নেওয়া হয় পুলিশ ভ্যানে। সেখানে তাকে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয় ছয় ঘণ্টা ধরে। মাথায় হাঁটুতে পায়ে পাছায় নির্মমভাবে পেটানো হয়। যে ভাষায় সারাক্ষণ গালিগালাজ করা হয়, তা ভাষায় প্রকাশ করার নয়। পথে পথচারি, রিকশাযাত্রী, যাকে পেয়েছে, তাকেই আটক করে তাদের টাকা পয়সা ছিনিয়ে নিয়েছে ঐ এসআই রফিক। যে টাকা দিতে পারেনি, তাতে লকআপে ঢুকিয়েছে। রাব্বি শেষ পর্যন্ত তার ছাত্রলীগের বন্ধুবান্ধবকে খবর দিতে সক্ষম হন। তারা এসে হাজির হন ঐ এলাকায়। পরে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। তিনি ভয়ে আতঙ্কে প্রলাপ বকতে থাকেন। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু মোহম্মদপুর থানার ওসি গাঁটকাটার মতো এক আজব কথা বলে বসেন। তিনি বলেন, রাব্বি পুলিশের কাজে অসহযোগিতা করেছিল। তাকে পুলিশ সার্চ করতে চেয়েছিল, কিন্তু তিনি তাতে বাধা দিয়েছেন। অতএব রাব্বি অনেক বড় ‘অপরাধী’। তাকে আটকে রাখা দোষের কিছু হয়নি।
আর মহাআশ্চর্য ঘটনা এই যে, রাব্বি থানায় মামলা দায়ের করতে চাইলে সে মামলা গ্রহণ করেননি মোহাম্মদপুর থানার ওসি। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান দোষী এসআই’র শাস্তি দাবি করে আইজিপিকে চিঠি দেন। তাতেও কোনো  কাজ হয় না। তখন রাব্বি মামলা করার জন্য হাইকোর্টে যান। হাইকোর্ট তার মামলা গ্রহণ করার জন্য থানাকে নির্দেশ দেন। বিপত্তি সেখানেই বাধে। এক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ খুব সঙ্গতভাবেই আশা করতে পারে যে, রাষ্ট্র দাঁড়াবে বিপন্ন মানুষের পাশে। নির্যাতনকারীর পাশে নয়। কিন্তু না, রাষ্ট্রের এটর্নি জেনারেল গিয়ে দাঁড়ালেন এসআই রফিকের পাশে। তিনি ফাইল বগলে নিয়ে ছুটলেন চেম্বার বিচারপতির আদালতে। উদ্দেশ্য, রাব্বির মামলা যেন গ্রহণ করা না হয়। কী ভয়ঙ্কর নির্মম আচরণ রাষ্ট্রের এটর্নি জেনারেলের। চেম্বার জজ এটর্নি জেনারেলের আবেদনের প্রেক্ষিতে মামলা নেওয়ার হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করে দিলেন। পরে অবশ্য আপিল বিভাগ হাইকোর্টের আদেশ বহাল রেখে মামলা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে ঢাকা দক্ষিণ মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের সুপারভাইজার বিকাশ দাসের ক্ষেত্রেও। বিকাশ খুব ভোরে মোটর সাইকেলে করে তার কাজে যাচ্ছিলেন। পথে সাদা পোশাকের পুলিশ তার পথ রোধ করে। তিনি ভেবেছিলেন ছিনতাইকারীর কবলে পড়েছেন। তাই মোটর সাইকেল ঘুরিয়ে আত্মরক্ষার জন্য পালাবার চেষ্টা করছিলেন। তখন পুলিশ তাকে আটকে বেধড়ক পিটিয়ে সংজ্ঞাহীন করে ফেলে। সুইপাররা পুলিশের পায়ে ধরে জানায় যে, বিকাশ তাদের অফিসার। তাকে যেন না মারা হয়। পুলিশ তাদের কোনো কথা শোনেনি। তিনি হাসপাতালে কোমায় ছিলেন।
এরপর পুলিশ উত্তরায় এক ব্যবসায়ীকে আটক করেছিল রাত এগারোটায়। ঐ ব্যবসায়ী তার এক নারী বন্ধুকে নিয়ে ফিরছিলেন। এক এসআই’র নেতৃত্বে টহল পুলিশ তাদের একটি গাড়িতে করে তুলে নেয়। প্রথমে পুলিশ তাদের ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করে। বলে, পাঁচ লক্ষ টাকা না দিলে তারা তাদের কথা পরিবারের কাছে ফাঁস করে দেবে। তখন ঐ ব্যবসায়ী তাদের কথা বরং পরিবারকে জানানো অনুরোধ করেন। তখন পুলিশ তাদের নিয়ে ছয় সাত ঘণ্টা ধরে রাস্তায় ঘুরতে থাকে এবং যেভাবেই হোক পাঁচ লক্ষ টাকা দেওয়ার দাবি জানাতে থাকে। না হলে ব্যবসায়ীর বান্ধবীকে পতিতা বলে চালান দেয়ার হুমকি দিতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ভোর রাতে ঐ ব্যবসায়ী তার এক বন্ধুকে ফোন করেন। ঐ বন্ধু আড়াই লক্ষ টাকা নিয়ে এসে এসআইকে দিয়ে আটক বন্ধুকে ছাড়িয়ে নিয়ে যান। পরে ঐ ব্যবসায়ী পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে এ বিষয়ে অভিযোগ করলে ঘটনার সত্যতা মেলে এবং সংশ্লিষ্ট পাঁচ পুলিশকে সাসপেন্ড করা হয়। পুলিশের এ ধরনের ব্লাকমেইলিংয়ের হাত থেকে রেহাই পাননি এসপির ছেলে থেকে ম্যাজিস্ট্রেট পর্যন্ত।
পরের ঘটনা মীরপুর এলাকার। সেখানে কয়েক দিন আগে পুলিশের আগুনে পুড়ে মারা গেছেন চা বিক্রেতা বাবুল মাতব্বর। গলির মোড়ে এই চা বিক্রি করেই চলে তার সংসার। তার কাছে এসে চাঁদা দাকি করে পুলিশের একটি টহল দল। কিন্তু চাঁদা দিতে অপারগতা প্রকাশ করে দরিদ্র বাবুল। তা নিয়ে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে চায়ের প্রজ্বলিত কেরোসিনের চুলাটি লাথি মেরে পুলিশ তার গায়ের ওপর ফেলে দিলে কেরোসিন ছিটিয়ে পড়ে তার সারা শরীরে আগুন ধরে যায়। তাকে হাসপাতালে নিলে ডাক্তাররা জানান, বাবুলের শরীরের ৯৫ শতাংশই পুড়ে গেছে। পরদিন মারা যান চা বিক্রেতা বাবুল। তিনিই ছিলেন ঐ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। যথারীতি কয়েকজনকে সাসপেন্ড করা হয়।
সর্বশেষ গত রোববার সন্ধ্যায় মীরপুরের পোড়াবস্তি সংলগ্ন বেলতলি মাঠে কয়েকজন মিলে আগুন পোহাচ্ছিল রিকশাচালক সাজু। এ সময় তিনজন পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে তাদের বেধড়ক পেটাতে শুরু করে। এরপর তাকে টেনে হিঁচড়ে পাশের বঙ্গবন্ধু সৈনিক ক্লাবে নিয়ে দ্বিতীয় দফা ব্যাপক মারধর করে। এসময় পুলিশ তার পায়ে শটগান ঠেকিয়ে গুলী করে। তারপর তাকে চিকিৎসার কথা বলে তিন ঘণ্টা ঘুরিয়ে একটি ক্লিনিকে ভর্তি করে রেখে চলে যায়। পরে তার পরিবার তাকে পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করেছে। তার পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুল অনেকাংশেই উড়ে গেছে। প্রথমে পুলিশ গুলীর কথা স্বীকার করলেও এখন বলছে মিস ফায়ার থেকে এই ঘটনা ঘটেছে। আরও ভয়াবহ আতঙ্কজনক ঘটনা ঘটছে গত দু’সপ্তাহ ধরে। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা সম্প্রতি দুটি ন্যায্য কথা বলেছেন। তার একটি হলো প্রশাসনিক বিভাগ বিচার বিভাগের ক্ষমতা কেড়ে নেবার চেষ্টা করছে। এ ব্যাপারে তিনি বিচার বিভাগ ও আইনজীবীদের সহযোগিতা চেয়েছেন। দ্বিতীয় কথা তিনি বলেছেন, অবসর নেওয়ার পর কোনো বিচারপতির রায় লেখা সংবিধান পরিপন্থী। তিনি আর এ ধরনের কোনো রায় গ্রহণ করবেন না। এখানে খুব সঙ্গতভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, বিচারপতি তার চাকরির মেয়াদ শেষে একজন সাধারণ নাগরিকে পরিণত হন। কারণ তখন তিনি আর শপথে থাকেন না। ফলে তিনি কোনো রায় লেখার অধিকার হারান। খুব সঙ্গত বিবেচনা। কারণ এর ফলে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের পয়সা খাওয়া বিচারপতি খায়রুল হকের দেয়া সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর রায় এমনিতেই বাতিলযোগ্য হয়ে পড়ে। কিন্তু প্রধান বিচারপতির এই পর্যবেক্ষণের পর আওয়ামী লীগের উকিল অ-উকিল নেতারা প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে একেবারে হামলে পড়েন। কালোবিড়াল খ্যাত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত তো প্রধান বিচারপতিকে একবারে শাসানি দিয়ে ছাড়লেন। সংসদেও প্রধান বিচারপতির এ বক্তব্য নিয়ে আওয়ামীরা তিক্ত আলোচনা করলেন।
প্রধান বিচারপতি সিনহা বিচারপতি শামসুদ্দিন আহমদ মানিকের অবসরে যাওয়ার বেশ আগেই তার যেসব রায় লেখা বাকি ছিল, সেগুলো লিখে অবসরে যাওয়ার জন্য মানিককে সময় দিয়েছিলেন। মানিক তার থোড়াই পরোয়া করেছেন। তিনি অবসরে গেছেন। অবসরে যাওয়ার আগেই তিনি আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সভা-সমাবেশে যোগ দিয়েছেন। তিনি অবসরে গিয়ে টকশোতে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে যা খুশি তাই বলছেন। খালেদার বাড়ি ঘেরাও করতে গেছেন অভিনেত্রী মন্ত্রী তারানা হালিমের সঙ্গে। তারপর তিনি কিছু রায় হাতে লিখে জমা দিয়েছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতিকে ডিনারে ডেকেছিলেন। তাতে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী, এটর্নি জেনারেল আর আইনমন্ত্রী। কিন্তু শামসুদ্দিন মানিক সর্বোচ্চ আদালতের বিরুদ্ধে তার  বক্তব্য প্রদান অব্যাহত রেখেছেন এবং সর্বশেষ তিনি বলেছেন, প্রধান বিচারপতির কোনো আদেশ তিনি মানবেন না। মানিক এখন আর বিচারপতি নেই। তিনি একজন সাধারণ নাগরিক। আমিও একজন সাধারণ নাগরিক। আমি যদি একথা বলতাম তা হলে নিশ্চয়ই আমার আদালত অবমাননা হতো। মানিকের বেলায় তা হবে না কেন? আইন আদালত চলুক তার নিজস্ব গতিতে। মানিককে তার কৃতকর্মের জন্য আইনের আওতায় আনা হবে, এটাই প্রত্যাশা।
ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী 
Reactions:

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads