বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০১৫

ঈদের প্রাক্কালে লাগামহীন অপরাধীরা


পবিত্র মাস রমযান শেষ হয়ে আসার পাশাপাশি এগিয়ে আসছে ঈদুল ফিতর। কিন্তু মানুষের কষ্ট ও ভোগান্তি এখনো বাড়ছেই, পাল্লা দিয়ে অবনতি ঘটছে সামগ্রিক পরিস্থিতিরও। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি থেকে শুরু করে বাড়ি যাওয়ার টিকেটের ব্যবস্থা পর্যন্ত সব কিছুর জন্য মানুষকে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হচ্ছে। শিশুদের পোশাকসহ ঈদের নতুন কাপড় কিনতে গিয়ে মুখ তো শুকিয়ে যাচ্ছেই, সেই সাথে রয়েছে যানজটের প্রতিদিনকার উৎপাত। গভীর রাত পর্যন্ত রাজধানীতে সব যানবাহনই ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকছে। এখানেও শেষ হচ্ছে না কষ্ট ও ভোগান্তির। এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মলম-অজ্ঞান-টানা পার্টিসহ নানা নামের ছিনতাইকারী ও চাঁদাবাজরা। অভিজাত বিপণি বিতান ও বাণিজ্যিক এলাকায় শুধু নয়, আবাসিক এলাকা থেকে শুরু করে রাস্তাঘাটে পর্যন্ত দুর্দান্ত দাপটে চলছে তাদের দৌরাত্ম্য। বিভিন্ন দৈনিকের রিপোর্টে জানানো হয়েছে, রাজধানীর অলিতে-গলিতে পর্যন্ত ছিনতাইয়ের ধুম পড়ে গেছে। ছিনতাই হচ্ছে এমনকি থানার আশপাশেও। কিন্তু পুলিশ কিছুই করছে না। জিজ্ঞাসা করা হলে সে একই পুলিশের কর্তাব্যক্তিরা বরং ঘোষণার সুরে জানিয়ে দিচ্ছেন, তাদের চোখ-কান সবই নাকি খোলা রয়েছে! অন্যদিকে ছিনতাইকারীরা যখন-তখন এবং যেখানে-সেখানে শুধু টাকা-পয়সা, অলংকার ও মোবাইলের মতো মূল্যবান সামগ্রীই কেড়ে নিচ্ছে না, স্ত্রীর সামনে স্বামীকে হেনস্থা করছে। স্বামীর সামনে স্ত্রীর গায়ে হাত দিচ্ছে। ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় আক্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্তরা মানসিক বিপর্যয়ের শিকার হচ্ছেন। মূলত এই ভীতির কারণে এবারের রমযানে রাজধানীবাসী মনের মতো ঈদের কেনাকাটা করতে পারেননি, অনেকে এমনকি পছন্দের মার্কেট বা শপিং মলেই যেতে পারেননি।
ওদিকে ছিনতাইয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চাঁদাবাজিও সকল সীমা ছাড়িয়ে গেছে। আগে চাঁদাবাজরা প্রধানত বড় বড় ব্যবসায়ী-শিল্পপতি ও ঠিকাদারদের পেছনে লেগে থাকতো, আজকাল পাড়া মহল্লার দোকানদার ও ফুটপাতের ক্ষুদে ব্যবসায়ী থেকে চাকরিজীবী পর্যন্ত কাউকেই ছাড় দিচ্ছে না তারা। অর্থাৎ জনগণের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই চাঁদাবাজদের টার্গেট হচ্ছেন। যারা দিচ্ছেন না বা সঙ্গতি না থাকায় দিতে পারছেন না তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীরা। অস্ত্রের মুখে ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে তারা। সাধারণ মানুষের বাসাবাড়িতেও হামলা ও ভাঙচুর চালাচ্ছে তারা, অনেকের সন্তানকে জিম্মি করেও টাকা আদায় করছে। খবরে জানা যাচ্ছে, পাড়া মহল্লার উঠতি চাঁদাবাজরা ভারতে বসবাসরত বিভিন্ন শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম ব্যবহার করেও ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। চাঁদার অর্থ পাওয়ার জন্য তারা বিশেষ করে ‘বিকাশ’-এর কোনো অ্যাকাউন্ট নাম্বার জানিয়ে দিচ্ছে। ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়া লোকজন ‘বিকাশ’-এর কোনো কেন্দ্রে গিয়ে টাকা জমা দিয়ে আসছে। কারো পক্ষেই চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করা বা খুঁজে বের করা সম্ভব হচ্ছে না। নিজের এবং স্ত্রী-সন্তানদের জীবন ও মানসম্মান বাঁচানোর জন্য হলেও মানুষকে চাঁদা দিয়ে রেহাই পেতে হচ্ছে।
অন্যদিকে মানুষের এই নানামুখী বিপদ, কষ্ট আর ভোগান্তির মধ্যেও সরকার এখনো নির্লিপ্তই রয়ে গেছে। পুলিশের বড় বড় কর্তা ব্যক্তিরা মাঝে-মধ্যে ধমক দিয়ে উঠলেও যাদের উদ্দেশে ধমক দেয়া সেই চাঁদাবাজ-ছিনতাইকারী ও সন্ত্রাসীরা কিন্তু কোনো এলকাতেই বাধার মুখে পড়ছে না। কারণ, অভিযোগ রয়েছে, নগদ লেনদেনের বিনিময়ে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের মধ্যস্থতায় পুলিশকে তারা আগেই ‘বন্ধু’ হিসেবে পেয়েছে। ঘটনাপ্রবাহে অন্য একটি বিশেষ বাহিনীর নামও জড়িয়ে পড়ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, সব কিছুর দায়দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত সরকারের ওপরই বর্তাচ্ছে। জনগণের প্রতি কর্তব্য পালনে সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে জনমনে। সরকারের কোনো তৎপরতা চোখে পড়ছে না বলে অনেকে এমনকি ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের দিকেও আঙুল তুলতে বাধ্য হচ্ছেন। তারা মনে করেন, ক্ষমতাসীনদের মদত ও যোগসাজশ না থাকলে কারো পক্ষেই এভাবে ছিনতাই-চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস করতে পারার কথা নয়। অন্যদিকে ট্যাক্সদাতা ও ভোটার জনগণ সরাসরি লাঞ্ছিত, ক্ষতিগ্রস্ত ও ভীত-আতংকিত হলেও প্রতিটি বিষয়ে সরকার এখনো, ঈদুল ফিতরের প্রাক্কালেও প্রশ্নসাপেক্ষ অবস্থানই বজায় রেখেছে। অপরাধ প্রতিরোধে তাই র‌্যাব ও পুলিশকেও তৎপর দেখা যাচ্ছে না। অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বরং আশংকা করা হচ্ছে, সামনের বাকি কয়েকদিনে অপরাধ আরো বেড়ে যেতে পারে। আমরা মনে করি, ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে পবিত্র রমযান মাসে এবং মুসলমানদের সবচেয়ে বড় উৎসব ঈদুল ফিতরের প্রাক্কালে মুসলমানরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, এমন অবস্থা অবশ্যই চলতে পারে না। ঈদ উপলক্ষে মানুষ যাতে নির্বিঘ্নে মার্কেটে ও শপিং মলে যাতায়াত ও কেনাকাটা করতে পারে তার আয়োজন এখনই নিশ্চিত করা দরকার। ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে তো বটেই, পাড়া-মহল্লার চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকারের উচিত এখনই এসব বিষয়ে মনোযোগ দেয়া এবং পুলিশ ও র‌্যাবসহ সকল বাহিনীকে সততার সঙ্গে তৎপর করে তোলা।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Ads